সম্প্রতি কৃতি খরবন্দা ও পুলকিত সম্রাটের সঙ্গে এক আলোচনা পর্বে বিয়ে প্রসঙ্গে মুখ খুললেন কর্ণ জোহর। সেখানেই নিজের ব্যক্তিগত অভ্যাস নিয়ে এক বিস্ফোরক তথ্য জানান তিনি বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ পেলেও কেন তিনি খাবার ছুঁয়েও দেখেন না, তার কারণও ইঙ্গিতে তুলে ধরেন। এই মন্তব্য ঘিরেই নেটদুনিয়ায় শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
চলছে বিয়ের মরসুম—মানে একদিকে সাজগোজ আর আনন্দ-উৎসব, অন্যদিকে গয়না, আলোকসজ্জা, গান-বাজনা, আর সবচেয়ে বড় কথা… দাওয়াতের খাবার! এই সময়টা এলেই অনেকের মনে একটাই দুশ্চিন্তা—“ডায়েট যাবে, কিন্তু বিয়ে বাড়ির পোলাও-রোস্ট-ডেজার্ট কি ছাড়তে পারি?” বেশিরভাগ খাদ্যরসিক মানুষের কাছে বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণ মানেই পেটপুজোর একটা ‘লাইসেন্স’। একেকজন তো আগে থেকেই প্ল্যান করে রাখেন—কোন স্টলে কী খাবেন, কোন পদটা দু’বার নেবেন, ডেজার্টটা শেষ করে তবেই উঠবেন।
কিন্তু এই চেনা ছবিটাই একেবারে উল্টে দিলেন বলিউডের জনপ্রিয় পরিচালক ও প্রযোজক কর্ণ জোহর। বিয়েবাড়ির খাবার নিয়ে আলোচনা উঠতেই তিনি এমন একটি তথ্য জানান, যা শুনে প্রথমে থমকে যান উপস্থিত অনেকেই—কর্ণ নাকি আজ পর্যন্ত কোনো বিয়েবাড়িতে গিয়ে খাবার খাননি! শুধু খাননি বললে হয়তো তবুও বোঝা যেত, কিন্তু তাঁর বক্তব্য আরও বিস্ফোরক—তিনি নাকি ইচ্ছা করেই বিয়ের অনুষ্ঠানে খাবার এড়িয়ে চলেন। আর কারণটা কোনও “ডায়েট” বা “ফিটনেস রুটিন” নয়; পুরোটা আসলে তাঁর ব্যক্তিগত অস্বস্তি, অভ্যাস এবং পরিস্থিতিগত স্বাচ্ছন্দ্য-অস্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে জড়িত।
সম্প্রতি কৃতি খরবন্দা ও পুলকিত সম্রাটের সঙ্গে এক আলোচনা পর্বে বিয়ে নিয়ে কথা বলছিলেন কর্ণ। কথায় কথায় কর্ণ তাঁদের জিজ্ঞেস করেন—কৃতি ও পুলকিতের বিয়েতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটা ছিল? দু’জনেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন—“ভাল ও সুস্বাদু খাবার।”
এই উত্তরটা আসলে খুবই স্বাভাবিক। আজকাল বিয়েতে খাবার শুধু ‘খাওয়া’ নয়, একটা বড়সড় ‘এক্সপেরিয়েন্স’। লাইভ কাউন্টার, কাস্টমাইজড মেনু, ফিউশন আইটেম, ডেজার্ট কর্নার—সব মিলিয়ে অতিথিদের মনে থাকে খাবারের স্মৃতিই সবচেয়ে বেশি। তাই কৃতি-পুলকিতের উত্তরে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু এরপরেই কর্ণ এমন কথা বলেন, যা শুনে কৃতি-পুলকিতও রীতিমতো অবাক হয়ে যান।
কর্ণ নিজের যুক্তিটা খুব সোজা ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। বিয়েবাড়ির খাবার খেতে গেলে বেশিরভাগ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। তারপর প্লেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে হয়, চারপাশে লোকজন, ভিড়, হৈচৈ—এই পুরো ব্যাপারটাই তাঁর কাছে ‘অস্বস্তিকর’।
অনেকে ভাবেন, সেলিব্রিটিরা তো ভিআইপি, তাঁদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু বাস্তবে সব বিয়েতে বা সব জায়গায় সেই সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে যদি অনুষ্ঠান বড় হয়, অতিথি বেশি হয়, আর খাবারের ব্যবস্থা “স্টল/কাউন্টার” ভিত্তিক হয়—তাহলে ভিড়, লাইন, ধাক্কাধাক্কি, অপেক্ষা… এই সব মিলিয়ে অনেকেরই অস্বস্তি হয়। কর্ণের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি, কারণ তিনি নিজে দাঁড়িয়ে প্লেট হাতে খাবার খেতে স্বচ্ছন্দ নন। ফলে তাঁর সমাধান একটাই—খাবার না খাওয়া।
এখানে একটা মজার মনস্তত্ত্ব কাজ করে। অনেক মানুষই সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবার নিয়ে ভিন্ন ধরনের অস্বস্তি অনুভব করেন—কেউ ভিড় পছন্দ করেন না, কেউ দাঁড়িয়ে খেতে পারেন না, কেউ আবার অচেনা লোকজনের মাঝে খেতে অস্বস্তি বোধ করেন। কর্ণের বক্তব্য সেই দিক থেকেই অনেকের কাছে রিলেটেবল হয়ে উঠেছে। পার্থক্য একটাই—তিনি সাধারণ মানুষ নন, তাঁর এই কথা ছড়িয়ে পড়লেই সেটা খবর হয়ে যায়।
বিয়েবাড়ির খাওয়াদাওয়া নিয়ে মানুষের আবেগ খুব গভীর। কারণ অনেক সময় বিয়ে বাড়ির খাবার মানেই “স্পেশাল”—বাড়ির রান্নার থেকেও আলাদা, মশলার গন্ধ, ঘি-বাসা পোলাও, ফিনিশিং টাচ, আর অতিথিদের হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে খাওয়ার আলাদা আনন্দ। অনেকেই তো বলেন, “বিয়েবাড়িতে অন্তত দুটো পদ মন ভরে খেতেই হয়।”
কেউ স্টার্টার বেশি খায়, কেউ মেইন কোর্সে ফোকাস করে, কেউ আবার ডেজার্টের জন্য জায়গা রেখে দেয়। আর একটা চেনা দৃশ্য—খাবার না খেয়েও মানুষ ঘুরে ঘুরে সব আইটেম দেখে, কী কী আছে তার তালিকা বানায়, কাউকে ধরে বলে, “ওইটা খেয়েছ? এটা নাও, দারুণ।” বিয়েবাড়ির খাবার তাই শুধু পেট ভরানোর ব্যাপার নয়—এটা একটা সামাজিক আনন্দ, একটা কমিউনিটি ফিলিং।
ঠিক এই জায়গাতেই কর্ণের বক্তব্যটা নজর কাড়ে। কারণ যেখানে সবাই খাবারকে বিয়ের ‘হাইলাইট’ ধরে নেয়, সেখানে কর্ণ বলছেন—তিনি এই হাইলাইটটাই কখনও উপভোগ করেননি।
কর্ণ জোহর এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর লাইফস্টাইল, মতামত, কথাবার্তা—সবকিছু নিয়েই মানুষের কৌতূহল থাকে। তিনি শুধু পরিচালক নন, একজন শো হোস্ট, প্রযোজক, ফ্যাশন আইকন, এবং বলিউডের ‘ইনসাইডার’ সার্কেলের এক পরিচিত মুখ। ফলে তিনি যখন নিজের সম্পর্কে এমন ব্যক্তিগত অভ্যাস শেয়ার করেন, সেটা সহজেই খবর হয়ে যায়।
আর “বিয়েবাড়িতে গিয়ে কখনও খাইনি”—এটা এমন এক বাক্য, যা অনেকের কানে অবিশ্বাস্য শোনায়। কারণ সাধারণ মানুষও তো বিয়েবাড়িতে গিয়ে অন্তত কিছু না কিছু খান—চা, মিষ্টি, জল, বা অন্তত একটা স্ন্যাক্স। কিন্তু কর্ণের বক্তব্য শুনে মনে হয়, তিনি পুরো খাবার পর্বটাই এড়িয়ে যান। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন ওঠে—তাহলে তিনি বিয়েতে গিয়ে করেনটা কী? শুধুই দেখা করা, শুভেচ্ছা দেওয়া, অনুষ্ঠান উপভোগ করা, আর বেরিয়ে যাওয়া?
এতেই গল্পটা জমে ওঠে—কারণ এটা ‘অস্বাভাবিক’ বলেই মানুষ বেশি আলোচনা করে।
কিছু দিন আগেই শিল্পপতি রাজু মান্টেনার কন্যা নেত্রা মান্টেনার বিয়ের অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করতে দেখা গিয়েছিল কর্ণকে। এই ধরনের হাই-প্রোফাইল বিয়েতে সাধারণত সবকিছুই হয় রাজকীয়—সাজসজ্জা থেকে অতিথি তালিকা, পারফরম্যান্স থেকে খাবার, সবই থাকে “গ্র্যান্ড”। তাই অনেক ভক্তেরই কৌতূহল—এমন বিয়েতে গিয়েও কি কর্ণ খাবার এড়িয়ে গেলেন?
কর্ণের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাবনাই বেশি যে তিনি খাওয়ার পর্বে যাননি বা খুবই সীমিতভাবে থেকেছেন। কারণ তাঁর অস্বস্তিটা খাবারের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং খাবার পরিবেশনের ‘ফরম্যাট’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। লাইন, ভিড়, দাঁড়িয়ে প্লেট হাতে খাওয়া—এই অভিজ্ঞতাটা তিনি এড়িয়ে চলেন বলেই জানিয়েছেন।
কর্ণ জোহরের সিনেমায় বিয়ে মানেই আলাদা একটা রূপকথা। তাঁর ছবিতে বিয়ের দৃশ্যে থাকে ঝলমলে পোশাক, রঙিন সেট, আবেগঘন সংলাপ, চোখে জল আনা মুহূর্ত, আর সেই সঙ্গে নাটকীয়তা। দর্শকরা কর্ণের ছবির বিয়ে দেখে প্রায়ই বলেন—“এমন বিয়ে যদি সত্যিই হতো!”
সেখানেই মজার টুইস্ট—যিনি পর্দায় বিয়েকে এত জমকালো করে তুলেছেন, বাস্তবে তিনি বিয়ের একেবারে ‘সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ’—খাবার—এড়িয়ে চলেন। এই বৈপরীত্যটাই খবরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
অনেকের কাছে কর্ণের এই স্বীকারোক্তি যেন একটা “রিয়েলিটি চেক”—পর্দায় যে জৌলুস দেখা যায়, বাস্তবে একজন তারকা বা পরিচালক হয়েও কারও ব্যক্তিগত অস্বস্তি বা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। আর সেটাই মানুষকে অবাকও করে, আবার কৌতূহলীও করে।
কর্ণের বক্তব্য সরাসরি ডায়েট বা ফিটনেস কেন্দ্রিক নয়। তবে অনেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবেন—সেলিব্রিটিদের তো ডায়েট প্ল্যান থাকে, শুটিং থাকে, ফিটনেস মেইনটেন করতে হয়; তাই কি তিনি খাবার খান না?
সত্যি বলতে, সেলিব্রিটি লাইফস্টাইলে ডায়েট বড় ব্যাপার। কিন্তু এখানে কর্ণ যেটা বলেছেন—তার মূল ফোকাস “কীভাবে খেতে হয়” সেই সামাজিক সেটিংটা। অর্থাৎ খাবারটা নয়, পরিবেশন প্রক্রিয়া, ভিড়, দাঁড়িয়ে খাওয়া, লাইনে দাঁড়ানো—এই বিষয়গুলোই তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলে।
আর এটা খুব মানবিক কারণ। অনেকেই রেস্টুরেন্টে আরাম করে খেতে পারেন, কিন্তু অনুষ্ঠান বাড়ির ভিড়ে অস্বস্তি বোধ করেন। কর্ণ হয়তো সেই ধাঁচেরই মানুষ।
এছাড়া আরেকটা ব্যাপার আছে—তারকা হলে মানুষ বারবার ছবি তুলতে আসতে পারেন, কথা বলতে আসতে পারেন, কেউ কেউ সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকেন—এই সবকিছু মিলিয়ে প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে খাওয়া আরও বিব্রতকর হয়ে ওঠে। তাই “না খাওয়াই” হয়তো তাঁর কাছে সবচেয়ে সহজ সমাধান।
এই ধরনের খবর সামনে এলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ মজা করে বলেন—“বিয়েবাড়িতে না খাওয়া সম্ভব?” কেউ বলেন—“এই তো, আমিও লাইনে দাঁড়াতে পারি না।” আবার কেউ কেউ বলেন—“ভিড়-ভাট্টা এড়িয়ে চলাই ভালো।”
এখানে কর্ণকে ঘিরে আলোচনা দু’ভাবে হচ্ছে—
যারা বিষয়টাকে ‘অদ্ভুত’ বা ‘ফানি’ বলে দেখছেন, কারণ তাঁদের কাছে বিয়েবাড়ি মানেই খাবার।
যারা বিষয়টাকে বুঝতে পারছেন, কারণ তাঁদেরও ভিড়ে দাঁড়িয়ে খেতে অস্বস্তি হয়।
দুটো মতই স্বাভাবিক। কারণ অভ্যাস আর স্বাচ্ছন্দ্য ব্যক্তি ভেদে বদলায়। তবে কর্ণের ক্ষেত্রে এটা বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে তাঁর জনপ্রিয়তা আর ইমেজের কারণে।
আমরা অনেক সময় ধরে নিই—বিয়েবাড়িতে গেলে খেতেই হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষই নানা কারণে খাবার এড়িয়ে চলেন।
কেউ ডায়েটের জন্য
কেউ মেডিক্যাল কারণে
কেউ ভিড়ের জন্য
কেউ নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি থাকার কারণে
কেউ আবার “খাবারের সময়টাই সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর” বলে
কর্ণ জোহরের বক্তব্য আসলে এই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। আর সেটা ‘শিরোনাম-যোগ্য’ হয়ে ওঠে কারণ এমন স্বীকারোক্তি একজন পরিচিত পরিচালক প্রকাশ্যে করছেন।
বিয়ের মরসুমে খাবার নিয়ে উন্মাদনা যেমন সত্যি, তেমনি কারও পছন্দ-অপছন্দ, আরাম-অস্বস্তিও সত্যি। কর্ণ জোহর যে বিয়েবাড়িতে কখনও খাবার খাননি—এটা একদিকে অবাক করার মতো, অন্যদিকে বেশ মানবিকও। কারণ সেলিব্রিটি হলেও তিনি একজন মানুষ, তাঁরও ব্যক্তিগত সীমা আছে।
তবে এই খবরের সবচেয়ে মজার দিকটা হলো—বিয়েবাড়ির খাবার নিয়ে আমাদের যে চিরচেনা ধারণা, সেটাকে এক ঝটকায় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে কর্ণের এই বক্তব্য। হয়তো অনেকেই আজ থেকে বিয়েবাড়িতে লাইনে দাঁড়ানোর সময় মনে মনে বলবেন—“কর্ণ জোহর ঠিকই তো বলেছে!” আবার কেউ বলবেন—“না না, লাইনে দাঁড়ালেও খাবার ছাড়ব না!”
আর বিয়েবাড়ির আসল মজা বোধহয় এখানেই—কারও কাছে এটা খাবারের উৎসব, কারও কাছে এটা সামাজিক মিলনমেলা, কারও কাছে গান-নাচ, কারও কাছে সাজ-পোশাক। কর্ণ জোহর হয়তো খাবার বাদ দিয়ে বাকি আনন্দটাই নিতে চান। আর সেই “উল্টো পথের পথিক” হওয়াতেই তাঁর এই স্বীকারোক্তি এতটা আলোচনায় উঠে এসেছে।