Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সমুদ্রের নিচ দিয়ে আসবে বিদ্যুৎ ভারত সৌদি আরবের ঐতিহাসিক গ্রিন এনার্জি করিডর চুক্তি এবং জ্বালানি খাতে এক নতুন বিপ্লব

ভারতের শক্তিক্ষেত্রে এক নতুন সূর্যোদয়। অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এবার সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানির পথে হাঁটল ভারত। আজ নয়াদিল্লিতে ভারত ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক গ্রিন এনার্জি করিডর চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় আরব সাগরের নিচ দিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তারের মাধ্যমে সৌদি আরবের মরুভূমিতে তৈরি সৌরবিদ্যুৎ ভারতে আসবে। আদানি গ্রিন এনার্জি এবং সৌদি সরকারের এই যৌথ প্রকল্পের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হবে যা দেশের বিদ্যুতের দাম কমাতে এবং কার্বন নিঃসরণ রোধে এক গেম চেঞ্জার হতে চলেছে।

ভারত এবং সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে আজ এক সোনালী অধ্যায় যুক্ত হলো। এতদিন আমরা জানতাম মধ্যপ্রাচ্য মানেই তেল এবং গ্যাস। ভারত তার জ্বালানি চাহিদাল মেটাতে সৌদি আরবের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু আজ সেই সমীকরণ বদলে গেল। তেলের পাইপলাইন নয় বরং সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে হাই ভোল্টেজ বা উচ্চ ক্ষমতার তারের মাধ্যমে এবার ভারতে আসবে বিশুদ্ধ সৌরবিদ্যুৎ। আজ সকালে নয়াদিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স বা যুবরাজ এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই মেগা প্রজেক্ট বা বিশাল কর্মযজ্ঞের দায়িত্ব পেয়েছে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপ এবং সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা পিআইএফ।

এই চুক্তির গুরুত্ব এবং প্রেক্ষাপট

এই চুক্তিটি কেবল দুটি দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ কেনাবেচার চুক্তি নয় এটি বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক বড় পদক্ষেপ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কয়েক বছর আগেই ওয়ান সান ওয়ান ওয়ার্ল্ড ওয়ান গ্রিড বা এক সূর্য এক বিশ্ব এক গ্রিড এর ডাক দিয়েছিলেন। আজকের এই চুক্তি সেই স্বপ্নেরই প্রথম বাস্তবায়িত রূপ। সৌদি আরবে বছরের অধিকাংশ সময় প্রখর রোদ থাকে এবং সেখানে বিস্তীর্ণ মরুভূমি রয়েছে যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদর্শ। অন্যদিকে ভারতে সন্ধের পর বিদ্যুতের চাহিদা বা পিক আওয়ার ডিমান্ড বাড়ে। ভারত এবং সৌদি আরবের মধ্যে সময়ের পার্থক্য বা টাইম জোন ডিফারেন্স থাকার ফলে সৌদি আরবে যখন রোদ থাকবে তখন সেই বিদ্যুৎ ভারতে এনে সন্ধ্যার চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

প্রকল্পের বিবরণ এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ

এই প্রকল্পের পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ইন্ডিয়া সৌদি আরব আন্ডার সি গ্রিন এনার্জি করিডর। পরিকল্পনা অনুযায়ী গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দর থেকে সৌদি আরবের পূর্ব উপকূল পর্যন্ত আরব সাগরের তলদেশ দিয়ে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হাই ভোল্টেজ ডাইরেক্ট কারেন্ট বা এইচভিডিসি কেবল পাতা হবে। এটি হবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রগর্ভস্থ বিদ্যুৎ পরিবাহী লাইনগুলোর মধ্যে অন্যতম।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন এটি ইঞ্জিনিয়ারিং এর এক বিস্ময় হতে চলেছে। সমুদ্রের কিছু জায়গায় গভীরতা ৩০০০ মিটারেরও বেশি। সেই গভীরতায় জলের প্রচন্ড চাপ সহ্য করে বিদ্যুৎ পরিবহন করা চাট্টিখানি কথা নয়। এই কেবলের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৫ গিগাওয়াট বা ৫০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতে আনা হবে যা ভবিষ্যতে বাড়িয়ে ১০ গিগাওয়াট করা হবে। এই বিদ্যুৎ পরিবহনের সময় যাতে ট্রান্সমিশন লস বা অপচয় কম হয় তার জন্য আল্ট্রা হাই ভোল্টেজ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। আদানি গ্রিন এনার্জি জানিয়েছে তারা এই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। তারা ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মধ্যে সান কেবল প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে।

আদানি গ্রুপের ভূমিকা এবং বিনিয়োগ

এই প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার বা দেড় লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে একটি বড় অংশ বিনিয়োগ করবে আদানি গ্রিন এনার্জি এবং বাকিটা আসবে সৌদি আরবের সভরেন ওয়েলথ ফান্ড থেকে। আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এক বিবৃতিতে বলেছেন এটি কেবল ব্যবসার জন্য নয় এটি ভারতের এনার্জি সিকিউরিটি বা শক্তি সুরক্ষার জন্য জরুরি। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রিন এনার্জি হাব বা সবুজ শক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বিশেষ করে কেবল তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজে।

কেন সৌদি আরব

প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন সৌদি আরব। উত্তরটা সহজ। সৌদি আরব তাদের ভিশন ২০৩০ এর আওতায় তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে। তাদের কাছে অফুরন্ত জমি এবং সূর্যরশ্মি আছে। সেখানে এক ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ তৈরি করতে যা খরচ হয় তা ভারতের খরচের প্রায় অর্ধেক। এই সস্তা বিদ্যুৎ ভারতে আনলে পরিবহন খরচ যোগ করার পরেও তা ভারতের কয়লা বিদ্যুৎ বা থার্মাল পাওয়ারের চেয়ে সস্তা হবে। অর্থনীতিবিদরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন যে এই প্রকল্প চালু হলে ভারতে বিদ্যুতের পাইকারি দর ইউনিট প্রতি ১ থেকে ১.৫০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এর সরাসরি সুফল পাবে সাধারণ মানুষ এবং শিল্পক্ষেত্র।

ভূ রাজনৈতিক বা জিও পলিটিক্যাল গুরুত্ব

এই চুক্তির পেছনে রয়েছে এক গভীর কূটনৈতিক চাল। চীন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর মাধ্যমে এশিয়া এবং আফ্রিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। ভারত এবং আমেরিকা মিলে এর পাল্টা হিসেবে আইএমইসি বা ইন্ডিয়া মিডল ইস্ট ইউরোপ করিডর তৈরি করার পরিকল্পনা করেছিল। আজকের এই বিদ্যুৎ চুক্তি সেই করিডরেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে ভারত মধ্যপ্রাচ্যের সাথে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হলো। পাকিস্তান বা অন্য কোনো শত্রু দেশ চাইলেও এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না কারণ এটি সমুদ্রের নিচ দিয়ে আসছে এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকবে। এটি ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

পরিবেশের ওপর প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী আজ বিপন্ন। ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে নেট জিরো বা কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করলে সেই লক্ষ্য পূরণ করা অসম্ভব। এই গ্রিন এনার্জি করিডর চালু হলে ভারতকে আর নতুন করে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করতে হবে না। ৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ আসা মানে প্রতি বছর কোটি কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে মেশা থেকে আটকানো। পরিবেশবিদরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল থেকে সরে আসার জন্য এটি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

অর্থনৈতিক লাভ এবং শিল্পের বিকাশ

news image
আরও খবর

সস্তা বিদ্যুৎ হলো শিল্পের অক্সিজেন। ভারতে বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ার কারণে অনেক সময় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এই করিডর চালু হলে ইস্পাত সিমেন্ট এবং অ্যালুমিনিয়ামের মতো ভারী শিল্পগুলো কম দামে বিদ্যুৎ পাবে। ফলে মেক ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচি আরও গতি পাবে। এছাড়াও এই প্রকল্পের জন্য যে বিশাল পরিমাণ সাবমেরিন কেবল বা সমুদ্রের তার লাগবে তা ভারতেই তৈরি হবে বলে জানা গেছে। এর ফলে দেশের কেবল প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর ভাগ্য খুলে যাবে।

চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকির দিক

তবে এই পথের কাঁটাও কম নয়। প্রথমত এত দীর্ঘ পথ সমুদ্রের নিচ দিয়ে তার নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ। মাঝসমুদ্রে যদি তার ছিঁড়ে যায় বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় তবে তা মেরামত করা অত্যন্ত কঠিন। দ্বিতীয়ত সামুদ্রিক প্রাণী বা হাঙরের কামড়ে তার নষ্ট হওয়ার ইতিহাস আছে যদিও এখনকার তারগুলোতে বিশেষ সুরক্ষা বর্ম থাকে। তৃতীয়ত নিরাপত্তার ঝুঁকি। নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে নাশকতার ঘটনা আমরা দেখেছি। আরব সাগরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এই কেবলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারত এবং সৌদি আরবের নৌবাহিনীর কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ হবে। উভয় দেশই জানিয়েছে তারা এই কেবলের সুরক্ষায় ড্রোন এবং স্যাটেলাইট নজরদারির ব্যবস্থা করবে।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন গ্লোবাল গ্রিড

এই প্রকল্পটি সফল হলে ভারত ভবিষ্যতে আফ্রিকার সাথেও একইভাবে যুক্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পৃথিবীটা গোল তাই কোথাও না কোথাও সবসময় সূর্য থাকে। যদি আমরা পুরো পৃথিবীকে একটি গ্রিডে যুক্ত করতে পারি তবে আর কখনো ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখার প্রয়োজন হবে না। এক দেশের দিন অন্য দেশের রাতকে আলোকিত করবে। ভারত এবং সৌদি আরবের এই চুক্তি সেই গ্লোবাল গ্রিড তৈরির পথে প্রথম মাইলফলক।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা

খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মুম্বাইয়ের এক শিল্পপতি বলেন বিদ্যুতের দাম কমলে আমাদের উৎপাদন বাড়বে এবং আমরা আরও বেশি মানুষকে চাকরি দিতে পারব। অন্যদিকে এক পরিবেশকর্মী বলেন সমুদ্রের তলদেশে এত বিশাল নির্মাণ কাজ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের ক্ষতি করবে কিনা তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হওয়া দরকার। তবে মোটের ওপর সবাই একমত যে এটি ভারতের জন্য এক বড় প্রাপ্তি।

আদানি গ্রুপের শেয়ারে প্রভাব

এই খবর আসার সাথে সাথেই শেয়ার বাজারে আদানি গ্রিন এনার্জি এবং আদানি পাওয়ারের শেয়ারের দাম রকেটের গতিতে বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন এই প্রকল্প আদানি গ্রুপকে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রিন এনার্জি কোম্পানিতে পরিণত করবে। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই শেয়ারগুলো লং টার্ম বা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য ভালো।

কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সফট পাওয়ার

সৌদি আরবের সাথে ভারতের সম্পর্ক গত এক দশকে অনেক উন্নত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমানের ব্যক্তিগত রসায়ন এই চুক্তিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সৌদি আরবে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় কাজ করেন। এই প্রকল্পের ফলে দুই দেশের মানুষের মধ্যেও যোগাযোগ বাড়বে। ভারত তার সফট পাওয়ার বা কূটনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি দিনটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সমুদ্রের নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ আনার এই পরিকল্পনা একসময় কল্পবিজ্ঞান মনে হতো। কিন্তু বিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে যে কোনো কিছুই সম্ভব তা আজ প্রমাণিত হলো। ২০৩০ সালে যখন আপনার বাড়ির ফ্যান বা লাইটটি জ্বলবে তখন হয়তো তার শক্তি আসবে হাজার মাইল দূরের সৌদি আরবের কোনো এক মরুভূমির সূর্যরশ্মি থেকে। পৃথিবীটা সত্যিই ছোট হয়ে আসছে। আর এই ছোট পৃথিবীতেই আমরা বড় স্বপ্ন দেখছি। দূষণমুক্ত এবং সস্তা বিদ্যুতের সেই স্বপ্নপূরণের পথে আজকের এই চুক্তি এক বিশাল লাফ। ভারত এখন আর কেবল শক্তি ব্যবহারকারী দেশ নয় ভারত এখন শক্তি সঞ্চালনের বিশ্বনেতা হওয়ার পথে।

 

Preview image