Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কন্নড় চলচ্চিত্রে হারানো হল এক উজ্জ্বল প্রতিভা: হরিশ রাই প্রয়াত

কন্নড় ও দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা হরিশ রাই আর নেই।কেজিএফ-এ রকির চাচার চরিত্রে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর বেঙ্গালুরুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।তেলুগু, তামিল ও কন্নড় সিনেমায় একাধিক উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন।হরিশ রাইয়ের নিষ্ঠা ও পর্দার উপস্থিতি দক্ষিণী সিনেমার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কন্নড় চলচ্চিত্রে হারানো হল এক উজ্জ্বল প্রতিভা: হরিশ রাই প্রয়াত

দক্ষিণী সিনেমা জগত শোকাহত। কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির প্রিয় অভিনেতা হরিশ রাই আর নেই। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে দীর্ঘদিনের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর মৃত্যু কেবল পরিবার ও বন্ধুদের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগৎ ও অনুরাগীদের জন্য এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। হরিশ রাই ছিলেন সেই অভিনয়শিল্পী, যিনি যে কোনো চরিত্রের মধ্য দিয়ে দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারতেন। বিশেষ করে ‘কেজিএফ’ সিনেমার রকির চাচার চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও ভক্তদের মনে অম্লান।

প্রাথমিক জীবন ও চলচ্চিত্রে পদার্পণ

হরিশ রাই-এর জন্ম ও প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে অনেকেই কমই জানেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর অভিনয় প্রবণতা লক্ষ্যণীয় ছিল। নৃত্য, নাটক এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ তাঁর প্রতিভাকে প্রসারিত করেছে। চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের আগে হরিশ বিভিন্ন স্টেজ শো এবং নাটকে অভিনয় করেছেন।

কন্নড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে হরিশ রাই প্রথম বড় ভূমিকা গ্রহণ করেন তখনই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ধারার স্বাভাবিকতা এবং চরিত্রে গভীরতা দর্শকদের সহজেই আকৃষ্ট করেছিল।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ও চরিত্র

হরিশ রাই-এর চলচ্চিত্রজীবন বহু বছরের। তিনি কেবল কন্নড় সিনেমাতেই নয়, তামিল ও তেলুগু সিনেমাতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য সিনেমা হলো:

  • ওম (Om) – এই সিনেমায় তাঁর পারফরম্যান্স দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

  • সামারা (Samara) – এখানে তিনি এক অনন্য চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেন।

  • বেঙ্গালুরু আন্ডারওয়ার্ল্ড (Bengaluru Underworld) – অপরাধ জগতের জটিল চরিত্রে তিনি দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন।

  • সঞ্জু ওয়েডস গীতা (Sanju Weds Geetha) – প্রেম ও আবেগের গল্পে তাঁর অভিনয় সমালোচক এবং দর্শক উভয়েরই প্রশংসা পেয়েছে।

  • রাজ বাহাদুর (Raj Bahadur) – এই সিনেমায় তাঁর চরিত্র ছিল এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের, যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

তবে হরিশ রাই-এর সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র সম্ভবত ‘কেজিএফ’ সিরিজে রকির চাচার ভূমিকায়। তাঁর অভিনয় চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছিল এবং সিনেমার গল্পের সঙ্গে দর্শকদের সংযোগ আরও গভীর করেছে।

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই

হরিশ রাই-এর জীবনের শেষ বছরগুলো ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইতে কাটে। তাঁর গলা ও ঘাড়ে ফোলাভাব লক্ষ্য করার পর থাইরয়েড ক্যান্সার ধরা পড়ে, যা পরবর্তীতে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। দীর্ঘ সময় তিনি নিজের অসুস্থতার খবর গোপন রাখতেন, কিন্তু পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন যে তিনি সিনেমায় দাড়ি রেখেছিলেন যাতে ঘাড়ের ফোলাভাব ঢেকে যায়।

চিকিৎসার সময় তিনি প্রায়শই অর্থনৈতিক সংকটে ছিলেন। হরিশ নিজেই একবার বলেছেন, “টাকা না থাকায় অস্ত্রোপচার করাতে পারিনি। বন্ধুদের কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই ভিডিও পোস্ট করার সাহস পাইনি।” এই কথাগুলো তার জীবনের বাস্তবতার কঠোরতা প্রকাশ করে। তবু, তিনি কখনোও নিজের পেশাদারিত্ব এবং শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা হারাননি। ‘কেজিএফ ২’-এর শুটিং চলাকালীনই তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, কিন্তু কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেননি।

news image
আরও খবর

চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর অবদান

হরিশ রাই-এর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে শুধু চরিত্রের বৈচিত্র্য বা সংলাপের কারণে নয়, বরং তাঁর অভিনয়ে যে গভীরতা ছিল, সেটির জন্য। তিনি যে কোনো চরিত্রে প্রাণ ঢেলে দিতে পারতেন – তা হোক একজন প্রেমিক, অপরাধী, পরিবারবর্গের সদস্য বা সমাজের একজন সাধারণ মানুষ। তাঁর অভিনয় প্রায়শই দর্শকদের মনে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকে।

কন্নড়, তামিল এবং তেলুগু সিনেমায় তিনি বহু উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন। প্রতিটি চরিত্রে তিনি দর্শকের সাথে এমন সংযোগ স্থাপন করেছেন যা কেবল প্রতিভা নয়, বরং আন্তরিক শ্রম ও নিষ্ঠার প্রতিফলন। বিশেষ করে দক্ষিণী সিনেমার ইতিহাসে হরিশ রাই-এর নাম একটি স্থায়ী ছাপ রেখেছে।

ব্যক্তিগত জীবন ও নীতি

হরিশ রাই ছিলেন একজন সহজ সরল মানুষ, যিনি ব্যক্তিগত জীবনে গোপনীয়তা পছন্দ করতেন। তিনি নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে সরাসরি বলতে ভালোবাসতেন না। বন্ধুরা ও সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। তিনি একবার বলেছেন, বন্ধুদের সহায়তা প্রয়োজন হলে তিনি সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা কখনো প্রকাশ্যে দেখাতে চাননি। এটি তাঁর বিনম্রতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধার পরিচায়ক।

অভিনয়ের পাশাপাশি হরিশ সিনেমার প্রতি গভীর নিবেদন এবং প্রফেশনালিজমের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি কখনোও চরিত্রের জন্য শরীরিক বা মানসিক পরিশ্রম এড়াতেন না। ‘কেজিএফ’ সিনেমার মতো বড় প্রজেক্টেও তিনি সর্বদা সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতেন, এমনকি অসুস্থতার মধ্যেও।

মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া

হরিশ রাই-এর মৃত্যু কেবল কন্নড় সিনেমা নয়, পুরো দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতকে শোকস্তব্ধ করেছে। সহকর্মী, পরিচালক, প্রযোজক এবং ভক্তরা তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। অনলাইনে বহু মানুষ তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং তাঁকে স্মরণ করছে একটি নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল অভিনেতা হিসেবে।

দক্ষিণী সিনেমার ইতিহাসে এমন অভিনেতার বিরল উদাহরণ পাওয়া যায়, যিনি প্রায়শই Supporting Role-এ থাকলেও চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে। হরিশ রাই-এর চরিত্রগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে অম্লান।

স্মৃতির অমলিন ছাপ

হরিশ রাই-এর অভিনয় চিরকাল স্মরণীয় থাকবে। তিনি কেবল চরিত্রের অভিনয় করতেন না, তিনি চরিত্রের ভেতরে ঢুকে দর্শককে অনুভব করাতেন। তাঁর নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম, এবং পেশাদারিত্ব কেবল অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে তাঁকে স্মরণীয় করে রাখে।

দক্ষিণী সিনেমার ইতিহাসে হরিশ রাই-এর নাম এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে থাকবে। ‘কেজিএফ’-এর রকির চাচা, ‘ওম’-এর চরিত্র, ‘বেঙ্গালুরু আন্ডারওয়ার্ল্ড’-এর অপরাধী – প্রতিটি চরিত্রে তিনি দর্শকের মনে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে গিয়েছেন। তাঁর অভিনয় শুধু সিনেমার পর্দাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দর্শকের মনের ভেতরেও জীবন্ত রয়েছে।

উপসংহার

হরিশ রাই-এর চলে যাওয়া কন্নড় চলচ্চিত্র জগৎ ও দক্ষিণী সিনেমার ভক্তদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পরও তিনি শিল্পের প্রতি তার নিষ্ঠা হারাননি। তাঁর অভিনয়, তাঁর চরিত্রের গভীরতা এবং তাঁর ব্যক্তিত্ব চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হরিশ রাই-এর জীবন আমাদের শেখায়, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে যেকোনো কাজকে স্মরণীয় করা যায়।

দক্ষিণী সিনেমার পর্দায় তাঁর অবদান, তাঁর স্মৃতি এবং তাঁর জীবনের গল্প চিরকাল দর্শক ও সহকর্মীদের মনে অমলিন থাকবে। আজ আমরা কেবল একটি অভিনেতাকে হারাইনি, বরং হারিয়েছি এক অনন্য প্রতিভা, যিনি প্রতিটি চরিত্রে জীবন ও প্রাণ ভরতে জানতেন। হরিশ রাই-এর চলে যাওয়া দক্ষিণী সিনেমার ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে, কিন্তু তাঁর শিল্প ও চরিত্রের স্মৃতি চিরকাল জীবন্ত থাকবে।

Preview image