Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘বাংলায় শুধু রাজনীতি হয় ভাবতাম এসে ধারণা বদলে গেল পশ্চিমবঙ্গ সফর নিয়ে কী বললেন বিনোদ-পত্নী কবিতা

প্রয়াত অভিনেতা বিনোদ খন্নার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কবিতা  আনন্দবাজার ডট কম-কে তিনি জানান  আজও বিনোদের ব্যক্তিত্ব ও কাজের প্রতি তিনি গভীরভাবে গুণমুগ্ধ 

বলিউডে এক সময়ের সুপারস্টার বিনোদ খন্নার নাম উঠলেই আজও আবেগে ভরে ওঠে একাধিক স্মৃতি। সেই স্মৃতির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কবিতা খন্না। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ সফরে এসে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রয়াত স্বামীর স্মৃতি এবং বাংলাকে নিয়ে বদলে যাওয়া ধারণা—সব মিলিয়ে খোলামেলা কথাবার্তায় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন কবিতা।

সম্পর্কের জটিলতা সত্ত্বেও সৌহার্দ্য বজায় রাখার এক বিরল উদাহরণ তিনি। কখনও অক্ষয় খন্নার ‘মা’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি কবিতা। বরং বিনোদ খন্নার প্রথম পক্ষের সন্তানদের সঙ্গে বরাবরই একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সম্মানজনক সম্পর্ক রেখেছেন। তাঁর কথায় স্পষ্ট, সম্পর্কের জোর কখনও চাপিয়ে দেওয়া যায় না। সময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই সেই সম্পর্ককে সংজ্ঞা দেয়।

সম্প্রতি মুর্শিদাবাদে এসে অক্ষয় খন্নার নতুন ছবি ‘ধুরন্ধর’ নিয়ে কথা বলেন কবিতা। একই সঙ্গে জানালেন, পশ্চিমবঙ্গে এসে তাঁর বহুদিনের কিছু ধারণা ভেঙে গিয়েছে।

বিনোদ খন্নার স্মৃতিতে আবেগ

প্রয়াত অভিনেতা বিনোদ খন্নার প্রসঙ্গ উঠতেই কবিতার গলায় আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আনন্দবাজার ডট কম-কে তিনি জানান, আজও তিনি বিনোদের গুণমুগ্ধ। তাঁর কথায়,
“ক্যামেরার বাইরে ওঁর সব অভিব্যক্তি আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাই পর্দায় যখন ওঁকে দেখতাম, বুঝে যেতাম উনি কত বড় মাপের অভিনেতা। মানুষ সাধারণত ওঁকে সবচেয়ে সুদর্শন তারকা হিসেবেই মনে রাখে। কিন্তু আমার চোখে, উনি ছিলেন একজন অসাধারণ অভিনেতা।”

বিনোদের সঙ্গে কাটানো ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলির কথাও উঠে আসে তাঁর কথায়। শুটিংয়ের পর গান, রাজস্থানে বেড়াতে যাওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো—সব স্মৃতি আজও তাজা কবিতার মনে।
“আমরা রাজস্থানে যেতাম বেড়াতে। ওঁর মাঝেমধ্যে শুটিং থাকত। শুটিংয়ের পর গান বসত। আমিও গান গাইতাম। ‘আজ জানে কি জ়িদ না করো’ গানটা উনি আমার জন্য গাইতেন,” বলতেই এক মুহূর্ত থেমে যান কবিতা।

এই স্মৃতিগুলি তাঁকে কি আজও কষ্ট দেয়? প্রশ্নের উত্তরে কবিতার সোজাসাপ্টা জবাব,
“একসময় খুব মনে পড়ত। এখনও পড়ে। কিন্তু মন ভার হয় না। ভালবাসা থাকলে স্মৃতিও মধুর হয়। চোখে জল আনে না, বরং আমাকে শক্ত রাখে।”

অক্ষয় খন্নার সঙ্গে সম্পর্ক

এই আবেগের মাঝেই উঠে আসে অক্ষয় খন্নার প্রসঙ্গ। কবিতার চোখে অক্ষয় একজন অসাধারণ অভিনেতা। ‘ধুরন্ধর’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন,
“অক্ষয় দুর্দান্ত অভিনয় করেছে। আমার প্রিয় অভিনেতা ও। তিনবার ‘ধুরন্ধর’ দেখে ফেলেছি। চতুর্থ বারও যাব।”

অক্ষয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন? কোনও কৃত্রিম আবেগ নেই উত্তরে।
“যেমন পুত্রের সঙ্গে হয়, তেমনই। তবে আমার দুই সন্তান শ্রদ্ধা ও সাক্ষী থেকে অক্ষয় প্রায় ২০ বছরের বড়। একটা বয়সের ব্যবধান আছে। এখন সবাই প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন। সম্পর্কটা বোঝাপড়ার।”

এই বক্তব্যেই স্পষ্ট—কবিতা কখনও সম্পর্ককে জোর করে কোনও ছাঁচে ফেলার পক্ষপাতী নন।

মুর্শিদাবাদ সফর ও বদলে যাওয়া ধারণা

‘মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল’-এ যোগ দিতে এসেছেন কবিতা। তিন দিনের সফরে মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক স্থাপত্য, সবুজ প্রকৃতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে মুগ্ধ তিনি। ঘুরে দেখছেন, ছবি তুলছেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, এমনকি তাঁদের কাছ থেকে নানা প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করছেন শহরের ইতিহাস।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বাংলা সম্পর্কে তাঁর পুরনো ধারণা ভেঙে গিয়েছে।
কবিতা বলেন,
“আমি ভাবিনি, এখানে এত সবুজে ঘেরা প্রকৃতি দেখতে পাব। খবরের কাগজ বা টিভিতে তো বাংলার কথা বলতে গেলে শুধু রাজনীতি, হিংসা, চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথাই সামনে আসে। কয়েক বছর আগে নকশালদের কথা, অশান্তির খবর শুনতাম। কিন্তু এখানে এসে আমি একেবারে আলাদা ছবি দেখছি। এখানে শান্তি আছে। আমার খুব ভাল লাগছে।”

এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ফের পশ্চিমবঙ্গে আসার ইচ্ছে জাগিয়েছে। আর সেই সঙ্গে তালিকার প্রথমেই রয়েছে মুর্শিদাবাদ।

খাবার, সংস্কৃতি ও শেহেরওয়ালি ঐতিহ্য

কবিতা জৈন সম্প্রদায়ের মানুষ। তাই নিরামিষ খাবারই তাঁর পছন্দ। মুর্শিদাবাদে এসে বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছেন শেহেরওয়ালি খাদ্যসংস্কৃতিতে। নবাবি আমলে রাজস্থানের বণিক সম্প্রদায় মুর্শিদাবাদে বসতি স্থাপন করেছিল। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন জৈন। বাংলার খাবার ও মোগল রান্নার সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ খাদ্যধারা।

কবিতার কথায়,
“এই খাবারে মশলা আছে, কিন্তু খুব ঝাল নয়। এমন স্বাদ আমার খুব পছন্দ। রসগোল্লা, মিষ্টি দইও খেয়েছি। অসাধারণ!”

মাত্র তিন দিনের সফর হলেও খাবার, মানুষ আর সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।

শাড়ি, স্মৃতি ও বিনোদ

বিনোদ খন্না তাঁকে শাড়িতে দেখতে পছন্দ করতেন। তাই আজও শাড়িই কবিতার প্রিয় পোশাক। মুর্শিদাবাদ থেকেও কিনেছেন শাড়ি। প্রয়াত অভিনেতার প্রসঙ্গ উঠলেই আবার আবেগে ভিজে ওঠেন তিনি।

news image
আরও খবর

“ওঁর সব স্মৃতি আমার সঙ্গে আছে। ভালবাসা থাকলে স্মৃতিগুলো ভারী হয় না। বরং বাঁচতে শেখায়,”—বলতে বলতে চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে জল।

এক সফর, অনেক উপলব্ধি

মুর্শিদাবাদ সফর কবিতার কাছে শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং আত্মিক এক অভিজ্ঞতা। বাংলা সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ধারণা বদলে গিয়েছে। রাজনীতি ছাড়াও যে এই রাজ্যে ইতিহাস, সংস্কৃতি, শান্তি ও মানবিক উষ্ণতা রয়েছে—তা নিজের চোখে দেখে বুঝেছেন তিনি।

এই সফর যেন কবিতাকে আরও একবার শিখিয়ে দিল—ভ্রমণ শুধু জায়গা বদল নয়, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেয়। 

বিনোদ খন্না তাঁকে শাড়িতে দেখতে পছন্দ করতেন। সেই পছন্দ আজও বহন করে চলেছেন কবিতা খন্না। সময় বদলেছে, জীবন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, কিন্তু শাড়ির প্রতি তাঁর টান এতটুকুও কমেনি। তাই মুর্শিদাবাদ সফরেও শাড়ি কেনা বাদ দেননি তিনি। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর স্মৃতির মেলবন্ধনে শাড়ি যেন কবিতার কাছে শুধুই একটি পোশাক নয়—একটি অনুভূতি।

প্রয়াত অভিনেতা বিনোদ খন্নার প্রসঙ্গ উঠলেই কবিতার চোখে-মুখে আলাদা এক আবেগের ছাপ ফুটে ওঠে। কথার মাঝেই তিনি একটু থেমে যান। গলায় ভারী হয়ে আসে অনুভূতির রেশ। স্মৃতির দরজা খুলে গেলে বোঝা যায়, বিনোদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলি আজও কতটা জীবন্ত তাঁর কাছে।

“ওঁর সব স্মৃতি আমার সঙ্গে আছে। ভালবাসা থাকলে স্মৃতিগুলো ভারী হয় না। বরং বাঁচতে শেখায়,”—বলতে বলতে কবিতার চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে জল। কিন্তু সেই জল কষ্টের নয়, তা যেন কৃতজ্ঞতার। জীবনকে যে মানুষটি এতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন, তাঁর স্মৃতি আজও কবিতাকে শক্তি দেয়।

বিনোদের সঙ্গে কাটানো জীবনের অধ্যায় কবিতার কাছে কখনও শুধুই অতীত হয়ে যায়নি। তা তাঁর বর্তমানের সঙ্গেই মিশে রয়েছে। শাড়ি পরা, গান গাওয়া, বেড়াতে যাওয়া—এই ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যেই তিনি খুঁজে পান সেই সম্পর্কের ছোঁয়া। স্মৃতিগুলো তাঁকে ভেঙে দেয় না, বরং নতুন করে বাঁচতে শেখায়—এই উপলব্ধিই তাঁর কথায় স্পষ্ট।

এই আবেগের মাঝেই মুর্শিদাবাদ সফর যেন কবিতার জীবনে আরেকটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। এই সফর তাঁর কাছে কেবলমাত্র একটি অনুষ্ঠান বা উৎসবে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নয়, বরং এক ধরনের আত্মিক যাত্রা। ইতিহাস আর সংস্কৃতির শহর মুর্শিদাবাদ তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছে, অনুভব করতে শিখিয়েছে।

বাংলা সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ধারণা এই সফরে এসে আমূল বদলে গিয়েছে। বাইরে থেকে যাঁরা বাংলাকে দেখেন, তাঁদের অনেকের মনেই রাজনীতি, অশান্তি আর সংঘর্ষের ছবি ভেসে ওঠে। কবিতার মনেও সেই ধারণার ছাপ ছিল। কিন্তু মুর্শিদাবাদে এসে সেই একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে পড়েছে।

তিনি দেখেছেন সবুজে ঘেরা প্রকৃতি, ইতিহাসে ভরা স্থাপত্য, শান্ত মানুষের জীবনযাপন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের সংস্কৃতি ও আতিথেয়তা অনুভব করে তিনি বুঝেছেন—বাংলা শুধুই রাজনীতির রাজ্য নয়। এখানে রয়েছে গভীর ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির ধারা, আর মানুষের মধ্যে মানবিক উষ্ণতা।

কবিতার কাছে এই সফর যেন নিজেকেও নতুন করে চিনে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। পরিচিত গণ্ডির বাইরে এসে, অচেনা জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি বুঝেছেন—ভ্রমণ মানে শুধু নতুন শহর দেখা নয়। ভ্রমণ মানে নিজের ভাবনার সীমারেখা পেরিয়ে যাওয়া।

মুর্শিদাবাদের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে নিতে, ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা উপলব্ধি করেছেন—জীবন আসলে বহুস্তরীয়। ঠিক যেমন তাঁর নিজের জীবন—যেখানে আনন্দ, বেদনা, স্মৃতি আর বর্তমান মিলেমিশে একাকার।

এই সফর তাঁকে আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে, অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকা আর অতীতকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। বিনোদ খন্নার স্মৃতি কবিতার জীবনে বোঝা হয়ে ওঠেনি। বরং সেই স্মৃতিই তাঁকে আরও সংবেদনশীল, আরও মানবিক করে তুলেছে।

মুর্শিদাবাদ থেকে কেনা শাড়িগুলো তাই শুধুই কেনাকাটা নয়। প্রতিটি শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রইল নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন উপলব্ধি এবং পুরনো স্মৃতির মধুরতা। ভবিষ্যতে সেই শাড়ি পরলে হয়তো আবার ফিরে আসবে এই সফরের কথা, বাংলার কথা, আর সেই বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির কথা।

সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ সফর কবিতার জীবনে এক নীরব কিন্তু গভীর ছাপ রেখে গেল। এই সফর যেন তাঁকে আবারও শিখিয়ে দিল—ভ্রমণ শুধু জায়গা বদল নয়, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেয়। আর সেই বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো মানুষকে আরও পরিণত, আরও শান্ত করে তোলে।

Preview image