Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রই রই বিনালে’ মুক্তি: জুবিন গর্গের শেষ ছবিতে অসমে উন্মাদনা ও আবেগের বিস্ফোরণ

৩১ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছে প্রয়াত গায়ক জুবিন গর্গের শেষ ছবি রই রই বিনালে ,মুক্তির পর থেকেই অসমজুড়ে চলছে আবেগের ঢেউ প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে হাউসফুল শো, দর্শকদের চোখে জল ও করতালি। মাত্র পাঁচ কোটির বাজেটে তৈরি ছবিটি ইতিমধ্যেই আয় করেছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। রাজেশ ভুঁইয়া পরিচালিত এই ছবিতে জুবিনকে দেখা গেছে এক অন্ধ সংগীতশিল্পীর ভূমিকায়, যেখানে নিজের সুরে গেয়েছেন ১১টি গান। অসম সরকার ছবির জিএসটি রাজস্ব তুলে দেবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলাগুরু আর্টিস্ট ফাউন্ডেশনএ ।

‘রই রই বিনালে’: জুবিন গর্গের শেষ ছবিতে অসমজুড়ে আবেগ, অশ্রু আর শ্রদ্ধার জোয়ার

৩১ অক্টোবর। দিনটি হয়তো অনেকের কাছে এক সাধারণ দিন, কিন্তু অসমবাসীর কাছে এ দিনটি হয়ে উঠেছে ইতিহাসের এক অংশ। কারণ, এই দিনেই মুক্তি পেয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা জুবিন গর্গের শেষ ছবি ‘রই রই বিনালে’। মৃত্যুর পর তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অজস্র শোক, অগণিত স্মৃতি, আর সেই সঙ্গে এক অভূতপূর্ব ভালোবাসার স্রোত। সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই গোটা অসম যেন ভেসে যাচ্ছে আবেগের বন্যায়।


অমর শিল্পীর শেষ উপস্থিতি

জুবিন গর্গ— এই নামটাই যেন এক আবেগ, এক ইতিহাস। ‘ইয়া আলি’, ‘ময়না’, ‘চলতে চলতে’ কিংবা ‘দিল তু হি বাতা’র মতো গান আজও লক্ষ মানুষের কণ্ঠে বেঁচে আছে। কিন্তু ‘রই রই বিনালে’ তাঁর জন্য এক বিশেষ অধ্যায়, কারণ এটি ছিল তাঁর শেষ চলচ্চিত্র প্রকল্প। পরিচালক রাজেশ ভুঁইয়া এই ছবিকে শুধু এক সিনেমা হিসেবে নয়, বরং এক শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে তৈরি করেছিলেন জুবিনের প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে।

ছবিতে জুবিন অভিনয় করেছেন এক অন্ধ সংগীতশিল্পীর ভূমিকায়, যার জীবন লড়াই, দুঃখ, প্রেম ও সঙ্গীতের নিরন্তর সাধনায় ভরা। বাস্তব জীবনের মতোই পর্দার জুবিনও লড়েছেন অন্ধকারের বিরুদ্ধে, আর সেই লড়াইয়ে তাঁর সুরই হয়েছে আলোর উৎস।


অশ্রু আর করতালির মেলবন্ধন

মুক্তির দিন থেকেই অসমজুড়ে এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা গেছে। প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহের সামনে বিশাল ভিড়, দর্শকদের হাতে ফুল, মালা, ছবিতে জুবিনের প্রতিকৃতি— যেন কোনো সিনেমা নয়, এক পূজার আসর।
গুয়াহাটির প্রেক্ষাগৃহ ‘অনুরাধা সিনেমা’-তে প্রথম দিনের প্রথম শোতে দেখা যায়, দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে সম্মান জানাচ্ছেন। অনেকেই চোখ মুছছেন, কেউবা নীরবে প্রার্থনা করছেন। ছবির শেষ দৃশ্যে যখন পর্দায় জুবিনের হাসি ভেসে ওঠে, তখন গোটা হল জুড়ে বাজে করতালির ঝড়, আর সেই মুহূর্তে সত্যিই বোঝা যায়— শিল্পী কখনো মরেন না।


অপ্রত্যাশিত সাফল্য ও ব্যবসায়িক রেকর্ড

মাত্র ৫ কোটি টাকার বাজেটে নির্মিত এই ছবিটি মুক্তির পর দুই সপ্তাহেই প্রায় ১৮ কোটি টাকা আয় করে ফেলেছে। স্যাকনিল্ক-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট সংগ্রহ ১৭.৯৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৫.৪৭ কোটি এসেছে শুধুমাত্র ভারত থেকে।
মুক্তির প্রথম দিনেই ছবিটি ১.৫ কোটি টাকা ব্যবসা করেছে, যা অসমিয়া সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।
এমনকি কলকাতা, বেঙ্গালুরু, দিল্লি ও মুম্বাইতেও অসমিয়া প্রবাসীদের মধ্যে ছবিটি নিয়ে উৎসাহ চোখে পড়ার মতো।

এই সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ভালোবাসা, আবেগ এবং স্মৃতির শক্তি কতটা গভীর হতে পারে। বাণিজ্যিক পরিসরে এই ছবির এমন সাফল্য অসমিয়া চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যতের জন্যও এক আশার আলো।


গানেই বেঁচে থাকবেন জুবিন

জুবিন শুধু অভিনয়ই করেননি, ছবির ১১টি গানও গেয়েছেন নিজে। প্রতিটি গানে তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়েছে জীবনের বেদনা ও ভালোবাসার গভীরতা।
‘রই রই বিনালে’ গানটির কথাগুলো যেন আজ আরও গভীর অর্থ বহন করছে—

“রই রই বিনালে, মোর হৃদয়ত তুমি…”
এই গানের প্রতিটি শব্দ যেন আজ শ্রোতার হৃদয়ে এক অমর প্রতিধ্বনি।

সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন জুবিনের ঘনিষ্ঠ সহচররা, যারা জানিয়েছেন— এই প্রকল্প ছিল জুবিনের কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত। তিনি চেয়েছিলেন, এই ছবির গানগুলো যেন তরুণ শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। মৃত্যুর পর সেই ইচ্ছাই যেন বাস্তব রূপ নিয়েছে।


অসম সরকারের উদ্যোগ: শিল্পীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা

অসম সরকার ঘোষণা করেছে, ‘রই রই বিনালে’ ছবিটি থেকে যে পরিমাণ জিএসটি রাজস্ব আসবে, তা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হবে জুবিনের প্রতিষ্ঠিত ‘কলাগুরু আর্টিস্ট ফাউন্ডেশন’-এর তহবিলে
এই ফাউন্ডেশন বহু বছর ধরে সমাজের অবহেলিত, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিল্পীদের কল্যাণে কাজ করছে।
সরকারি এই সিদ্ধান্তে শিল্পমহল ও সাধারণ মানুষ উভয়েই প্রশংসা করেছেন। অনেকেই বলছেন, এটি জুবিনের উত্তরাধিকারের প্রতি এক প্রকৃত শ্রদ্ধার প্রকাশ।


দর্শকের চোখে জুবিন: আবেগ ও উত্তরাধিকার

অসমের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর— সর্বত্রই মানুষ জুবিনকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো ভালোবাসেন। মুক্তির দিন থেকে শুরু করে আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে গেছে অসংখ্য পোস্ট, ভিডিও ও স্মৃতিচারণে। কেউ লিখেছেন,

“জুবিনের গান আমাদের শৈশবের সঙ্গী ছিল, আজ তাঁর ছবিতে যেন সেই শৈশব ফিরেছে।”

অন্য কেউ বলেছেন,

“তিনি শুধু গায়ক ছিলেন না, ছিলেন এক সংস্কৃতি।”

গুয়াহাটির এক কলেজ শিক্ষার্থী জানান, “ছবির শেষে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে জুবিন দাকে অভিবাদন জানিয়েছি। মনে হচ্ছিল, উনি ঠিক সামনেই আছেন।”
এমন অসংখ্য অভিব্যক্তি প্রমাণ করছে— মৃত্যু কখনও শিল্পীকে নিঃশেষ করতে পারে না, বরং তাঁর সৃষ্টি তাঁকে চিরঞ্জীব করে তোলে।


‘রই রই বিনালে’-এর গল্পে জীবন ও সুরের মেলবন্ধন

ছবির কাহিনিতে দেখা যায়, এক অন্ধ যুবক সংগীতশিল্পী— যার পৃথিবী শুধুই সুর ও অনুভূতির। সমাজের অবহেলা, ভালোবাসার হারানো সম্পর্ক, এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও সে কখনো সঙ্গীত ছাড়ে না।
এই চরিত্রের মাধ্যমে পরিচালক যেন জুবিনের নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন।
জুবিনের অভিনয় ছিল স্বাভাবিক, মৃদু অথচ গভীর। তাঁর চোখে আলো না থাকলেও মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠের আবেগ, আর শরীরের ভাষা— সবকিছুই যেন জীবনের সুরে বাঁধা।

সমালোচকদের মতে, এই চরিত্রে অভিনয় করে জুবিন তাঁর শিল্পীসত্তার এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন। তাঁর উপস্থিতি যেন পুরো ছবিটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।

news image
আরও খবর

অসমিয়া চলচ্চিত্র শিল্পের নবজাগরণ

‘রই রই বিনালে’-এর অপ্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য অসমিয়া সিনেমার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে আঞ্চলিক চলচ্চিত্র শিল্প নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল— বাজেট, দর্শকসংখ্যা, প্রেক্ষাগৃহের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি। কিন্তু এই ছবির সাফল্য প্রমাণ করেছে যে, যদি কন্টেন্ট ভালো হয় এবং আবেগ সঠিকভাবে ছোঁয়া যায়, তবে আঞ্চলিক চলচ্চিত্রও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে পারে।

অসম ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রণজিৎ কাকতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন,

“জুবিন গর্গ শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি অসমের আত্মা। তাঁর শেষ ছবি আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুন দিশা দেখিয়েছে।”


প্রবাসী অসমিয়াদের প্রতিক্রিয়া

দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু এমনকি বিদেশেও বসবাসকারী অসমিয়ারা বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করেছেন জুবিনের স্মরণে। লন্ডন ও নিউ ইয়র্কে প্রবাসী সম্প্রদায় নিজেদের উদ্যোগে ছবিটি প্রদর্শন করেছে।
প্রবাসী তরুণ তন্ময় ডেকা বলেন,

“আমরা সবাই মিলে ছবিটি দেখেছি, শেষে মোমবাতি জ্বালিয়ে জুবিন দার জন্য প্রার্থনা করেছি। মনে হয়েছে, তিনি আমাদের সবার সঙ্গে আছেন।”


পরিচালক রাজেশ ভুঁইয়া ও গরিমা গর্গের ভূমিকা

পরিচালক রাজেশ ভুঁইয়া এই ছবিটি বানানোর সময় জুবিনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর মতে,

“এই ছবি জুবিন দার জীবনের প্রতিফলন। তিনি নিজেই প্রতিটি দৃশ্যে প্রাণ দিয়েছেন।”

জুবিনের স্ত্রী গরিমা গর্গ, যিনি ছবিটির সহপ্রযোজকও, বলেন,

“এই ছবিটি জুবিনের আত্মার অংশ। তাঁর স্বপ্ন ছিল এই গল্পটি বড় পর্দায় তুলে ধরা। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে, সেটাই আমার তৃপ্তি।”


সমালোচকদের প্রশংসা

দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সমালোচক ছবিটিকে প্রশংসায় ভরিয়েছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে—

“রই রই বিনালে এমন এক সিনেমা, যা শিল্পীর মৃত্যুর পরও তাঁর আত্মাকে জীবন্ত করে রাখে।”

অসমের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন প্রত্যহিকী লেখে—

“এই ছবি অসমের সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি শুধু সিনেমা নয়, এক আবেগের ইতিহাস।”


চলচ্চিত্রের নামের তাৎপর্য

‘রই রই বিনালে’ শব্দবন্ধটি অসমিয়া ভাষায় অর্থাৎ “রয়েই যাও, থেকো তুমি।”
নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে পুরো ছবির মূল বার্তা— শিল্পী চলে গেলেও তাঁর সুর, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর স্মৃতি থেকে যায়।
এই নামটিই আজ যেন অসমবাসীর হৃদয়ের এক যৌথ প্রার্থনা— “রই রই বিনালে, জুবিন।”


উপসংহার: মৃত্যুর পরও জীবন্ত এক কিংবদন্তি

জুবিন গর্গ কেবল একজন গায়ক বা অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন অসমের আত্মার প্রতীক। তাঁর কণ্ঠে ছিল নদীর স্রোত, পাহাড়ের নীরবতা, আর মানুষের প্রাণের সুর।
‘রই রই বিনালে’-এর মাধ্যমে তিনি যেন নিজেই বলে গিয়েছেন—

“আমি যাচ্ছি না, আমি রয়েই যাচ্ছি আমার সঙ্গীতে, তোমাদের হৃদয়ে।”

অসমজুড়ে এই আবেগের জোয়ার প্রমাণ করেছে, মৃত্যুর সীমারেখা শিল্পীর কাছে তুচ্ছ।
জুবিন গর্গ বেঁচে থাকবেন তাঁর গানে, তাঁর সুরে, তাঁর সেই অমলিন হাসিতে।
আর ‘রই রই বিনালে’ হয়ে থাকবে এক চিরকালীন স্মারক—
এক শিল্পীর জীবনের শেষ পর্ব, কিন্তু এক জাতির ভালোবাসার অনন্ত শুরু।

Preview image