Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দাঁত রোজ দুবার মাজার পরও হলুদ কেন জানুন চারটি বড় কারণ

দাঁত সাদা রাখতে শুধু নিয়মিত ব্রাশ করাই যথেষ্ট নয় বরং অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যাসিডিক খাবার গ্রহণের ফলেও ধীরে ধীরে দাঁতে হলুদ ছোপ পড়তে পারে তাই সচেতন হওয়া জরুরি।

দাঁতের যত্ন মানেই শুধু দিনে দুবার ব্রাশ করা এই ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যেই খুব গভীরভাবে গেঁথে আছে। ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে শুতে যাওয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করা জরুরি। নিঃসন্দেহে এটি মুখের স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। নিয়মিত ব্রাশ মুখের ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে মাড়ির সমস্যা কমায় এবং দুর্গন্ধ দূরে রাখে। তবুও বহু মানুষ অভিযোগ করেন যে নিয়ম মেনে দাঁত পরিষ্কার করার পরেও তাঁদের দাঁত ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে কিংবা হলুদ দেখাচ্ছে। তখন প্রশ্ন ওঠে এত যত্ন নেওয়ার পরেও কেন দাঁতের উজ্জ্বলতা বজায় থাকছে না।

আসলে দাঁত সাদা থাকা বা না থাকার বিষয়টি কেবল উপরিভাগ পরিষ্কার থাকার ওপর নির্ভর করে না। দাঁতের গঠন অনেকটাই স্তরবিন্যাসের মতো। দাঁতের বাইরের স্তরটি হল এনামেল যা দেখতে সাদা এবং কিছুটা স্বচ্ছ। এই এনামেলের নিচে থাকে ডেন্টিন নামের একটি স্তর যার রং স্বাভাবিকভাবেই হালকা হলুদ। যখন এনামেল সুস্থ এবং পুরু থাকে তখন ডেন্টিন চোখে পড়ে না এবং দাঁত সাদা দেখায়। কিন্তু কোনও কারণে যদি এনামেল পাতলা হয়ে যায় অথবা দাগ পড়ে যায় তখন ভিতরের ডেন্টিন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে দাঁত হলুদ বা নিস্তেজ দেখাতে শুরু করে। এই কারণেই অনেক সময় ভালোভাবে ব্রাশ করার পরেও দাঁতের রঙে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায় না।

দাঁতে দাগ পড়ার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হল আমাদের খাদ্যাভ্যাস। প্রতিদিন আমরা যা খাই বা পান করি তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দাঁতের ওপর। গাঢ় রঙের খাবার এবং পানীয় যেমন চা কফি কোলা কোমল পানীয় বা লাল ওয়াইনে এমন কিছু রঞ্জক পদার্থ থাকে যা সহজেই এনামেলের সঙ্গে লেগে যায়। নিয়মিত এই ধরনের পানীয় গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে দাঁতের উপরিভাগে দাগ জমতে থাকে। যদি খাওয়ার পরপরই দাঁত পরিষ্কার না করা হয় তাহলে সেই দাগ আরও গভীর হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা সহজে ওঠে না।

এছাড়া খাদ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবও দাঁতের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। ক্যালসিয়াম ভিটামিন ডি এবং ফসফরাসের মতো উপাদান দাঁতের এনামেলকে মজবুত রাখতে সাহায্য করে। এই উপাদানগুলির অভাব হলে এনামেল দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল এনামেল সহজেই দাগ ধরে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে দাঁত দ্রুত হলুদ দেখাতে শুরু করে।

অ্যাসিডিক খাবার দাঁতের জন্য আরেকটি বড় শত্রু। সাইট্রাস ফল যেমন লেবু কমলা টক ফল সোডা প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং টক স্বাদের বিভিন্ন পদ মুখের ভিতরে অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই অ্যাসিড ধীরে ধীরে এনামেল ক্ষয় করে। অনেকেই ভাবেন ফল খাওয়া স্বাস্থ্যকর তাই এতে কোনও সমস্যা নেই কিন্তু অতিরিক্ত টক ফল বা অ্যাসিডিক পানীয় নিয়মিত গ্রহণ করলে দাঁতের ক্ষতি হতে পারে। এনামেল যত পাতলা হয় ততই ভিতরের হলুদ ডেন্টিন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলেই নিয়মিত ব্রাশ করার পরেও দাঁত হলুদ দেখাতে পারে।

বয়স বাড়ার সঙ্গেও দাঁতের রঙের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে ঘটে। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বছরের পর বছর ধরে খাবার চিবানো ব্রাশ করা এবং বিভিন্ন অ্যাসিডিক উপাদানের সংস্পর্শে থাকার ফলে দাঁতের এনামেল ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এনামেল পাতলা হয়ে যায় এবং ভিতরের ডেন্টিন বেশি করে দেখা যায়। তাই অনেক ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে দাঁত হলুদ হওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয় এবং এটি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

অনেকেই দাঁত সাদা রাখার জন্য অতিরিক্ত শক্ত ব্রাশ ব্যবহার করেন বা জোরে জোরে দাঁত মাজেন। এতে সাময়িকভাবে দাঁত পরিষ্কার মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফল উল্টো হতে পারে। খুব শক্ত ব্রাশ বা বেশি চাপ দিয়ে ব্রাশ করলে এনামেল দ্রুত ক্ষয় হয়। ফলে দাঁতের সুরক্ষামূলক স্তর নষ্ট হয়ে যায় এবং দাঁত আরও সংবেদনশীল ও হলুদ হয়ে ওঠে। তাই দাঁত মাজার সময় নরম ব্রাশ ব্যবহার করা এবং হালকা হাতে ব্রাশ করা অত্যন্ত জরুরি।

দাঁতের আরেকটি বড় শত্রু হল ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্য। সিগারেট বিড়ি কিংবা জর্দা খৈনি দাঁতের উপর গভীর দাগ ফেলে। এই দাগ সাধারণ ব্রাশে সহজে ওঠে না। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস থাকলে দাঁতের স্বাভাবিক রং নষ্ট হয়ে যায় এবং দাঁত কালচে হলুদ দেখাতে শুরু করে। তাই দাঁত সাদা ও সুস্থ রাখতে চাইলে এই অভ্যাসগুলি ত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক সময় দাঁতের হলুদ ভাবের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে কোনও রোগ বা সংক্রমণ। দাঁতের ভিতরের স্নায়ুতে সমস্যা হলে বা মাড়ির সংক্রমণ হলে দাঁতের রঙ বদলে যেতে পারে। কিছু ওষুধ বিশেষ করে ছোটবেলায় নেওয়া নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক দাঁতের রঙে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধরনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্রাশ বা ঘরোয়া পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

news image
আরও খবর

তাই যদি লক্ষ্য করেন যে হঠাৎ করে দাঁত খুব দ্রুত হলুদ হয়ে যাচ্ছে দাঁতে ব্যথা হচ্ছে বা ঠান্ডা গরমে সংবেদনশীলতা বেড়ে যাচ্ছে তাহলে দেরি না করে দাঁতের ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক দাঁতের প্রকৃত অবস্থা বুঝে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা পরিষ্কার করার পরামর্শ দেবেন। অনেক সময় পেশাদার স্কেলিং বা ক্লিনিং দাঁতের জমে থাকা দাগ দূর করতে সাহায্য করে।

মনে রাখা দরকার দাঁত ব্রাশ করা মুখের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য হলেও এটি একমাত্র উপায় নয়। সাদা ও ঝলমলে দাঁতের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস পর্যাপ্ত জল পান নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ এবং ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দাঁতের যত্ন মানে শুধু সৌন্দর্য নয় এটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আজ থেকেই দাঁতের দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিন কারণ সুস্থ দাঁতই সুস্থ হাসির আসল চাবিকাঠি।

দাঁতের যত্নের বিষয়টি অনেক সময় আমরা কেবল সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখি। উজ্জ্বল সাদা দাঁত মানেই সুন্দর হাসি এই ধারণা থাকলেও এর গুরুত্ব আরও অনেক গভীর। সুস্থ দাঁত ও মুখগহ্বর আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুখের ভিতরের সমস্যা শরীরের অন্য অংশেও প্রভাব ফেলতে পারে এই কথা আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত। তাই দাঁতের যত্নকে অবহেলা করা মানেই নিজের স্বাস্থ্যের একটি বড় দিককে উপেক্ষা করা।

সঠিক খাদ্যাভ্যাস দাঁত সুস্থ রাখার প্রথম ধাপ। অতিরিক্ত চিনি যুক্ত খাবার এবং পানীয় দাঁতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। চিনি মুখের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিশে অ্যাসিড তৈরি করে যা এনামেল ক্ষয় করে। তাই মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার পর মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ দই শাকসবজি বাদাম ইত্যাদি দাঁতের গঠন মজবুত রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি মাড়ির স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত টক খাবার গ্রহণ করলে দাঁতের ক্ষতি হতে পারে তাই পরিমিতি বজায় রাখা প্রয়োজন।

পর্যাপ্ত জল পান দাঁতের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অভ্যাস। জল মুখের ভিতরের খাবারের কণা ধুয়ে ফেলতে সাহায্য করে এবং মুখে লালা উৎপাদন বাড়ায়। লালা প্রাকৃতিকভাবে দাঁত পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং অ্যাসিডের প্রভাব কমায়। বিশেষ করে খাবারের পর অল্প জল পান করলে দাঁতের উপর জমে থাকা ক্ষতিকর উপাদান অনেকটাই কমে যায়।

নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ দাঁতের সমস্যাকে শুরুতেই শনাক্ত করতে সাহায্য করে। অনেক সময় দাঁতের ক্ষয় বা মাড়ির সমস্যা শুরুতে তেমন উপসর্গ না দেখালেও ভিতরে ভিতরে বাড়তে থাকে। ছয় মাস বা অন্তত বছরে একবার দাঁতের ডাক্তারের কাছে গেলে এই ধরনের সমস্যা আগেভাগেই ধরা পড়ে এবং সহজ চিকিৎসায় সমাধান করা সম্ভব হয়। পেশাদার ক্লিনিং দাঁতের উপর জমে থাকা শক্ত দাগ বা প্লাক দূর করে দাঁতকে আরও সুস্থ রাখে।

ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকা দাঁতের যত্নের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধূমপান তামাক বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ দাঁতের রঙ নষ্ট করার পাশাপাশি মাড়ির রোগ এবং মুখগহ্বরের অন্যান্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। এই অভ্যাসগুলি ত্যাগ করলে শুধু দাঁতের রংই ভালো থাকে না বরং মুখের সামগ্রিক স্বাস্থ্যও উন্নত হয়।

দাঁত মাজার পদ্ধতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দিনে দুবার নরম ব্রাশ দিয়ে সঠিক পদ্ধতিতে দাঁত মাজা উচিত। খুব জোরে বা ভুল কায়দায় ব্রাশ করলে উপকারের বদলে ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি জিভ পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনে ফ্লস ব্যবহার করলে মুখের ভিতরের পরিচ্ছন্নতা আরও ভালোভাবে বজায় থাকে।

সব মিলিয়ে দাঁতের যত্ন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। শুধু একটি অভ্যাস নয় বরং একাধিক ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্ত মিলেই সুস্থ দাঁত এবং সুন্দর হাসি নিশ্চিত করে। দাঁত ভালো থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে কথা বলার সময় হাসির সময় কোনও দ্বিধা থাকে না। তাই আজ থেকেই দাঁতের যত্নকে দৈনন্দিন জীবনের অগ্রাধিকার দিন কারণ সুস্থ দাঁত শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয় এটি সুস্থ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

Preview image