পার্শ্বকোণাসনের একাধিক ভঙ্গিমা রয়েছে। শুরুতে সহজ পদ্ধতিতেই অভ্যাস করা যেতে পারে। নিয়মিত সকালে এই আসন করলে সারা শরীরের ভালো স্ট্রেচিং হয়, পাশাপাশি পিঠ, কোমর ও পায়ের ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে।
দেহের অন্যান্য অংশের তুলনায় পেটের মেদ ঝরানো নিঃসন্দেহে অনেক বেশি কঠিন একটি কাজ। নিয়মিত জিমে গিয়ে ঘাম ঝরালেও বা দীর্ঘদিন শরীরচর্চা করলেও অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, হাত-পা, মুখ কিংবা শরীরের অন্যান্য অংশের মেদ কিছুটা কমলেও পেটের মেদ একেবারেই নাছোড়বান্দা হয়ে রয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে হতাশা গ্রাস করে। অনেকে মাঝপথেই শরীরচর্চা ছেড়ে দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেটের মেদ কমানোর জন্য শুধু ব্যায়াম বা শুধু ডায়েট—এই দু’টির যে কোনও একটি অনুসরণ করলেই হবে না। প্রয়োজন সঠিক ডায়েটের পাশাপাশি নিয়মিত ও সুনির্দিষ্ট শরীরচর্চা। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ত জীবনে জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফলে এমন একটি সহজ, ঘরে বসে করা যায় এমন পদ্ধতির খোঁজ করেন সকলে, যা কম সময়ে কার্যকর ফল দিতে পারে।
এই জায়গাতেই যোগাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। যোগাসনের বিভিন্ন ভঙ্গি শুধু শরীরের মেদ ঝরাতে সাহায্য করে না, পাশাপাশি শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। নিয়মিত যোগাভ্যাসে যেমন ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে, তেমনই একাধিক শারীরিক সমস্যারও উপশম হয়। পেটের মেদ কমাতে যে যোগাসনগুলি বিশেষ ভাবে কার্যকর, তার মধ্যে অন্যতম হল পার্শ্বকোণাসন।
পেটের মেদ জমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অনিয়মিত জীবনযাপন, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস—সব মিলিয়েই পেটের চারপাশে মেদ জমতে থাকে।
বিশেষ করে বর্তমানে অফিসের কাজের ধরন বদলেছে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করতে হয়। আবার অনেকের পেশায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার প্রয়োজন পড়ে। এর ফলে শরীরের নড়াচড়া কমে যায়, পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে কোমর ও পেটের অংশে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে।
চিকিৎসকদের মতে, পেটের মেদ শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয়, এটি স্বাস্থ্যের পক্ষেও বিপজ্জনক। পেটের অতিরিক্ত মেদ থেকে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের মতো নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই পেটের মেদ কমানো শুধু ফিট দেখানোর জন্য নয়, সুস্থ থাকার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
যোগাসন এমন একটি প্রাচীন অনুশীলন পদ্ধতি, যা শরীরের প্রতিটি অংশকে সক্রিয় করে তোলে। নিয়মিত যোগাভ্যাসে পেশি নমনীয় হয়, রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং হজমশক্তি উন্নত হয়। বিশেষ করে পেট ও কোমরের অংশে জমে থাকা চর্বি ঝরাতে যোগাসনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
পার্শ্বকোণাসন এমন একটি যোগাসন, যা একসঙ্গে শরীরের একাধিক অংশে কাজ করে। এই আসন করলে পেট, কোমর, ঊরু, হাঁটু ও পায়ের পেশিগুলি সক্রিয় হয়। পাশাপাশি মেরুদণ্ড প্রসারিত হয়, ফলে পিঠ ও কোমরের ব্যথা কমতে সাহায্য করে।
বর্তমানে কম বয়সিদের মধ্যেও কোমর ও পিঠের ব্যথার সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় একটানা বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করার ফলে অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। কারও ক্ষেত্রে হাঁটতে-বসতে অসুবিধা হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে কাজের মাঝেই ব্যথা বাড়তে থাকে। এই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে পার্শ্বকোণাসন অত্যন্ত উপকারী।
পার্শ্বকোণাসন নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীরের একাধিক উপকার পাওয়া যায়। যেমন—
পেট ও কোমরের জমে থাকা মেদ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে
পিঠ, কোমর ও হাঁটুর ব্যথা কমে
হাত ও পায়ের পেশি শক্তিশালী হয়
শরীরের গড়ন সুন্দর ও সুগঠিত হয়
শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে
হজমশক্তি উন্নত হয়
গ্যাস, অম্বল ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সকালে খালি পেটে এই আসন অভ্যাস করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
পার্শ্বকোণাসনের একাধিক ভঙ্গি রয়েছে। নতুনদের ক্ষেত্রে সব ভঙ্গি একসঙ্গে অভ্যাস করা প্রয়োজন নেই। শুরুতে সহজ ভঙ্গি দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে অভ্যাস বাড়ানো উচিত। শরীর যত নমনীয় হবে, ততই উন্নত ভঙ্গি আয়ত্তে আসবে।
এই আসনটি করার সময় শরীরের ভঙ্গির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। ধাপে ধাপে কী ভাবে করবেন, তা নিচে দেওয়া হল—
১) প্রথমে একটি যোগা ম্যাটের উপর সোজা হয়ে দাঁড়ান। দুই পায়ের মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান রাখুন।
২) এবার ডান পা ৯০ ডিগ্রি কোণে মুড়ুন। বাঁ পা সামান্য প্রসারিত অবস্থায় থাকবে।
৩) ডান হাঁটু সামান্য ভাঁজ করুন এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখুন।
৪) ডান হাতটি ডান পায়ের হাঁটুর উপর রাখুন বা মেঝেতে ছোঁয়ানোর চেষ্টা করুন।
৫) এবার বাঁ হাতটি মাথার উপর দিয়ে প্রসারিত করুন। হাতটি যেন কানের পাশ দিয়ে যায়, সে দিকে খেয়াল রাখুন।
৬) দৃষ্টি সামনের দিকে বা উপরের দিকে রাখুন। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখুন।
৭) এই ভঙ্গিতে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড স্থির থাকুন।
৮) ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন।
৯) এবার পা বদলে একই ভাবে আসনটি আবারও অভ্যাস করুন।
শুরুর দিকে ভারসাম্য রাখতে সমস্যা হলে দেয়ালের সাহায্য নিতে পারেন।
নতুনদের ক্ষেত্রে দিনে ২ থেকে ৩ বার এই আসনটি করাই যথেষ্ট। ধীরে ধীরে অভ্যাস বাড়িয়ে ৫ থেকে ৬ বার পর্যন্ত করা যেতে পারে। প্রতিবার ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে রাখার চেষ্টা করুন। শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী সময় বাড়ানো যেতে পারে।
নিয়মিত পার্শ্বকোণাসন অভ্যাস করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শরীরে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। প্রথমে শরীরের জড়তা কমবে, পেশি নমনীয় হবে। এরপর ধীরে ধীরে পেট ও কোমরের মেদ কমতে শুরু করবে। পাশাপাশি কোমর ও পিঠের ব্যথা অনেকটাই কমে যাবে।
যাঁরা দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আসনটি বিশেষ উপকারী। অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরকে সতেজ করতেও এই যোগাসন কার্যকর ভূমিকা নেয়।
যদিও পার্শ্বকোণাসন একটি নিরাপদ যোগাসন, তবুও কিছু ক্ষেত্রে এটি করা থেকে বিরত থাকা উচিত—
পিঠে গুরুতর আঘাত লাগলে
সম্প্রতি কোনও অস্ত্রোপচার হলে
হাঁটু প্রতিস্থাপন বা হাঁটুর অস্ত্রোপচার হলে
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় প্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া
এই ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসক বা যোগ প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে তবেই আসনটি অভ্যাস করা উচিত।
পেটের মেদ কমানো নিঃসন্দেহে একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, তবে তা একেবারেই অসম্ভব নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা ও যোগাসন অভ্যাস করলে ধীরে ধীরে শরীরে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে পেটের চারপাশে জমে থাকা মেদ কমাতে যোগাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে যোগাভ্যাস করলে শুধু ওজনই নিয়ন্ত্রণে থাকে না, শরীরের পেশিগুলিও শক্ত ও নমনীয় হয়ে ওঠে।
এই প্রসঙ্গে পার্শ্বকোণাসন একটি সহজ অথচ অত্যন্ত কার্যকর যোগাসন। নিয়মিত এই আসন অভ্যাস করলে পেট ও কোমরের মেদ কমতে শুরু করে এবং পিঠ ও কোমরের ব্যথা থেকেও ধীরে ধীরে মুক্তি পাওয়া যায়। দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করার ফলে যে সব মানুষ কোমর ও পিঠের ব্যথায় ভোগেন, তাঁদের জন্য এই আসন বিশেষ উপকারী। পাশাপাশি এটি শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং হজমশক্তি উন্নত করতেও সহায়ক।
নতুন বছরের আগেই নিজেকে আরও ফিট ও সুস্থ দেখতে চাইলে এখনই দৈনন্দিন রুটিনে পার্শ্বকোণাসন যোগ করা জরুরি। নিয়ম মেনে, ধৈর্য ধরে এবং নিজের শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী এই যোগাসন অভ্যাস করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব। সুস্থ শরীর ও সতেজ মনে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আজ থেকেই শুরু করুন।