মৌসম ভবনের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রাজধানীতে মরসুমের শীতলতম দিন নথিভুক্ত হয়েছিল। সেদিন দিল্লির সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি বছরে তাপমাত্রা আরও নীচে নামায় শীতের দাপট নতুন করে রেকর্ড গড়ল।
উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে ফের একবার চরম শীতের দাপট। দিল্লি ও সংলগ্ন এনসিআর এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক দিন ধরেই রাজধানীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ঘোরাফেরা করছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই সীমা ভেঙে পারদ নেমে গেল ৩ ডিগ্রির নীচে। মৌসম ভবনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে দিল্লির সফদরজঙ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলেই চলতি শীতের মরসুমে এটিই এখনও পর্যন্ত রাজধানীর সবচেয়ে ঠান্ডা দিন হিসেবে নথিভুক্ত হল।
এই তাপমাত্রা শুধু চলতি মরসুমেই নয়, গত তিন বছরের নিরিখেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই নিয়ে দ্বিতীয় বার দিল্লির তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির ঘরে পৌঁছল। মৌসম ভবনের তথ্য বলছে, এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রাজধানীতে মরসুমের শীতলতম দিন হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। সেদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি বছর সেই রেকর্ড ভাঙেনি ঠিকই, তবে ২.৯ ডিগ্রি তাপমাত্রা সেই রেকর্ডের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, উত্তর ভারতের শীত ক্রমশ আরও তীব্র হচ্ছে।
যদিও সফদরজঙে বৃহস্পতিবারই প্রথমবার তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রির নীচে নামল, তবে রাজধানীর সব এলাকায় একই সময়ে একই চিত্র ছিল না। দু’দিন আগেই দিল্লির আয়ানগর এলাকায় তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রির নীচে নেমে গিয়েছিল। সেই সময় আয়ানগরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে তখনও সফদরজঙে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রির আশপাশেই ঘোরাফেরা করছিল। এই ভৌগোলিক তারতম্য দিল্লির আবহাওয়ার বৈচিত্র্যকেই তুলে ধরছে।
শীতের কামড়ের সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার দাপট রাজধানীর জনজীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ভোরের দিকে দিল্লির একাধিক এলাকায় ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। অনেক জায়গায় দৃশ্যমানতা এতটাই কমে যাচ্ছে যে, কয়েক মিটারের বেশি দূরে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। মৌসম ভবনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে দিল্লির পালম বিমানবন্দরে দৃশ্যমানতা নেমে গিয়েছিল ৫০ মিটারেরও নীচে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহণ ব্যবস্থার উপর। একাধিক বিমান দেরিতে উড়েছে বা অবতরণে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। ট্রেন পরিষেবাতেও বিঘ্ন ঘটেছে। বহু দূরপাল্লার ট্রেন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে গন্তব্যে পৌঁছেছে। জাতীয় সড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েগুলিতে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
দিল্লির বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রার পার্থক্য লক্ষ্য করা গিয়েছে। পালম এলাকায় বৃহস্পতিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা রাজধানীর মধ্যে অন্যতম কম। আয়ানগরে ২.৭ ডিগ্রি, সফদরজঙে ২.৯ ডিগ্রি এবং লোঢী রোডে ৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, দিল্লির প্রায় সব অংশেই শীতের প্রকোপ প্রবল, তবে কিছু এলাকায় ঠান্ডার তীব্রতা আরও বেশি।
দিল্লির পাশাপাশি এনসিআর এলাকার অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। গুরুগ্রাম, নয়ডা, ফরিদাবাদ-সহ বিভিন্ন এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ঠান্ডা বাতাসের দাপটে সকাল ও রাতের সময় বাইরে বের হওয়া কার্যত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অফিসযাত্রীদের বড় অংশকে ভোরের দিকে ঘন কুয়াশার মধ্যেই রওনা দিতে হচ্ছে।
উত্তর ভারতের শীতের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হরিয়ানার বিভিন্ন জেলায়। রাজ্যের বেশির ভাগ জায়গায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। বুধবার সকালে গুরুগ্রামের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মাত্র ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হিসারে পারদ নেমে যায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা গত দু’বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
মৌসম ভবনের তথ্য অনুযায়ী, হরিয়ানার অন্তত আটটি জেলায় তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এসেছে। পাশাপাশি রাজ্যের ১৩টি জেলায় ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সব কিছুতেই প্রভাব পড়ছে।
শৈত্যপ্রবাহ শুধু দিল্লি বা হরিয়ানায় সীমাবদ্ধ নেই। মৌসম ভবনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হিমাচল প্রদেশ, পঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, দিল্লি, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, সিকিম, গুজরাত, ওড়িশা, ছত্তীসগঢ় এবং ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এই সব রাজ্যের বেশ কিছু জেলায় রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই নীচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলিতে শীতের দাপট আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
হিমাচল প্রদেশে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। সেখানে শৈত্যপ্রবাহের পাশাপাশি তুষারপাতের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে মৌসম ভবন। রাজ্যের কিছু উচ্চাঞ্চলে তুষারপাত হতে পারে এবং কিছু জায়গায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই তুষারপাতের ফলে সমতল এলাকায় ঠান্ডা বাতাস আরও জোরালো হয়ে নামতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দিল্লি ও এনসিআর এলাকাতেও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শৈত্যপ্রবাহের প্রধান কারণ উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক ও ঠান্ডা হাওয়া। হিমালয় সংলগ্ন এলাকায় তুষারপাতের পর সেই ঠান্ডা হাওয়া সমতলের দিকে নেমে আসছে। পাশাপাশি, রাতের আকাশ পরিষ্কার থাকায় বিকিরণজনিত তাপক্ষয় দ্রুত হচ্ছে, ফলে রাতের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাচ্ছে।
এ ছাড়া বাতাসের গতি কম থাকায় এবং আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হওয়ায় কুয়াশা জমার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো অনেক সময় কুয়াশার কারণে মাটিতে ঠিকমতো পৌঁছতে পারছে না। এর ফলেই দিনের তাপমাত্রাও খুব একটা বাড়ছে না।
শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার জেরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ভোরের দিকে স্কুলগামী শিশু, অফিসযাত্রী ও শ্রমজীবী মানুষদের চরম সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। খোলা আকাশের নীচে থাকা মানুষদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
দিল্লি ও এনসিআর এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে কম্বল ও গরম খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে প্রয়োজনের তুলনায় এই ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল বলে অভিযোগ উঠছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিতে বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রবীণ মানুষ, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এই শীত বিশেষভাবে বিপজ্জনক হতে পারে। ঠান্ডাজনিত অসুখ, শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, ফ্লু এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, খুব প্রয়োজন না হলে ভোর ও গভীর রাতে বাইরে না বেরোনোই ভালো। গরম পোশাক পরা, উষ্ণ খাবার খাওয়া এবং শরীর আর্দ্র রাখা জরুরি।
মৌসম ভবনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন উত্তর ভারতের উপর শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব বজায় থাকবে। অন্তত ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় কুয়াশার দাপট চলতে পারে। রাতের তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা নেই। দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও শীতের অনুভূতি বজায় থাকবে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, পশ্চিমি ঝঞ্ঝার প্রভাবে পরবর্তী সময়ে আবহাওয়ায় কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। তবে আপাতত উত্তর ভারতের বাসিন্দাদের আরও কয়েক দিন হাড়কাঁপানো শীতের সঙ্গে লড়াই করেই চলতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই শৈত্যপ্রবাহ শুধু স্বল্পমেয়াদি কোনও আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর জলবায়ুগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
পশ্চিমি ঝঞ্ঝা মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন একটি আবহাওয়া ব্যবস্থা, যা শীতকালে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। এই ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তর ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে তুষারপাত এবং কোথাও কোথাও বৃষ্টি হয়। এর পরেই সেই ঠান্ডা হাওয়া সমতল এলাকায় নেমে আসে, ফলে তাপমাত্রা হঠাৎ করে অনেকটা নেমে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, পশ্চিমি ঝঞ্ঝার একটি দুর্বল প্রভাব আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উত্তর ভারতে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও, শীতের দাপট একেবারে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই। বরং তুষারপাতের পর ঠান্ডা বাতাস আরও জোরালো হয়ে নামলে সমতলে শীত আরও কিছুটা বাড়তেও পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবছর শীতের সময়কাল তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হতে পারে। সাধারণত জানুয়ারির দ্বিতীয়ার্ধে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু এবছর সেই স্বাভাবিক চক্রে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই নীচে রয়ে যাচ্ছে এবং দিনের বেলাতেও সূর্যের তাপ পর্যাপ্ত মাত্রায় অনুভূত হচ্ছে না।
এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে পরিষ্কার আকাশ, শুষ্ক বাতাস এবং কম বাতাসের গতিবেগ। এই পরিস্থিতিতে রাতের বেলায় মাটির তাপ দ্রুত বিকিরিত হয়ে যায়, ফলে ভোরের দিকে তাপমাত্রা হঠাৎ করে অনেকটা নেমে যায়। একই সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় ঘন কুয়াশা তৈরি হচ্ছে, যা দিনের বেলায় সূর্যের আলোকে বাধা দিচ্ছে।
কুয়াশা সাধারণত শীতকালের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এবছর কুয়াশার ঘনত্ব এবং স্থায়িত্ব দুটোই অস্বাভাবিক। ভোর থেকে বেলা বাড়লেও অনেক জায়গায় কুয়াশা কাটছে না। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাতাসের গতিবেগ কম থাকায় কুয়াশা জমে থাকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এর ফলে দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় দৃশ্যমানতা ৫০ মিটারের নীচে নেমে যাচ্ছে, যা পরিবহণের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিমানবন্দর, রেললাইন এবং সড়কপথে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
ঘন কুয়াশার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বিমান চলাচলে। একাধিক বিমানবন্দরে CAT-III প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও বারবার ফ্লাইট বাতিল বা দেরিতে চলাচল করতে হচ্ছে। যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিমানবন্দরে। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প বিমানবন্দরে বিমান নামানো হচ্ছে।
রেল পরিষেবাতেও একই ছবি। উত্তর ভারতের বহু গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্রেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে চলছে। শীতের কারণে রেলের যন্ত্রাংশেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেল আধিকারিকরা। সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে, বিশেষ করে জাতীয় সড়ক এবং এক্সপ্রেসওয়েগুলিতে।
এই শৈত্যপ্রবাহের বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি ক্ষেত্রেও। উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে রবি শস্যের চাষ হয়। অতিরিক্ত ঠান্ডা এবং কুয়াশার কারণে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আলু, সরষে, গম এবং সবজির ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, হালকা কুয়াশা অনেক ক্ষেত্রে ফসলের জন্য উপকারী হলেও, দীর্ঘস্থায়ী ঘন কুয়াশা এবং তীব্র ঠান্ডা ফসলের ক্ষতি করতে পারে। কোথাও কোথাও তুষারপাত বা শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যের উপর। ঠান্ডাজনিত অসুখ যেমন হাইপোথার্মিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্রোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি এই সময়ে অনেকটাই বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং গৃহহীন মানুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
দিল্লি ও অন্যান্য বড় শহরে শীতকালে প্রতি বছরই ঠান্ডাজনিত মৃত্যুর খবর সামনে আসে। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে গরম পোশাক, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং আশ্রয় অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডায় থাকা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, বাস্তবে অনেক জায়গায় সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দিল্লি, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে কম্বল ও গরম খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলির সংখ্যা ও পরিকাঠামো প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বহু গৃহহীন মানুষ এখনও খোলা আকাশের নীচেই রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শৈত্যপ্রবাহের প্রকৃত ক্ষতি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
আবহাওয়াবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই ধরনের চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনেরই একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত। একদিকে যেমন গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে শীতকালে দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক ঠান্ডা এবং দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হচ্ছে। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও খরা, আবার কখনও তীব্র শীত—এই চরম অবস্থাগুলি ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে।
শৈত্যপ্রবাহের এই সময়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় পরিবর্তন এসেছে। সকালবেলা স্কুলে যাওয়া, অফিসে যাতায়াত, বাজার করা—সব কিছুতেই বাড়তি কষ্ট হচ্ছে। অনেক জায়গায় স্কুলের সময়সূচি বদলানো হয়েছে। কোথাও কোথাও অনলাইন ক্লাসের কথাও ভাবা হচ্ছে।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়েছে। ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে রাস্তার হকাররা শীতের কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সন্ধ্যার পর মানুষ বাইরে বেরোতে কম চাচ্ছেন, ফলে বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও কমছে।
মৌসম ভবনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আপাতত শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েক দিন বজায় থাকবে। পশ্চিমি ঝঞ্ঝার প্রভাবে কোথাও কোথাও সামান্য পরিবর্তন এলেও, শীতের প্রকোপ হঠাৎ করে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। জানুয়ারির শেষের দিকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে, তবে তার আগে উত্তর ভারতের মানুষকে আরও কিছু দিন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই সময় সতর্কতা অবলম্বন করাই সবচেয়ে জরুরি। আবহাওয়ার আপডেট নিয়মিত দেখে নেওয়া, প্রয়োজন ছাড়া ভোর বা গভীর রাতে বাইরে না বেরোনো এবং শীতজনিত অসুখের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।