প্রবাসী ভারতীয়দের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির নিয়ম সহজ করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি নামমাত্র করের কথা বাজেটে ঘোষণা করেছেন তিনি। প্যান-ভিত্তিক চালানে এই সুবিধা পাবেন ক্রেতারা।অনাবাসী ভারতীয়দের থেকে সম্পত্তি কেনায় কমল জটিলতা। রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে পেশ করা বাজেটে সে কথা ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিগুলি লেনদেনে আগামী দিনে একটি ‘একক নিয়ন্ত্রণ’ (সিঙ্গেল রেগুলেটরি) ব্যবস্থা চালু করবে সরকার। শুধু তা-ই নয়, এতে প্যান-ভিত্তিক চালানের মাধ্যমে টিডিএস (ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স) জমার সুবিধা ক্রেতাদের দেওয়া হবে বলে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কেন্দ্রীয় বাজেট মানেই শুধু আয়কর বা ভর্তুকির হিসাব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা বাস্তব সমস্যা। রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে বাজেট পেশ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ প্রবাসী ভারতীয়দের (এনআরআই) জন্য তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির ঘোষণা করলেন। দীর্ঘদিন ধরে যে জটিলতা ও বিভ্রান্তি নিয়ে অনাবাসী ভারতীয়দের ভারতে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে হত, তা অনেকটাই সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্র। নামমাত্র কর, প্যান-ভিত্তিক চালান এবং ‘একক নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—এনআরআইদের সম্পত্তি লেনদেনকে আরও স্বচ্ছ, সহজ ও কম ঝামেলাপূর্ণ করতে চায় তারা।
এই ঘোষণার প্রভাব শুধু প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যাঁরা এনআরআইদের কাছ থেকে সম্পত্তি কিনতে চান, তাঁরাও এর ফলে সরাসরি উপকৃত হবেন। এত দিন এই ধরনের লেনদেনে আইনি ও কর সংক্রান্ত জটিলতা ছিল অত্যন্ত বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেতারা ঝুঁকি নিতে চাইতেন না, ফলে এনআরআইদের সম্পত্তি বিক্রি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত বা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতে হত। নতুন বাজেট ঘোষণার ফলে সেই পরিস্থিতির বদল হতে চলেছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনাবাসী ভারতীয়দের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কর সংক্রান্ত নিয়মাবলি। আয়কর আইনে এনআরআইদের কাছ থেকে সম্পত্তি কেনার সময় ক্রেতাকে টিডিএস কাটতে হত। কিন্তু এই টিডিএসের হার অনেক ক্ষেত্রেই ছিল বেশ বেশি এবং নিয়মও ছিল জটিল। কোন ক্ষেত্রে কত শতাংশ টিডিএস কাটতে হবে, তা নির্ভর করত সম্পত্তির ধরন, কেনার সময়কাল, বিক্রয়মূল্য এবং এনআরআইয়ের করস্থিতির উপর।
এর পাশাপাশি টিডিএস জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ ছিল না। ক্রেতাকে নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে, বিভিন্ন অনুমোদন নিয়ে আলাদা ভাবে টিডিএস জমা দিতে হত। অনেক সাধারণ ক্রেতার পক্ষেই এই নিয়ম মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ত। ফলে তাঁরা এনআরআইদের কাছ থেকে সম্পত্তি কেনা এড়িয়ে চলতেন। অন্য দিকে, এনআরআই বিক্রেতাদেরও বারবার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইনজীবী এবং কর পরামর্শকের দ্বারস্থ হতে হত।
নির্মলা সীতারমণের বাজেট ঘোষণায় এই জটিলতার সরলীকরণের দিকেই বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, প্রবাসী ভারতীয়দের স্থাবর সম্পত্তি লেনদেনের ক্ষেত্রে আগামী দিনে একটি ‘একক নিয়ন্ত্রণ’ বা সিঙ্গেল রেগুলেটরি ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর অর্থ, একাধিক দফতরের কাছে ঘুরে বেড়ানোর বদলে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর মধ্যেই এই লেনদেনের অধিকাংশ নিয়ম-কানুন সম্পন্ন করা যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হল প্যান-ভিত্তিক চালানের মাধ্যমে টিডিএস জমা দেওয়ার সুবিধা। অর্থাৎ, ক্রেতারা সরাসরি প্যান নম্বর ব্যবহার করে টিডিএস জমা দিতে পারবেন। এর ফলে আলাদা আলাদা ফর্ম, জটিল প্রক্রিয়া এবং দেরির ঝামেলা অনেকটাই কমবে। সরকার চাইছে, কর জমার প্রক্রিয়া যেন যতটা সম্ভব স্বয়ংক্রিয় এবং ব্যবহারবান্ধব হয়।
এ ছাড়াও বাজেটে নামমাত্র করের কথা বলা হয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট হার সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশিকা পরে জানানো হবে, তবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এনআরআইদের সম্পত্তি বিক্রিতে করের বোঝা হালকা করাই সরকারের লক্ষ্য।
এখনও পর্যন্ত এনআরআইদের সম্পত্তি লেনদেনে একাধিক সংস্থার ভূমিকা থাকে—আয়কর দফতর, রাজ্য সরকারের রেজিস্ট্রেশন দফতর, কখনও কখনও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। এই সব দফতরের নিয়ম আলাদা, প্রক্রিয়া আলাদা। ফলে সামান্য একটি বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন করতেও সময় এবং খরচ দুটোই বাড়ত।
একক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হলে এই সব নিয়ম একটি ছাতার তলায় আনার চেষ্টা করা হবে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনই দুর্নীতির সুযোগও কমবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য এটি বড় স্বস্তির বিষয়, কারণ তাঁরা অনেক সময় বিদেশে বসেই এই লেনদেন সম্পন্ন করতে চান।
এত দিন এনআরআইদের কাছ থেকে সম্পত্তি কেনা মানেই অনেক ক্রেতার কাছে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। টিডিএস সঠিক ভাবে না কাটলে বা জমা না দিলে ভবিষ্যতে কর সংক্রান্ত নোটিস আসার ভয় ছিল। নতুন ব্যবস্থায় প্যান-ভিত্তিক চালানের মাধ্যমে টিডিএস জমা দিলে সেই ভয় অনেকটাই কমবে। প্রক্রিয়া যত সহজ হবে, ততই ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়বে।
এর ফলে রিয়েল এস্টেট বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মেট্রো শহর এবং বড় শহরগুলিতে এনআরআইদের বিনিয়োগ করা সম্পত্তির সংখ্যা কম নয়। সেই সব সম্পত্তি বাজারে সহজে এলে সরবরাহ বাড়বে, দামও কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
বাজেট ঘোষণার পর প্রবাসী ভারতীয় মহলে ইতিমধ্যেই আশাবাদী সাড়া মিলেছে। অনেক এনআরআই সংগঠনের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই তারা এই ধরনের সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাঁদের মতে, ভারত সরকার যদি সত্যিই এনআরআইদের দেশের অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখতে চায়, তবে এই ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
একজন দুবাই-প্রবাসী ভারতীয় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, “ভারতে আমার একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করতে গিয়ে যে পরিমাণ কাগজপত্র আর কর সংক্রান্ত ঝামেলা পোহাতে হয়েছে, তা সত্যিই হতাশাজনক। যদি নতুন নিয়মে সেই প্রক্রিয়া সহজ হয়, তা হলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বা সম্পত্তি বিক্রি—দুটোই করতে আগ্রহ বাড়বে।”
এই ঘোষণাকে শুধু কর সংস্কার হিসেবে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকবে। সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হল বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এনআরআইরা দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি—রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ, রিয়েল এস্টেট—সব ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান উল্লেখযোগ্য। সম্পত্তি লেনদেনের মতো ক্ষেত্রে জটিলতা কমানো মানে সেই বিনিয়োগকে আরও উৎসাহ দেওয়া।
এ ছাড়াও ডিজিটাল ইন্ডিয়ার লক্ষ্যের সঙ্গেও এই পদক্ষেপ সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্যান-ভিত্তিক চালান, একক নিয়ন্ত্রণ—সবই ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার দিকে এক ধাপ এগোনো।
যদিও ঘোষণাটি আশাব্যঞ্জক, তবু কিছু প্রশ্ন এখনও খোলা রইল। নামমাত্র কর বলতে ঠিক কত শতাংশ বোঝানো হচ্ছে? কোন কোন সম্পত্তির ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে? পুরনো মামলাগুলির ক্ষেত্রে কি নতুন নিয়ম কার্যকর হবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনে বিস্তারিত নোটিফিকেশন এবং নির্দেশিকার মাধ্যমে জানা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘোষণার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তব রূপায়ণের উপর। অতীতে অনেক ভালো নীতি ঘোষণার পরেও বাস্তবে তার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। তাই এবার সরকার কী ভাবে এই একক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করে, সেটাই দেখার।
রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, এই ঘোষণার ফলে এনআরআইদের আটকে থাকা বা দীর্ঘদিন বিক্রি না হওয়া বহু সম্পত্তি বাজারে আসতে পারে। এতে এক দিকে যেমন লেনদেন বাড়বে, অন্য দিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়তে পারে—যদিও করের হার কমানো হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিদেশে বসে থাকা অনেক এনআরআই আবার নতুন করে ভারতে বিনিয়োগের কথা ভাবতে পারেন। কারণ তাঁরা বুঝতে পারবেন, প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রি করা এখন আগের মতো জটিল নয়।
১ ফেব্রুয়ারির বাজেটে নির্মলা সীতারমণের ঘোষণাটি প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় স্বস্তির বার্তা। স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে নামমাত্র কর, প্যান-ভিত্তিক চালান এবং একক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা—এই তিনটি পদক্ষেপ মিলিয়ে এনআরআইদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের উত্তর দিতে চেয়েছে সরকার।
এখন নজর থাকবে বাস্তবায়নের দিকে। যদি ঘোষিত নিয়মগুলি দ্রুত ও কার্যকর ভাবে চালু করা যায়, তবে শুধু এনআরআইরাই নন, গোটা রিয়েল এস্টেট বাজার এবং দেশের অর্থনীতিও তার সুফল পাবে। এই বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে সরকার যে প্রবাসী ভারতীয়দের গুরুত্ব দিচ্ছে, সেই বার্তাই সবচেয়ে স্পষ্ট ভাবে উঠে এসেছে।
এই ঘোষণার ফলে প্রবাসী ভারতীয়দের (এনআরআই) স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জটিলতা অনেকটাই কাটবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। এত দিন এনআরআইদের থেকে বাড়ি বা জমি কেনার সময় টিডিএস সংক্রান্ত নিয়ম অত্যন্ত জটিল ছিল। একাধিক চালান, ভিন্ন ভিন্ন করহার এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্রেতাই এনআরআইদের সম্পত্তি কিনতে আগ্রহ হারাতেন। নতুন ব্যবস্থায় প্যান-ভিত্তিক একক চালানের মাধ্যমে টিডিএস জমা দেওয়া গেলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে।
‘সিঙ্গেল রেগুলেটরি’ ব্যবস্থার ফলে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে। এতে এক দিকে যেমন স্বচ্ছতা বাড়বে, তেমনই অন্য দিকে লেনদেনের সময়সীমা কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রিয়েল এস্টেট বাজারে। বিশেষ করে মেট্রো শহর এবং উপকূলবর্তী এলাকায় এনআরআইদের বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া নামমাত্র করের ঘোষণায় প্রবাসী ভারতীয়দের সম্পত্তি বিক্রির প্রবণতাও বাড়বে। অনেক এনআরআই এত দিন কর জটিলতার কারণে দেশে থাকা সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইছিলেন না। এখন সেই বাধা কাটলে বাজারে বাড়তি সম্পত্তি আসবে, যা ক্রেতাদের জন্যও সুবিধাজনক হবে। সামগ্রিক ভাবে এই সিদ্ধান্তকে রিয়েল এস্টেট ও কর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি বড় সংস্কার বলেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।