প্রচুর ব্যস্ততা সামলেও ডায়েটে ফাঁকি না দেওয়ার চেষ্টা করেন বিকাশ খন্না। কী ভাবে সুঠাম চেহারা ধরে রেখেছেন তিনি, শারীরিক ধকলই বা কী ভাবে সামলান রন্ধনশিল্পী?ভারতের রন্ধনশিল্পের জগতে পরিচিত মুখ রন্ধনশিল্পী বিকাশ খন্না। যে সব ভারতীয় শেফের ঝুলিতে রয়েছে ‘মিশেলিন স্টার’-এর তকমা, তাঁদের মধ্যে এক জন বিকাশ। রসনাজগতের এই সম্মান তাঁদের ঝুলিতেই থাকে, মিশেলিন সংস্থার বিচারে যাঁরা নিজেদের সেরা প্রমাণ করেছেন। তাঁর রান্নায় মজেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সারা দিন খাবারের মধ্যে থাকলেও বিকাশের চেহারা কিন্তু বেশ সুঠাম। এত ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও তিনি খুবই ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। কী ভাবে সুঠাম চেহারা ধরে রেখেছেন তিনি, শারীরিক ধকলই বা কী ভাবে সামলান রন্ধনশিল্পী?
কাজের সূত্রে কখনও ভারত, আবার কখনও আমেরিকায় থাকেন বিকাশ। সমাজমাধ্যমের একটি পোস্টে তিনি বলেন, ‘‘দুই দেশের সময়ের ফারাক, কাজের চাপ, ঘন ঘন বিমান সফর, শুটিংয়ের ব্যস্ত শিডিউলের জন্য কখনও কখনও বুঝতেই পারি না, কখন সকাল পেরিয়ে রাত হয়ে যায়। সারা দিনের ধকল প্রথমে শরীরকে ক্লান্ত করে, তার পরে মনের উপরেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। কাজে মনোযোগ দেওয়া যায় না, ধৈর্য কমে যায়। আমি বুঝতে পারি, বেশি কাজ করার ফলে নয়, আমার শরীরের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটেছে বলেই আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ছি।’’
কী ভাবে শারীরিক ধকলকে পিছনে ফেলে চাঙ্গা হয়ে ওঠেন বিকাশ?বিকাশের মতে এই সব সমস্যা থেকে রেহাই পেতে তাঁর নতুন খাদ্যাভ্যাস অনেকটাই সাহায্য করেছে। রন্ধনশিল্পী বলেন, ‘‘ডায়েট হল আমার চালিকাশক্তি। আমি খাবার খেয়ে তৃপ্ত হই না, প্রয়োজনের কথা ভেবে খাবার খাই। সূর্য ওঠার আগে ইষদুষ্ণ জলে চুমুক দিই, খুব সাধারণ খাবার খাই, খাবারে গ্লুটেনের মাত্রা যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করি, চিনি কম খাই, মেপে খাই, মরসুমি শাকসব্জি-ফল ডায়েটে বেশি রাখি আর যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে ফেলি। ঘড়ি ধরে নয়, আমি সূর্যের উপর নির্ভর করে খাবার খাই। খাদ্যাভাসে এই পরিবর্তনগুলি আনার পর আমার জীবন অনেকটাই বদলেছে। আমি স্পষ্ট ভাবে ভাবতে পারছি, মানসিক ক্ষেত্রেও অনেক উপকার পেয়েছি।’’
শেফ বিকাশের মতে, শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার কোনও কারণ নেই। দুইয়ের মধ্যে গভীর যোগ আছে। অন্ত্রের সঙ্গে স্মৃতি, মেজাজ এবং শক্তি, সব কিছুই জড়িয়ে। পেট ভাল না থাকলে কিন্তু মেজাজও বিগড়ে থাকে। বিকাশ বলেন, ‘‘ডায়েট মেনে চলা একটি অনুশাসনের ব্যাপার। আমি তা এখনও শিখছি। মাঝেমধ্যেই হেরে যাই। এখন কেবল শরীর চাঙ্গা রাখতে খাই না, মনমেজাজ চাঙ্গা রাখতেও খাই।’’
কাজের সূত্রে কখনও ভারত, আবার কখনও আমেরিকায়—দুই ভিন্ন টাইম জোন, ভিন্ন খাদ্যসংস্কৃতি, ভিন্ন কাজের চাপের মধ্যে নিজেকে সামলে রাখতে হয় শেফ বিকাশকে। পেশাগত জীবনের সাফল্যের আড়ালে যে শারীরিক ও মানসিক ধকল লুকিয়ে থাকে, সমাজমাধ্যমে করা তাঁর একটি পোস্ট সেই অদৃশ্য ক্লান্তির কথাই সামনে এনেছে। তিনি লিখেছেন, সময়ের ফারাক, ঘন ঘন বিমানযাত্রা, শুটিংয়ের ব্যস্ত সূচি—সব মিলিয়ে কখন সকাল পেরিয়ে রাত হয়ে যায়, তা বোঝাই যায় না। এই জীবনযাত্রা শুধু শরীরকে নয়, ধীরে ধীরে মনকেও ক্লান্ত করে তোলে।
নীচে শেফ বিকাশের অভিজ্ঞতা, তাঁর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, শারীরিক-মানসিক সুস্থতার দর্শন, এবং আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে ডায়েটের গুরুত্ব—সব মিলিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনা তুলে ধরা হল।
ভারত ও আমেরিকার সময়ের পার্থক্য গড়ে ৯–১২ ঘণ্টা। অর্থাৎ যখন ভারতে সকাল, আমেরিকায় তখন রাত। এই সময় বদলের সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি (Circadian Rhythm) তাল মেলাতে পারে না।
ঘুমের ব্যাঘাত
হজমের সমস্যা
হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট
মনোযোগ কমে যাওয়া
বিরক্তি বৃদ্ধি
বিকাশ নিজেই বলেন, বেশি কাজ নয়—শরীরের ছন্দ নষ্ট হওয়াই তাঁর ক্লান্তির আসল কারণ।
ঘন ঘন দীর্ঘ বিমানযাত্রা শরীরের উপর আলাদা চাপ ফেলে।
ডিহাইড্রেশন
ফুলে যাওয়া
পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া
অনিদ্রা
জেট ল্যাগ
এই সব মিলিয়েই দিনের শেষে শরীর ভেঙে পড়ে।
শুধু শরীর নয়, মনও প্রভাবিত হয়।
বিকাশের ভাষায়:
কাজে মন বসে না
ধৈর্য কমে যায়
সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়
এটি “Cognitive Fatigue” নামে পরিচিত—অতিরিক্ত চাপ ও ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে বিকাশ প্রথমেই নজর দেন ডায়েটে। তাঁর মতে:
“ডায়েট হল আমার চালিকাশক্তি।”
অর্থাৎ খাবার শুধু তৃপ্তির জন্য নয়—শরীর চালানোর জ্বালানি।
বিকাশ ঘড়ি ধরে নয়, সূর্যের উপর নির্ভর করে খাবার খান।
সূর্য ওঠার আগে দিন শুরু
তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট
সূর্যাস্তের আগেই ডিনার
এটি “Circadian Eating” নামে পরিচিত—শরীরের প্রাকৃতিক জৈবঘড়ির সঙ্গে মিল রেখে খাওয়া।
সকাল শুরু করেন হালকা গরম জলে চুমুক দিয়ে।
হজমশক্তি জাগ্রত
টক্সিন বের হয়
মেটাবলিজম বাড়ে
শরীর হাইড্রেট হয়
অনেকে এতে লেবু বা মধু যোগ করেন, তবে বিকাশ সাধারণ রাখতেই পছন্দ করেন।
বিকাশের ডায়েটের মূলমন্ত্র—Simple Eating।
ভাপা সবজি
হালকা ডাল
সেদ্ধ শস্য
কম তেল
তিনি বিলাসী রান্না করেন, কিন্তু নিজের জন্য বেছে নেন সরল খাবার।
গ্লুটেন—গমজাত খাদ্যে থাকা প্রোটিন—অনেকের হজমে সমস্যা করে।
বিকাশ:
গ্লুটেন কমান
বিকল্প শস্য খান
মিলেট
কুইনোয়া
ব্রাউন রাইস
এতে ফোলাভাব কমে, এনার্জি বাড়ে।
রিফাইন্ড সুগার:
ইনসুলিন স্পাইক করে
এনার্জি ক্র্যাশ আনে
মুড সুইং বাড়ায়
বিকাশ তাই চিনি প্রায় বাদ দিয়েছেন।
বিকল্প:
ফল
খেজুর
মধু (সীমিত)
Portion Control তাঁর ডায়েটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অতিরিক্ত খেলে ক্লান্তি বাড়ে
হজমে চাপ পড়ে
ঘুম পায়
ছোট পরিমাণে, বারবার খাওয়া—এটাই তাঁর পছন্দ।
Seasonal Eating তাঁর ডায়েটের বড় স্তম্ভ।
পুষ্টি বেশি
রাসায়নিক কম
শরীরের মৌসুমি চাহিদা পূরণ
যেমন:
গরমে জলসমৃদ্ধ ফল
শীতে মূল জাতীয় সবজি
Early Dinner:
হজম ভালো
ঘুম ভালো
ফ্যাট জমে কম
মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায়
তিনি যতটা সম্ভব সূর্যাস্তের কাছাকাছি ডিনার সারেন।
বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য:
“শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য আলাদা নয়।”
বিজ্ঞানও তা সমর্থন করে।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের সরাসরি যোগাযোগ আছে—Vagus Nerve এর মাধ্যমে।
মুড খারাপ
উদ্বেগ
ক্লান্তি
মনোযোগ কমে
অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়াই সেরোটোনিন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে।
বিকাশ বলেন:
স্মৃতি
শক্তি
মেজাজ
সব অন্ত্রের সঙ্গে জড়িত।
Balanced microbiome = Better mental clarity.
তিনি স্বীকার করেন:
এখনও শিখছেন
মাঝেমধ্যে ভেঙে পড়েন
চিট মিল হয়
অর্থাৎ পারফেকশন নয়—Consistency জরুরি।
আগে:
শুধু শরীর চাঙ্গা রাখতে খেতেন
এখন:
মন ভালো রাখতে খান
Food as Mood Regulator.
ব্যস্ত শিডিউলেও তিনি:
মিল প্রেপ করেন
ট্রাভেল ফ্রেন্ডলি খাবার রাখেন
হাইড্রেশন বজায় রাখেন
প্লেনে অ্যালকোহল কম
জল বেশি
হালকা প্রোটিন
প্রসেসড খাবার এড়ানো
এটি বিশেষ দিক:
প্রতিদিন রিচ খাবার সামনে
তবুও আত্মনিয়ন্ত্রণ
এটাই পেশাদারিত্ব।
ডায়েট তাঁকে সাহায্য করেছে:
এনার্জি ধরে রাখতে
মনোযোগ বাড়াতে
রাগ কমাতে
ঘুম ভালো করতে
বিকাশের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা যায়:
শুধু জিম যথেষ্ট নয়
শুধু ঘুমও নয়
ডায়েটই বেসলাইন
যাদের:
নাইট শিফট
আন্তর্জাতিক কল
ভ্রমণ
শুটিং
তাদের জন্য এই ডায়েট দর্শন কার্যকর।
বিকাশ স্পষ্ট বলেন:
“খাদ্যাভাস বদলানোর পর জীবন বদলেছে।”
চিন্তা পরিষ্কার
মুড স্থির
শরীর হালকা
ক্লান্তি কম
শেফ বিকাশের জীবনদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাফল্যের পেছনে শুধু প্রতিভা বা পরিশ্রম নয়, সুস্থ শরীর ও স্থির মনও সমান জরুরি। সময়ের ফারাক, ভ্রমণ, কাজের চাপ—এসব এড়ানো যায় না, কিন্তু সঠিক খাদ্যাভ্যাস দিয়ে তার প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়।
খাবার শুধু স্বাদের বিষয় নয়—এটি শক্তি, মন, স্মৃতি, ধৈর্য, এমনকি জীবনের গুণগত মানের সঙ্গেও জড়িত। বিকাশের অভিজ্ঞতা তাই আধুনিক ব্যস্ত মানুষের জন্য এক বাস্তব শিক্ষা:
“প্রয়োজন বুঝে খাও, শরীর শুনে খাও, সূর্যের ছন্দে খাও—তবেই ক্লান্তির উপর জিত সম্ভব।”
আপনি চাইলে আমি এটিকে ছোট নিউজ, ভয়েসওভার স্ক্রিপ্ট, বা সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাপশন সিরিজেও রূপান্তর করে দিতে পারি।