Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কুরবানির মরশুমে গরুর বাজারে ধাক্কা! মুসলিম ক্রেতাদের অনীহায় বিপাকে হিন্দু ব্যবসায়ীরা

কুরবানির মরশুমে গরুর বাজারে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক মন্দা। মুসলিম ক্রেতাদের একাংশের অনীহা ও কম চাহিদার জেরে বিপাকে পড়েছেন বহু হিন্দু গরু ব্যবসায়ী। বিক্রি কমে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী মহল, আর এই পরিস্থিতি ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক।

কুরবানির মরশুম মানেই প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গরুর বাজারে বাড়তি ভিড়, উৎসবের আমেজ এবং ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ সহ একাধিক রাজ্যে কুরবানির কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই জমে ওঠে গরুর হাট। বহু ব্যবসায়ী সারা বছরের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেন এই মরশুমকে কেন্দ্র করে। কেউ দূরদূরান্ত থেকে গরু কিনে আনেন, কেউ আবার স্থানীয় খামার থেকে পশু সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রির জন্য প্রস্তুতি নেন। কিন্তু চলতি বছরে সেই পরিচিত চিত্র যেন একেবারেই বদলে গিয়েছে।

এবার কুরবানির আগে একাধিক গরুর বাজারে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক মন্দা। প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা বাজারে আসছেন না। অনেক জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেও ব্যবসায়ীরা বিক্রি করতে পারছেন না। বিশেষ করে বহু হিন্দু গরু ব্যবসায়ী অভিযোগ করছেন, মুসলিম ক্রেতাদের একাংশ এবার গরু কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বড়সড় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক বছরে গরুর দাম, পরিবহণ খরচ, খাবারের খরচ এবং প্রশাসনিক নানা নিয়মের কারণে ব্যবসা আগেই কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অনেকেই ধার করে বা ঋণ নিয়ে গরু কিনেছিলেন কুরবানির বাজারে ভালো লাভের আশায়। এখন সেই গরু বিক্রি না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় ঘুম উড়েছে বহু পরিবারের।

মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, বীরভূম, হাওড়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন পশুর হাটে ব্যবসায়ীদের মুখে একই অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তাঁদের কথায়, “আগে কুরবানির সময় বাজারে পা রাখার জায়গা থাকত না। এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই ভিড় নেই। মানুষ গরুর দাম জিজ্ঞেস করেই চলে যাচ্ছেন।”

এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি প্রায় দশটি গরু নিয়ে বাজারে এসেছিলেন। তার মধ্যে মাত্র একটি বিক্রি হয়েছে। বাকিগুলি নিয়ে আবার ফিরতে হয়েছে। প্রতিদিন পশুর খাবার, চিকিৎসা ও পরিবহণে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বড়সড় লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

অন্যদিকে মুসলিম সমাজের একাংশের বক্তব্য, বর্তমানে বাজারে গরুর দাম অত্যন্ত বেশি। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে সেই দাম বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেকেই জানিয়েছেন, সংসারের খরচ, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার কুরবানির বাজেট কমাতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। কেউ ছোট পশুর দিকে ঝুঁকছেন, আবার কেউ যৌথভাবে কুরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

কিছু মানুষের মতে, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও অনেকের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গরু পরিবহণ, বাজারে নজরদারি এবং বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় অনেকেই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ফলে সামগ্রিকভাবে বাজারে প্রভাব পড়ছে।

এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণেই বাজারে এই মন্দা দেখা দিয়েছে। তাঁদের দাবি, বেকারত্ব বৃদ্ধি, মূল্যবৃদ্ধি এবং আয় কমে যাওয়ার ফলে মানুষ এখন প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত খরচ করতে পারছেন না। ফলে কুরবানির বাজারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে।

অন্যদিকে শাসকদলের বক্তব্য, পরিস্থিতিকে অযথা রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, প্রতি বছর বাজারের পরিস্থিতি একরকম থাকে না। কোথাও চাহিদা কমলে অন্যত্র বাড়তে পারে। এছাড়া এখনও কুরবানির বাকি সময় রয়েছে, ফলে শেষ মুহূর্তে বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে বলেও তাঁদের মত।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতির পিছনে একাধিক অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। করোনা পরবর্তী সময় থেকে বহু ছোট ব্যবসায়ী আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে উৎসবের খরচ কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ডিজিটাল বাজার ও অনলাইন পশু কেনাবেচার প্রবণতাও কিছুটা প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

গ্রামের অনেক কৃষকও সমস্যার মুখে পড়েছেন। কারণ বহু কৃষক অতিরিক্ত আয়ের আশায় গরু পালন করেন এবং কুরবানির মরশুমে তা বিক্রি করেন। এবার সেই বিক্রি কমে গেলে তাঁদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। একজন কৃষক বলেন, “ছ’মাস ধরে গরু পালন করেছি। খাবার, ওষুধ সব মিলিয়ে অনেক খরচ হয়েছে। এখন যদি ঠিকমতো দাম না পাই, তাহলে সব পরিশ্রম বিফলে যাবে।”

news image
আরও খবর

পশু ব্যবসায়ী সংগঠনগুলিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের দাবি, বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রশাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন। কিছু সংগঠন গরু পরিবহণে সুবিধা, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং বাজারে পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর দাবি তুলেছে।

এদিকে সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলছেন, আবার কেউ বলছেন ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে অযথা বিভাজন তৈরি করা উচিত নয়। অনেকেই মনে করছেন, এটি মূলত অর্থনৈতিক সমস্যা, যাকে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ঠিক হবে না।

সমাজবিদদের মতে, কুরবানির বাজার শুধুমাত্র ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে যুক্ত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা। পশুপালক, ব্যবসায়ী, পরিবহণ কর্মী, খাদ্য সরবরাহকারী— বহু মানুষের আয় নির্ভর করে এই মরশুমের উপর। ফলে বাজারে মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাব বিস্তৃত স্তরে পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ বাজারে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। শুধু পশুর বাজার নয়, পোশাক, খাদ্য ও অন্যান্য উৎসবকেন্দ্রিক ব্যবসাতেও তার প্রভাব পড়ছে। মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ কম থাকায় তারা খরচ কমানোর পথ বেছে নিচ্ছেন।

একাধিক বাজারে দেখা গিয়েছে, ব্যবসায়ীরা আগের তুলনায় দাম কমিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু তাতেও ক্রেতা টানতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে হতাশা বাড়ছে ব্যবসায়ী মহলে। অনেকেই বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত না বদলালে আগামী বছরে তাঁরা আর এই ব্যবসায় নামবেন না।

তবে কিছু ব্যবসায়ী এখনও আশাবাদী। তাঁদের মতে, কুরবানির ঠিক আগের কয়েকদিনে সাধারণত বাজারে ভিড় বাড়ে। অনেক ক্রেতাই শেষ মুহূর্তে পশু কিনতে পছন্দ করেন। ফলে শেষ পর্যন্ত কিছুটা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

প্রশাসনের তরফেও বিভিন্ন জায়গায় নজরদারি চালানো হচ্ছে। কোথাও যাতে অবৈধভাবে পশু পরিবহণ বা বাজারে বিশৃঙ্খলা না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।

এই পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হল সাধারণ মানুষের আর্থিক অনিশ্চয়তা। উৎসবের মরশুমেও যখন মানুষ খরচ কমাতে বাধ্য হন, তখন তা বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কুরবানির বাজারে এই অস্বাভাবিক মন্দা শেষ পর্যন্ত সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বহু ব্যবসায়ী, কৃষক এবং পশুপালকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিতর্ক, সামাজিক আলোচনা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গরুর বাজারের এই ছবি এখন রাজ্যের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রয়েছেন ছোট ও মাঝারি গরু ব্যবসায়ীরা। কারণ বড় ব্যবসায়ীদের মতো তাঁদের হাতে অতিরিক্ত পুঁজি থাকে না। অনেকেই স্থানীয় মহাজন বা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গরু কিনেছেন। এখন সেই গরু বিক্রি না হলে ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে পশুর খাবার, ওষুধ এবং পরিবহণের খরচ প্রতিদিন বাড়ছে। ফলে প্রতিটি অতিরিক্ত দিন ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে, সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় খরচের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে কুরবানির মতো ধর্মীয় উৎসবের বাজারেও তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে আস্থা ফেরাতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক নীতি অত্যন্ত জরুরি। না হলে আগামী বছরগুলিতে এই ঐতিহ্যবাহী পশুর বাজার আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।

Preview image