"কলকাতায় তাপমাত্রা ১৩ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে এক নতুন মাপকাঠিতে পৌঁছেছে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা নেমে গেছে শীতকালীন সর্বনিম্ন পর্যায়ে, যার ফলে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিস্তারিত জানুন একনজরে!"
কলকাতায় ১৩ বছরের রেকর্ড ভাঙল পারদ, বাংলার বিভিন্ন জেলায় নামল তাপমাত্রা দেখুন একনজরে!
শীতকাল কলকাতার মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে প্রাপ্তি, তবে এই বছরের শীতের অনুভূতি অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র। কলকাতার তাপমাত্রা ১৩ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে গেছে, যা শহরের বাসিন্দাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। কেবল কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে তাপমাত্রার পারদ ব্যাপকভাবে নেমেছে, এবং শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
কলকাতায় গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গিয়েছিল, যা ছিল শহরের জন্য মরসুমের শীতলতম দিন। গত ১৩ বছর ধরে, এমন শীতলতা কলকাতায় দেখা যায়নি। শহরের প্রায় সব এলাকাতেই ঠাণ্ডার অনুভূতি ছিল খুবই প্রবল, যা সাধারণত কলকাতায় খুবই অস্বাভাবিক। শহরের অভ্যন্তরে শীতের অনুভূতির পরিবর্তন হয়েছে। তাপমাত্রার এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে শহরের বাসিন্দাদের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা।
কলকাতার পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের অন্য অংশে তাপমাত্রা ব্যাপকভাবে কমেছে। নদী তীরবর্তী অঞ্চলের তাপমাত্রা যেমন কমেছে, তেমনি হাওড়া, বর্ধমান, দার্জিলিং, পুরুলিয়া, শিলিগুড়ি, বাঁকুড়া সহ বিভিন্ন জায়গাতেও তাপমাত্রার পারদ নেমেছে।
হাওড়ায়, তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রিতে নেমে গিয়েছিল, যা ওই এলাকার শীতকালীন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। বর্ধমানে, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, দার্জিলিং এবং শিলিগুড়িতে শীতের অনুভূতি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে এবং তাপমাত্রার পারদ যথাক্রমে ৯ ডিগ্রি এবং ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ছিল। এই সমস্ত স্থানে শীতের অনুভূতি একেবারে অতিরিক্ত ছিল এবং স্থানীয় বাসিন্দারা শীতের কঠিন পরিস্থিতি অনুভব করেছেন।
এটি সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না যে কেন তাপমাত্রার এই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটল, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে শীতের শক্তি বরফের নদী এবং পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে শক্তিশালী হয়েছে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং একটি শক্তিশালী শীতের মেঘের উপস্থিতি তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে, কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অংশে শীতের তীব্রতা আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এই পরিবর্তনটি সম্ভবত একটি মৌসুমী আবহাওয়া প্যাটার্নের ফল। এমনিতেই বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা শীতল হয়ে যাওয়ার কারণে বায়ুর প্রবাহের দিক পরিবর্তন হয়ে যায়, যা পশ্চিমবঙ্গের অঞ্চলে তীব্র শীতের সৃষ্টি করে। বিভিন্ন অংশে এই শীতের কারণে তীব্র ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত হতে থাকে, যা শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে।
এই তাপমাত্রার পরিবর্তন কৃষির জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষত, শীতকালীন শস্যের জন্য তাপমাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি তাপমাত্রা খুব বেশি নেমে যায়, তবে শীতকালীন শস্য যেমন আলু, শসা, মটর, বাঁধাকপি এবং অন্যান্য শাকসবজি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই ধরনের শীতের প্রভাব কৃষকদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের কিছু অঞ্চলে, যেখানে কৃষির উপর শীতের প্রভাব বেশি, সেখানকার কৃষকরা এর ফলে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন।
এই শীতের কারণে কলকাতার জীবনযাত্রাও কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দা বেশি গরম কাপড় পরতে শুরু করেছেন। অনেকেই সন্ধ্যায় ক্যান্ডেল লাইট ডিনার বা গরম চায়ের কাপ হাতে বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রাস্তার পাশে গরম ভাত, ছোলা এবং অন্যান্য গরম খাবার বিক্রির বাজার বেড়ে গেছে। এমনকি সড়কজুড়ে ঘুরতে থাকা কিছু স্ট্রিট ফুড ভেন্ডরের দোকানগুলোতেও প্রচুর ভিড় দেখা যাচ্ছে।
এই শীতের পরিবর্তন শুধু মানুষের জন্যই নয়, বরং পরিবেশের জন্যও একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতের এত তীব্রতা একটি অস্বাভাবিক আবহাওয়া প্যাটার্নের সূচনা হতে পারে। যদি এই ধরনের শীতীয় পরিবর্তন পর্যায়ক্রমে আরও বৃদ্ধি পায়, তবে সেখান থেকে পরিবেশগত উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি এটি সমুদ্র স্তরের উত্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য পরিবেশগত প্রভাবগুলোকেও উত্তেজিত করতে পারে।
আগামী দিনে আরও শীতের প্রবাহ থাকতে পারে, বিশেষত জানুয়ারি মাসে। শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে, এবং তাপমাত্রা ৯-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় শীতের তীব্রতা আরও বেশি হতে পারে এবং এই প্রবণতা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।
কলকাতায় এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে তাপমাত্রার এই পরিবর্তন শুধুমাত্র শীতকালীন রেকর্ড ভাঙার একটি ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সংকেত হতে পারে। পরিবেশের পরিবর্তন এবং আবহাওয়া প্যাটার্নের এই অস্বাভাবিকতা ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, এই তীব্র শীতের অনুভূতি শহরের জীবনযাত্রা এবং কৃষির উপর যে প্রভাব ফেলবে, সেটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ।
শীতের এই অতিরিক্ত তীব্রতা মানুষের স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, শীতের কারণে ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রবণতা বাড়ছে। শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, এবং গলা ব্যথার মতো সমস্যা বাড়ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা এই শীতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের শীতজনিত রোগের জন্য হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও বেড়ে গেছে।
এছাড়া, শীতের কারণে রক্তচাপও বেড়ে যেতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তাই শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। তাপমাত্রার এই বিরূপ প্রভাব থেকে বাঁচতে বিশেষত প্রবীণরা যেন খুব বেশি সময় বাইরে না থাকেন, তা নিশ্চিত করা উচিত।
শীতের তীব্রতা কিছু জায়গায় পর্যটন শিল্পের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, ও হিমালয় অঞ্চলে। শীতকালীন পর্যটকদের আকর্ষণ বিশেষভাবে বেড়ে গেছে, কারণ শীতের সময় এই অঞ্চলের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর হয়ে ওঠে। তবে, শীতের তীব্রতা কিছু পর্যটন গন্তব্যে বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে তুষারপাতের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই তীব্র শীতের কারণে, কৃষকদের জন্য কিছু সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শীতকালীন ফসলের জন্য তাপমাত্রার এ ধরনের পরিবর্তন ক্ষতিকর হতে পারে। কৃষকদের উচিত শীতের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে বিশেষ ধরনের শীতকালীন ফসল চাষ পদ্ধতি গ্রহণ করা। ফসলের ওপর অত্যধিক ঠাণ্ডা প্রভাব ফেললে সেগুলোর পচন হতে পারে এবং ফলন কমে যেতে পারে।
এছাড়া, সেচ ব্যবস্থাও যথাযথভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে ফসলের ক্ষতি না হয়। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই পানি জমে গিয়ে জমির ক্ষতি হতে পারে, তাই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কলকাতার বাসিন্দাদের জন্য কিছু সতর্কতা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালীন স্বাস্থ্য সমস্যা এড়াতে বিশেষত শীতের পোশাক পরা এবং ঠাণ্ডা পরিবেশে বাইরে বের হওয়ার আগে শরীরের তাপমাত্রা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা উচিত। যাদের শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য শীতজনিত সমস্যা আছে, তাদের বাইরে না বেরনোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শীতের সময়ে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা, শরীরকে উষ্ণ রাখার জন্য গরম পানীয় খাওয়া এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এই অতিরিক্ত শীতের ঘটনা আমাদের পরিবেশের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যেহেতু এটি একটি অস্বাভাবিক ঘটনা, তাই বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এটি ভবিষ্যতে আরও প্রকট হতে পারে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বিভিন্ন পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে এমন অতিরিক্ত শীতকাল দেখা দিচ্ছে।
পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদের সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সাধারণ জনগণকেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা এবং এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কলকাতায় তাপমাত্রার এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তন শীতকালীন শর্তকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। তবে, এটা আমাদের জন্য এক ধরনের সংকেত হতে পারে যে শীতের তীব্রতা আমাদের জীবনযাত্রাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে। তাই, এই ধরনের আবহাওয়া পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। এবারের শীতের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে শিখিয়েছে, পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের প্রতি আরও বেশি যত্নবান হতে হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে আমরা আরও নিরাপদে থাকতে পারি।