কিছু খাবার স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী হলেও, ত্বকের ক্ষেত্রে সেগুলি সব সময় নিরাপদ নয়। অনেকের শরীরে এই খাবারগুলি হরমোনের ভারসাম্য বা ত্বকের তেল নিঃসরণে প্রভাব ফেলে ব্রণের সমস্যা বাড়াতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের খাবারকে অ্যাকনে ট্রিগার বলা হয়, যা ব্যক্তিভেদে ভিন্নভাবে কাজ করে।
শরীর ভালো রাখতে আমরা অনেক সময় এমন কিছু খাবার নিয়মিত খাই, যেগুলিকে সাধারণভাবে ‘স্বাস্থ্যকর’ বলেই মনে করা হয়। দুধ, ফল, প্রোটিন, বীজ, ডার্ক চকোলেট—এসব খাবার পুষ্টিগুণে ভরপুর, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ত্বকের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি সব সময় এতটা সরল নয়। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নিয়ম মেনে হেলদি খাবার খাওয়ার পরেও মুখে ব্রণের সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব খাবার সব শরীরের জন্য সমানভাবে উপযোগী হয় না। শরীরের মতো ত্বকেরও একটি নিজস্ব চরিত্র বা প্রকৃতি রয়েছে। কিছু খাবারে থাকা নির্দিষ্ট উপাদান, হরমোন বা রাসায়নিক যৌগ কারও কারও ত্বকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের খাবারকে অনেক সময় ‘অ্যাকনে ট্রিগার’ বলা হয়।
বেঙ্গালুরু নিবাসী ত্বকের চিকিৎসক নীরা নাথন সম্প্রতি তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, ‘‘কিছু খাবার স্বাস্থ্যের জন্য নিঃসন্দেহে উপকারী হলেও, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে সেগুলিই ব্রণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিভেদে আলাদা।’’
চলুন দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন তথাকথিত ‘হেলদি’ খাবার ত্বকের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে এবং কেন সেগুলি সাবধানে খাওয়া জরুরি।
প্রথমেই আসে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের কথা। দুধ ক্যালশিয়াম, প্রোটিন এবং ভিটামিনের অন্যতম প্রধান উৎস। ছোটবেলা থেকেই দুধ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে প্রায় সবারই। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে গরুর দুধে থাকা কিছু প্রাকৃতিক হরমোন এবং অ্যামাইনো অ্যাসিড রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে শরীরে ইনসুলিন-লাইক গ্রোথ ফ্যাক্টর বা আইজিএফ-১ নামের হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। এই হরমোন ত্বকের সেবাসিয়াস গ্রন্থিগুলিকে অতিরিক্ত সক্রিয় করে তোলে, যার ফলে ত্বকে তেল উৎপাদন বেড়ে যায়। তেল জমলে লোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, স্কিমড মিল্ক বা ফ্যাট-মুক্ত দুধের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ ফ্যাট কম থাকলেও হরমোনের প্রভাব সেখানে একই রকম থেকে যায়। দই, চিজ, আইসক্রিমের মতো দুগ্ধজাত খাবারও অনেকের ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এর পরের গুরুত্বপূর্ণ খাবার হল হোয়ে প্রোটিন। বর্তমানে জিম, ফিটনেস ও বডি-বিল্ডিংয়ের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে হোয়ে প্রোটিনের ব্যবহারও দ্রুত বেড়েছে। পেশি গঠনে এটি অত্যন্ত কার্যকর হলেও, ত্বকের জন্য এটি সব সময় নিরাপদ নয়। হোয়ে প্রোটিন শরীরে আইজিএফ-১ হরমোনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এই হরমোন ত্বকের তৈলাক্ত গ্রন্থিগুলিকে অতি সক্রিয় করে তোলে, যার ফলে মুখ, বুক বা পিঠে ব্রণ দেখা দিতে পারে।
অনেক তরুণ-তরুণী নিয়মিত প্রোটিন শেক খাওয়ার পর হঠাৎ করেই ত্বকের অবস্থা খারাপ হতে দেখেন। কিন্তু তারা বুঝতেই পারেন না, এর পিছনে প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের ভূমিকা থাকতে পারে। তাই যাঁদের ত্বক ব্রণপ্রবণ, তাঁদের ক্ষেত্রে হোয়ে প্রোটিন নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তৃতীয় যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হল মিষ্টি ফল ও শর্করা বেশি থাকা খাবার। সাধারণভাবে ফলকে ত্বকের জন্য ভালো বলেই ধরা হয়। কিন্তু সব ফল সব ত্বকের জন্য এক রকম উপকারী নয়। পাকা আম, কলা, খেজুরের মতো ফলগুলিতে প্রাকৃতিক শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে। এগুলি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ‘হাই গ্লাইসেমিক রেসপন্স’।
রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে শরীরে প্রদাহজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। এই প্রদাহ ত্বকের উপরও প্রভাব ফেলে এবং ব্রণের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। একই কারণে সাদা ভাত, পাউরুটি, ময়দা দিয়ে তৈরি খাবারও ব্রণপ্রবণ ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এগুলি নিয়মিত ও অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
চতুর্থত, ওমেগা ৬ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে এমন বীজ ও তেলের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণভাবে ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিডকে ত্বকের জন্য খুবই উপকারী বলা হয়। মাছ, আখরোট, তিসির বীজে থাকা ওমেগা ৩ প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু উল্টো দিকে, কিছু উদ্ভিজ্জ তেল ও বীজে ওমেগা ৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে।
সয়াবিন তেল, সূর্যমুখীর তেল, ভুট্টার তেলের মতো তেলগুলি অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। যদি ওমেগা ৩ এবং ওমেগা ৬-এর মধ্যে সঠিক ভারসাম্য না থাকে, তা হলে ত্বকে ব্রণ, লালচে ভাব এবং অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শুধু তেল নয়, কোন ধরনের তেল কতটা খাওয়া হচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
সবশেষে আসে ডার্ক চকোলেট। ডার্ক চকোলেটকে অনেকেই ‘গিল্ট-ফ্রি’ ট্রিট হিসেবে ভাবেন। এতে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট থাকে, যা শরীরের জন্য ভালো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কারও কারও ক্ষেত্রে ডার্ক চকোলেটও ব্রণের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডার্ক চকোলেট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সংবেদনশীল করে তোলে। এর ফলে ত্বকে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে, যা ব্রণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে মনে রাখতে হবে, এই সব খাবারই যে সবার জন্য ক্ষতিকর, তা নয়। বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিভেদে আলাদা। কারও ক্ষেত্রে দুধ বা চকোলেট কোনও সমস্যাই তৈরি করে না, আবার কেউ সামান্য পরিমাণ খেলেই ত্বকে পরিবর্তন দেখতে পান। তাই নিজের ত্বকের ধরন, শরীরের প্রতিক্রিয়া এবং খাবারের প্রভাব ভালোভাবে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শরীরের সংকেতগুলো ঠিকভাবে বুঝে নেওয়া। হঠাৎ করে কোনও নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার পর যদি মুখে বা শরীরের অন্য অংশে ব্রণ বেড়ে যেতে দেখা যায়, তা হলে সেটিকে অবহেলা না করে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় আমরা খাবারকে শুধুই তার পুষ্টিগুণের বিচারে বিচার করি, কিন্তু ভুলে যাই যে প্রতিটি শরীর ও ত্বকের প্রতিক্রিয়া আলাদা হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে সন্দেহজনক খাবারটি অন্তত কয়েক সপ্তাহের জন্য ডায়েট থেকে বাদ দিয়ে দেখা উচিত। এতে ত্বকের অবস্থার কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা সহজেই বোঝা যায়।
পাশাপাশি, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান ত্বকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। জল শরীর থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করে এবং ত্বককে ভেতর থেকে আর্দ্র রাখে। দিনে অন্তত ৮–১০ গ্লাস জল পান করলে ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় থাকে এবং ব্রণের প্রবণতা অনেকাংশে কমে। শুধু জল নয়, সুষম খাদ্যাভ্যাসও ত্বকের স্বাস্থ্যের একটি বড় ভিত্তি। ডায়েটে শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, ফল, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সঠিক সমন্বয় থাকলে ত্বক তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।
ত্বকের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়মিততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন মুখ পরিষ্কার রাখা, নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী ক্লিনজার ও ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনে সানস্ক্রিন লাগানো ত্বকের সুরক্ষায় সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহার বা অকারণে নতুন নতুন প্রোডাক্ট প্রয়োগ করলে উল্টো ফল হতে পারে। তাই ত্বকের যত্নে সরল ও ধারাবাহিক রুটিন মেনে চলাই সবচেয়ে ভালো।
যাঁদের ব্রণের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে বা বারবার ফিরে আসছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ত্বকের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ত্বকের ধরন, হরমোনের অবস্থা এবং জীবনযাত্রার উপর ভিত্তি করে উপযুক্ত ডায়েট প্ল্যান ও স্কিন কেয়ার রুটিন সাজিয়ে দিতে পারেন। এতে শুধু ব্রণের সমস্যা নয়, ত্বকের সামগ্রিক স্বাস্থ্যও ধীরে ধীরে উন্নত হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই যে তা সবার ত্বকের জন্য সমানভাবে উপকারী হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। আজকাল অনেকেই ট্রেন্ড দেখে বা সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবেই ডায়েট বেছে নেন, কিন্তু নিজের শরীরের চাহিদা না বুঝে সেই পথে হাঁটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কোন খাবার আপনার শরীর ও ত্বকের সঙ্গে মানানসই, তা বুঝে খাওয়াই সবচেয়ে জরুরি। সচেতন খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ত্বকের যত্ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ—এই তিনটির সমন্বয়ই সুস্থ ও উজ্জ্বল ত্বকের চাবিকাঠি।