সলমন একেবারেই কর্ণের কথা শুনতে রাজি ছিলেন না। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত অভিনেতার ভ্যানিটি ভ্যানে গিয়ে এমন এক ঘটনা ঘটে, যা পুরো ছবিটাই বদলে দেয়। কী হয়েছিল সেই মুহূর্তে?
বলিপাড়ায় তাঁর দাপট প্রশ্নাতীত। ক্যামেরার সামনে না থেকেও যিনি নায়কদের মতোই আলো কেড়ে নেন, যাঁর একটি সিদ্ধান্তে বদলে যায় বহু তারকার ভবিষ্যৎ—তিনি কর্ণ জোহর। তারকা সন্তানদের ‘গডফাদার’ বলেই যাঁকে কটাক্ষ করা হয়, আবার একই সঙ্গে যাঁর হাত ধরে বলিউড পেয়েছে একের পর এক কালজয়ী ছবি। আজ কর্ণ জোহর মানেই বিলাস, গ্ল্যামার, নেপোটিজম বিতর্ক এবং সর্বোপরি হিট ছবির নিশ্চয়তা। কিন্তু এই কর্ণ জোহরের শুরুর পথটা মোটেও এতটা মসৃণ ছিল না।
১৯৯৫ সাল। হিন্দি ছবির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। মুক্তি পাচ্ছে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে। পরিচালক আদিত্য চোপড়া-র এই প্রথম ছবি শুধু বক্স অফিসে ঝড় তোলে না, বরং রোমান্টিক সিনেমার সংজ্ঞাই বদলে দেয়। সেই ছবিতেই সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন এক তরুণ—কর্ণ জোহর। ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে তিনি তখন শেখার পর্যায়ে। সেটের প্রতিটি খুঁটিনাটি, অভিনেতাদের কাজ করার ধরন, পরিচালকের সিদ্ধান্ত—সবই গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতেন কর্ণ।
এই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে তাঁর নিজের পরিচালনা শৈলীর ভিত গড়ে দেয়। তিন বছর পর, ১৯৯৮ সালে, সেই তরুণ সহকারী পরিচালকই আত্মপ্রকাশ করেন পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে, ছবি কুছ কুছ হোতা হ্যায় দিয়ে।
‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ শুধু একটি রোমান্টিক ছবি নয়, এটি ৯০-এর দশকের শেষভাগের এক সাংস্কৃতিক মাইলস্টোন। কলেজ রোমান্স, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, ত্রিভুজ সম্পর্ক—সব মিলিয়ে ছবিটি তরুণ প্রজন্মের হৃদয় জয় করে নেয়। ছবির মুখ্য চরিত্রে ছিলেন শাহরুখ খান, কাজল এবং রানি মুখোপাধ্যায়।
তবে এই তিনজনের পাশাপাশি ছবিতে আর এক তারকার উপস্থিতি দর্শকদের আলাদা করে চমকে দিয়েছিল—সলমন খান। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় নায়ক, কিন্তু তাঁর চরিত্রের আবেগ, ত্যাগ আর পরিণতি আজও দর্শকের চোখে জল এনে দেয়।
এই ছবির সঙ্গে সলমন খানের যুক্ত হওয়া নিয়েই রয়েছে এক বিস্ময়কর তথ্য। শোনা যায়, তিনি এই ছবির জন্য এক টাকাও পারিশ্রমিক নেননি। বন্ধুত্বের খাতিরে, কর্ণ জোহরের উপর ভরসা রেখেই নাকি তিনি ছবিতে কাজ করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করলেও সলমনের নিজস্ব স্টাইল, ব্যক্তিত্ব এবং সিদ্ধান্তে অনড় মনোভাব ছবির সেটে একাধিকবার সমস্যা তৈরি করে।
ছবির জনপ্রিয় গান সাজন জি ঘর অ্যায়-র শুটিংয়ের সময়ই ঘটে সেই বিখ্যাত ঘটনা, যা আজও বলিপাড়ায় গল্প হয়ে ঘোরে।
গানটির দৃশ্যে সলমনের চরিত্র ছিল একজন পরিণত, সংযত এবং আত্মত্যাগী মানুষ। কর্ণ জোহরের ভাবনায়, এই চরিত্রের জন্য দরকার ছিল একটি মার্জিত লুক—স্যুট ও প্যান্ট। সেই অনুযায়ী পোশাকও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু শুটিংয়ের দিন সেটে ঢুকেই সলমন সোজা চলে যান নিজের ভ্যানিটি ভ্যানে। সেখানেই বসে জানিয়ে দেন, তিনি এই গানের শুটিং করবেন শুধুমাত্র টি-শার্ট ও জিন্স পরে।
সলমনের যুক্তি ছিল স্পষ্ট—তিনি এই পোশাকেই স্বচ্ছন্দ, এবং গানটির আবেগ পোশাকের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু পরিচালক কর্ণের মাথায় অন্য পরিকল্পনা। তাঁর কাছে দৃশ্যের ভিজ্যুয়াল ভাষা, চরিত্রের মানসিকতা এবং গল্পের ধারাবাহিকতা—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সলমন ছিলেন অনড়। কর্ণ বোঝানোর চেষ্টা করেন, চরিত্রের গভীরতা, দৃশ্যের প্রভাব—সবই নির্ভর করছে সঠিক লুকের ওপর। কিন্তু কোনও কথাতেই নরম হননি অভিনেতা। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। সেটে কাজ থমকে যায়। ইউনিটের সবাই অপেক্ষায়—শেষ পর্যন্ত কী হবে?
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এই ঘটনার কথা স্মরণ করে কর্ণ জোহর নিজেই বলেন, তিনি দীর্ঘ সময় সলমনের ভ্যানিটি ভ্যানে বসে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনও ফল হয়নি। তখনই নাকি মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন তিনি।
কর্ণের কথায়, শেষমেশ তিনি নিজেকে আর সামলাতে পারেননি। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেন। সেই কান্না ছিল একজন নবাগত পরিচালকের অসহায়ত্ব, দায়িত্ববোধ আর নিজের ছবিকে নিখুঁত করার তাগিদের প্রকাশ। অবাক করা বিষয় হল, কর্ণের সেই কান্নাই নাকি সলমনের মন গলিয়ে দেয়।
সলমন বুঝতে পারেন, এই তরুণ পরিচালক শুধু নিজের জেদে নয়, ছবির ভালোর জন্যই এতটা অনড়। মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায় পরিস্থিতি। তিনি রাজি হন কর্ণের কথা মানতে। পরেন স্যুট-প্যান্ট, শুরু হয় শুটিং।
আজ ‘সাজন জি ঘর অ্যায়’ শুধু একটি গান নয়, এটি বলিউডের আবেগের ইতিহাস। কাজলের বিপরীতে সলমনের সংযত অভিনয়, গানটির কথা, সুর—সব মিলিয়ে এই দৃশ্য দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। যদি সেই দিন কর্ণ নিজের আবেগ প্রকাশ না করতেন, যদি সলমন মত না বদলাতেন, তবে হয়তো এই দৃশ্য এতটা আইকনিক হয়ে উঠত না।
এই গল্প শুধু একটি পোশাক বা গান নিয়ে দ্বন্দ্বের কথা বলে না। এটি বলিউডের কাজ করার সংস্কৃতি, তারকাদের ক্ষমতা এবং একজন পরিচালকের মানসিক লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। আজ কর্ণ জোহর বলিপাড়ার অন্যতম শক্তিশালী নাম। কিন্তু এক সময় তাঁকেও নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে আবেগ, পরিশ্রম আর দৃঢ়তার মাধ্যমে।
সলমন খানের মতো সুপারস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা সহজ কাজ নয়। আবার সেই সুপারস্টারেরও একজন নবাগত পরিচালকের অনুভূতিকে সম্মান করা—এটাও বলিউডের সৌন্দর্যের অংশ।
এই ঘটনার পর কর্ণ ও সলমনের সম্পর্ক আরও গভীর হয় বলেই মনে করেন অনেকে। মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব থাকলেও পেশাদারিত্ব আর পারস্পরিক সম্মানই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। বলিউডে যেখানে অহংকারের সংঘর্ষ প্রায়শই সম্পর্ক ভেঙে দেয়, সেখানে এই গল্প এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
উপসংহার
বলিপাড়া মানেই যে কেবল রঙিন আলো, ঝলমলে পর্দা আর সাফল্যের গল্প—এই ধারণা আসলে অসম্পূর্ণ। ক্যামেরার সামনে যতটা চাকচিক্য দেখা যায়, তার চেয়েও বেশি বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে পর্দার আড়ালে। সেখানে আছে মানুষের স্বপ্নভঙ্গ, অহংকারের সংঘাত, অসম লড়াই, মানসিক চাপ, একাকিত্ব এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্কের গল্প। এই জটিল মানবিক আবর্তের মধ্যেই গড়ে ওঠে বলিপাড়ার প্রকৃত ইতিহাস, যা প্রায়ই দর্শকের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে করণ জোহর ও সলমন খান-এর সম্পর্কের ওঠানামার গল্পটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দু’জনেই আজ বলিউডের দুই স্তম্ভ—নিজেদের অবস্থানে অটল, প্রভাবশালী এবং ব্যস্ত। কিন্তু এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছনোর পথ যে একেবারেই মসৃণ ছিল না, তা তাঁদের শুরুর দিনগুলির অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দেয়। মতের অমিল, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতির সংঘাত—সবই একসময় তাঁদের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে তাঁরা যে পরিণত ও সংযত অবস্থানে পৌঁছেছেন, সেটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খ্যাতি বা ক্ষমতা যতই বড় হোক না কেন, মানুষ হিসেবে অনুভূতি কখনও ছোট হয় না। সম্মান, সংবেদনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া ছাড়া কোনও সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না—সে সম্পর্ক ব্যক্তিগত হোক বা পেশাগত। বলিউডের মতো প্রতিযোগিতামূলক জগতে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ক্যারিয়ার বদলে দিতে পারে, সেখানে আবেগকে সামলে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। করণ ও সলমনের গল্প সেই চ্যালেঞ্জেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ধরনের গল্প দর্শকদের কাছে শুধু গসিপ হিসেবে ধরা দেয় না। বরং এগুলি মানুষের জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। সাধারণ মানুষের জীবনেও তো মতবিরোধ, দূরত্ব, আবার সমঝোতা আসে। তাই তারকাদের জীবনের এই মানবিক মুহূর্তগুলি দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। মানুষ তখন তারকাকে আর দূরের কোনও আইকন হিসেবে দেখে না, বরং নিজের মতোই একজন অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখে।
এই কারণেই বলিপাড়ার এমন গল্পগুলি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না। নতুন ছবি, নতুন তারকা এলেও, সম্পর্কের এই মানবিক অধ্যায়গুলি বারবার আলোচনায় ফিরে আসে। কারণ এগুলির মধ্যে লুকিয়ে থাকে জীবনের সার্বজনীন সত্য—সময় সব ক্ষত সারিয়ে তোলে, অহংকারের চেয়ে বড় হয় বোঝাপড়া, আর সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষই থেকে যায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বলিপাড়ার এই গল্প আমাদের শেখায় যে গ্ল্যামারের আড়ালে থাকা মানবিক অনুভূতিই আসল। সেই অনুভূতি, সম্মান আর পরিণত মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত সব সম্পর্ককে অর্থবহ করে তোলে। আর ঠিক এই কারণেই এমন গল্প আজও মানুষের মনে আলাদা, স্থায়ী জায়গা করে নেয়।