Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আঙুর থেকে পেস্টিসাইডস পুরোপুরি দূর করার সহজ ও নিরাপদ উপায় জানেন তো এই কয়েকটি ধাপ মেনে চললেই নিশ্চিন্তে খেতে পারবেন

আঙুর দেখতে ও খেতে যতই লোভনীয় হোক না কেন না ধুয়ে সরাসরি খেলে শরীরে ঢুকে পড়তে পারে ক্ষতিকর রাসায়নিক বিষ। বিশেষজ্ঞদের মতে আঙুরের গায়ে থাকা পেস্টিসাইড স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে তাই সাবধান না হলে বিপদ অনিবার্য।

আঙুর খেতে কে না ভালোবাসে। স্বাদে মিষ্টি রসে ভরপুর এই ফলটি শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের কাছেই সমান জনপ্রিয়। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও আঙুর নিঃসন্দেহে একটি পাওয়ারহাউজ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি ভিটামিন কে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফাইবার এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান যা শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এখন যেহেতু আঙুরের মরশুম চলছে তাই বাজারে সর্বত্রই চোখে পড়ছে সবুজ কালো লাল নানা রঙের চকচকে আঙুর। দেখতে এতটাই আকর্ষণীয় যে অনেকেই বাজার থেকে কিনে এনে ধোয়ার আগেই মুখে পুরে দেন। কিন্তু এই অভ্যাসই হতে পারে আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য বড় বিপদের কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে বাজারে পাওয়া অধিকাংশ আঙুরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। এই চাষের ক্ষেত্রে ফলন বাড়াতে পোকামাকড় ও ছত্রাক থেকে ফসল রক্ষা করতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। শুধু চাষের সময়ই নয় ফসল তোলার পর পরিবহণ এবং সংরক্ষণের সময়ও আঙুরের উপর বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে আঙুরের খোসা চকচকে দেখানোর জন্য মোম জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা হয় যাতে ক্রেতাদের চোখে ফলটি আরও টাটকা ও আকর্ষণীয় লাগে। কিন্তু এই চকচকে রূপের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বিষ।

আঙুরের খোসা খুবই পাতলা ও সূক্ষ্ম। থোকায় থোকায় ঘন হয়ে থাকার কারণে এর ফাঁকে ফাঁকে সহজেই ধুলো ময়লা কীটনাশক এবং জীবাণু জমে যায়। এই খোসা খুব দ্রুত বাইরের রাসায়নিক শোষণ করে নেয়। ফলে শুধু কলের নিচে জল দিয়ে ধুয়ে নিলেই আঙুর পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে যায় এমন ধারণা একেবারেই ভুল। সাধারণ জল দিয়ে ধোয়ায় উপরের ধুলো ময়লা কিছুটা সরে গেলেও অধিকাংশ কীটনাশক এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে লিভার কিডনি হরমোনের ভারসাম্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু গর্ভবতী মহিলা এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাই আঙুর খাওয়ার আগে সঠিকভাবে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকরা।

ভালো দিক হল এর জন্য কোনও দামী কেমিক্যাল ক্লিনার ব্যবহার করার দরকার নেই। আপনার রান্নাঘরেই থাকা কয়েকটি সাধারণ উপাদান ব্যবহার করেই আঙুরকে অনেকটাই নিরাপদ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে আঙুর পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে করা উচিত যাতে ধুলো ময়লা রাসায়নিক এবং জীবাণু সর্বোচ্চ মাত্রায় দূর হয়।

প্রথম ধাপ হিসেবে আঙুর পরিষ্কার করা শুরু করতে হবে ঠান্ডা জল দিয়ে। একটি বড় পাত্র বা চালুনি নিন। তার মধ্যে আঙুর রেখে দিন এবং প্রবাহমান ঠান্ডা জলের নিচে অন্তত বিশ থেকে ত্রিশ সেকেন্ড ধরে ধুয়ে নিন। এই সময় হাত দিয়ে খুব আলতো করে আঙুরের গোছা ঘষতে হবে। এতে খোসার উপর জমে থাকা ধুলো ময়লা এবং কিছু পৃষ্ঠের রাসায়নিক সরে যায়। এই ধাপটি সব কীটনাশক দূর করতে না পারলেও এটি আঙুর পরিষ্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। অনেক সময় আঙুরের গোছার ভেতরে চোখে না দেখা ময়লা জমে থাকে যা এইভাবে ধুলেই বেরিয়ে আসে।

এরপর আসে দ্বিতীয় ধাপ যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলির মধ্যে একটি। কীটনাশক কমানোর জন্য আঙুরকে বেকিং সোডার দ্রবণে ভিজিয়ে রাখা অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বেকিং সোডা বা সোডিয়াম বাইকার্বোনেট অনেক সাধারণ কীটনাশকের রাসায়নিক গঠন ভেঙে দিতে সাহায্য করে। একটি বড় পাত্রে পরিষ্কার জল নিয়ে তাতে পরিমাণ মতো বেকিং সোডা মিশিয়ে নিন। এই জলে আঙুর কয়েক মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এরপর হাত দিয়ে আলতো করে ঘষে নিন এবং পরিষ্কার জল দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। এই পদ্ধতিতে আঙুরের গায়ে লেগে থাকা ক্ষতিকারক রাসায়নিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

তৃতীয় ধাপে জীবাণু এবং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজার থেকে আনা আঙুর অনেক মানুষের হাতে ঘোরে পরিবহণের সময় নানা জায়গায় রাখা হয় ফলে এর গায়ে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি। এই সমস্যা দূর করতে ভিনিগার একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রাকৃতিক উপাদান। ভিনিগার শুধু কীটনাশক কমাতে সাহায্য করে না বরং ব্যাকটেরিয়া ছত্রাক এবং অন্যান্য জীবাণুও ধ্বংস করতে পারে। ব্যবহারের জন্য এক ভাগ সাদা ভিনিগার এবং তিন ভাগ জল মিশিয়ে একটি দ্রবণ তৈরি করুন। এই দ্রবণে আঙুর ভালো করে ধুয়ে নিন। এরপর আবার পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন যাতে ভিনিগারের গন্ধ বা স্বাদ না থাকে।

চতুর্থ ধাপে আসে আঙুর শুকানোর বিষয়টি। অনেকেই এই ধাপটি এড়িয়ে যান যা একেবারেই উচিত নয়। ধোয়ার পর আঙুরে যদি অতিরিক্ত আর্দ্রতা থেকে যায় তাহলে খুব সহজেই ছত্রাক জন্মাতে পারে। তাই প্রতিটি আঙুরের গোছা আঙুল দিয়ে বা একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে আলতো করে ঘষে নিন। এতে যদি কোনও রাসায়নিক বা জীবাণুর অবশিষ্টাংশ থেকে থাকে তাও দূর হয়ে যায়। এরপর আঙুর বাতাসে শুকাতে দিন অথবা রান্নাঘরের তোয়ালে দিয়ে ভালোভাবে মুছে নিন। সম্পূর্ণ শুকনো আঙুর অনেক বেশি সময় সতেজ থাকে।

পঞ্চম এবং শেষ ধাপ হল সঠিকভাবে সংরক্ষণ। পরিষ্কার আঙুর সবসময় বায়ুরোধী পাত্রে রাখা উচিত। ধোয়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা একেবারেই ঠিক নয় কারণ আর্দ্র পরিবেশ ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। আপনি চাইলে যতটুকু খাওয়ার দরকার শুধু ততটুকুই ধুয়ে নিতে পারেন। বাকি আঙুর না ধুয়ে ফ্রিজে রেখে দিলে তা তুলনামূলকভাবে বেশি দিন ভালো থাকে। পরিষ্কার ও শুকনো আঙুর ঢাকনা দেওয়া পাত্রে রেখে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে কয়েক দিন পর্যন্ত টাটকা থাকে।

news image
আরও খবর

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে অন্যান্য ফলের তুলনায় আঙুরে কেন এত বেশি কীটনাশক থাকে। এর প্রধান কারণ হল আঙুর গাছ ও ফল পোকামাকড় এবং ছত্রাকের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য আক্রমণেই ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কৃষকরা ফসল রক্ষা করার জন্য একাধিকবার কীটনাশক স্প্রে করেন। এছাড়া আঙুর দীর্ঘদিন সংরক্ষণ ও দূরে পাঠানোর জন্যও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ফলস্বরূপ বাজারে পৌঁছনো আঙুরে রাসায়নিকের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায় আঙুর যতই প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর ফল হোক না কেন সঠিকভাবে পরিষ্কার না করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সামান্য সচেতনতা এবং কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতি মেনে চললেই আপনি নিরাপদে এই সুস্বাদু ফল উপভোগ করতে পারবেন। বিশেষ করে শিশুদের আঙুর খাওয়ানোর আগে এই ধাপগুলি অবশ্যই অনুসরণ করা উচিত। মনে রাখবেন স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই শুধু পুষ্টিকর নয় নিরাপদও হতে হবে।

আঙুর আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অনেকেই সকালের নাস্তায় ফলের বাটি তৈরি করেন যেখানে আঙুর প্রায় অপরিহার্য একটি উপাদান। আবার কেউ কেউ ডায়েটের অংশ হিসেবে বা শরীর চাঙ্গা রাখতে আঙুর খেতে পছন্দ করেন। এতে থাকা প্রাকৃতিক চিনি দ্রুত শক্তি জোগায় এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এই সমস্ত উপকারিতা তখনই কার্যকর হবে যখন ফলটি নিরাপদভাবে গ্রহণ করা হবে।

আমাদের অনেকের ধারণা ফল মানেই প্রাকৃতিক এবং তাই একেবারেই ক্ষতিকর নয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাণিজ্যিক কৃষির কারণে ফল উৎপাদনের প্রক্রিয়া অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। অধিক ফলন এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই সচেতন ভোক্তা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ফল খাওয়ার আগে সঠিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার করা।

আঙুরের ক্ষেত্রে ঝুঁকি একটু বেশি কারণ এটি থোকায় থোকায় ঘন হয়ে থাকে এবং প্রতিটি দানার খোসা খুব পাতলা। ফলে বাইরের কীটনাশক বা ময়লা সহজেই লেগে থাকে। শুধু জল দিয়ে ধুলে অনেক সময় উপরের অংশ পরিষ্কার হলেও ফাঁকে থাকা অশুদ্ধি থেকে যায়। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা ধাপে ধাপে পরিষ্কার করার পরামর্শ দেন। বেকিং সোডা বা ভিনিগারের মতো সাধারণ উপাদান ব্যবহার করলে রাসায়নিকের পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ছোটদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কম। তাদের শরীর এখনও বেড়ে ওঠার পর্যায়ে থাকে। তাই ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ব্যাকটেরিয়া তাদের শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় পেটের সমস্যা অ্যালার্জি বা ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে যা আসলে অপরিষ্কার ফল খাওয়ার ফলাফল। তাই শিশুদের আঙুর দেওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এছাড়া বয়স্ক মানুষ বা যাদের দীর্ঘমেয়াদি অসুখ রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিভার বা কিডনির সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত রাসায়নিক শরীরের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই পরিবারের সকলের সুস্থতার জন্য ফল পরিষ্কারের অভ্যাসকে দৈনন্দিন রুটিনের অংশ করে তোলা উচিত।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার তা হল পরিষ্কার করার পাশাপাশি সঠিক সংরক্ষণও সমান জরুরি। ভেজা অবস্থায় ফ্রিজে রাখলে আঙুর দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তাই ধোয়ার পর সম্পূর্ণ শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখা উচিত। এতে ফলের সতেজতা বজায় থাকবে এবং জীবাণুর ঝুঁকিও কমবে।

অবশেষে বলা যায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য শুধু ভালো খাবার বেছে নেওয়াই যথেষ্ট নয় বরং সেই খাবার নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত করাও জরুরি। আঙুরের মতো পুষ্টিকর ফল আমাদের শরীরের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে যদি আমরা একটু সচেতন হই। সামান্য সময় নিয়ে সঠিকভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তাই আজ থেকেই অভ্যাস গড়ে তুলুন নিরাপদ ফল খাওয়ার। মনে রাখবেন আপনার এবং আপনার পরিবারের সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করছে এই ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তের উপর।

 

Preview image