Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নদীয়ার পাবাখালিতে স্থায়ী ব্রিজের দাবিতে সরব গ্রামবাসী নিজ খরচে রাস্তা সারাচ্ছেন যুবক প্রকাশ দেব শর্মন

নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জের ভারত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাবাখালি গ্রামে তিন নদীর মিলনস্থলে বর্ষায় চরম দুর্ভোগের শিকার হন মানুষ  দুর্ঘটনা এড়াতে নিজের খরচে রাস্তা মেরামত করছেন যুবক প্রকাশ দেব শর্মন এলাকাবাসীর দাবি  দ্রুত স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ হোক

নদীয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ইতিহাস প্রসিদ্ধ পাবাখালি গ্রাম আজও উন্নয়নের অপেক্ষায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী ঘেরা পরিবেশ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হন এলাকার হাজার হাজার মানুষ। এই গ্রামেই রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর মিলনস্থল— চূর্ণী, মাথাভাঙ্গা এবং ইছামতি নদী। বাংলাদেশ থেকে নেমে আসা মাথাভাঙ্গা নদী এখান থেকে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে একদিকে রানাঘাটের দিকে চূর্ণী নদী হিসেবে প্রবাহিত হয়েছে এবং অন্যদিকে বনগাঁ ও বসিরহাটের দিকে ইছামতি নদী গিয়েছে।

একসময় যে ইছামতি নদী ছিল প্রবল স্রোতস্বিনী, বর্তমানে বর্ষাকাল ছাড়া নদীর উৎস মুখে প্রায় জলই থাকে না। নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়ায় সেই অংশ দিয়েই বর্তমানে মানুষ যাতায়াত করে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে সাইকেল, মোটরবাইক, টোটো, চারচাকা গাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। যদিও নদীর দুই পাশে ঢালাই রাস্তা রয়েছে, কিন্তু মাঝের নদীর অংশ বর্ষাকাল বা বৃষ্টির সময় সম্পূর্ণ কাদাময় হয়ে পড়ে। ফলে রাস্তা এতটাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষার সময় নদীতে জল জমে গেলে রাস্তা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গাড়ি কাদায় আটকে যায়, টোটো উল্টে যায়, বহু মানুষ আহত হন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া, রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া মানুষ এবং দৈনন্দিন কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে সীমাহীন সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। তবুও আজ পর্যন্ত স্থায়ী সমাধানের জন্য কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর।

এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই মানবিক উদ্যোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন পাবাখালির যুবক প্রকাশ দেব শর্মন। প্রতিবছর বর্ষার সময় কিংবা জোরে বৃষ্টি হলে যখন রাস্তা কাদায় ভরে যায় এবং যাতায়াত কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে, তখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত অর্থ খরচ করে ইট, মাটি ও শ্রম দিয়ে রাস্তা মেরামতের কাজ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেই হাতে-কলমে রাস্তা তৈরির কাজে অংশ নেন এবং পরে সেই রাস্তার দেখভালও করেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, প্রকাশ বাবুর এই উদ্যোগ না থাকলে বহুদিন আগেই এই রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেত। কারণ প্রশাসনের তরফে স্থায়ী সমাধানের কোনও উদ্যোগ না থাকলেও সাধারণ মানুষের যাতায়াত সচল রাখতে তিনি একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই কাজের জন্য এলাকায় তিনি আজ প্রশংসিত।

স্থানীয় বাসিন্দা সমরেশ নন্দী বলেন, “বর্ষার সময় আমাদের খুব কষ্ট হয়। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন, এখানে যদি একটি স্থায়ী ব্রিজ তৈরি করে দেওয়া হয় তাহলে অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি গ্রামের মানুষ উপকৃত হবেন।”

তিনি আরও বলেন, “এই রাস্তা শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বিএসএফের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই রাস্তার গুরুত্ব অনেক বেশি। স্থায়ী ব্রিজ তৈরি হলে মাজদিয়া ও আশেপাশের এলাকার মানুষের কলকাতায় যাতায়াত অনেক সহজ হয়ে যাবে।”

টোটো চালক বিবেক বিশ্বাস বলেন, “এখানে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। কাদার মধ্যে গাড়ি উল্টে যায়। যাত্রীদের নিয়ে খুব ভয় নিয়ে চলতে হয়। স্থায়ী রাস্তা বা ব্রিজ হলে খুব সুবিধা হয়।”

আরও এক টোটো চালক অমল রায় জানান, “বর্ষার সময় এই রাস্তা দিয়ে সাইকেল বা গাড়ি চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়। আমরা খুব সমস্যার মধ্যে পড়ে যাই। প্রকাশ বাবু নিজের উদ্যোগে রাস্তা তৈরি করে দেন বলেই আমরা কোনওভাবে যাতায়াত করতে পারছি।”

স্থানীয় বাসিন্দা পিন্টু অধিকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বছরের পর বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে আসছি। নতুন নতুন সরকার আসে, সবাই বলে এখানে ব্রিজ হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও কাজ হয়নি। এখন নতুন সরকারের কাছে আবেদন, তারা যদি মানুষের কথা ভেবে এখানে স্থায়ী ব্রিজ তৈরি করে দেয় তাহলে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হবে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রকাশ দেব শর্মন দীর্ঘদিন ধরে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে মানুষের সুবিধার জন্য রাস্তা তৈরি করছেন। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করেন, রাস্তার দেখভাল করেন। তাঁর জন্যই আজ সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতে পারছেন। নাহলে এখানে আরও অনেক দুর্ঘটনা ঘটত।”

স্থানীয়দের দাবি, এই রাস্তা শুধুমাত্র একটি গ্রামের যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি বহু গ্রামের জীবনরেখা। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যেতে এই রাস্তার উপর নির্ভরশীল। ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজে যাতায়াত করেন এই পথ দিয়ে। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতাল পৌঁছাতেও এই রাস্তার বিকল্প নেই। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই রাস্তা কাদায় ভরে যায় এবং বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

news image
আরও খবর

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নয়, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জড়িত। তাই পাবাখালির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, তিনটি নদীর মিলনস্থল হওয়ায় এই এলাকায় পর্যটনেরও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিকাঠামো তৈরি হলে ভবিষ্যতে এই জায়গা নদীয়া জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে সেই সম্ভাবনাও আজ বাধাগ্রস্ত। 

সব মিলিয়ে বলা যায়, নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাবাখালি গ্রামের মানুষ আজও উন্নয়নের আশায় দিন গুনছেন। ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই গ্রামটি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, তেমনি ভৌগোলিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চূর্ণী, মাথাভাঙ্গা ও ইছামতি— এই তিনটি নদীর মিলনস্থল হওয়ায় এলাকাটির বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও আজও এখানকার মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই সমস্যার ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায়।

বর্তমানে নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়ায় সেই অংশ দিয়েই মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তা কাদায় ভরে যায় এবং যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। বহু সময় গাড়ি কাদায় আটকে যায়, টোটো উল্টে দুর্ঘটনা ঘটে, সাধারণ মানুষ আহত হন। স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী, রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া পরিবার, কর্মসূত্রে প্রতিদিন বাইরে যাওয়া মানুষ— সকলকেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী স্থায়ী ব্রিজের দাবি জানিয়ে এলেও বাস্তবে সেই দাবি এখনও পূরণ হয়নি।

এই রাস্তার গুরুত্ব শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় বিএসএফের ক্ষেত্রেও এই রাস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বহু যানবাহন এই পথ ব্যবহার করে। মাজদিয়া ও আশেপাশের এলাকার মানুষের কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই রাস্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এলাকাবাসীর মতে, এখানে একটি স্থায়ী ব্রিজ তৈরি হলে শুধু একটি গ্রামের নয়, প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি গ্রামের মানুষের জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে।

এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন পাবাখালির যুবক প্রকাশ দেব শর্মন। প্রশাসনের তরফে স্থায়ী কোনও উদ্যোগ না থাকলেও তিনি প্রতিবছর নিজের ব্যক্তিগত অর্থ খরচ করে রাস্তার কাদাময় অংশে ইট ফেলে যাতায়াতের উপযোগী করে তোলেন। শুধু অর্থ খরচ করেই থেমে থাকেন না, তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে রাস্তা তৈরির কাজ করেন এবং পরবর্তীতে সেই রাস্তার দেখভালও করেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টার ফলেই আজ বহু মানুষ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রকাশ বাবুর এই উদ্যোগ না থাকলে বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠত। বহু দুর্ঘটনা ঘটত এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যেত। এলাকার টোটো চালক থেকে শুরু করে সাধারণ পথচলতি মানুষ— সকলেই তাঁর এই কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, যেখানে প্রশাসনের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে বছরের পর বছর কেটে যায়, সেখানে একজন সাধারণ যুবক নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে কাজ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

একদিকে যখন বছরের পর বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি মিলেছে, অন্যদিকে প্রকাশ দেব শর্মনের মতো যুবকেরা বাস্তবে কাজ করে দেখাচ্ছেন কীভাবে মানবিক উদ্যোগ সমাজকে বদলে দিতে পারে। তাঁর এই কাজ শুধুমাত্র রাস্তা মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সামাজিক সচেতনতার এক বড় উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।

এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবি— আর যেন শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি না শোনা যায়। দ্রুত এই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটির উপর একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ করা হোক, যাতে বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পান সাধারণ মানুষ। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই সফল হয়, যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়। পাবাখালির মানুষ আজ সেই বাস্তব উন্নয়নেরই অপেক্ষায় রয়েছেন।

 

 

Preview image