রবিবার কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার তার চেয়েও সামান্য নেমেছে পারদ। দক্ষিণবঙ্গের সর্বত্র পারদপতন হয়েছে। রয়েছে শীতের আমেজ।দক্ষিণবঙ্গে গত দু’দিনে ফের তাপমাত্রার পারদ কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। সোমবারও কলকাতার তাপমাত্রা সামান্য কমল। পারদ রয়েছে স্বাভাবিকের নীচেই। তবে নতুন করে কনকনে ঠান্ডার আর কোনও পূর্বাভাস দেয়নি আলিপুর আবহাওয়া দফতর। উত্তরবঙ্গে ঘন কুয়াশার সতর্কতা রয়েছে।
রবিবার কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার তা সামান্য কমে হয়েছে ১৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি কম। রবিবার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ২৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৪ ডিগ্রি কম।
আলিপুর হাওয়া অফিস জানিয়েছে, রাজ্যের কোথাও আপাতত বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। সর্বত্র আবহাওয়া থাকবে শুকনো। দক্ষিণবঙ্গের কোনও কোনও জেলায় সকালের দিকে হালকা কুয়াশা থাকতে পারে। তার ফলে দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে ৯৯৯ থেকে ২০০ মিটার পর্যন্ত। ঘন কুয়াশার সতর্কতা এখনও রয়েছে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুরে। এই চার জেলায় সকালের দিকে দৃশ্যমানতা ৫০ মিটার পর্যন্ত নামতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় তাপমাত্রা কমেছে। তবে কোথাও ১১ ডিগ্রির নীচে নামেনি পারদ। নদিয়ার কল্যাণীতে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বীরভূমের সিউড়িতে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, শ্রীনিকেতনে ১২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আসানসোলে ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ক্যানিংয়ে ১২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বহরমপুরে ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, পুরুলিয়ায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বসিরহাটে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বর্ধমানে ১৩.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছিল পারদ। দার্জিলিঙের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া, কালিম্পঙে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, জলপাইগুড়িতে ১১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং কোচবিহারে তাপমাত্রা নেমেছিল ১০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
রাজ্যজুড়ে আপাতত শীতের দাপট বজায় থাকলেও বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই—এমনই জানিয়েছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র আবহাওয়া থাকবে শুকনো। আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকলেও সকালের দিকে কুয়াশা রাজ্যের একাধিক জেলার বাসিন্দাদের ভোগাতে পারে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি রেখেছে হাওয়া অফিস।
আলিপুর হাওয়া অফিসের মতে, আগামী কয়েক দিন রাজ্যের কোথাও বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। কোনও পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বা ঘূর্ণাবর্তের প্রভাব এই মুহূর্তে রাজ্যের উপর নেই। ফলে শীতের আবহাওয়া থাকলেও তা হবে সম্পূর্ণ শুষ্ক প্রকৃতির। কৃষিকাজ, দৈনন্দিন যাতায়াত কিংবা নির্মাণকাজ—সব ক্ষেত্রেই এই শুকনো আবহাওয়া আপাতত স্বস্তির কারণ হতে পারে।
তবে বৃষ্টির অনুপস্থিতি মানেই স্বস্তি—তা নয়। শুষ্ক আবহাওয়ার ফলে রাতের দিকে তাপমাত্রা দ্রুত কমছে, আবার ভোরের দিকে কুয়াশার প্রকোপ বাড়ছে।
দক্ষিণবঙ্গের কিছু জেলায় সকালের দিকে হালকা কুয়াশা থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে। তার ফলে দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে ৯৯৯ মিটার থেকে ২০০ মিটার পর্যন্ত। যদিও এই কুয়াশা সাধারণত সকাল ৮টা–৯টার পর কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে উত্তরবঙ্গে পরিস্থিতি অনেক বেশি গুরুতর। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুর—এই চার জেলায় এখনও ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি রয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সকালের দিকে এই জেলাগুলিতে দৃশ্যমানতা নেমে যেতে পারে মাত্র ৫০ মিটার পর্যন্ত।
ঘন কুয়াশার ফলে—
সড়কপথে যান চলাচল ব্যাহত হতে পারে
ট্রেন পরিষেবা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে
পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস না হলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে
বিমান চলাচলেও প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে বাগডোগরা বিমানবন্দরে
প্রশাসনের তরফে গাড়িচালকদের সতর্কভাবে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাইবিম লাইট ব্যবহার না করা, গতি কম রাখা এবং প্রয়োজনে কুয়াশা কাটার অপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় তাপমাত্রা কমেছে। তবে কোথাও পারদ ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নামেনি। অর্থাৎ, শীত অনুভূত হলেও এখনও তা তীব্র বা কনকনে পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
নদিয়ার কল্যাণী: ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস
বীরভূমের সিউড়ি: ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস
শ্রীনিকেতন: ১২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস
আসানসোল: ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস
ক্যানিং: ১২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস
বহরমপুর: ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস
পুরুলিয়া: ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস
বসিরহাট: ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস
বর্ধমান: ১৩.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, পশ্চিমের জেলাগুলিতে শীতের আমেজ তুলনামূলক বেশি হলেও উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে তাপমাত্রা কিছুটা বেশি রয়েছে।
কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি রয়েছে। সকালে হালকা কুয়াশা থাকলেও দিনের বেলা রোদ উজ্জ্বল থাকবে। শহরে শীত অনুভূত হলেও এখনও ভারী শীতের পোশাক বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠেনি।
তবে হাওয়া অফিস জানাচ্ছে, উত্তুরে হাওয়ার প্রভাব বাড়লে কলকাতাতেও রাতের তাপমাত্রা আরও ১–২ ডিগ্রি কমতে পারে।
উত্তরবঙ্গের পার্বত্য ও তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে শীত অনেক বেশি স্পষ্ট।
দার্জিলিং: সর্বনিম্ন ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস
কালিম্পং: ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস
জলপাইগুড়ি: ১১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস
কোচবিহার: ১০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস
দার্জিলিংয়ে ৫.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা কার্যত পাহাড়ে কনকনে শীতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পর্যটকদের জন্য এটি একদিকে যেমন আকর্ষণীয়, অন্যদিকে তেমনই সতর্কতারও বিষয়।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই ধরনের শুষ্ক ঠান্ডা আবহাওয়ায়—
শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়তে পারে
শিশু ও প্রবীণদের ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বেশি
কাশি, সর্দি, গলা ব্যথার সমস্যা দেখা দিতে পারে
পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে—
ভোরে বাইরে বেরোলে গরম পোশাক পরা
কুয়াশার মধ্যে হাঁটা বা দৌড় এড়ানো
পর্যাপ্ত জল পান করা
শুষ্ক আবহাওয়া এবং কম তাপমাত্রা রবি শস্যের জন্য আপাতত অনুকূল। আলু, সর্ষে, গমের চাষে এই আবহাওয়া সহায়ক। তবে কুয়াশার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ফসলের উপর ছত্রাকের আক্রমণের আশঙ্কা থাকে। কৃষকদের নিয়মিত ক্ষেত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে—
আগামী ৩–৪ দিন রাজ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই
রাতের তাপমাত্রা আরও সামান্য কমতে পারে
উত্তরবঙ্গে কুয়াশার সতর্কতা বজায় থাকবে
দক্ষিণবঙ্গে সকালের দিকে হালকা কুয়াশা হতে পারে
অর্থাৎ, রাজ্যবাসীকে আপাতত শীত, কুয়াশা ও শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গে এখন শীত তার স্বাভাবিক গতিতেই এগোচ্ছে। কোথাও চরম ঠান্ডা না হলেও উত্তরবঙ্গে শীতের প্রকোপ স্পষ্ট, আর দক্ষিণবঙ্গে ধীরে ধীরে শীত জাঁকিয়ে বসছে। বৃষ্টি না থাকায় দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক থাকলেও কুয়াশা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে—বিশেষ করে যাতায়াত ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে।
আবহাওয়া দফতরের নিয়মিত আপডেট নজরে রাখা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
এছাড়াও রাজ্যের বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও পরিবেশের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
শুষ্ক আবহাওয়ার ফলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, অনেক জেলাতেই সকালের দিকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত কমছে। এই কারণেই সকালে কুয়াশা তৈরি হচ্ছে এবং সূর্য ওঠার পর তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি জানুয়ারির শেষ ও ফেব্রুয়ারির শুরুতে স্বাভাবিক হলেও, কুয়াশার ঘনত্ব কিছু জায়গায় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সতর্কতা জরুরি।
ঘন কুয়াশার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পরিবহণ ব্যবস্থায়। উত্তরবঙ্গের জাতীয় সড়ক ও রাজ্য সড়কগুলিতে ভোরের দিকে গাড়ির গতি অনেকটাই কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে দার্জিলিং–শিলিগুড়ি পাহাড়ি রাস্তায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়েছে। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, কুয়াশার কারণে বেশ কয়েকটি দূরপাল্লার ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে চলছে। বিমান চলাচলেও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, কারণ দৃশ্যমানতা ৫০ মিটারে নেমে এলে অবতরণ ও উড্ডয়ন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শীত এখনও তীব্র পর্যায়ে না পৌঁছালেও সকালের দিকে ঠান্ডার কামড় বেশ স্পষ্ট। গ্রামাঞ্চলে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহানোর দৃশ্য আবার চোখে পড়ছে। শহরাঞ্চলেও সকাল ও রাতের দিকে গরম পোশাকের ব্যবহার বেড়েছে। ফুটপাথবাসী ও খোলা আকাশের নীচে থাকা মানুষদের জন্য এই শীত কিছুটা কষ্টকর হয়ে উঠছে। সমাজকল্যাণ দফতর ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফে কম্বল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শুষ্ক ও ঠান্ডা আবহাওয়ার আরেকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল বায়ুদূষণ। বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় ধুলো ও দূষণ কণা সহজে ভেসে বেড়াচ্ছে। বড় শহরগুলিতে সকালের দিকে বাতাসের মান কিছুটা খারাপ হচ্ছে বলে পরিবেশবিদদের আশঙ্কা। কুয়াশার সঙ্গে দূষণ মিশে গেলে ‘স্মগ’-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা শ্বাসযন্ত্রের রোগীদের জন্য বিপজ্জনক।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করবে। তখন শীতের দাপট কমবে, কুয়াশাও অনেকটাই হ্রাস পাবে। তবে তার আগে পর্যন্ত রাজ্যবাসীকে ঠান্ডা সকাল, পরিষ্কার দুপুর ও শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তের আবহাওয়া বড় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত না দিলেও, কুয়াশা ও ঠান্ডা জনজীবনে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। সচেতনতা ও সতর্কতাই এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।