হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিনে দক্ষিণবঙ্গে তাপমাত্রা আরও ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে। ফলে শীতের তীব্রতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার পরবর্তী চার দিনে তাপমাত্রায় বড় কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
উত্তুরে হাওয়ার দাপটে বর্ষশেষের ছুটিতে কনকনে ঠান্ডা, দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গে কুয়াশার সতর্কতা
বড়দিনের ভোরে এক ধাক্কায় শীতের চূড়ান্ত অনুভূতি পেল কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা। বৃহস্পতিবার সকালে শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এল ১৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা চলতি মরসুমে এখনও পর্যন্ত সর্বনিম্ন। বছরের শেষ লগ্নে এমন কনকনে ঠান্ডা বহুদিন পর অনুভব করছেন শহরবাসী। ভোরের আলো ফোটার আগেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় ময়দান, আলিপুর চত্বর, সল্টলেক ও শহরের একাধিক এলাকা। শীতের আমেজে বড়দিনের ছুটি কাটাতে সকাল হতেই সোয়েটার-জ্যাকেটে মুড়ে চিড়িয়াখানা, ইকোপার্ক, সায়েন্স সিটি, পার্ক স্ট্রিট ও নিউ টাউনের বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রের দিকে রওনা দেন মানুষজন।
আবহাওয়া দফতরের মতে, এই ঠান্ডা আরও বাড়তে পারে। আগামী দু’ থেকে তিন দিনে দক্ষিণবঙ্গে তাপমাত্রা আরও ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বর্ষশেষের গোটা ছুটির মরসুম জুড়েই রাজ্যবাসী শীতের স্বাদ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারবেন বলে জানাচ্ছে হাওয়া অফিস।
আবহাওয়া দফতর আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিল, বড়দিন থেকেই রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র তাপমাত্রা ধাপে ধাপে কমবে। সেই পূর্বাভাসই কার্যত সত্যি হয়েছে। উত্তর ভারতে একের পর এক পশ্চিমি ঝঞ্ঝা সরে যাওয়ার ফলে হিমেল উত্তুরে হাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এই উত্তুরে হাওয়াই সরাসরি প্রভাব ফেলছে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে, যার জেরে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বৃহস্পতিবার কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ০.৮ ডিগ্রি কম। বুধবার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিকের নিচে ২৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের থেকে প্রায় ১.৯ ডিগ্রি কম। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই প্রবণতা আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে।
শুধু ঠান্ডাই নয়, শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কুয়াশার দাপটও। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় কুয়াশার প্রকোপ স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে। বিশেষ করে পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূম জেলায় ঘন কুয়াশার হলুদ সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর। এই জেলাগুলিতে কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা নেমে যেতে পারে মাত্র ২০০ থেকে ৫০ মিটারে, যা যান চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা থাকবে বলে জানানো হয়েছে। সকালের দিকে রাস্তাঘাটে যান চলাচলে কিছুটা সমস্যা হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শীতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে উত্তরবঙ্গে। বৃহস্পতিবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুর জেলায় ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দার্জিলিংয়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে মাত্র ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা কার্যত পাহাড়ি শীতের অনুভূতি ফিরিয়ে এনেছে।
এ ছাড়া আলিপুরদুয়ারে তাপমাত্রা নেমেছে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, কোচবিহারে ১০.১ ডিগ্রি এবং কালিম্পঙে ১০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ভোর ও রাতের দিকে পাহাড়ি এলাকায় কনকনে ঠান্ডার সঙ্গে ঘন কুয়াশা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বড়দিনের দিন গোটা দক্ষিণবঙ্গ জুড়েই শীতের প্রকোপ ছিল চোখে পড়ার মতো। চলতি মরসুমে এই প্রথম একসঙ্গে একাধিক জেলায় এতটা তাপমাত্রা পতন লক্ষ্য করা গেল। দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে বীরভূমের শ্রীনিকেতনে মাত্র ৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা কার্যত শীতপ্রবণ এলাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে মত আবহাওয়াবিদদের।
শুধু শ্রীনিকেতন নয়, দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই পারদ উল্লেখযোগ্যভাবে নেমেছে। সিউড়িতে তাপমাত্রা ছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বর্ধমানে ১০ ডিগ্রি, বাঁকুড়ায় ৯.১ ডিগ্রি এবং আসানসোলে ১০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কলকাতার পার্শ্ববর্তী ব্যারাকপুর ও ডায়মন্ড হারবারে তাপমাত্রা নেমেছে ১৩ ডিগ্রিতে। মেদিনীপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২.৬ ডিগ্রি এবং বহরমপুরে ১০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বড়দিনে দক্ষিণবঙ্গ জুড়েই শীতের আমেজ ছিল জোরালো।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্ষশেষে এই শীত কিছুদিন বজায় থাকবে। হাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশেই ঘোরাফেরা করবে। নতুন বছরের শুরুতে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে আপাতত রাজ্যের সর্বত্র আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে এবং বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কুয়াশার দাপটও। সকালের দিকে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। যদিও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ মূলত পরিষ্কার থাকছে। এই পরিস্থিতি বর্ষশেষের ছুটির মরসুমে ঘোরাঘুরি ও উৎসব উদ্যাপনের জন্য আদর্শ বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
কনকনে ঠান্ডা বড়দিনের আনন্দে যেন বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে শহরবাসীর কাছে। বহুদিন পর এমন শীতের আবহে বড়দিন উদ্যাপন করতে পেরে খুশি কলকাতাবাসী। শহরের প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিট থেকে শুরু করে নিউ টাউন, সল্টলেক কিংবা দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এলাকা সর্বত্রই উৎসব আর শীতের মেলবন্ধন চোখে পড়ছে। সন্ধ্যা নামতেই পার্ক স্ট্রিটের ঝলমলে আলো, সাজানো চার্চ ও ক্রিসমাস ট্রির রঙিন আলো শীতের পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে। চার্চে প্রার্থনার জন্য মানুষের ভিড় যেমন ছিল চোখে পড়ার মতো, তেমনই কেক-পেস্ট্রি ও ক্রিসমাস স্পেশাল খাবারের দোকানগুলিতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।
বড়দিনের সকালে শহরের বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রেও ছিল মানুষের ঢল। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে চিড়িয়াখানা, ইকোপার্ক, সায়েন্স সিটি, নিক্কো পার্কের মতো জায়গাগুলির উদ্দেশে সকাল থেকেই রওনা দেন অনেকে। ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেও আনন্দে মুখর ছিল এই সব জায়গা। শিশুদের গায়ে সোয়েটার, মাথায় উলের টুপি ও গলায় মাফলার বহুদিন পর কলকাতায় যেন প্রকৃত শীতের ছবি ধরা পড়েছে। শীতের এই আবহে সকাল বিকেলের হাঁটাহাঁটি কিংবা ফুচকা-কফির আসরও যেন আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কুয়াশার দাপটও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ভোর ও গভীর রাতের দিকে কলকাতা-সহ শহরের একাধিক এলাকায় ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে রাস্তা-ঘাট। এর ফলে দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় যান চলাচলে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা কয়েকশো মিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এই পরিস্থিতিতে আবহাওয়া দফতর সাধারণ মানুষকে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষ করে ভোরের দিকে কিংবা গভীর রাতে যাঁরা গাড়ি চালান, তাঁদের জন্য গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। কুয়াশার মধ্যে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো বিপজ্জনক হতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রশাসন। হেডলাইট ও ফগ লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করা, পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় ওভারটেক এড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, কুয়াশার কারণে রেল ও সড়ক যোগাযোগে সামান্য বিলম্ব হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া দফতর। ট্রেন চলাচলের সময়সূচিতে কিছুটা হেরফের দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে নিত্যযাত্রীদের উপর।
শীতের এই আবহাওয়ায় প্রবীণ ও শিশুদের জন্যও বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে হাওয়া অফিস। ঠান্ডাজনিত সর্দি-কাশি, জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা এড়াতে গরম পোশাক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভোর ও রাতের ঠান্ডা হাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা, ঘরের ভেতরে উষ্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রবীণদের ক্ষেত্রে রাত ও ভোরের দিকে অপ্রয়োজনীয় বাইরে বেরোনো এড়াতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
সব মিলিয়ে, বড়দিনের সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যে শীত তার পুরো শক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে। উত্তুরে হাওয়ার দাপটে তাপমাত্রা কমার পাশাপাশি কুয়াশার প্রকোপও পরিস্থিতিকে আরও শীতল করে তুলছে। তবে এই কনকনে ঠান্ডাই যেন বর্ষশেষের ছুটির মরসুমে রাজ্যবাসীর উৎসবের আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেই মানুষজন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘোরাঘুরি, উৎসব ও অবসর কাটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
শীতের এই পরিবেশে উৎসব, ভ্রমণ ও ছুটির আমেজ সব মিলিয়ে বছরের শেষটা যে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে, তা বলাই যায়। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী কয়েক দিন এই শীত ও কুয়াশার প্রভাব বজায় থাকবে। ফলে বর্ষশেষের দিনগুলোতে সতর্কতার পাশাপাশি শীতের আনন্দ উপভোগ করাটাই এখন রাজ্যবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।