সেরাথাঙে প্রবল তুষারপাতে কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফে ঢেকে গিয়েছে রাস্তা ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।
উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য রাজ্য Sikkim-এ গত কয়েক দিন ধরে চলা প্রবল তুষারপাতে পর্যটন-চিত্র একেবারে বদলে গেছে। জনপ্রিয় উচ্চভূমি গন্তব্য Tsomgo Lake (ছাঙ্গু হ্রদ)–এর পথে হঠাৎ ভারী বরফ পড়ায় বন্ধ হয়ে যায় একাধিক সড়ক। পূর্ব সিকিমের বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়েন হাজারো পর্যটক। প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৭৩৬ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। তবু কোথাও কোথাও এখনও গাড়ির লম্বা লাইন, পিচ্ছিল রাস্তায় চলাচলে ঝুঁকি, আর শৈত্যপ্রবাহে দুর্ভোগের ছবি স্পষ্ট।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ছাঙ্গু যাওয়ার পাহাড়ি রাস্তায়। স্থানীয় সূত্র বলছে, সেরাথাঙ ও আশপাশের এলাকায় কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফ জমে যায়। উচ্চতা বেশি হওয়ায় তাপমাত্রা দ্রুত নেমে গিয়ে রাস্তার উপর বরফের শক্ত আস্তরণ তৈরি হয়। এর ফলে গাড়ির চাকা পিছলে যায়, গতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয় এবং বহু গাড়ি মাঝপথে থেমে পড়তে বাধ্য হয়। ছাঙ্গু ও ‘১৫ মাইল’ এলাকার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫০০ গাড়ি আটকে ছিল বলে প্রশাসনের প্রাথমিক অনুমান।
তুষারপাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাওয়া পর্যটকেরা অনেকেই গাড়ির ভিতরেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ঠান্ডায় খাবার ও পানীয়ের অভাব, মোবাইল নেটওয়ার্কের অনিয়মিত সংযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত সমন্বয় করে রাজ্য প্রশাসন, পুলিশ ও সীমান্ত সড়ক সংস্থার কর্মীরা। পাশাপাশি সহায়তায় এগিয়ে আসে Indian Army। বরফে ঢেকে যাওয়া জওহরলাল নেহরু রোডের সিপসু ও ১৬ মাইলের মাঝামাঝি অংশে আটকে পড়া পর্যটকবাহী গাড়িগুলিকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রবল ঠান্ডার মধ্যে শিশু-সহ অন্তত ৪৬ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়। রাতভর চলা অভিযানের পর বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৭৩৬ জনকে নিরাপদে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।
উদ্ধারকার্য সহজ ছিল না। বরফের কারণে রাস্তা অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় ভারী যান নিয়ে এগোনো ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কোথাও কোথাও আগে বরফ পরিষ্কার করে, পরে ধীরে ধীরে কনভয়ের মতো করে গাড়ি নামানো হয়। চিকিৎসা সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয় অ্যাম্বুল্যান্স। প্রাথমিক চিকিৎসা, গরম জল ও খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়।
পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়া দ্রুত বদলে যায়। টানা কয়েক দিনের তুষারপাতে রাস্তার উপর বরফের স্তর মোটা হয়ে গেলে সাধারণ টায়ার দিয়ে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ‘স্নো চেন’ না থাকলে গাড়ির গ্রিপ কমে যায় এবং স্কিড করার আশঙ্কা বাড়ে। পর্যটন দফতর ইতিমধ্যে পর্যটক ও ট্যুর অপারেটরদের আবহাওয়া-সংক্রান্ত আপডেট নিয়মিত খতিয়ে দেখতে এবং তুষারপাতপ্রবণ এলাকায় যাত্রার সময় বাধ্যতামূলকভাবে স্নো চেন বহনের পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চতাজনিত অসুস্থতা (হাই অল্টিটিউড সিকনেস)–এর ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে আটকে থাকলে অক্সিজেনের স্বল্পতা, ডিহাইড্রেশন বা হাইপোথার্মিয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই সময়মতো উদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উদ্ধার হওয়া কয়েকজন পর্যটক জানিয়েছেন, প্রথমে তুষারপাত দেখে তাঁরা উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কিন্তু রাস্তা বন্ধ হয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ে। কেউ কেউ বলছেন, সন্ধ্যার পর ঠান্ডা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুদের গায়ে অতিরিক্ত পোশাক জড়িয়ে রাখা, গাড়ির হিটার সচল রাখা—এসব করেই রাত কাটাতে হয়েছে অনেককে।
তবে উদ্ধার অভিযানে সেনা ও প্রশাসনের দ্রুত তৎপরতার প্রশংসাও করেছেন তাঁরা। কঠিন আবহাওয়ার মধ্যেও যে ভাবে সমন্বিতভাবে কাজ হয়েছে, তা বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করেছে বলে মত অনেকের।
প্রবল তুষারপাতের মতো প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমণ সবসময়ই বাড়তি সতর্কতা দাবি করে। পূর্ব সিকিমের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে—পর্যটনের আনন্দের চেয়ে নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পাহাড় যেমন অপরূপ, তেমনই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।
প্রথমত, আবহাওয়া দফতরের সতর্কতা মেনে চলা বাধ্যতামূলক। পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়া মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। সকালবেলা রোদ থাকলেও বিকেলে তুষারপাত বা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই ভ্রমণের আগে সরকারি আবহাওয়া বুলেটিন খতিয়ে দেখা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক সময় পর্যটকেরা আগাম বুকিং বা নির্ধারিত সূচির চাপে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেন—এই প্রবণতা বিপদের ঝুঁকি বাড়ায়।
দ্বিতীয়ত, তুষারপাতপ্রবণ রাস্তায় ‘স্নো চেন’ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বরফে ঢেকে থাকা রাস্তায় সাধারণ টায়ার ঠিকমতো গ্রিপ পায় না। ফলে গাড়ি স্কিড করতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। স্নো চেন চাকার সঙ্গে যুক্ত থাকলে বরফের উপরেও গাড়ি তুলনামূলক স্থিরভাবে চলতে পারে। প্রশাসন জানিয়েছে, উচ্চভূমিতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এটি কেবল পরামর্শ নয়, প্রায় বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। ট্যুর অপারেটর ও ব্যক্তিগত গাড়িচালকদের এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র, শুকনো খাবার ও পর্যাপ্ত পানীয় সঙ্গে রাখা উচিত। পাহাড়ে কখন, কোথায় কতক্ষণ আটকে পড়তে হতে পারে, তা আগে থেকে বলা যায় না। তীব্র ঠান্ডায় শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে, যা হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। উলের পোশাক, গ্লাভস, টুপি, মোটা মোজা, থার্মাল জ্যাকেট—এসব সঙ্গে থাকলে বিপদের সময়ে তা বড় সহায়তা করে। পাশাপাশি বিস্কুট, চকলেট, শুকনো ফল বা এনার্জি বার মতো হালকা খাবার শরীরে শক্তি জোগায়। পানীয় জলও অত্যন্ত জরুরি, কারণ ঠান্ডায় তেষ্টা কম পেলেও শরীর ডিহাইড্রেশনের শিকার হতে পারে।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। উচ্চভূমিতে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকায় তাঁদের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমিভাব—এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিচু এলাকায় নামিয়ে আনা প্রয়োজন। তাই শিশু ও প্রবীণদের নিয়ে তুষারপাতপ্রবণ অঞ্চলে ভ্রমণের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যাত্রা করাই শ্রেয়।
স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় এগিয়ে যাওয়া একেবারেই অনুচিত। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কিছু গাড়িচালক ‘ঝুঁকি নিয়ে’ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে কেবল নিজেরাই নয়, অন্যদেরও বিপদে ফেলেন। উদ্ধারকাজে তখন অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। তাই রাস্তা বন্ধ থাকলে ধৈর্য ধরাই একমাত্র সমাধান।
রাজ্য পর্যটন দফতর জানিয়েছে, কোথায় কত পর্যটক এখনও আটকে রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষত উচ্চভূমি ও তুষারপাতপ্রবণ এলাকাগুলিতে সাময়িক বিধিনিষেধ জারি হতে পারে।
তুষারপাত অব্যাহত থাকলে পুনরায় রাস্তা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। বরফ সরানো একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। ভারী যন্ত্র দিয়ে বরফ কাটতে হয়, পরে রাস্তার উপর জমে থাকা বরফ গলাতে লবণ বা বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তাপমাত্রা খুব কম থাকলে এই প্রক্রিয়াও ধীরগতির হয়ে পড়ে। ফলে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
রাস্তা মেরামতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বরফ গলে আবার জমাট বাঁধলে রাস্তার উপরিভাগে ফাটল বা গর্ত তৈরি হতে পারে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তাই প্রশাসনের কাছে চ্যালেঞ্জ শুধু যানজট সরানো নয়, দীর্ঘমেয়াদে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও।
আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল পর্যটন অর্থনীতি। পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। কিন্তু ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হোটেল, গাড়ি পরিষেবা, গাইড—সবার উপরই প্রভাব পড়ে। তাই প্রশাসন একদিকে যেমন নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত পর্যটন পরিষেবা চালু করার পরিকল্পনাও করছে।
আবহাওয়া খানিকটা স্বাভাবিক হলেই ধীরে ধীরে পর্যটন পরিষেবা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে—এমনটাই আশা প্রশাসনের। তবে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াও জরুরি। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা, রিয়েল-টাইম আবহাওয়া আপডেট ছড়িয়ে দেওয়া, পর্যটকদের জন্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নির্দেশিকা তৈরি—এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
হিমালয়ের কোলে প্রকৃতির সৌন্দর্য অপরূপ, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে অনিশ্চয়তা। তুষারঢাকা পাহাড় যেমন মন ভরিয়ে দেয়, তেমনই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তা মুহূর্তে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিকল্পনা, সচেতনতা এবং প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলাই নিরাপদ ভ্রমণের চাবিকাঠি।
পাহাড়ে যাত্রার আগে প্রস্তুতি নিন, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা সঙ্গে রাখুন, এবং আবহাওয়ার আপডেট নিয়মিত অনুসরণ করুন। তবেই প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে।