বেলডাঙার এক যুবক ঝাড়খণ্ডে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। গ্রামে খবর পৌঁছোতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন গ্রামবাসীরা। শুক্রবার সকাল থেকে চলছে বিক্ষোভ।
ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা। দোষীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জাতীয় সড়ক অবরোধ, রেল অবরোধ এবং টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন গ্রামবাসীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশবাহিনী। তবে শুক্রবার সকাল পেরিয়ে গেলেও অবরোধ ওঠেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।
মৃত শ্রমিকের নাম আলাই শেখ (৩০)। তিনি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার অন্তর্গত সুজাপুর কুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে কয়েক মাস আগে ঝাড়খণ্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন আলাই। সেখানে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে গ্রামে খবর আসে—ঝাড়খণ্ডে নিজের ঘর থেকে আলাই শেখের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রশাসনের তরফে প্রাথমিক ভাবে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও, পরিবার এবং গ্রামবাসীদের দৃঢ় দাবি—আলাইকে নির্মম ভাবে পিটিয়ে খুন করার পর তাঁর দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই খবর গ্রামে পৌঁছাতেই শোক দ্রুত রূপ নেয় ক্ষোভে। শুক্রবার সকালে আলাইয়ের দেহ গ্রামে ফিরতেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বেলডাঙার ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে গ্রামবাসীরা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। একই সঙ্গে অবরোধ করা হয় বেলডাঙা রেল স্টেশনও। এর জেরে শিয়ালদহ–লালগোলা শাখায় একাধিক ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। যাত্রীদের চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। পাশাপাশি জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ থাকায় উত্তরবঙ্গ ও কলকাতাগামী যান চলাচলও কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য একাধিক বার গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা চালানো হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—দোষীদের গ্রেপ্তার এবং কড়া শাস্তির আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার দুপুরেই শেষ বার বাড়িতে ফোন করেছিলেন আলাই। মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। সেই কথোপকথন আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে পরিবারকে। মৃতের মা সোনা বিবি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “ছেলে ফোনে বলেছিল, যেখানে আছে সেখানে অবস্থা খুব ভাল নয়। খুব ভয়ে ভয়ে আছে। ঘর থেকে বেরোতে পারছে না। বলেছিল সুযোগ পেলেই বাড়ি ফিরবে। বুধবার দুপুর দুটোয় শেষ কথা হয়েছিল। তার পর আর ফোন ধরেনি। আমার ছেলে ভাতটুকুও খেতে পারেনি। ওরা ওকে খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছে।”
পরিবারের অভিযোগ, শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদের শ্রমিক হওয়ার কারণেই আলাইয়ের উপর অত্যাচার করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, আলাইয়ের কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া হয়েছিল। আইকার্ডে মুর্শিদাবাদের ঠিকানা দেখেই তাঁকে মারধর করা হয়। এই অভিযোগ ঘিরেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের অনেকেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধেও। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি—উভয় দলের বিরুদ্ধেই স্লোগান ওঠে বিক্ষোভস্থলে। এক বিক্ষোভকারী বলেন, “ছেলেটাকে আইকার্ড দেখাতে বলেছিল। মুর্শিদাবাদের ঠিকানা দেখেই ওকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। বাইরে কাজে গেলেই কেন মুর্শিদাবাদের মানুষ এই ভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন? আমরা কি ভারতের অংশ নই? মুর্শিদাবাদ একটা ঐতিহাসিক জেলা। আমরা দোষীদের ফাঁসি চাই।”
আর এক বিক্ষোভকারীর বক্তব্য, “মুখ্যমন্ত্রী নিজে আশ্বাস না দেওয়া পর্যন্ত আমরা অবরোধ তুলব না। নিজের দেশেই যদি সুরক্ষা না থাকে, তবে আমরা যাব কোথায়? আমাদের ছেলেদের বাইরে কাজ করতে যেতে হবে না—এমন ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।”
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এর আগেও বহু পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্যে গিয়ে হেনস্থার শিকার হয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই প্রশাসনিক স্তরে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। এবার আর চুপ করে থাকতে রাজি নন তাঁরা। আলাই শেখের মৃত্যু তাঁদের কাছে শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং গোটা জেলার সম্মানের প্রশ্ন।
এদিকে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। ঝাড়খণ্ড পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এই বিষয়টিই গ্রামবাসীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম নতুন কিছু নয়। কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে গিয়ে দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয় তাঁদের। কখনও কাজের জায়গায় দুর্ঘটনা, কখনও মজুরি না পাওয়ার অভিযোগ, আবার কখনও ভাষা ও পরিচয়ের কারণে হেনস্থা—সব মিলিয়ে তাঁদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আলাই শেখের মৃত্যু সেই কঠিন বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বেলডাঙার মতো শান্ত জনপদ কী ভাবে হঠাৎ রণক্ষেত্রের চেহারা নিল, তা বুঝতে গেলে এই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বঞ্চনার কথাও মাথায় রাখতে হবে। একের পর এক পরিযায়ী শ্রমিকের উপর অত্যাচারের খবর সামনে এলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই আজ পরিস্থিতি এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বর্তমানে বেলডাঙায় থমথমে পরিস্থিতি। জাতীয় সড়ক ও রেললাইন অবরোধ থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে। পুলিশি পাহারায় রয়েছে গোটা এলাকা। যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন সতর্ক নজর রাখছে। তবে গ্রামবাসীদের দাবি একটাই—আলাই শেখের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং কঠোরতম শাস্তি।
এই ঘটনার পর নতুন করে বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে ভারতের পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আলাই শেখের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং তা গোটা দেশের শ্রমব্যবস্থা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং সামাজিক সহাবস্থানের উপর গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জীবিকার সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবন যে কতটা অনিশ্চিত ও বিপন্ন, এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।
ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোর এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। কৃষিকাজ, নির্মাণ, কারখানা, হকারি, পরিষেবা ক্ষেত্র—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভিন রাজ্যের শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তবুও বাস্তবতা হল, এই শ্রমিকদের অধিকাংশই থেকে যান আইনি সুরক্ষা, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে। আলাই শেখের মতো মানুষরা দিনের পর দিন পরিশ্রম করেন, অথচ তাঁদের জীবন ও নিরাপত্তা যেন কারও অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকে না।
মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলি বহুদিন ধরেই পরিযায়ী শ্রমিক সরবরাহকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কাজের অভাবে বা স্বল্প আয়ের কারণে বহু যুবক ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু কিংবা কেরালার দিকে পাড়ি জমান। কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ কারখানার মজুর, কেউ হোটেলের কর্মী, আবার কেউ আলাই শেখের মতো ফেরিওয়ালা। জীবিকার তাগিদে নিজের ঘরবাড়ি, পরিবার, পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তাঁরা অজানা জায়গায় পা রাখেন—যেখানে ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, আর অনেক সময় মনোভাবও আলাদা।
এই ভিন্নতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে বিপদের বীজ। ভাষাগত সমস্যা, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দূরত্ব, আইনি জ্ঞানের অভাব এবং সামাজিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা সহজেই শোষণ ও হেনস্থার শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের কাজের কোনও লিখিত চুক্তি থাকে না, শ্রম দফতরের সঙ্গে কোনও নথিভুক্তি থাকে না, এমনকি অনেক সময় তাঁদের থাকার জায়গাটুকুও থাকে অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ।
আলাই শেখের ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ, শুধুমাত্র পরিচয়পত্রে মুর্শিদাবাদের ঠিকানা দেখেই তাঁর উপর অত্যাচার নেমে আসে। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়, তবে তা নিছক একটি অপরাধ নয়—এটি এক গভীর সামাজিক ব্যাধির ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন ওঠে, নিজের দেশের মধ্যেই কি মানুষ নিজের পরিচয়ের জন্য আক্রান্ত হবেন? জেলা, রাজ্য বা ভাষার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার এই প্রবণতা কি ক্রমশ বেড়েই চলেছে?
পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আইনগতভাবে কিছু ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। ইন্টার-স্টেট মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কমেন অ্যাক্ট থাকলেও বহু ক্ষেত্রেই তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বেশির ভাগ পরিযায়ী শ্রমিকই জানেন না তাঁদের অধিকার কী, কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, বা বিপদে পড়লে কার সাহায্য চাইতে হবে। এই অজ্ঞতাই তাঁদের আরও দুর্বল করে তোলে।
আলাই শেখের মৃত্যুর পর বেলডাঙায় যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা আসলে বহুদিনের জমে থাকা হতাশা ও বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। গ্রামবাসীদের ক্ষোভ শুধু একটি মৃত্যুকে ঘিরে নয়, বরং বারবার অবহেলিত হওয়ার অনুভূতিকে ঘিরে। তাঁদের প্রশ্ন—বাইরে কাজে গেলে কেন বারবার মুর্শিদাবাদের মানুষদের নিশানা করা হচ্ছে? প্রশাসন কি আদৌ তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও চাপ বাড়ছে। বিক্ষোভকারীরা তৃণমূল ও বিজেপি—উভয় দলের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ভোটের সময় রাজনীতিকরা আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবে পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষার প্রশ্নে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। রাজনৈতিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এই অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু আলাই শেখের মৃত্যুর পর তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
অন্য দিকে, প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। ভিন রাজ্যে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনার তদন্তে প্রায়ই রাজ্য প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা থাকে। ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মধ্যে সমন্বয় কতটা দ্রুত ও কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় রয়েছে। দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত এই সংশয় আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন অনেকেই।
পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গেলে শুধু আইন নয়, দরকার একটি সামগ্রিক কাঠামো। কাজের জায়গায় তাঁদের নথিভুক্তি, স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি, হেল্পলাইন, আইনি সহায়তা কেন্দ্র এবং সচেতনতা কর্মসূচি—এই সব কিছুর সমন্বয় জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থাগুলির অধিকাংশই নেই বা থাকলেও কার্যকর নয়।
আলাই শেখের শেষ ফোনালাপ আজ এক মর্মান্তিক সাক্ষ্য হয়ে উঠেছে। মায়ের কাছে তাঁর ভয় পাওয়ার কথা, বাড়ি ফেরার আকুতি—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, তিনি কোনও বিপদের আশঙ্কা করছিলেন। কিন্তু সেই বিপদের মোকাবিলা করার মতো কোনও সহায়ক কাঠামো তাঁর কাছে ছিল না। এই একাকীত্বই পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
এই ঘটনা সমাজকেও আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করায়। ভিন রাজ্যের মানুষ মানেই কি অপরিচিত বা অবিশ্বাস্য? কেন কাজ করতে আসা শ্রমিকদের এখনও অনেক জায়গায় সন্দেহের চোখে দেখা হয়? কেন তাঁদের সঙ্গে সহমর্মিতার বদলে বিদ্বেষ তৈরি হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে না পারলে ভবিষ্যতেও আলাই শেখের মতো আরও নাম খবরের শিরোনাম হয়ে উঠবে।
বেলডাঙায় যে আন্দোলন চলছে, তা হয়তো একদিন থেমে যাবে। রাস্তা খুলবে, ট্রেন চলবে, স্বাভাবিক জীবন ফিরবে। কিন্তু আলাই শেখের পরিবারের শূন্যতা কোনও দিন পূরণ হবে না। তাঁর মায়ের প্রশ্ন—“আমার ছেলে কি এই দেশের নাগরিক ছিল না?”—এই প্রশ্নের উত্তর যদি রাষ্ট্র ও সমাজ স্পষ্ট ভাবে না দিতে পারে, তবে এই ক্ষোভ থামবে না।
পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা শুধুমাত্র শ্রম দফতরের বিষয় নয়, এটি মানবিকতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে কাজ করতে যাওয়া মানুষদের যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে সেই উন্নয়নের দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, যার উপর দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতির গল্প বলা হয়।
আলাই শেখের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের পরিসংখ্যানের আড়ালে কত জীবন অনিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। আজ বেলডাঙার আকাশে-বাতাসে যে আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে, তা শুধু একটি গ্রামের নয়—তা গোটা দেশের পরিযায়ী শ্রমিক সমাজের মনের কথা। বিচার না হলে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে, এই আশঙ্কা আগামী দিনে আরও গভীর হবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হল নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। নইলে আলাই শেখের মৃত্যু শুধুই আরেকটি সংখ্যা হয়ে থেকে যাবে—আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যাবে আমাদের সমাজের নৈতিক অধিকারও।