মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে উৎসবের রঙ। ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে নানান রকমের পিঠে-পুলি, চলছে ধর্মীয় আচার ও সামাজিক মিলনমেলা। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে উৎসবমুখর রাজ্য।
মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলায় আবারও ফিরে এসেছে চেনা উৎসবের রঙ, আনন্দ আর ঐতিহ্যের আবহ। পৌষ মাসের শেষে সূর্যের উত্তরায়ণকে কেন্দ্র করে পালিত এই উৎসব বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে বহু দূরে, গ্রামাঞ্চলে মকর সংক্রান্তি এখনও এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলার রূপ নিয়েছে।
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে মকর সংক্রান্তি উদযাপিত হলেও, গ্রামবাংলায় এর প্রস্তুতি শুরু হয় আরও অনেক আগে থেকেই। বাড়ির মহিলারা আগেভাগেই চাল ধোয়া, শুকানো ও গুঁড়ো করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। খেজুর গুড় সংগ্রহ, নারকেল কোরা, দুধ জ্বাল দেওয়া—সব মিলিয়ে যেন গোটা গ্রামটাই এক উৎসবের রান্নাঘরে পরিণত হয়।
পিঠে-পুলি ছাড়া মকর সংক্রান্তির কথা কল্পনাই করা যায় না। পাটিসাপটা, দুধ পুলি, ভাপা পিঠে, চিতই পিঠে, নকশি পিঠে—নানান রকমের পিঠের সম্ভারে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়ি। এই পিঠে শুধু খাবার নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। বহু পরিবারে এখনও ঠাকুমা-দিদিমাদের শেখানো পুরনো রেসিপি মেনেই তৈরি হয় পিঠে-পুলি।
মকর সংক্রান্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিজীবনও। নতুন ধান ঘরে তোলার পর এই উৎসব পালনের মধ্যে কৃষকের আনন্দ ও স্বস্তি ফুটে ওঠে। অনেক গ্রামে এই দিনটি নতুন ফসলের উৎসব হিসেবেও উদযাপিত হয়। ক্ষেতের ধান, খামারের দুধ, খেজুর গাছের রস—সব মিলিয়ে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক নিঃশব্দ বার্তা বহন করে এই উৎসব।
ধর্মীয় দিক থেকেও মকর সংক্রান্তির গুরুত্ব অপরিসীম। ভোরবেলা গঙ্গা, দামোদর, অজয় কিংবা স্থানীয় পুকুর-নদীতে স্নান করে পুণ্য অর্জনের বিশ্বাস বহু মানুষের মধ্যে আজও অটুট। নদীয়া, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন গ্রামে এই উপলক্ষে ছোটখাটো ধর্মীয় আচার ও পুজোর আয়োজন দেখা যায়।
একই সঙ্গে মকর সংক্রান্তি সামাজিক মিলনেরও একটি বড় উপলক্ষ। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে যাওয়া, পিঠে খাওয়ানো, গল্প করা—এই সব কিছু মিলিয়ে গ্রামীণ সমাজে এক আলাদা বন্ধনের সৃষ্টি হয়। শহুরে জীবনের একাকীত্বের বিপরীতে গ্রামবাংলার এই সামাজিক সম্পর্ক আজও অনেকটাই অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
অনেক এলাকায় মকর সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মেলা বসে। এই মেলাগুলিতে গ্রামীণ হস্তশিল্প, খেলনা, মাটির বাসন, বাঁশ ও কাঠের সামগ্রী বিক্রি হয়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, পুতুল নাচ কিংবা লোকগানের আসর মেলায় বাড়তি আকর্ষণ যোগ করে। লোকশিল্পীদের জন্য এই মেলাগুলি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও কাজ করে।
সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে, মকর সংক্রান্তি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিকতার চাপে গ্রামজীবন বদলালেও এই উৎসব এখনও মানুষের মধ্যে শিকড়ের টান বজায় রাখছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গ্রামীণ সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করতে এই ধরনের উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের রূপেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে বাড়ির সামগ্রী দিয়েই সবকিছু তৈরি হতো, সেখানে এখন বাজারজাত উপকরণের ব্যবহার বেড়েছে। তবুও গ্রামবাংলার মানুষ চেষ্টা করছেন নিজেদের ঐতিহ্য ও স্বাদ বজায় রাখতে। অনেক পরিবার এখনও বাড়িতে তৈরি খেজুর গুড় ব্যবহার করে পিঠে বানান, যা এই উৎসবের আসল স্বাদ ধরে রাখে।
শহরের মানুষদের মধ্যেও গ্রামবাংলার মকর সংক্রান্তি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই এই সময় গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ি যান, উৎসবের অংশ হন এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। পর্যটনের দিক থেকেও এই সময়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামাজিক দিক ছাড়াও মকর সংক্রান্তি অর্থনৈতিকভাবেও গ্রামাঞ্চলে কিছুটা প্রভাব ফেলে। পিঠে-পুলি তৈরির উপকরণ, মেলার সামগ্রী, স্থানীয় হস্তশিল্প—সব মিলিয়ে এই সময় গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা গতি আসে। ছোট ব্যবসায়ী ও কারিগরদের জন্য এটি বছরের অন্যতম ব্যস্ত সময়।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে মকর সংক্রান্তির ছবি ও ভিডিও শেয়ার করছেন। পিঠে-পুলি বানানোর মুহূর্ত, গ্রামের উঠোনে উৎসবের হাসি—এই সব দৃশ্য ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, যা গ্রামবাংলার সংস্কৃতিকে আরও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মকর সংক্রান্তি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলায় শুধু একটি উৎসব নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিফলন। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও এই উৎসব তার নিজস্ব রূপ ও আবেগ ধরে রেখেছে। গ্রামবাংলার আকাশে তাই মকর সংক্রান্তির দিন এখনও ভেসে আসে আনন্দ, ঐতিহ্য ও মিলনের বার্তা।
মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামবাংলার উৎসব শুধু একটি দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক এলাকায় এই উৎসবের রেশ থাকে কয়েক দিন ধরে। সংক্রান্তির আগের দিন থেকেই বাড়িতে বাড়িতে প্রস্তুতি শুরু হয় এবং পরের দিনগুলোতেও আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা লেগেই থাকে। এই ধারাবাহিক মিলনই গ্রামীণ সমাজের শক্ত ভিত গড়ে তোলে।
গ্রামবাংলার মহিলাদের কাছে মকর সংক্রান্তি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পিঠে-পুলি তৈরির মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পান। অনেক পরিবারে এই দিনটি এক প্রকার প্রতিযোগিতার মতো—কার পিঠে বেশি সুন্দর, কার পুলি বেশি সুস্বাদু। এই প্রতিযোগিতা অবশ্য নিছক আনন্দের জন্যই, যার মাধ্যমে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।
বয়স্ক মানুষদের কাছে মকর সংক্রান্তি স্মৃতিচারণার এক বড় উপলক্ষ। প্রবীণরা তাঁদের শৈশবের সংক্রান্তির গল্প বলেন—কীভাবে খোলা উনুনে পিঠে তৈরি হতো, কীভাবে গোটা গ্রাম একসঙ্গে আনন্দ করত। এই গল্পগুলির মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম শিখে নেয় নিজেদের সংস্কৃতির ইতিহাস ও মূল্যবোধ।
গ্রামবাংলার শিশুদের কাছে মকর সংক্রান্তি মানেই বাড়তি আনন্দ। স্কুল ছুটি, নতুন জামাকাপড়, পিঠে খাওয়া আর মেলায় যাওয়া—সব মিলিয়ে এই দিনটি তাদের জন্য বিশেষ। মেলায় নাগরদোলা, খেলনা, মিষ্টি কেনা—এই সব স্মৃতি বহু বছর ধরে তাদের মনে গেঁথে থাকে।
কিছু কিছু অঞ্চলে মকর সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে লোকগান, বাউল গান কিংবা কীর্তনের আসর বসে। সন্ধ্যার পর গ্রামের খোলা মাঠে বা মন্দির চত্বরে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলি গ্রামের মানুষের মধ্যে এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করে। আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে এই লোকজ অনুষ্ঠানগুলি এখনও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মকর সংক্রান্তির দিনে দান করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অনেক পরিবার এই দিন গরিব মানুষদের খাদ্য, কাপড় বা আর্থিক সাহায্য করেন। এই সামাজিক দায়িত্ববোধ গ্রামবাংলার মানবিক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা পড়ে।
বর্তমান সময়ে গ্রামবাংলার মকর সংক্রান্তিতে প্রযুক্তির প্রভাবও চোখে পড়ছে। স্মার্টফোনের ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে পিঠে বানানোর মুহূর্ত, মেলার দৃশ্য কিংবা পারিবারিক মিলন। সামাজিক মাধ্যমে এই ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ফলে শহর ও গ্রামের দূরত্ব কিছুটা হলেও কমছে।
তবে প্রযুক্তির এই উপস্থিতির মাঝেও গ্রামবাংলার মানুষ চেষ্টা করছেন উৎসবের আসল রূপ বজায় রাখতে। অনেক পরিবার এখনও মোবাইল দূরে রেখে পারিবারিক সময় কাটানোর ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, মকর সংক্রান্তির আসল আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে মুখোমুখি কথোপকথন ও একসঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যেই।
কৃষিভিত্তিক সমাজে মকর সংক্রান্তির অর্থ আরও গভীর। নতুন ফসল ঘরে ওঠার পর এই উৎসব কৃষকদের কাছে কৃতজ্ঞতা ও আশার প্রতীক। প্রকৃতির দানকে সম্মান জানিয়ে তাঁরা এই দিনটি পালন করেন। জল, মাটি ও সূর্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই এই উৎসবের মূল বার্তা বলে মনে করেন অনেকেই।
শহরের সঙ্গে তুলনা করলে গ্রামবাংলার মকর সংক্রান্তির উদযাপন অনেক বেশি সরল ও আন্তরিক। সেখানে নেই বড় মঞ্চ, নেই আলোর ঝলকানি—তবুও মানুষের হাসি ও আন্তরিকতাই এই উৎসবকে আলাদা করে তোলে। এই সরলতাই গ্রামবাংলার উৎসবকে অনন্য করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রামবাংলার মকর সংক্রান্তিকে ঘিরে সচেতনতা কর্মসূচির আয়োজন করছে। পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ রক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে এই সময় বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা প্রশংসিত হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, মকর সংক্রান্তির মতো উৎসবগুলি পরিবেশবান্ধব উপায়ে পালন করা গেলে তা সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করতে পারে। গ্রামবাংলায় এখনও প্লাস্টিকের ব্যবহার তুলনামূলক কম, যা পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি ভালো দৃষ্টান্ত।
গ্রামবাংলার মকর সংক্রান্তি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছে। অনেক মহিলা এই সময় বাড়িতে তৈরি পিঠে বা হস্তশিল্প বিক্রি করে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান। স্থানীয় বাজার ও মেলাগুলিতে তাঁদের তৈরি সামগ্রীর চাহিদাও বাড়ছে।
সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এই ধরনের উৎসব গ্রামবাংলার সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী রাখে। পারস্পরিক নির্ভরতা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মানসিকতা এই উৎসবের মধ্য দিয়েই আরও দৃঢ় হয়। আধুনিক সমাজে যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ছে, সেখানে গ্রামবাংলার এই চর্চা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মকর সংক্রান্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ স্থাপন। বয়স্কদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের উদ্দীপনা একত্রিত হয়ে এই উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এই প্রজন্মগত সংযোগ ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
সবশেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলায় মকর সংক্রান্তি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এই উৎসব মানুষের মধ্যে সহাবস্থান, কৃতজ্ঞতা ও আনন্দের বোধ জাগিয়ে তোলে। পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ কিছুটা বদলালেও মূল চেতনা আজও অটুট রয়েছে।
গ্রামবাংলার আকাশে তাই প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির দিনে শুধু উৎসবের শব্দ নয়, ভেসে আসে ঐতিহ্য, মানবিকতা ও সামাজিক বন্ধনের এক গভীর বার্তা—যা বাংলার সংস্কৃতিকে যুগের পর যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখবে।