ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি রাশিয়া থেকে তেল কেনা এ বার বন্ধ করবে ভারত? না কি কমিয়ে দেবে?আমেরিকার সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য-সমঝোতা মেনে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা এ বার কিছুটা হয়তো কমিয়ে দেবে ভারত। তবে বন্ধ করবে না। সূত্রকে উদ্ধৃত করে এমনটাই জানিয়েছে পিটিআই। ওই সূত্রেরই দাবি, ভারতের কিছু তৈল শোধনাগারের হাতে তেল ক্রয়ের বিষয়ে বিকল্প নেই। তাই রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করা এখনই সম্ভব নয়। এই নিয়ে প্রশ্নের মুখে বিদেশ মন্ত্রক যদিও সরাসরি কোনও উত্তর দেয়নি। তবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি রাশিয়া থেকে তেল কেনা এ বার বন্ধ করবে ভারত? না কি কমিয়ে দেবে? কারণ চুক্তির শর্তই ছিল সে রকম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সমঝোতার কথা ঘোষণার পরে দাবি করেছিলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে।
ভারতের তেল শোধনাগারগুলির সূত্রে জানা গিয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে বলে তাদের কাছে এখনও কোনও নির্দেশিকা যায়নি। সূত্রের খবর, মস্কো থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমাতে বলে তাদের কাছে বেসরকারি ভাবে পরামর্শ এসেছে। এই শোধন সংস্থাগুলি রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে তা থেকে পেট্রোল, ডিজেল তৈরি করে। ওই সংস্থার এক সূত্র জানিয়েছে, সমঝোতার আগে পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে তেল কেনা নিয়ে যে চুক্তি তারা করেছিল, তাকে মান্যতা দেওয়া হবে। মাল নেওয়ার ছয় থেকে আট সপ্তাহ আগে সাধারণত রাশিয়ার সংস্থাগুলিকে বরাত দেওয়া হয়। তবে তাদের নতুন করে তেল কেনার বরাত দেওয়া হবে না।
সূ্ত্র বলছে, গত বছর রাশিয়ার তেল রফতানিকারক সংস্থাগুলির উপর আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরে মস্কো থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছিল হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (এইচপিসিএল), ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড (এমআরপিএল), এইচপিসিএল-মিত্তল এনার্জি লিমিটেড। সূত্র বলছে, ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (বিপিসিএল), ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (আইওসি) ধীরে ধীরে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমাবে। গত বছর রসনেফট এবং লুকোয়েলের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা জারির পরে রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেড মস্কো থেকে তেল কেনা থামিয়েছিল। পরে তা আবার চালু করে। ভারতে অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা তারাই। তবে সূত্রের খবর, রুশ সংস্থাকে আবার বরাত দেওয়া ১,৫০,০০০ ব্যারেল হাতে পাওয়ার পরে ওই সংস্থাও মস্কো থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে চলেছে।
তবে ব্যতিক্রম হতে পারে ন্যায়ারা এনার্জি। এই সংস্থার শোধনাগার গুজরাতে হলেও তার ৪৯.১৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে রুশ সংস্থা রসনেফ্টের কাছে। সে কারণে গত বছর ন্যায়ারার উপরে নিষেধাজ্ঞা চাপায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেন। সে কারণে তাদের সঙ্গে অন্য কোনও তেল সংস্থা ব্যবসা করতে রাজি নয়। ফলে তারা বাধ্য হয়েই এখনও রুশ সংস্থার থেকে তেল কিনে চলেছে।
এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি ভারতীয় তেল মন্ত্রক। বাণিজ্য মন্ত্রক এবং বিদেশ মন্ত্রকও সরাসরি কিছু বলেনি। তবে একটি সূত্র বলছে, গত বছর দুই রুশ সংস্থার উপরে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরেই সেগুলি থেকে তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছে ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়া থেকে প্রতিদিনি ১২ লক্ষ ব্যারেল তেল কিনেছে ভারত। যেখানে ২০২৩ সালের মে মাসে প্রতি দিন ২১ লক্ষ ব্যারেল তেল কিনত। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে তা কমে হয়েছে ১১ লক্ষ ব্যারেল। অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে প্রতি দিন রাশিয়া থেকে ১১ লক্ষ ব্যারেল তেল কিনেছে ভারত। ফেব্রুয়ারি মাসে তা আরও কমে ১০ লক্ষ ব্যারেল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারত যত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই রাশিয়া থেকে কম দামে কেনে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে রাশিয়ার উপরে আর্থিক নিষেধজ্ঞা চাপায় আমেরিকা। তার পর রাশিয়া থেকে আরও কম দামে তেল কিনতে থাকে ভারত। এ বার তা বন্ধ হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। পিটিআই সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলছে, ন্যায়ারার ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যতিক্রম হতে পারে। ডিসেম্বরে আমেরিকার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যখন বাণিজ্য-সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হয়, তখন ন্যায়ারা এনার্জির বিষয়টি তাদের আলাদা ভাবে জানানো হয়।
রিসার্চ অ্যানালিস্ট সুমিত রিটোলিয়া মনে করেন, আগামী আট থেকে ১০ সপ্তাহ রাশিয়া থেকে তেল আসবে ভারতে। তা বন্ধ হলে চাপ পড়তে পারে ভারতে। আগামী দিনেও ভারত রাশিয়া থেকে তেল ক্রয় পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না বলেই মনে করেন তিনি। তবে অনেকে মনে করেন, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল ভারী এবং টক। সে কারণে সস্তা। তাই তাদের তেল বিকল্প হতে পারে ভারতের কাছে।
শনিবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘‘ভারত কোথা থেকে জ্বালানি আমদানি করবে আর কোথা থেকে নয়, তা নিয়ে অতীতে সরকারের তরফে বার বার অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পায়।’’ তিনি আরও জানান, বাজার এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেলের উৎস খোঁজার ক্ষেত্রে বৈচিত্র নিশ্চিত করাই ভারতের কৌশলগত নীতি। সব পদক্ষেপই এই বিষয়ের উপর নির্ভর করে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি ভোক্তা দেশ। দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ন, পরিবহণের বিস্তার, ডিজিটাল অবকাঠামো—সব মিলিয়ে জ্বালানির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।
১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যা
দ্রুত বাড়তে থাকা মধ্যবিত্ত
শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি
বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি
পরিবহণ খাতের সম্প্রসারণ
ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫% আমদানি করে। ফলে আমদানির উৎস, দাম এবং সরবরাহ স্থিতিশীলতা—সবই জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
আধুনিক ভূরাজনীতিতে জ্বালানি শুধু অর্থনৈতিক পণ্য নয়, এটি কৌশলগত সম্পদ।
জ্বালানি ঘাটতি হলে—
শিল্প উৎপাদন কমে
মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে
পরিবহণ খরচ বাড়ে
খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে
জিডিপি বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে
তাই জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা মানেই অর্থনীতি ও সমাজ স্থিতিশীল রাখা।
রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট বলেছেন, বাজার ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেলের উৎসে বৈচিত্র নিশ্চিত করা ভারতের কৌশল।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমানো
যুদ্ধ/নিষেধাজ্ঞা ঝুঁকি মোকাবিলা
দামের প্রতিযোগিতা পাওয়া
সরবরাহ বিঘ্ন এড়ানো
ভারত তেল আমদানি করে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে—
ইরাক
সৌদি আরব
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি
কুয়েত
সাম্প্রতিক বছরে রাশিয়া ভারতের অন্যতম বড় সরবরাহকারী হয়েছে, বিশেষ করে ছাড় মূল্যে তেল পাওয়ার কারণে।
শেল অয়েল রপ্তানির ফলে আমদানি বেড়েছে।
নাইজেরিয়া
অ্যাঙ্গোলা
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই প্রেক্ষিতে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে।
ভারতের অবস্থান—
সস্তা তেল অর্থনীতির জন্য জরুরি
উন্নয়নশীল দেশের প্রয়োজন আলাদা
ইউরোপ নিজেও জ্বালানি আমদানি করেছে
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই “স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি” নীতি অনুসরণ করে—
কারও ব্লকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে নয়
জাতীয় স্বার্থ আগে
বহুমুখী সম্পর্ক বজায়
জ্বালানি আমদানিতেও সেই নীতি প্রতিফলিত।
সরকারি অবস্থান অনুযায়ী—
দাম
পরিবহণ খরচ
বীমা
পেমেন্ট মেকানিজম
সব বিবেচনা করে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সব তেল একরকম নয়। ভারতের রিফাইনারিগুলি বিভিন্ন গ্রেড প্রসেস করতে পারে—
লাইট ক্রুড
হেভি ক্রুড
সাওয়ার ক্রুড
এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও উৎস বৈচিত্রে সহায়তা করে।
ভারত জ্বালানিকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করে—
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি
যৌথ বিনিয়োগ
আপস্ট্রিম অংশীদারিত্ব
সরবরাহ বিঘ্ন হলে ব্যবহারযোগ্য মজুত তৈরি করেছে ভারত—
বিশাখাপত্তনম
মঙ্গলোর
পাদুর
ভবিষ্যতে মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির। ভারত মোকাবিলা করে—
সোর্স শিফট
স্পট বনাম টার্ম কন্ট্রাক্ট
ডিসকাউন্ট নেগোশিয়েশন
তেলের দাম বাড়লে—
পেট্রোল/ডিজেল দাম বাড়ে
পরিবহণ খরচ বাড়ে
খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে
তাই সস্তা উৎস খোঁজা অর্থনৈতিকভাবে জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভরতা কমাতে ভারত জোর দিচ্ছে—
সৌরশক্তি
বায়ুশক্তি
সবুজ হাইড্রোজেন
ইলেকট্রিক যান
পরিষ্কার জ্বালানিতে রূপান্তর জরুরি, কিন্তু—
তেলের চাহিদা এখনও উচ্চ
শিল্প ও পরিবহণ নির্ভর
তাই দুই নীতির ভারসাম্য জরুরি।
ভারত একদিকে—
যুক্তরাষ্ট্র
ইউরোপ
অন্যদিকে—
রাশিয়া
মধ্যপ্রাচ্য
সব দিকেই সম্পর্ক বজায় রাখে।
ডলার নির্ভরতা কমাতে—
রুপি ট্রেড
কারেন্সি সোয়াপ
বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা খোঁজা হচ্ছে।
তেল আসে সমুদ্রপথে—
হরমুজ প্রণালী
মালাক্কা প্রণালী
এই রুট নিরাপত্তা ভারতীয় নৌবাহিনীর কৌশলগত অগ্রাধিকার।
নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিতে—
ট্যাঙ্কার বীমা
শিপিং লজিস্টিক
বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে।
ভারত চেষ্টা করছে—
অফশোর এক্সপ্লোরেশন
শেল গ্যাস
অনশোর ড্রিলিং
রিলায়েন্স, নাইয়ারা ইত্যাদি বেসরকারি রিফাইনারিও উৎস বৈচিত্রে ভূমিকা রাখে।
জ্বালানি সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলে—
কূটনৈতিক সম্পর্ক
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
বাণিজ্য চুক্তি
ভারতের বক্তব্য—
উন্নয়নশীল দেশের জ্বালানি প্রয়োজন আলাদা।
সস্তা জ্বালানি = উন্নয়ন গতি।
কার্বন কমানো জরুরি, কিন্তু তেল ছাড়াই অর্থনীতি চালানো এখনই সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
গ্যাস ব্যবহার বাড়বে
হাইড্রোজেন বাড়বে
তেলের শেয়ার ধীরে কমবে
রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্য ভারতের জ্বালানি কূটনীতির মূল দর্শনকে তুলে ধরে—জাতীয় স্বার্থ সবার আগে। ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও কৌশলগত প্রয়োজনও।
তেলের উৎসে বৈচিত্র, বাজারভিত্তিক সিদ্ধান্ত, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবমানতা—সব মিলিয়ে ভারত এক বহুমাত্রিক জ্বালানি নীতি অনুসরণ করছে।
ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক চাপ, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা—সব কিছুর মধ্যেই ভারত তার জ্বালানি সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় প্রয়োজন, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থকে সামনে রেখেই।