২০১৮-এর পর আবারও এশিয়াডে পাকিস্তানের কাছে হার ভারতের। পঞ্চম স্থান নির্ণায়ক ম্যাচেও ফিরল সেই পুরনো ছবি—পাকিস্তানের দাপটে হতাশ ভারত।
এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের মাঠে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের দাপট নিয়ে যতই আলোচনা থাকুক, অন্য খেলায় ছবিটা সব সময় একই রকম নয়। এ বারের এশিয়ান গেমসে পুরুষদের ভলিবলের কোয়ার্টার ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে বড় ব্যবধানে হারতে হল ভারতকে। মাত্র তিন সেটেই ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান। ফলে এশিয়ান গেমসে ভলিবলে ভারতের ৪০ বছরের পদকের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হল।
কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে ভারতকে ৩-০ সেটে হারিয়েছে পাকিস্তান। ম্যাচের স্কোরলাইন ছিল ২৫-১৯, ২৫-২৩, ২৫-১৮। অর্থাৎ দ্বিতীয় সেটে ভারত যথেষ্ট লড়াই করলেও প্রথম ও তৃতীয় সেটে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি তারা। দ্বিতীয় সেটে এক সময় ভারত ১৯-১৬ পয়েন্টে এগিয়েও ছিল। সেই জায়গা থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি ভারতীয় দল। পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়িয়ে সেই সেটও নিজেদের দখলে নেয়।
প্রথম সেটের শুরুতে অবশ্য দুই দলের মধ্যে যথেষ্ট লড়াই হয়েছিল। একটা সময় স্কোর ছিল ১১-১১। কিন্তু এরপরই পাকিস্তান টানা কয়েকটি পয়েন্ট তুলে নিয়ে ১৬-১১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। সেই জায়গা থেকে ভারত আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২৫-১৯ ব্যবধানে প্রথম সেট জিতে নেয় পাকিস্তান।
দ্বিতীয় সেটে ভারতকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল। এক সময় ১৯-১৬ পয়েন্টে এগিয়ে যায় তারা। ম্যাচের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল, এই সেটটি জিতে ভারত হয়তো লড়াইয়ে ফিরতে পারে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পাকিস্তান নিজেদের খেলা বদলে ফেলে। পিছিয়ে থেকেও পরপর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে নেয় তারা। চাপের মুখে ভারতীয় দল কয়েকটি ভুল করায় পাকিস্তান সুযোগ পেয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২৫-২৩ ব্যবধানে দ্বিতীয় সেটও জিতে নেয় পাকিস্তান।
তৃতীয় সেটে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ভারত। শুরু থেকেই পাকিস্তান এগিয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে সেই ব্যবধান বাড়াতে থাকে। ভারত চেষ্টা করলেও পাকিস্তানের তৈরি করা চাপ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২৫-১৮ ব্যবধানে তৃতীয় সেট জিতে ম্যাচও ৩-০ ব্যবধানে নিজেদের নামে করে পাকিস্তান। এই জয়ের ফলে দীর্ঘ ৬৪ বছর পর এশিয়ান গেমসের ভলিবল সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল পাকিস্তান।
ভারতের জন্য এই হার আরও হতাশার কারণ, গ্রুপ পর্বে দলটি দুর্দান্ত ছন্দে ছিল। গ্রুপের প্রতিটি ম্যাচ জিতেই নকআউট পর্বে উঠেছিল ভারত। এমনকি কাতারের বিরুদ্ধে শেষ গ্রুপ ম্যাচেও শুরুতে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল তারা। এক সময় ০-২ সেটে পিছিয়ে থাকার পরও টানা তিন সেট জিতে ম্যাচ নিজেদের দখলে নেয় ভারত। সেই পারফরম্যান্সের পর কোয়ার্টার ফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও ভালো লড়াইয়ের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারল না ভারত।
এশিয়ান গেমসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভলিবলে ভারতের এই হার অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। ২০১৮ সালের এশিয়াডেও পাকিস্তানের কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরেছিল ভারত। গত এশিয়ান গেমসেও পঞ্চম স্থান নির্ণায়ক ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে হারতে হয়েছিল ভারতকে। ফলে এ বারও একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হারের ফলে ভলিবলে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্ব ভলিবলের ক্রমতালিকাতেও দুই দলের অবস্থান ভারতের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর ছবি তুলে ধরে। প্রকাশিত র্যাঙ্কিং অনুযায়ী পাকিস্তান ৩৮ নম্বরে এবং ভারত ৪৮ নম্বরে ছিল। সেই ব্যবধান মাঠের পারফরম্যান্সেও দেখা গেল। বিশেষ করে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের ঠান্ডা মাথায় পয়েন্ট সংগ্রহ ভারতকে চাপে ফেলে দেয়।
ভারতের ভলিবল ইতিহাস অবশ্য সমৃদ্ধ। এশিয়ান গেমসে এই খেলায় ভারত অতীতে একাধিকবার পদক জিতেছে। ১৯৫৮ সালের এশিয়াডে ব্রোঞ্জ, ১৯৬২ সালে রুপো এবং ১৯৮৬ সালের এশিয়াডে আবার ব্রোঞ্জ জিতেছিল ভারত। কিন্তু ১৯৮৬ সালের পর আর এশিয়ান গেমসে পুরুষদের ভলিবলে পদক জিততে পারেনি ভারত। ফলে ৪০ বছর ধরে চলে আসা এই অপেক্ষা এ বারও শেষ হল না।
এ বারের প্রতিযোগিতায় গ্রুপ পর্বে ভারতের পারফরম্যান্স দেখে অবশ্য আশা তৈরি হয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে ম্যাচ জিতে নকআউট পর্বে ওঠার পর ভারতীয় দলকে পদকের অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখছিলেন সমর্থকেরা। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিন সেটে হার সেই প্রত্যাশায় ধাক্কা দিল। বিশেষ করে দ্বিতীয় সেটে ১৯-১৬ এগিয়ে যাওয়ার পরও সেটটি হারানো ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে দাঁড়ায়।
ভলিবলের মতো খেলায় সার্ভিস, ব্লক, স্পাইক এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পয়েন্ট ধরে রাখার ক্ষমতা ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেয়। পাকিস্তান সেই জায়গায় ভারতের চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল। প্রথম ও তৃতীয় সেটে পাকিস্তান দ্রুত লিড তৈরি করে সেটিকে ধরে রাখে। দ্বিতীয় সেটে ভারত এগিয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের প্রত্যাবর্তন ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।
এই ম্যাচের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল খেলা শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের সৌজন্য বিনিময়। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের খেলোয়াড়েরা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলান। ক্রিকেটে দুই দেশের ম্যাচ ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে করমর্দন নিয়ে যে বিতর্ক ও আলাদা আলোচনা দেখা যায়, ভলিবলের এই ম্যাচে তেমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ম্যাচের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হওয়ার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে স্বাভাবিক সৌজন্য দেখা যায়।
ভারতের জন্য তাই এই ম্যাচ থেকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, গ্রুপ পর্বের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নকআউট পর্বে কেন ধরে রাখা গেল না। কাতারের বিরুদ্ধে পিছিয়ে থেকেও যেখানে দল ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই প্রত্যাবর্তন দেখা গেল না। বরং দ্বিতীয় সেটে এগিয়ে থেকেও সেট হারানোর পর তৃতীয় সেটে ভারতীয় দলের লড়াই অনেকটাই কমে যায়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য এই জয় নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ৬৪ বছর পর এশিয়ান গেমসের ভলিবল সেমিফাইনালে পৌঁছনোর পাশাপাশি ভারতের বিরুদ্ধে আবারও বড় মঞ্চে নিজেদের সক্ষমতা দেখাল তারা। কোয়ার্টার ফাইনালে কোনও সেট না হারিয়ে ৩-০ ব্যবধানে জয় পাকিস্তানকে আত্মবিশ্বাসও দেবে।
তবে একটি ম্যাচের ফল দিয়ে দুই দেশের ভলিবলের সামগ্রিক শক্তির বিচার করা যায় না। ভারতের সামনে ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। দীর্ঘদিনের পদক-খরা কাটাতে হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, শক্তিশালী প্রস্তুতি এবং বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এশিয়ান গেমসের এই ম্যাচে ভারতের যাত্রা থেমে গেল কোয়ার্টার ফাইনালেই। পাকিস্তান উঠে গেল শেষ চারে। আর ভারতের ক্ষেত্রে ১৯৮৬ সালের পর এশিয়ান গেমসে পুরুষদের ভলিবলে পদকের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হল। ৪০ বছরের সেই খরা কাটানোর সুযোগ এসেছিল, কিন্তু পাকিস্তানের কাছে ০-৩ ব্যবধানে হেরে আবারও খালি হাতেই ফিরতে হল ভারতকে।
এই ম্যাচের ফলাফল শুধু একটি কোয়ার্টার ফাইনালের হার নয়, ভারতের পুরুষদের ভলিবল দলের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাও। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ভারতীয় দল নকআউট পর্বে উঠেছিল যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শুরু থেকেই প্রত্যাশিত ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে প্রথম সেটে পাকিস্তান যখন মাঝপর্বের পর ব্যবধান তৈরি করতে শুরু করে, তখন ভারতীয় দলের আক্রমণ এবং রক্ষণ—দুই বিভাগেই ধারাবাহিকতার অভাব দেখা যায়।
দ্বিতীয় সেটে অবশ্য ভারতীয় দল নিজেদের অনেকটাই গুছিয়ে নেয়। ১৯-১৬ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচে ভারতের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছিল। সেই সময় একটি সেট জিতে ব্যবধান কমিয়ে আনার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ কয়েকটি পয়েন্টে পাকিস্তানের খেলোয়াড়েরা বেশি কার্যকর প্রমাণিত হন। ফলে ভারত এগিয়ে থেকেও সেটটি ২৫-২৩ ব্যবধানে হারায়। এই সেটের ফলই ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় সেটে জয়ের পর পাকিস্তানের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। তৃতীয় সেটের শুরু থেকেই তারা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলতে থাকে। ভারত চেষ্টা করলেও পাকিস্তানের লিড কমাতে পারেনি। এক পর্যায়ে স্পষ্ট হয়ে যায়, ম্যাচে ফিরতে হলে ভারতকে দ্রুত বড় প্রত্যাবর্তন করতে হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব হয়নি।
ভারতের জন্য এই ফলাফল আরও হতাশার কারণ, দলটি গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচ জিতেছিল। শেষ ম্যাচে কাতারের বিরুদ্ধে ০-২ সেটে পিছিয়ে যাওয়ার পরও পরপর তিন সেট জিতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছিল ভারত। সেই পারফরম্যান্স দেখে সমর্থকদের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছিল যে নকআউট পর্বেও ভারত একই মানের লড়াই করবে। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
এশিয়ান গেমসে ভলিবলে ভারতের ইতিহাসের দিকে তাকালেও এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৮ সালে ব্রোঞ্জ, ১৯৬২ সালে রুপো এবং ১৯৮৬ সালে ব্রোঞ্জ জিতেছিল ভারত। কিন্তু ১৯৮৬ সালের পর আর পদক আসেনি। অর্থাৎ চার দশক ধরে ভারতীয় পুরুষদের ভলিবল দল এশিয়ান গেমসের মঞ্চে পদকের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবারই নতুন দল, নতুন প্রস্তুতি এবং নতুন প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামলেও সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেনি।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ম্যাচগুলির ফলও ভারতের জন্য চিন্তার জায়গা তৈরি করেছে। ২০১৮ সালের এশিয়াডে ৩-১ ব্যবধানে হার এবং পরবর্তী এশিয়ান গেমসে পঞ্চম স্থান নির্ণায়ক ম্যাচে পরাজয়ের পর এবার কোয়ার্টার ফাইনালেও পাকিস্তানের কাছে হারল ভারত। ফলে এশিয়ান গেমসে দুই দেশের ভলিবল লড়াইয়ে সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সৌজন্যের ছবি ছিল ইতিবাচক দিক। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ম্যাচ হলেও শেষ বাঁশি বাজার পর খেলোয়াড়েরা পরস্পরের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। মাঠের প্রতিযোগিতা এবং ম্যাচের বাইরের সৌজন্য—দুটিই আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাকিস্তান এখন সেমিফাইনালের প্রস্তুতি নেবে, আর ভারতকে ফিরতে হবে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতে। ৪০ বছরের পদক-খরা কাটাতে হলে এই ম্যাচের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের দিকে নজর দিতে হবে ভারতীয় দলকে।