বলিউডে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’-এর ইন্দ্রবদন সারাভাই হিসেবে জনপ্রিয় অভিনেতা সতীশ শাহ আর নেই। শনিবার দুপুরে কিডনি বিকল হয়ে ৭৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন তিনি। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন অমিতাভ বচ্চন, অনুপম খের-সহ বহু তারকা।
বলিউডের আকাশে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। ভারতীয় বিনোদন জগৎ আজ এক প্রিয় মুখকে হারিয়েছে। ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’-এর প্রিয় ইন্দ্রবদন সারাভাই, অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমার কৌতুকপ্রদ অথচ সংবেদনশীল চরিত্রের প্রাণপুরুষ সতীশ শাহ আর নেই। শনিবার দুপুরে মুম্বইয়ে কিডনি বিকল হয়ে ৭৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন এই অভিনেতা। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বাড়িতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু শনিবার সকালে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বলিউডের সহকর্মীরা, বন্ধু-শিল্পী, এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত শোকবার্তা জানাতে শুরু করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড হতে থাকে “#SatishShah”। অমিতাভ বচ্চন, অনুপম খের, রত্না পাঠক শাহ, সোহেল সেথ, বোমান ইরানি— সকলেই গভীর শোক প্রকাশ করেন। এক সময়ের সহকর্মীরা জানান, “সতীশ শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিল্প জগতের আনন্দের প্রতীক।”
সতীশ শাহ ২৫ জুন ১৯৫১ সালে মুম্বইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। গুজরাটি পরিবারের সন্তান তিনি। ছোটবেলা থেকেই নাটক, অভিনয়, এবং গল্প বলা ছিল তাঁর প্রিয় কাজ। কলেজে পড়ার সময় থেকেই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (NSD)-এর প্রাক্তনী এই অভিনেতা অভিনয়ের কৌশল শিখেছিলেন গুরুর মতো শিল্পীদের কাছ থেকে। সেই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় এক স্বতন্ত্র কৌতুকবোধ, যা পরে ভারতীয় টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে এক নতুন ধারা তৈরি করে।
১৯৭৮ সালে ‘অব আমারা’ নামের একটি গুজরাটি ছবির মাধ্যমে তিনি অভিনয়জীবন শুরু করেন। তবে মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর সাফল্য আসে ১৯৮০-এর দশকে। সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় কমেডি ছবি ‘জানে ভি দো ইয়ারো’ (১৯৮৩) তাঁকে অমর করে দেয়। কুন্দন শাহ পরিচালিত এই ছবিতে তিনি “মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ধিমান্না” চরিত্রে অভিনয় করেন, যা আজও কাল্ট ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সতীশ শাহ ছিলেন এমন এক অভিনেতা, যিনি একদিকে যেমন হাসির দৃশ্যে প্রাণ আনতেন, অন্যদিকে আবেগঘন দৃশ্যে দর্শকের মন ছুঁয়ে যেতেন। তাঁর অভিনয় কখনও কৃত্রিম লাগেনি, বরং তিনি প্রতিটি চরিত্রকে নিজের মতো করে বাঁচিয়ে তুলতেন।
তিনি অভিনয় করেছেন ৩০০-রও বেশি হিন্দি ছবিতে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
জানে ভি দো ইয়ারো (১৯৮৩)
কাল হো না হো (২০০৩) – এখানে তিনি কফি শপের মালিক হিসেবে অভিনয় করেন।
ম্যায় হুঁ না (২০০৪) – তাঁর ‘স্পিট কোবরা প্রফেসর’ চরিত্র দর্শকদের হাসিতে মাতিয়ে দিয়েছিল।
ফানা (২০০৬), ওম শান্তি ওম (২০০৭), ধুম ধড়াকা (২০০৮), এবং হাম সাথ সাথ হ্যাঁ (১৯৯৯)– প্রতিটি ছবিতেই তিনি ছিলেন দর্শকপ্রিয় চরিত্রের অংশ।
এক সময় তাঁকে নিয়ে নির্মাতারা বলতেন— “যদি কোনো দৃশ্যে প্রাণ না থাকে, সেখানে সতীশ শাহকে বসিয়ে দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।” তাঁর উপস্থিতিই ছিল আনন্দের প্রতীক।
২০০৪ সালে স্টার ওয়ান চ্যানেলে শুরু হয় একটি সিটকম— ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’। সেখানে তিনি অভিনয় করেন ইন্দ্রবদন সারাভাই চরিত্রে— এক মধ্যবিত্ত, খিটখিটে অথচ প্রাণবন্ত বাবা, যিনি তাঁর স্ত্রীর অভিজাত ভাবমূর্তি আর ছেলের বৌয়ের সাধারণত্বের মাঝে হাস্যরস খুঁজে পান।
এই চরিত্রের মাধ্যমে তিনি টেলিভিশনের ইতিহাসে এক স্থায়ী ছাপ ফেলেছিলেন। তাঁর সংলাপ, অঙ্গভঙ্গি, হাসির ধরন আজও জনপ্রিয়। এমনকি ২০১৭ সালে সিরিজটির দ্বিতীয় পর্ব ওয়েব ভার্সনে ফিরে এলে, দর্শকরা আবারও তাঁকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানান।
‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’-এর সহ-অভিনেত্রী রত্না পাঠক শাহ (তাঁর অনস্ক্রিন স্ত্রী মায়া সারাভাই) বলেন,
“সতীশ এমন একজন অভিনেতা যিনি স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়েও দৃশ্যকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারতেন। তাঁর উপস্থিতি মানেই হাসি।”
এই সিরিজ তাঁকে কেবল জনপ্রিয় করেনি, তাঁকে দিয়েছে কালজয়ী পরিচিতি— একজন চিরসবুজ কমেডি লিজেন্ড হিসেবে।
সতীশ শাহের অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল টাইমিং— হাস্যরসের নিখুঁত সময়জ্ঞান। তিনি কখনও শব্দ, কখনও মুখভঙ্গি, কখনও নিঃশব্দ বিরতিকে ব্যবহার করে কমেডির আবহ তৈরি করতেন। অনেক তরুণ অভিনেতা তাঁকে আদর্শ মানতেন।
তিনি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,
“আমাকে সবাই কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দেখে, কিন্তু হাসির পেছনেও থাকে কষ্ট। মানুষ কাঁদলে তা বোঝা যায়, কিন্তু হাসির আড়ালেও অনেক ব্যথা থাকে।”
এই সংবেদনশীলতা তাঁকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
সতীশ শাহের স্ত্রী মধু শাহ-ও ছিলেন থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। দাম্পত্য জীবনে তাঁরা ছিলেন একে অপরের সহযাত্রী। তাঁদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন অনুপম খের, বোমান ইরানি, এবং ফরহা খান।
২০২০ সালে যখন কোভিড-১৯ মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন সতীশ শাহও সংক্রমিত হন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসার কারণে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। সুস্থ হওয়ার পর তিনি এক টুইটে লিখেছিলেন—
“ডাক্তারদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। তাঁরা ঈশ্বরের দূত।”
![]()
আরও খবর
এভাবেই তাঁর মানবিকতা প্রকাশ পায় প্রতিটি কথায়।
তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য, “সতীশ কখনও কারও সাহায্যের অনুরোধ ফিরিয়ে দেননি। তিনি ছিলেন সত্যিকারের ‘গুড হিউম্যান বিং’। যখনই কোনো নবাগত অভিনেতা পরামর্শ চাইতেন, তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।”
গত কয়েক মাস ধরে তিনি কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকরা তাঁকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন নিয়মিত। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর দুপুরে তাঁর শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হয়। দ্রুত তাঁকে মুম্বইয়ের হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা আর বাঁচাতে পারেননি।
অভিনেতা ও পরিচালক অশোক পন্ডিত এক ভিডিও বার্তায় জানান,
“আজ আমরা এমন একজন মানুষকে হারালাম যিনি প্রতিটি সেটে হাসির বন্যা বইয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ বন্ধু।”
সন্ধ্যায় মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজ শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপস্থিত ছিলেন অনেক সহকর্মী— অনুপম খের, রত্না পাঠক শাহ, বোমান ইরানি, সুপ্রিয়া পাঠক, এবং অনেক টেলিভিশন তারকা।
অমিতাভ বচ্চন টুইটারে লেখেন,
“Satish… তুমি আমাদের হাসিয়েছ, ভরিয়ে দিয়েছ আনন্দে। আজ আমরা কাঁদছি, কিন্তু তোমার হাসি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বাজবে।”
অনুপম খের বলেন,
“আমরা একই সময়ে থিয়েটার শুরু করেছিলাম। ওর মধ্যে ছিল এক অনন্য পজিটিভ এনার্জি। সে চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল হাসির উত্তরাধিকার।”
চলচ্চিত্র সমালোচক তরন আদর্শ লেখেন,
“কমেডি জগতে এমন প্রাকৃতিক প্রতিভা বিরল। তিনি ছিলেন স্ক্রিপ্টের প্রাণ।”
সতীশ শাহ শুধু একজন অভিনেতা নন; তিনি ছিলেন এক যুগের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পী। তাঁর হাতে ভারতীয় সিটকম পেয়েছিল এক নতুন রূপ— এমন কমেডি, যা কখনও অশ্লীল নয়, বরং সমাজের বাস্তবতার প্রতিফলন। তাঁর মতো অভিনেতারা প্রমাণ করেছেন, কৌতুকও হতে পারে উচ্চমানের শিল্প।
তরুণ প্রজন্মের অভিনেতা যেমন আয়ুষ্মান খুরানা, রাজকুমার রাও প্রায়ই সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তাঁরা সতীশ শাহকে রোল মডেল মনে করেন। তাঁর সহজ অভিনয়, সংলাপের স্বাভাবিক উপস্থাপনা, এবং সংযত হাস্যরস তাঁদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
এমনকি ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’-এর রি-রান বা ইউটিউব ক্লিপ আজও কোটি কোটি মানুষ দেখে হাসে। তাঁর তৈরি চরিত্রগুলো আজও সোশ্যাল মিডিয়ায় মিম হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কেউ হাসতে হাসতে লেখে— “Indravadan Sarabhai is eternal.”
কমেডি ছিল সতীশ শাহের পরিচয়, কিন্তু তিনি কখনও কৌতুককে হালকা কিছু মনে করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল— মানুষকে হাসানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,
“দর্শককে হাসাতে পারলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।”
এই সহজ সত্যটাই তাঁকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক রেখেছিল। তাঁর সহকর্মীরা বলেন, “সতীশ সেটে আসলে সবাই রিল্যাক্স হয়ে যেত। ওর উপস্থিতি মানেই ছিল ইতিবাচকতা।”
সতীশ শাহের প্রয়াণে বলিউড এক অমূল্য সম্পদ হারাল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে শিখবে কীভাবে কমেডিও হতে পারে চরিত্রনির্ভর, কীভাবে হাসির আড়ালেও লুকিয়ে থাকে গভীর আবেগ।
তাঁর মতো শিল্পীরা আর ফিরে আসে না। তাঁরা একবারই আসেন, নিজের আলোয় চারপাশ আলোকিত করে যান। আজ তাঁর শরীর মাটির নিচে, কিন্তু তাঁর চরিত্র, তাঁর সংলাপ, তাঁর অমলিন হাসি চিরকাল বেঁচে থাকবে কোটি দর্শকের মনে।
শেষবারের মতো তাঁরই সংলাপ মনে পড়ে—
“Life is a comedy, my friend. Don’t forget to laugh.”
আজও যেন সেই হাসিই আমাদের চোখে জল এনে দেয়।