সৃজিত মুখোপাধ্যায় থেকে নন্দিতা রায় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় প্রথম সারির পরিচালকদের আস্থার জায়গা এখন কৌশানী মুখোপাধ্যায়। অভিনয়ের দ্বিতীয় ইনিংস, বনির সঙ্গে সম্পর্ক, পারিশ্রমিক আর জীবনের ওঠা পড়া নিয়ে খোলামেলা কথায় ধরা দিলেন নায়িকা।
কৌশানী মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় ইনিংস: সময়, সাফল্য আর আত্মবিশ্বাসের গল্প
২০২৪ সাল থেকে তাঁর অভিনয়জীবন যেন নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের পথচলার পরে আজ তিনি আরও পরিণত, আরও স্থির এবং নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন। কৌশানী মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট জানালেন—হ্যাঁ, এটা তাঁর অভিনয়জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস। এমন এক সময়, যা তিনি উপভোগ করছেন প্রাণভরে।
অভিনয়জগতের প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন থাকে এমন একটা সময়ের, যখন কাজ নিজে থেকে আসে, পরিচালকরা ভরসা রাখেন, আর দর্শক অপেক্ষা করেন নতুন চরিত্রে তাঁকে দেখার জন্য। কৌশানীর কথায়, তিনি চান প্রমাণ হোক—তিনি ‘লম্বা রেসের ঘোড়া’। অর্থাৎ, ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যই তাঁর লক্ষ্য।
সাফল্য বনাম ব্যর্থতা: দুটোই সমান প্রয়োজনীয়
দশ বছরের কেরিয়ারে গত দু’বছর তাঁকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা। কিন্তু এই সোনালি সময়ে পৌঁছতে কী কী শর্ত পূরণ করতে হয়? টোটকা, জ্যোতিষ, ভাগ্য—এসব কি ভূমিকা রাখে?
কৌশানীর উত্তর অত্যন্ত পরিণত। তিনি বিশ্বাস করেন—সবার যাত্রাপথ এক নয়। সাফল্যের মতো ব্যর্থতাও জরুরি। এমন সময়ও আসা দরকার, যখন আপনাকে নিয়ে চর্চা হবে না, মাতামাতি হবে না। সেই সময়ই মানুষ ধৈর্য শেখে।
তিনি খোলাখুলি স্বীকার করেছেন—চুনি পাথরও পরেছিলেন ভাগ্য ফেরানোর আশায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝেছেন, সময় না এলে সাফল্য আসে না। তাঁর মতে, ৭৫ শতাংশ নির্ভর করে ভাগ্যের উপর, আর বাকিটা পরিশ্রমের। তবে ধারাবাহিক পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাপ্য এনে দেয়।
এই আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো তাঁকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
টিকে থাকার দর্শন: সংখ্যায় নয়, স্মরণীয়তায়
বনি সেনগুপ্ত এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য এমন কিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন, যেগুলো না করলেও চলত। এই দর্শনে কৌশানী একেবারেই সহমত নন।
তাঁর মতে, বছরে পাঁচটা ছবি করার চেয়ে দুটো এমন ছবি করা ভালো, যেগুলোর জন্য দর্শক পাঁচ বছর পরেও মনে রাখবেন। টিকে থাকার লড়াইয়ে তিনি গুণগত মানে বিশ্বাসী, সংখ্যায় নয়।
এমনকি বনির অনেক ছবির ক্ষেত্রেও তিনি ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন—দর্শক হিসেবে মনে হয়েছে বলে বলেছেন, ‘এই ছবিটা তোমার করা উচিত নয়।’ আবার এখন এমন সময় এসেছে, যখন তিনি বনিকে কিছু কাজ করতে উৎসাহ দেন, আর বনি নিজে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়।
সম্পর্কের ভিত যে কতটা খোলামেলা ও পরিণত, তা এখানেই স্পষ্ট।
‘আদালত ও একটি মেয়ে’: তুলনা নয়, নতুন গল্প
‘আদালত ও একটি মেয়ে’ নাম শুনলেই অনেকের মনে পড়ে তপন সিংহ পরিচালিত বিখ্যাত চলচ্চিত্রটির কথা। সেখানে অভিনয় করেছিলেন কিংবদন্তি তনুজা।
কিন্তু কৌশানী স্পষ্ট জানালেন—নতুন ওয়েব সিরিজ়টি সেই ছবির অনুপ্রেরণায় নয়। এটি সম্পূর্ণ সমসাময়িক গল্প, যেখানে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা, এক নারীর লড়াই এবং সমাজের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। তাই পুরনো ছবির সঙ্গে তুলনা টানাকে তিনি অপ্রাসঙ্গিক মনে করেন।
এই বক্তব্যে বোঝা যায়, তিনি চরিত্র বাছাইয়ে সচেতন এবং বিতর্ক এড়াতে আগেভাগেই অবস্থান পরিষ্কার করেন।
অস্বস্তিকর প্রস্তাব ও ‘না’ বলার সাহস
চলচ্চিত্রজগৎ নিয়ে নানা গুঞ্জন আছে—প্রযোজক-ঘনিষ্ঠ না হলে কাজ পাওয়া কঠিন। পরিবারের কেউ ইন্ডাস্ট্রিতে না থাকলে সমস্যা বাড়ে।
কৌশানীর অভিজ্ঞতা মিশ্র। কেরিয়ারের শুরুতে এমন সমস্যায় পড়েননি, কিন্তু পরে অস্বস্তিকর প্রস্তাব এসেছে। তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন—মুখের উপর ‘না’ বলতে পারেন। তাঁর মতে, প্রত্যেক মেয়ের এমন একটি গণ্ডি টানা উচিত, যা কেউ অতিক্রম করতে না পারে।
তিনি আরও বলেন—একতরফা কিছু হয় না, দু’হাতেই তালি বাজে। এই মন্তব্যে বোঝা যায়, তিনি পরিস্থিতিকে জটিল বাস্তবতায় দেখেন, একপাক্ষিক নয়।
প্রভাবশালী পরিবারের ছায়া: সুবিধা না চাপ?
অনেকের ধারণা, প্রভাবশালী পরিবারের অংশ হলে নিরাপত্তা বেশি পাওয়া যায়। বনির মা পিয়া সেনগুপ্ত টলিউডের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন—এই প্রসঙ্গে কৌশানীর উত্তর স্পষ্ট।
তাঁর মতে, উল্টে সমস্যা বাড়ে। বেশি নজর থাকে, বেশি দায়িত্ব থাকে। প্রতিপত্তি থাকলেই কাজের নিশ্চয়তা আসে না। যদি তা-ই হত, তবে বনির হাতে কাজের অভাব থাকত না।
এই মন্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন—ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকা এখনও ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও পরিশ্রমের উপর নির্ভরশীল।
পারিশ্রমিক: ধীরে ধীরে পরিবর্তন
বলিউডে একটি হিট ছবি বা সিরিজ়ের পর শিল্পীদের পারিশ্রমিক দ্রুত বাড়ে। কিন্তু আঞ্চলিক চলচ্চিত্রে পরিস্থিতি আলাদা।
কৌশানীর ভাষায়, তিনি হয়তো ১০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন, এখন পাচ্ছেন ৩০ টাকা। কিন্তু সেই ১০ টাকা নিয়েই পাঁচ বছর কাজ করেছেন। পরিবর্তন এসেছে পরের পাঁচ বছরে।
এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন—বৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু তা রাতারাতি নয়। ধারাবাহিক কাজ, দর্শকের গ্রহণযোগ্যতা এবং সময়—এই তিনে মিলেই পরিবর্তন এসেছে।
বলিউড ও অডিশন: শূন্য থেকে শুরু করতে প্রস্তুত
হিন্দিতে কাজের প্রসঙ্গে তিনি দ্বিধাহীন। মুম্বইয়ে অডিশন দিতে তাঁর কোনও সঙ্কোচ নেই। তিনি আগেও অডিশন দিয়েছেন, ভবিষ্যতেও দেবেন।
‘খাকি: দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার’ সিরিজ়ে একটি চরিত্রের জন্য তিনি অডিশন দিয়েছিলেন, কিন্তু নির্বাচিত হননি। Khakee: The Bengal Chapter-এ সুযোগ না পাওয়াকে তিনি স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন।
এই মনোভাবই প্রমাণ করে—তিনি ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন না, বরং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখেন।
রাজনীতি: আপাতত বিরতি
কয়েক বছর আগে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন কৌশানী। কিন্তু এখন তিনি স্পষ্ট জানালেন—অভিনয়ের সঙ্গে আপোস করতে চান না। রাজনীতি আলাদা দায়িত্বের জায়গা। যেদিন মানসিকভাবে পুরোপুরি সময় দিতে পারবেন, সেদিনই ভাববেন।
এখন তাঁর সমস্ত মনোযোগ অভিনয়ে। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও বিয়ে নিয়ে ভাবার সময় নেই। তাঁর কথায়—তিনি তাঁর কাজের সঙ্গেই বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন, আর বনি তাঁদের ‘সন্তান’।
এই মন্তব্যে তাঁর রসিকতা যেমন ধরা পড়ে, তেমনই কাজের প্রতি নিবেদনও স্পষ্ট।
সম্পর্ক: ওঠা–পড়ায় অটুট
কর্মক্ষেত্রে সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্ককে প্রভাবিত করে কি? কৌশানীর মতে, বাড়িতে তাঁরা অভিনেতা নন। সিনেমার জন্য বনিকে বেছে নেননি।
খারাপ সময়ে বনিকে বলেছেন তাঁর হয়ে কথা বলতে। এখনও প্রয়োজনে বলবেন। দুটি ছবি খারাপ চললে সম্পর্ক বদলে যায় না।
বন্ধু বা সঙ্গী হলে একে অপরকে ভালো রাখার চেষ্টা করতে হয়—এই বিশ্বাসেই তাঁরা এগোন।
দ্বিতীয় ইনিংসের সারমর্ম
এই দীর্ঘ আলাপচারিতায় যে কৌশানী মুখোপাধ্যায়কে পাওয়া গেল, তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, বাস্তববাদী এবং সংযত। ভাগ্যকে মানেন, কিন্তু পরিশ্রমকে অস্বীকার করেন না। সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন, কিন্তু পেশাদারিত্বে আপস করেন না। সুযোগ হারান, তবু হতাশ হন না।
দ্বিতীয় ইনিংস মানে শুধু নতুন কাজ নয়—নতুন মানসিকতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। সাফল্যের ঝলকানি যেমন আছে, তেমনই আছে আত্মসমালোচনা। এই ভারসাম্যই হয়তো তাঁকে দীর্ঘ পথ চলার শক্তি দিচ্ছে।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তাঁর এই সময়টা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেই বলেছেন—সময়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখতে চান। সেই সময় কতটা দীর্ঘ হয়, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে আপাতত তিনি প্রস্তুত—লম্বা রেসের জন্য।
সময়ের সঙ্গে লড়াই: আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসা
গত দু’বছরে যে ভাবে ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারির পরিচালকরা তাঁর উপর ভরসা রাখতে শুরু করেছেন, তা নিছক কাকতালীয় নয়। মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি কনটেন্ট-ভিত্তিক কাজেও তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। এক সময় যাঁকে শুধুই গ্ল্যামারাস চরিত্রে দেখা যেত, এখন তিনি স্ক্রিপ্ট পড়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, চরিত্রের গ্রাফ বিশ্লেষণ করছেন, এমনকি পরিচালককে প্রশ্নও করছেন।
এই বদলটা হঠাৎ হয়নি। কৌশানীর মতে, একটা সময় ছিল যখন তিনি শুধু কাজ করতে চেয়েছেন—ভালো-মন্দ বিচার না করেই। কারণ, ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার চাপ ছিল। কিন্তু এখন তিনি বুঝেছেন, প্রতিটা কাজই ভবিষ্যতের পরিচয়পত্র। তাই সিদ্ধান্তও নিতে হচ্ছে ভেবেচিন্তে।
তিনি বলেন, “আগে ভাবতাম সুযোগ এসেছে, মানে করতেই হবে। এখন ভাবি—এটা আমার যাত্রাপথে কী যোগ করবে?” এই প্রশ্নটাই তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের মূল চাবিকাঠি।
দর্শকের বদল, অভিনেত্রীর বদল
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান, দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং বিষয়ভিত্তিক গল্পের চাহিদা—সব মিলিয়ে বাংলা বিনোদন জগতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পেরেছেন বলেই কৌশানীর কেরিয়ারে এই উত্থান।
তিনি বুঝেছেন, এখন শুধুই নাচ-গান বা রোম্যান্টিক দৃশ্য দিয়ে দর্শককে ধরে রাখা যায় না। চরিত্রে গভীরতা চাই, অভিনয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা চাই। সেই জায়গায় পৌঁছতে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছেন নিয়মিত—ওয়ার্কশপ, স্ক্রিপ্ট রিডিং, ভাষা চর্চা, শরীরচর্চা—সব কিছুতেই গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব
অভিনয়জীবনের চড়াই-উতরাই মানসিকভাবে ভীষণ চাপ তৈরি করে। কৌশানী স্বীকার করেন, এমন সময় গেছে যখন কাজের অভাব, সমালোচনা, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোল—সব মিলিয়ে নিজেকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে শিখেছেন নিজেকে আলাদা রাখতে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রশংসা যেমন মাথায় তোলেন না, তেমনই সমালোচনাও একেবারে ব্যক্তিগতভাবে নেন না। তাঁর মতে, মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা না গেলে দীর্ঘ দৌড়ে টিকে থাকা যায় না।
এই উপলব্ধিই তাঁকে আরও স্থির করেছে।
প্রেম ও পেশার ভারসাম্য
বনি সেনগুপ্ত-র সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহুদিনের। কিন্তু দু’জনেই একই পেশায় থাকার কারণে তুলনা, প্রতিযোগিতা বা আলোচনা—সব কিছুই স্বাভাবিক।
কৌশানীর কথায়, তাঁদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হল বন্ধুত্ব। পেশাগত ব্যর্থতা নিয়ে বাড়িতে বসে আলোচনা হলেও, সেটা কখনও ব্যক্তিগত আঘাতে পরিণত হয় না। বরং তাঁরা একে অপরকে সমর্থন করেন।
তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নেই, আছে অনুপ্রেরণা।” এই মনোভাবই হয়তো তাঁদের সম্পর্ককে স্থায়ী করেছে।
নারীর অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান
কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা নিয়ে কাজ করার প্রসঙ্গে তিনি যে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন, তা নিছক অভিনয় নয়—ব্যক্তিগত বিশ্বাসও। তিনি মনে করেন, এখন সময় এসেছে মেয়েদের আরও স্পষ্ট, আরও শক্তিশালী হওয়ার।
ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে গেলে অনেক সময় আপসের চাপ আসে। কিন্তু তিনি মনে করেন, ‘না’ বলতে শেখা জরুরি। এই অবস্থান নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।
পারিবারিক সমর্থন
পরিবারের কেউ ইন্ডাস্ট্রিতে না থাকলেও, পরিবার সবসময় তাঁর পাশে ছিল। কৌশানী বলেন, “আমার পরিবার কখনও বলেনি, এটা করো না বা ওটা করো না। বরং সবসময় বলেছে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নাও।”
এই স্বাধীনতাই তাঁকে নিজের ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিয়েছে। আর সেই শিক্ষা আজ তাঁর পরিণত ভাবনায় প্রতিফলিত।
ব্যর্থতার শিক্ষা
তিনি একাধিকবার বলেছেন—ব্যর্থতা তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। কোনও ছবি চলেনি, সমালোচনা হয়েছে, সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে—এসবই তাঁকে ভিতর থেকে শক্ত করেছে।
‘খাকি: দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার’-এর অডিশনে বাদ পড়া তাঁর কাছে হতাশার হলেও, তিনি সেটাকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেননি। বরং বুঝেছেন—প্রতিযোগিতা বড়, সুযোগ সীমিত। তাই প্রস্তুতিও ততটাই বড় হওয়া দরকার।
কাজের প্রতি নিবেদন
বর্তমানে তাঁর ক্যালেন্ডার ভর্তি। এই বছরে তাঁর আর কোনও ‘ডেট’ খালি নেই। কিন্তু তবু তিনি প্রতিটি প্রজেক্টে নতুনের মতোই উত্তেজিত থাকেন।
তিনি মনে করেন, প্রতিটা চরিত্রই নতুন পরীক্ষা। আগের সাফল্য পরের কাজের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই প্রতিবারই নতুন করে প্রমাণ করতে হয়।
এই মানসিকতাই তাঁকে দ্বিতীয় ইনিংসে এগিয়ে রাখছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
হিন্দি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও, তিনি তাড়াহুড়ো করতে চান না। মুম্বইয়ে গিয়ে শূন্য থেকে শুরু করতে তিনি প্রস্তুত, কিন্তু সেটা যেন সঠিক সময়ে হয়—এই কামনা।
একই সঙ্গে তিনি চান, বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতেও আরও শক্তিশালী কনটেন্ট তৈরি হোক। আঞ্চলিক ভাষার কাজ আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছাক—এটাই তাঁর স্বপ্ন।
ব্যক্তিগত জীবন: বিয়ে এখন নয়
বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, তিনি আপাতত সে দিকে মন দিচ্ছেন না। তাঁর মতে, এখন তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার কাজ।
রসিকতার সুরে বললেও, কথার ভিতরে স্পষ্ট বার্তা—তিনি নিজের কেরিয়ার গড়ার সময়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আত্মবিশ্বাসের নতুন সংজ্ঞা
আগে হয়তো তিনি নিজেকে প্রমাণ করার তাড়নায় ছিলেন। এখন তিনি জানেন, তাঁর জায়গা কোথায়। এই আত্মবিশ্বাস অহংকার নয়, বরং আত্মসম্মান।
তিনি জানেন, সব কাজ তাঁর জন্য নয়। সব সুযোগও গ্রহণ করতে হবে না। এই বাছাই করার ক্ষমতাই তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের আসল শক্তি।
দীর্ঘ পথের প্রস্তুতি
বাংলা চলচ্চিত্র জগতে প্রতিযোগিতা কম নয়। নতুন মুখ আসছে, দর্শকের রুচি বদলাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে গেলে ক্রমাগত নিজেকে বদলাতে হয়।
কৌশানী সেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। শারীরিক ফিটনেস থেকে অভিনয়ের দক্ষতা—সব ক্ষেত্রেই তিনি আপডেট থাকতে চান।
উপসংহার: সময়কে আঁকড়ে ধরার লড়াই
দ্বিতীয় ইনিংস মানে শুধুই নতুন সুযোগ নয়—নতুন দায়িত্বও। দর্শকের প্রত্যাশা বেড়েছে, পরিচালকদের আস্থা বেড়েছে, সমালোচনার নজরও বেড়েছে।
এই সব কিছুর মাঝেও কৌশানী মুখোপাধ্যায় স্থির। তিনি জানেন, সময় চিরস্থায়ী নয়। তাই সময়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখতে চান।
ভাগ্য, পরিশ্রম, সম্পর্ক, আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে তিনি এখন এক নতুন অধ্যায়ে। সামনে পথ দীর্ঘ। আর তিনি প্রস্তুত—লম্বা রেসের ঘোড়া হয়ে সেই পথ পেরোতে।