প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে অলরাউন্ড নৈপুণ্যে উজ্জ্বল হার্দিক পাণ্ড্য ব্যাটে ঝড় তোলার পাশাপাশি বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে দলের জয়ে বড় ভূমিকা রাখলেন। এই জয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ১-০ এগিয়ে গেল ভারত।
কটকের বারাবাটি স্টেডিয়ামে ফের ক্রিকেটারদের প্রত্যাবর্তনের গল্পই যেন লিখিত হল নতুন করে। ভারত–দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম টি–টোয়েন্টিতে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই ক্রিকেটার—শুভমন গিল এবং হার্দিক পাণ্ড্য। দু’জনেই চোট সারিয়ে ফিরেছেন। তবে প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে ভাগ্য যেন দু’জনের কাছে দুই রকম মুখ দেখাল। যেখানে শুভমনের ব্যাট ব্যর্থতার অন্ধকারে ঢেকে গেল, সেখানে হার্দিক পাণ্ড্য নিজের নামের পাশে লিখলেন প্রত্যাবর্তনের উজ্জ্বলতা। ব্যাটে ঝড় তোলার পর বল হাতেও উইকেট তুলে নিয়ে প্রমাণ করে দিলেন—ভারতীয় দলে তাঁর প্রয়োজনীয়তা এখনো অটুট। নেতৃত্বের দৌড় থেকে সাময়িক ছিটকে গেলেও, অলরাউন্ড দক্ষতায় তিনি (৩২) আবারও রঙিন আলোয় ফিরে আসলেন। এই ম্যাচে তাঁর প্রদর্শন শুধু একটি জয়ের গল্প নয়; বরং বিশ্বকাপের আগে দলের আত্মবিশ্বাস, ভারসাম্য এবং পরিকল্পনার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
হার্দিকের প্রত্যাবর্তনের গল্প: চাপের মুখে একক লড়াই
ভারতের প্রথম ইনিংসের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে যায়—হার্দিক পাণ্ড্যই ছিলেন একমাত্র ব্যাটার, যিনি ব্যাট হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছেন। ২৮ বলে অপরাজিত ৫৯ রানের ইনিংস শুধু ঝোড়ো ছিল না; ছিল পরিণত, হিসেবি এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দলের স্কোর যখন বারবার চাপে পড়ছিল, তখন তিনি এক প্রান্ত আগলে রেখে সুযোগ এলেই বড় শটে স্কোরবোর্ড ঘোরাতে থাকেন। তাঁর ইনিংসে ৬টি চার এবং ৪টি ছক্কা ছিল; কিন্তু সেই সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইনিংসের সময় নির্বাচন এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা। যখন একের পর এক অভিজ্ঞ ব্যাটাররা উইকেট ছুড়ে দিচ্ছিলেন, তখন হার্দিকের ব্যাট ছিল ভারতের একমাত্র ভরসা।
চাপের মধ্যে তিনি যেভাবে খেলে গেলেন, তা বলছে তাঁর ফোকাস এবং শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতির স্তর সম্পর্কে। কয়েকদিন আগেও প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর ফিটনেস নিয়ে। সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে সব ম্যাচ খেলতে পারেননি। ভারতীয় দলের অনুশীলনেও কিছুটা অস্বস্তি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ম্যাচের দিন সব জল্পনা উড়িয়ে দিলেন। বড় ম্যাচ মানসিকতার প্রমাণ দিলেন। টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে আবারও স্পষ্ট করে দিলেন—ফিট হার্দিক মানেই ভারতের টি–টোয়েন্টি ব্যালান্সের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
শুভমন গিলের ব্যর্থতা: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
অন্যদিকে প্রত্যাবর্তনের ম্যাচটিতেই ব্যর্থ হলেন শুভমন গিল। কটকের ২২ গজ শুভমনকে হাসিমুখে বরণ করল না। মাত্র ২ বল টিকে ৪ রান করে সাজঘরে ফিরে গেলেন তিনি। আইপিএল ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মিলিয়ে গত এক বছরে তাঁর ধারাবাহিকতা তাঁকে ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করছিল। বর্তমানে তিনি টেস্ট এবং ওয়ানডে দলের অধিনায়কও। সেই কারণে তাঁর দিকে ক্রিকেটপ্রেমীদের আলাদা নজর ছিলই। কিন্তু টি–টোয়েন্টি দলে সহ–অধিনায়কের ভূমিকায় নেমেও তিনি নিজের ছাপ রাখতে ব্যর্থ হলেন।
টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে শুভমনের ব্যাটিং অনেক সময়েই দ্বিধাসঙ্কুল হয়ে পড়ে—এমন অভিযোগ উঠেছে আগে। সালামি ব্যাটার হিসেবে আত্মবিশ্বাসী শুরু করতে না পারলে দলের উপর চাপ বাড়ে। সেই ছবিই দেখা গেল কটকের ম্যাচে। অনেকেই ভেবেছিলেন চোট কাটিয়ে ফেরা শুভমন নতুন উদ্যমে শুরু করবেন। কিন্তু তাঁর ব্যাটিং দেখে মনে হল তিনি এখনো সম্পূর্ণ তাল–লয়ে নেই। বিশ্বকাপের আগে এমন পারফরম্যান্স অবশ্যই প্রশ্ন তুলছে।
সূর্যকুমার যাদব—অধিনায়কত্বে সফল, ব্যাটে ব্যর্থতা অব্যাহত
সূর্যকুমার যাদবের কথা না বললে ম্যাচের বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না। ভারত ১০১ রানে বিশাল ব্যবধানে জয় পেলেও অধিনায়কের ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেল। তিনি নেমেছিলেন ভালো শুরু করার উদ্দেশ্যে; কিন্তু ১১ বলে ১২ রান করে ফেরেন। গত কয়েক মাস ধরেই তাঁর টি–টোয়েন্টি ফর্ম চেনার বাইরে। যাঁকে ‘মিস্টার ৩৬০’ বলা হয়, তাঁকে বোলাররা এখন অনেক বেশি পড়তে পারছেন বলে মনে হচ্ছে। ম্যাচের পর ম্যাচ রান পাচ্ছেন না তিনি। যত ওভারই খেলুন, স্ট্রাইক রেট ও ইনপ্যাক্ট দুটোই কমছে।
তবে অধিনায়কত্বে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রশংসনীয় ছিল। বিশেষত বোলারদের সঠিক সময়ে ব্যবহার এবং ফিল্ড সেটিং—এই দুটি জায়গায় তিনি পরিষ্কারভাবে ম্যাচ পড়তে পেরেছিলেন। অক্ষরকে ওভারে আনা, অর্শদীপকে আক্রমণাত্মক ভূমিকা দিয়ে শুরু করানো, বুমরাহকে সঠিক সময়ে ব্যবহার—সবটাই ছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী।
তবুও ব্যাট হাতে সূর্যর এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা বিশ্বকাপের আগে ভারতের জন্য বড় মাথাব্যথা।
ভারতের ১৭৫ কম নাকি যথেষ্ট?
ভারতের ইনিংস থামল ৬ উইকেটে ১৭৫ রানে। পিচ অনুযায়ী এটা খারাপ স্কোর নয়। কিন্তু ব্যাটারদের ব্যর্থতার কারণে ভারত অন্তত ১৫–২০ রান কম করেছে—এমন মত ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের। অভিষেক শর্মা শুরুটা সুন্দর করলেও ১২ বলে ১৭ রানের বেশি যেতে পারেননি। শট সিলেকশন ছিল অত্যন্ত খারাপ। তিলক বর্মাও ৩২ বলে ২৬ রান করে ব্যাটিংয়ের গতি তোলার আগেই আউট হয়ে যান। এশিয়া কাপ ফাইনালের মতো তাঁর ছন্দ দেখা যায়নি।
শিবম দুবে এবং অক্ষর পটেল কিছুটা সাহায্য করলেও বড় জুটি তৈরি হয়নি। প্রয়োজনীয় পার্টনারশিপ না হওয়ার কারণে ভারতের ইনিংস বারবার টালমাটাল হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং: এনগিডির ধারাবাহিকতা
লুঙ্গি এনগিডি ৩১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সফলতম বোলার। ভারতীয় ব্যাটারদের বিরুদ্ধে তাঁর পেস–ভ্যারিয়েশন বরাবরই কার্যকর। লুথো সিপামলা পেয়েছেন ২ উইকেট। ফেরেইরা ১ উইকেট নিলেও ভারতের ব্যাটিংয়ের উপর চাপ তৈরি করতে পারেননি।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস: ভারতীয় বোলারদের দাপটে ধস
১৭৬ রান তাড়া করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। দ্বিতীয় বলেই আউট হন কুইন্টন ডি–কক—অর্শদীপের দুর্দান্ত সুইং ডেলিভারিতে। দ্বিতীয় উইকেটও তোলেন তিনি। স্টাবসকে মাত্র ১৪ রানে ফেরান।
তৃতীয় উইকেটের পতন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অক্ষর পটেল নিজের প্রথম ওভার করতেই তুলে নেন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক এডেন মার্করামের উইকেট। সেই মুহূর্তে দক্ষিণ আফ্রিকা দাঁড়িয়ে ছিল ৪০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে—এই অবস্থায় দল ফেরার মতো জুটি গড়ার কোনও লক্ষণ ছিল না।
এরপর মিলার এবং ফেরেইরা ফিরে গেলে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইন–আপ ভেঙে পড়তে শুরু করে। কেউই ভারতের বোলিং আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে পারেননি। জানসেন, ব্রেভিস, মহারাজ—একজনের পর একজন আউট হয়ে যায়।
১৮ বলে শেষ ৫ উইকেট হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। পুরো ইনিংস গুটিয়ে যায় মাত্র ৭৪ রানে। ভারত জয় পায় ১০১ রানের বিশাল ব্যবধানে।
ভারতীয় বোলারদের আধিপত্য
ভারতের প্রতিটি বোলারই উইকেট পেয়েছেন—এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।
অক্ষর পটেল: ৭ রানে ২ উইকেট
অর্শদীপ সিং: ১৪ রানে ২ উইকেট
জশপ্রীত বুমরাহ: ১৭ রানে ২ উইকেট (টি–টোয়েন্টিতে ১০০ উইকেট সম্পূর্ণ)
বরুণ চক্রবর্তী: ১৯ রানে ২ উইকেট
হার্দিক পাণ্ড্য: ১৬ রানে ১ উইকেট
শিবম দুবে: ১ রানে ১ উইকেট
এই ম্যাচ পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয়—ভারতের বোলিং ইউনিট কতটা শক্তিশালী। বুমরাহ তাঁর পুরোনো ধার ফিরে পেয়েছেন। অর্শদীপের সুইং কাজে দিয়েছে। অক্ষরের লাইন–লেংথ ছিল নিখুঁত।
বিশ্বকাপ প্রস্তুতির প্রথম পরীক্ষা: উত্তীর্ণ নাকি সতর্কবার্তা?
ভারত ১–০ ব্যবধানে সিরিজে এগিয়ে গেল। বিশ্বকাপের আগে এটি একধরনের আত্মবিশ্বাস জোগানোর জয়। তবে এই জয়ের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রেখে গেল ম্যাচটি—
যা ভালো হয়েছে:
হার্দিক পাণ্ড্য সম্পূর্ণ ফিট এবং ফর্মে আছেন।
বোলাররা অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন।
বুমরাহর ফিরতি ফর্ম ভারতের জন্য বড় প্রাপ্তি।
ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝে অধিনায়ক হিসেবে সূর্যর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রখর।
যা উদ্বেগের:
সূর্যকুমার যাদবের ব্যাটিং ফর্ম এখনও চিন্তার।
শুভমন গিলের প্রত্যাবর্তন ব্যর্থ।
ভারতীয় মিডল অর্ডার এখনও অস্থির।
কয়েকজন ব্যাটার পুরোদমে ফর্মে নেই।
শেষকথা
ম্যাচটি নিঃসন্দেহে ভারতের দাপুটে জয়। কিন্তু এই জয় অনেক প্রশ্নও তুলে দিল। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের আগে বোলারদের ফর্ম যেমন স্বস্তি দেবে, ঠিক তেমন ব্যাটারদের অস্থিরতা ভাবাবে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকবেন হার্দিক পাণ্ড্য—শেষ কয়েক মাস ধরে যাঁর নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল, তিনি দেখিয়ে দিলেন যে দলে তাঁর স্থান এখনো অপরিহার্য।
কটকের রাত হয়তো মনে রাখা হবে পারফরম্যান্সের জন্য নয়; বরং প্রত্যাবর্তনের গল্পের জন্য। একদিকে ব্যর্থ শুভমন, অন্যদিকে তুফান তুলতে থাকা হার্দিক। আর ভারত? সিরিজে এগিয়ে, বিশ্বকাপের প্রথম পরীক্ষায় সফল—কিন্তু সামনে লম্বা পথ এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করে আছে।