Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের পরেই জাপান উপকূলে আছড়ে পড়ল সুনামি, জারি সতর্কতা

জাপানের স্থানীয় প্রশাসনের তরফে জানানো হয়, উত্তর জাপানের আইওয়েট এবং হোক্কাইদো প্রদেশের উপকূলবর্তী এলাকার কোথাও কোথাও সমুদ্রের জলস্তরের উচ্চতা তিন মিটার বাড়তে পারে।৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল জাপান। তার পরেই সে দেশের উপকূলীয় এলাকায় সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তার পরেই সে দেশের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে আছড়ে পড়ল সুনামি। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, উত্তর জাপানের আইওয়েট প্রদেশের কুজি বন্দরে সমুদ্রের জলস্তরের উচ্চতা ২.৬ ফুট পর্যন্ত বেড়েছে।

জাপানের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ভূমিকম্পের প্রভাব সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া গিয়েছে উত্তর জাপানে। আরও জানানো হয়েছে, কম্পনের উৎসস্থল প্রশান্ত মহাসাগরের ১০ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত।

জাপানের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ভূমিকম্পের প্রভাব সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া গিয়েছে উত্তর জাপানে। ভূমিকম্পের জেরে কতটা কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যেই উত্তর জাপানের উপকূলবর্তী এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলা হয়েছে।জাপান এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম ভূকম্পপ্রবণ দেশ। প্রশান্ত মহাসাগরের অগ্নিবলয় বা ‘রিং অফ ফায়ার’-এর উপর অবস্থান করায় বছরে প্রায় ১৫০০টি বড়-ছোট ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে জাপান। ২০১১ সালে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল জাপান এবং সংলগ্ন এলাকা। মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ১৮ হাজার জনের।

জাপান এমন একটি দেশ, যাকে পৃথিবীর অন্যতম ভূকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর প্রধান কারণ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। জাপান অবস্থিত প্রশান্ত মহাসাগরের অগ্নিবলয় বা Pacific Ring of Fire-এর উপর, যা পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় ভূকম্পীয় অঞ্চলগুলোর একটি। এই অঞ্চলে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো ক্রমাগত নড়াচড়া করে, যার ফলে ঘন ঘন ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে থাকে।

জাপানের ভূমিকম্পপ্রবণতার পেছনে মূলত চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের ভূমিকা রয়েছে—প্যাসিফিক প্লেট, ফিলিপাইন সি প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং উত্তর আমেরিকান প্লেট। এই প্লেটগুলো একে অপরের সাথে সংঘর্ষ, স্লাইডিং এবং সাবডাকশন (একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যাওয়া) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপ যখন হঠাৎ মুক্তি পায়, তখনই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এই কারণেই জাপানে বছরে প্রায় ১৫০০টি ছোট-বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মধ্যে কিছু খুবই শক্তিশালী হয়ে থাকে।

জাপানের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমিকম্প। এখানে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রশিক্ষণ পায়। স্কুল, অফিস, এমনকি বাসাবাড়িতেও নিয়মিত মহড়া (drill) করা হয় যাতে বিপদের সময় সবাই দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকার অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এই early warning system-এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের কম্পন শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগেই মানুষকে সতর্ক করা যায়, যা অনেক সময় জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জাপানের স্থাপত্যশৈলীও ভূমিকম্পের সাথে খাপ খাইয়ে তৈরি করা হয়েছে। এখানে অধিকাংশ ভবন এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যাতে তারা ভূমিকম্পের কম্পন সহ্য করতে পারে। আধুনিক বিল্ডিংগুলোতে flexible foundation এবং shock absorber প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা কম্পনের সময় ভবনকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করে। এমনকি উঁচু ভবনগুলোও দুলতে পারে, কিন্তু সহজে ভেঙে পড়ে না। এই উন্নত প্রযুক্তির কারণে জাপানে অনেক বড় ভূমিকম্প হলেও ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হয়।

তবে সব সময় পরিস্থিতি এতটা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এর একটি বড় উদাহরণ হলো ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প, যা ইতিহাসে 2011 Tōhoku earthquake and tsunami নামে পরিচিত। এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৯.০, যা জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। এটি শুধু জাপানকেই কাঁপিয়ে দেয়নি, বরং এর ফলে সৃষ্টি হওয়া সুনামি বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

২০১১ সালের এই ভূমিকম্পটি জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় তোহোকু অঞ্চলে আঘাত হানে। ভূমিকম্পের পরপরই বিশাল সুনামি তৈরি হয়, যার ঢেউয়ের উচ্চতা কিছু জায়গায় ১০ মিটার বা তারও বেশি ছিল। এই সুনামি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, রেললাইন—সবকিছু পানির নিচে চলে যায়। প্রায় ১৮,০০০ মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়।

এই বিপর্যয়ের আরেকটি ভয়াবহ দিক ছিল ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনা। সুনামির কারণে Fukushima Daiichi Nuclear Power Plant ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে রেডিয়েশন লিক শুরু হয়। এর ফলে আশেপাশের এলাকা থেকে লক্ষাধিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

তবে এই ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেও জাপানের মানুষের দৃঢ়তা এবং শৃঙ্খলা সারা বিশ্বের কাছে উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা আতঙ্কিত না হয়ে সংগঠিতভাবে উদ্ধারকাজে অংশ নেয় এবং দ্রুত পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। সরকার এবং সাধারণ মানুষ একসাথে কাজ করে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে আবার গড়ে তোলে।

জাপানের ভূমিকম্পপ্রবণতা শুধু একটি প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, এটি তাদের সংস্কৃতি এবং জীবনধারার একটি অংশ হয়ে গেছে। তারা এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই নিজেদের জীবনকে সাজিয়েছে। প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং সচেতনতার মাধ্যমে তারা ভূমিকম্পের ক্ষতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

news image
আরও খবর

বর্তমান সময়ে জাপান ভূমিকম্প গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী দেশ। তারা উন্নত সেন্সর এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমিকম্পের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করছেন যাতে ভবিষ্যতে আরও সঠিকভাবে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যায়।

সবশেষে বলা যায়, জাপান একটি অনন্য উদাহরণ যেখানে প্রকৃতির ভয়াবহ শক্তির সাথে মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তির লড়াই চলছে। ভূমিকম্প এখানে একটি নিয়মিত ঘটনা হলেও, সঠিক প্রস্তুতি এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ২০১১ সালের মতো বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির সামনে মানুষ এখনও অনেকটাই অসহায়, কিন্তু একই সাথে এটি দেখায় যে ঐক্য, সাহস এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

এই কারণেই জাপান শুধু ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবেই নয়, বরং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি বিশ্বমানের উদাহরণ হিসেবেও পরিচিত।

জাপানের ভূমিকম্পপ্রবণতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে, সেটি হলো সুনামি প্রতিরোধ ব্যবস্থা। যেহেতু জাপান একটি দ্বীপ রাষ্ট্র এবং চারদিকেই সমুদ্রবেষ্টিত, তাই ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামি এখানে একটি বড় হুমকি। এই কারণে উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে বিশাল কংক্রিটের সুনামি প্রতিরোধক দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। কিছু জায়গায় এই দেয়ালের উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। যদিও ২০১১ সালের 2011 Tōhoku earthquake and tsunami-এর সময় অনেক জায়গায় এই দেয়াল ভেঙে যায় বা সুনামির ঢেউ তা অতিক্রম করে, তবুও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এছাড়াও, জাপানে উন্নত মানের evacuation system বা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সুনামি সতর্কতা সংকেত বাজলে মানুষ দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পথ ও আশ্রয়কেন্দ্র সম্পর্কে আগে থেকেই জানে। শহরের বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ড দিয়ে evacuation route চিহ্নিত করা থাকে। এমনকি মোবাইল ফোন, টেলিভিশন এবং রেডিওর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করতে সাহায্য করে।

জাপানের প্রযুক্তিগত উন্নয়নও ভূমিকম্প মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, বুলেট ট্রেন বা শিনকানসেনে এমন ব্যবস্থা রয়েছে যা ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পন শনাক্ত করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন থামিয়ে দেয়। এর ফলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। একইভাবে শিল্পকারখানাগুলোতেও emergency shutdown system থাকে, যা কম্পন অনুভূত হলেই বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি বন্ধ করে দেয়।

ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও জাপানের একটি শক্তিশালী দিক। তারা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করে না, বরং আগের চেয়ে আরও উন্নত ও নিরাপদ করে তোলে। এই ধারণাকে “Build Back Better” বলা হয়। অর্থাৎ, দুর্যোগের পর পুনর্গঠন এমনভাবে করা হয় যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগের ক্ষতি কম হয়। এই পদ্ধতির কারণে জাপান প্রতিবার বিপর্যয়ের পর আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।

এছাড়া, জাপানে জনগণের মধ্যে একটি বিশেষ মানসিকতা গড়ে উঠেছে, যাকে বলা যায় “disaster resilience” বা দুর্যোগ সহনশীলতা। তারা জানে যে ভূমিকম্প থামানো সম্ভব নয়, তাই তারা এটিকে জীবনের একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই মানসিক প্রস্তুতি তাদের আতঙ্কিত না হয়ে সঠিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশও জাপানের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলো যেমন ইন্দোনেশিয়া, চিলি এবং নেপাল জাপানের প্রযুক্তি ও নীতিমালা অনুসরণ করে নিজেদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উন্নত করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও জাপান বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করে থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জাপান একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে, অন্যদিকে তারা সেই ঝুঁকিকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি মডেল তৈরি করেছে। উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী অবকাঠামো, সচেতন জনগণ এবং কার্যকর সরকারি নীতির সমন্বয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে সঠিক প্রস্তুতি থাকলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

Preview image