ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) নিশ্চিত করল, দরকার পড়লেও শুভমন গিলকে ইডেন টেস্টে আর পাওয়া যাবে না। তিনি এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
যা আশঙ্কা করা হচ্ছিল, ঠিক সেটাই ঘটল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত চলতি টেস্ট সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর মাঠে নামতে পারবেন না ভারত অধিনায়ক শুভমন গিল। ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (BCCI) আনুষ্ঠানিকভাবে রবিবার সকালে এক জরুরি বিবৃতি প্রকাশ করে এই কঠিন সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে। ঘাড়ে চোটের তীব্রতা এতটাই গুরুতর যে আপাতত তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাচ্ছেন না, নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাঁকে।
এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা ভারতীয় শিবিরের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। বিশেষত যখন ইডেনের পিচ ক্রমশ কঠিন হচ্ছে এবং দলের সামনে প্রতিপক্ষের দেওয়া রানের পাহাড় তাড়া করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, ঠিক তখনই নিয়মিত অধিনায়ক ও দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানকে ছাড়া মাঠে নামতে হবে।
জানা গেছে, শনিবার দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরুর আগে থেকেই শুভমন গিল ঘাড়ে অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন তিনি ব্যাট করতে নামেন। দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনার সাইমন হারমারকে স্লগ সুইপ মারার প্রচেষ্টার সময়ই তাঁর ঘাড়ে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। মাত্র তিনটি বল খেলেই যন্ত্রণায় কাতর শুভমনকে সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছাড়তে হয়। ফিজিয়োর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাঁকে আর মাঠে রাখা যাবে না।
দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার পর পরই বোর্ডের মেডিকেল টিম দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। গুরুতর চোটের জেরে তাঁকে আর টিম হোটেলে পাঠানো হয়নি। অ্যাম্বুলেন্সে করে শুভমনকে কলকাতার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
রবিবার সকালে বিসিসিআই (BCCI) এক বিবৃতি জারি করে গিলের ছিটকে যাওয়ার খবরটি নিশ্চিত করে। বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়:
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুভমনের ঘাড়ের এমআরআই (MRI) এবং অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ধারণা, সম্ভবত এটি তাঁর পুরনো ঘাড়ের চোটেরই পুনরাবৃত্তি। তাঁর ঘাড়ের পেশি শক্ত (Stiff Neck) হয়ে যাওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবে মাথা ঘোরাতে পারছেন না, যা ক্রিকেট খেলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং এই চোটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে বিসিসিআইয়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেল পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। আপাতত ঝুঁকি এড়াতে তাঁকে হাসপাতালেই বিশ্রামে থাকতে বলা হয়েছে।
শুভমন গিলের এই আকস্মিক অনুপস্থিতি চলতি ইডেন টেস্টের ফলাফলের উপর বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি কেবল একজন দক্ষ ওপেনারই নন, তিনি দলের অধিনায়ক হিসেবে মাঠে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেন। এখন তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব সামলানোর গুরুদায়িত্ব সিনিয়র কোনো ক্রিকেটারের ওপর অর্পিত হবে। ইডেনের পিচ এখন চতুর্থ এবং পঞ্চম দিনের খেলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, যেখানে রান তাড়া করা আরও কঠিন হবে। এমন পরিস্থিতিতে অধিনায়ক এবং সেরা ব্যাটারের অনুপস্থিতি অবশ্যই ভারতীয় দলের মনোবলে বড় ধাক্কা দেবে।
শুভমনের এই চোট ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকেই এখন দ্রুত তাঁর আরোগ্য কামনা করছে এবং আশা করছে যে তিনি যেন পরবর্তী ম্যাচগুলির আগে দ্রুত সুস্থ হয়ে দলে ফিরতে পারেন।
বিসিসিআইয়ের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "কলকাতায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে চলতি টেস্টের দ্বিতীয় দিনে অধিনায়ক শুভমান গিলের ঘাড়ে চোট লাগে। দিনের খেলা শেষ হওয়ার পর তাকে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তিনি আর এই টেস্টে খেলতে পারবেন না। বিসিসিআইয়ের মেডিকেল টিম তাকে কড়া পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
শনিবার দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার পরেই শুভমনকে বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সে করে মাঠ থেকে দ্রুত কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তের উডল্যান্ডস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি করানো হয়।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, শনিবার ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুভমন তাঁর ঘাড়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করছিলেন। ব্যথা কমানোর জন্য তাৎক্ষণিক ওষুধ গ্রহণ করা হলেও তাতে পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। ব্যাট করতে নামার আগেও তাঁকে ব্যথানাশক ওষুধ নিতে হয়।
কিন্তু মাঠে নামার পর দুর্ভাগ্যবশত পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। নিজের তৃতীয় বলেই সাইমন হারমারকে স্লগ সুইপ মারার চেষ্টা করতেই শুভমনের ঘাড়ে ফের তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ায় সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে আসেন দলের ফিজিওথেরাপিস্ট। দীর্ঘ পরীক্ষার পর শুভমনকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি মাত্র তিনটি বলই ক্রিজে থাকতে পেরেছিলেন। সমস্যা এতটাই গুরুতর ছিল যে শুভমন স্বাভাবিকভাবে তাঁর ঘাড় ঘোরাতেই পারছিলেন না।
হাসপাতালে ভর্তি করার পর দ্রুত শুভমনের ঘাড়ের এমআরআই MRI করানো হয়। সেই রিপোর্টে ঘাড়ের পেশি শক্ত Stiff Neck হয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এক বছর আগেও একই ধরনের চোট পেয়েছিলেন শুভমন এবং সেই সময়ের এমআরআই রিপোর্টের সঙ্গে বর্তমান ফলাফলের সাদৃশ্য রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, শুভমনের বয়স যেহেতু ২৬ বছর, তাই তাঁর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা বা ‘পেন থ্রেসহোল্ড’ Pain Threshold অনেকটাই বেশি। কিন্তু এবারের যন্ত্রণা এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি তা সহ্য করতে পারছিলেন না। এই কারণেই চিকিৎসকেরা তাঁকে আর হোটেলে দলের সঙ্গে না রেখে হাসপাতালে ভর্তি রাখার সিদ্ধান্ত নেন। শুভমনের পরবর্তী চিকিৎসার ধরন এবং কবে তিনি আবার মাঠে ফিরতে পারবেন সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিসিসিআইয়ের বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল প্যানেল।
ইডেন টেস্টের মাঝপথে ভারত অধিনায়ক শুভমন গিলের ছিটকে যাওয়াটা ভারতীয় দলের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুধু একজন ক্রিকেটার হিসেবেই নয়, একজন নিয়মিত নেতা হিসেবে তাঁর অনুপস্থিতি দলের কৌশলগত পরিকল্পনা এবং মনোবলের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
তাঁর অনুপস্থিতিতে, একজন গুরুত্বপূর্ণ ওপেনারকে হারাল দল, যা একটি শক্তিশালী শুরুর জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, দলের ভেতরে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের জন্য নতুন করে কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। ইডেন টেস্ট এখন এক এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দলের সামনে কঠিন পিচে রান তাড়া করার চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
গিলের অনুপস্থিতিতে ভারতীয় দল বাধ্য হচ্ছে তাদের কৌশল পুনর্বিন্যাস করতে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, অধিনায়কের অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন? এই গুরুদায়িত্ব সাধারণত দলের সহ-অধিনায়ক অথবা সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ওপর বর্তায়।
যদি দলে সহ-অধিনায়ক পূর্বনির্ধারিত থাকেন, তবে তিনিই বাকি ম্যাচের জন্য নেতৃত্ব দেবেন।
যদি তা না হয়, তবে রোহিত শর্মা বা বিরাট কোহলির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের মধ্যে কেউ এই অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে পারেন, যদিও তাঁরা হয়তো এই সিরিজে সহ-অধিনায়কের ভূমিকায় নেই।
এছাড়াও, এই অবস্থায় তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। ওপেনিং স্লটে গিলের জায়গায় হয়তো রিজার্ভ বেঞ্চের কাউকে সুযোগ দিতে হতে পারে, যা দলের ব্যাটিং গভীরতাকে কিছুটা দুর্বল করে দিতে পারে।
এই মুহূর্তে ইডেন গার্ডেন্সের পিচ স্পিনারদের দারুণভাবে সাহায্য করছে। যত খেলা এগোচ্ছে, পিচ ততই ভাঙছে এবং স্পিনাররা টার্ন ও বাউন্স আদায় করে নিতে পারছেন। এমন পরিস্থিতিতে, চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে কঠিন রান তাড়া করার জন্য ব্যাটিং লাইনআপে স্থিতিশীলতা এবং সঠিক কৌশল নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি।
অধিনায়ক গিল সাধারণত স্পিন ভালো খেলেন। তাঁর ছিটকে যাওয়ায় স্পিনারদের বিরুদ্ধে একটি ভরসাযোগ্য ব্যাটসম্যানকে হারাল দল। এখন দলের বাকি ব্যাটসম্যানদের ওপর এই দায়িত্ব বর্তাল যে, তাঁরা কীভাবে স্পিনের মোকাবিলা করেন এবং প্রয়োজনীয় রান তুলে নেন।
সংক্ষেপে, শুভমন গিলের এই আকস্মিক বিদায় কেবল একটি চোট নয়; এটি ভারতীয় দলের জন্য নেতৃত্ব, কৌশল এবং ব্যাটিংয়ের গভীরতা—এই তিনটি দিক থেকেই একটি বড় পরীক্ষা। বাকি ম্যাচের জন্য ভারতীয় দল কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করে এবং কে এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।