বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে আগামী কয়েক মাসে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ় খেলবে অস্ট্রেলিয়া। সেই কঠিন লড়াইয়ের প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে প্যাট কামিন্সের দল।
বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জ়িল্যান্ড এবং ভারত—বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আগামী কয়েক মাসে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ় খেলতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে। ফলে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে অস্ট্রেলীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন ফরম্যাটে তাদের পরিকল্পনা স্পষ্ট—তারুণ্যের পাশাপাশি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে অভিজ্ঞতাকে। যে ক্রিকেটারের বয়স বেশি, তাঁকে শুধুমাত্র বয়সের কারণে সরিয়ে দেওয়ার কোনও ভাবনাই আপাতত নেই অস্ট্রেলিয়ার।
ঠিক এখানেই ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে তাদের পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠেছে।
গৌতম গম্ভীর ভারতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে টেস্ট দলের চেহারা। ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু হয়েছে প্রজন্ম বদলের প্রক্রিয়া। দীর্ঘ দিন ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটের স্তম্ভ হয়ে থাকা একাধিক ক্রিকেটার এখন আর দলের অংশ নন। রবিচন্দ্রন অশ্বিন, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিদের মতো মহাতারকারা লাল বলের ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন। চেতেশ্বর পুজারা, অজিঙ্ক রাহানে বা মহম্মদ শামির মতো দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদেরও ঘিরে আগের মতো ভারতীয় টেস্ট দলের পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে না।
ফলে ভারতের সামনে এখন নতুন যুগ।
নতুন অধিনায়ক, নতুন ব্যাটিং লাইন-আপ, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন ক্রিকেটারদের নিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এগোনোর চেষ্টা করছে ভারত। অন্য দিকে অস্ট্রেলিয়া যেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে। তাদের কাছে বয়স কোনও ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়ার প্রধান কারণ নয়। বরং কঠিন টেস্ট সিরিজ়, বিদেশের পরিবেশ এবং চাপের ম্যাচে অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাই এখনও অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ভারতীয় ক্রিকেটে গৌতম গম্ভীরের আগমন শুধু কোচ বদল নয়, একই সঙ্গে একটি নতুন ক্রিকেটীয় দর্শনের সূচনাও বলা যেতে পারে। গম্ভীর বরাবরই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার ক্রিকেটে বিশ্বাস করেন। তাঁর মতে, জাতীয় দলের জার্সি কারও জন্য স্থায়ী নয়। পারফরম্যান্স, ফিটনেস এবং দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেই জাতীয় দলে জায়গা ধরে রাখা সম্ভব।
এই দর্শনের প্রভাব ভারতীয় দলে স্পষ্ট।
এক সময় ভারতের টেস্ট একাদশ মানেই রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, চেতেশ্বর পুজারা, অজিঙ্ক রাহানে, মহম্মদ শামিদের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের নাম উঠে আসত। তাঁদের অভিজ্ঞতা ভারতকে দেশে এবং বিদেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিতিয়েছে।
কিন্তু কোনও দলই একই প্রজন্মকে নিয়ে অনন্তকাল এগোতে পারে না।
ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট তাই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে তরুণ ক্রিকেটারদের উপর বেশি দায়িত্ব দিতে শুরু করেছে। শুভমন গিলদের প্রজন্মকে সামনে রেখেই আগামী কয়েক বছরের টেস্ট দল গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু প্রজন্ম বদলের এই সময়টাই যে কোনও দলের জন্য সবচেয়ে কঠিন।
একদিকে পুরনো অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা চলে যান, অন্যদিকে নতুন ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের চাপ সামলাতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। ফলে এই পরিবর্তনের সময় ফলাফল সবসময় প্রত্যাশামতো হয় না।
ভারতও সেই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেট অন্য সব ফরম্যাটের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। টি-টোয়েন্টিতে কয়েকটি ওভার বা কয়েকটি বড় শট ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এক দিনের ক্রিকেটেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ম্যাচ শেষ হয়। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে পাঁচ দিন ধরে মানসিক ও শারীরিক লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।
এখানেই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনেক বেশি।
একজন অভিজ্ঞ ব্যাটার জানেন কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন বল ছাড়তে হবে এবং কখন প্রতিপক্ষের বোলারকে ক্লান্ত হতে দিতে হবে। একই ভাবে একজন অভিজ্ঞ বোলার জানেন কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের লাইন-লেংথ কাজে লাগবে।
ভারতের বর্তমান প্রজন্মের প্রতিভা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মার মতো বহু ম্যাচের অভিজ্ঞ ব্যাটারের জায়গা রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
একই ভাবে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতো ক্রিকেটার শুধু উইকেট নেওয়ার ক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে বোলিং পরিকল্পনা বদলে দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
ভারতের নতুন প্রজন্মকে এখন সেই অভিজ্ঞতা মাঠে খেলতে খেলতেই অর্জন করতে হবে।
আর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মতো প্রতিযোগিতায় এই শেখার সময়টিই কখনও কখনও অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
ভারত যখন দ্রুত প্রজন্ম বদলের পথে হাঁটছে, অস্ট্রেলিয়া সেখানে অনেক বেশি সতর্ক।
অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটে নতুন প্রতিভার অভাব কখনওই বিশেষ দেখা যায়নি। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে নিয়মিত প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে আসেন। কিন্তু শুধুমাত্র নতুন ক্রিকেটারকে সুযোগ দেওয়ার জন্য অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে সরিয়ে দেওয়ার পথে সাধারণত হাঁটে না অস্ট্রেলিয়া।
তাদের পরিকল্পনা অনেকটাই সহজ।
যতদিন একজন ক্রিকেটার পারফর্ম করছেন, ফিট রয়েছেন এবং দলের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন, ততদিন তাঁর বয়স বড় বিষয় নয়।
ফলে স্টিভ স্মিথ, নাথান লিয়ন, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউড বা উসমান খাওয়াজার মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের গুরুত্ব এখনও অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট পরিকল্পনায় বিশাল।
এই ক্রিকেটারদের প্রত্যেকেরই দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের পিচ, প্রতিকূল পরিবেশ, বড় সিরিজ় এবং চাপের ম্যাচে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মতো প্রতিযোগিতায় ঠিক এই অভিজ্ঞতাই অস্ট্রেলিয়াকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জ়িল্যান্ড এবং ভারতের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার আসন্ন সিরিজ়গুলি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের হিসাবের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
প্রতিটি দলের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জও আলাদা।
উপমহাদেশের পরিবেশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে হলে স্পিন এবং ধীরগতির উইকেট সামলানোর দক্ষতা প্রয়োজন হতে পারে। সেখানে একজন ব্যাটারের টেকনিকের পাশাপাশি ধৈর্যের পরীক্ষাও হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। পেস এবং বাউন্স সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিউ জ়িল্যান্ডেও সিম এবং সুইংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাটারদের পরীক্ষা দিতে হতে পারে।
আর ভারতের বিরুদ্ধে যে কোনও টেস্ট সিরিজ়ই অস্ট্রেলিয়ার কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
দুই দেশের ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা গত কয়েক বছরে আরও তীব্র হয়েছে। ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ় বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত দ্বিপাক্ষিক লড়াইগুলির একটি।
ফলে চারটি ভিন্ন প্রতিপক্ষ এবং বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে খেলার কথা মাথায় রেখেই অস্ট্রেলিয়া অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপর নির্ভরতা বজায় রাখতে চাইছে।
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান টেস্ট কাঠামোয় কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের গুরুত্ব শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়।
তাঁরা দলের তরুণ ক্রিকেটারদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
স্টিভ স্মিথের মতো একজন ব্যাটার ড্রেসিংরুমে থাকলে তরুণরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রস্তুতি সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারেন। ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ বোলারদের বিশ্লেষণ, নিজের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা বুঝে কাজ করা, দীর্ঘ ইনিংস গড়ার পদ্ধতি—এসব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
একই ভাবে নাথান লিয়নের মতো স্পিনারের উপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণে ভারসাম্য এনে দেয়।
মিচেল স্টার্ক এবং জশ হ্যাজেলউডের মতো পেসাররা বহু বছর ধরে বিশ্বের সেরা ব্যাটিং লাইন-আপগুলির বিরুদ্ধে খেলেছেন। চাপের পরিস্থিতিতে তাঁদের ব্যবহার কী ভাবে করতে হয়, অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক এবং টিম ম্যানেজমেন্ট তা খুব ভাল করেই জানে।
এই কারণেই বয়স বাড়লেও তাঁদের গুরুত্ব কমে যায়নি।
ক্রিকেটের আধুনিক যুগে ফিটনেসের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে বয়সকে শুধুমাত্র নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখা সবসময় সঠিক নয়।
বিশেষ করে ব্যাটার এবং স্পিনারদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেক সময় পারফরম্যান্স আরও পরিণত হয়।
একজন তরুণ ব্যাটারের শটের সংখ্যা বেশি হতে পারে, কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ব্যাটার হয়তো জানেন কোন শটটি কখন না খেলাই ভাল।
টেস্ট ক্রিকেটে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই অনেক সময় ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে।
অস্ট্রেলিয়া সম্ভবত ঠিক সেই কারণেই তাদের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপর আস্থা হারাতে চাইছে না।
তাদের কাছে প্রশ্নটা ‘ক্রিকেটারের বয়স কত’ নয়।
প্রশ্নটা হল—‘তিনি এখনও দলকে ম্যাচ জেতাতে পারছেন কি না?’
উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তা হলে বয়স নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।
ভারতের পরিস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার থেকে কিছুটা আলাদা।
একসঙ্গে একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার সরে যাওয়ায় ভারতীয় দলের ব্যাটিং এবং বোলিং কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে।
নতুন ক্রিকেটারদের শুধু নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করলেই হবে না, একই সঙ্গে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও নিতে হবে।
শুভমন গিলের উপর দায়িত্ব অনেক বেশি।
শুধু ব্যাটার হিসেবে রান করা নয়, নতুন প্রজন্মের ভারতীয় টেস্ট দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর উপর।
তাঁর সঙ্গে যাঁরা খেলছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই আগামী কয়েকটি সিরিজ় নিজেদের আন্তর্জাতিক টেস্ট কেরিয়ার প্রতিষ্ঠা করার বড় সুযোগ।
কিন্তু বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ অপেক্ষা করে না।
প্রতিটি ম্যাচ এবং প্রতিটি পয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে নতুন দল তৈরি করতে গিয়ে ভারত যদি কয়েকটি সিরিজ়ে পয়েন্ট হারায়, তাহলে ফাইনালের সমীকরণ দ্রুত কঠিন হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সিরিজ়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেও পরের দু’টি সিরিজ়ে খারাপ ফল করলে পয়েন্ট শতাংশ দ্রুত নিচে নেমে যেতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রেও সেই চাপ তৈরি হয়েছে।
নতুন ক্রিকেটারদের নিয়ে দল তৈরি করতে গিয়ে ফলাফলের ওঠানামা দেখা গেলে WTC ফাইনালে ওঠার অঙ্ক জটিল হয়ে উঠতে বাধ্য।
ভারতের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ।
একদিকে ভবিষ্যতের দল তৈরি করতে হবে।
অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিটি ম্যাচ জেতার চেষ্টা করতে হবে।
দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই গম্ভীরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।