শেষের দিকে জেসন কামিংসকে পরিবর্ত হিসাবে নামিয়েও কাজের কাজ হল না। একাধিক গোল মিসের মাশুল গুনে বেঙ্গালুরু থেকে গোলশূন্য ড্র করে ফিরছে সবুজ-মেরুন।
মোহনবাগান গোলশূন্য ড্র করে বেঙ্গালুরু থেকে ফিরে এসেছে, আর তার খেসারত দিয়েই টানা চার ম্যাচে জয় পাওয়ার পর প্রথম পয়েন্ট হারাতে হল তাদের। দলটির লক্ষ্য ছিল পাঁচে পাঁচ করতে যাওয়ার, কিন্তু কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে সুনীল ছেত্রীর বেঙ্গালুরু এফসি’র বিরুদ্ধে ০-০ গোলের ড্র করে ফিরে এসেছে মোহনবাগান। সেইসঙ্গে, তাতে বেঙ্গালুরু থেকে একটি পয়েন্ট পেয়েও সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সবুজ-মেরুন দলকে।
খেলার শুরু থেকেই, বেঙ্গালুরুর মাঠে মোহনবাগানের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কলকাতা থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে মোহনবাগান সমর্থকরা দলে দলে হাজির হয়েছিলেন। বিশেষভাবে, দিমিত্রি পেত্রাতোসের শততম ম্যাচ উপলক্ষে কান্তিরাভায় এক বিশেষ টিফোও প্রদর্শিত হয়। অপরদিকে, বেঙ্গালুরু এফসি গোলাপি জার্সিতে মাঠে নামে, এবং সুনীল ছেত্রী ও আশিক কুরুনিয়নের উপস্থিতি দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। সুনীল ছেত্রী ও আশিক কুরুনিয়নের সাথেই মাঠে প্রবেশ করেন তাঁদের মা-স্ত্রীরা, যা দর্শকদের নজর কেড়েছে।
ম্যাচের শুরুতে মনে হয়েছিল, বেঙ্গালুরুর কোচ রেনেডি সিং একটি ড্র করার উদ্দেশ্যে খেলতে নেমেছিলেন। খুবই কম আক্রমণ ও মোহনবাগানের আক্রমণ আটকে রাখার লক্ষ্য ছিল তার। প্রথম দিকেই একটি সহজ সুযোগ মিস করেন সুনীল ছেত্রী। অন্যদিকে, মোহনবাগানও গোল মিসের প্রদর্শনী চালিয়ে গেছে।
মোহনবাগান কোচ লোবেরা বিশেষভাবে বেঙ্গালুরুর উইং প্লে নিয়ে সতর্ক ছিলেন। কারণ, আশিক কুরুনিয়ন মোহনবাগান ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে চলে গেছেন, এবং রায়ান উইলিয়ামসও খেলার মধ্যে ছিলেন। এই কারণে লোবেরা পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন, যাতে বেঙ্গালুরুর আক্রমণ আটকানো যায়। সেই অনুযায়ী টম অলড্রেড ও আলবার্তো রডরিগেজকে প্রথম একাদশে খেলানো হয়েছিল। বিপক্ষের আক্রমণ আটকে রাখা গেল, কিন্তু মোহনবাগানের আক্রমণ একেবারেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে থাকল।
খেলার প্রথম কয়েক মিনিটে বেঙ্গালুরুর রায়ান উইলিয়ামস অসাধারণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এক দুর্দান্ত সেভের মাধ্যমে মোহনবাগানের গোলকিপার বিশাল কাইথ তাঁর শট রুখে দেন। এরপর, মোহনবাগান চেষ্টা চালিয়েও গোলমুখ খুলতে পারল না। যদিও খেলার শেষে, বিশেষ কিছু সুযোগ তৈরি হলেও, দলের ফিনিশিং দুর্বলতার কারণে তা কাজে আসেনি।
মোহনবাগানের আরও কিছু বড় সুযোগ নষ্ট হয়েছে। ৭০ মিনিটে গোললাইন সেভ, ৮৩ মিনিটে দিমিত্রি পেত্রাতোসের সামনে থাকা সহজ সুযোগটি বাইরে মিস করা—এটি ছিল আজকের খেলার সবচেয়ে বড় সুযোগ। যদি গোলটি পেতেন, তবে শততম ম্যাচে গোল করে মোহনবাগানকে জেতাতে পারতেন দিমিত্রি। কিন্তু, পরবর্তীতে জয় আসেনি।
ম্যাচের শেষে, কিছু পরিবর্তন আনা হলেও, একাধিক গোল মিসের পর বেঙ্গালুরু থেকে গোলশূন্য ড্র নিয়েই ফিরতে হয়েছে মোহনবাগানকে। তবে, পাঁচ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে তারা শীর্ষে থাকল। জামশেদপুর ১২ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, তবে তাদের এক ম্যাচ কম খেলা রয়েছে। পরবর্তী ম্যাচে ২০ মার্চ মুম্বই সিটির বিরুদ্ধে মাঠে নামবে মোহনবাগান।
এদিনের খেলা দর্শকদের জন্য অনেকটাই মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে। গোল মিসের মাশুলের পরেও মোহনবাগান শীর্ষে রয়েছে, তবে তাদের খেলার মধ্যে আরও উন্নতি প্রয়োজন। তাদের আক্রমণভাগের ফিনিশিং আরও তীক্ষ্ণ করতে হবে, যদি তারা পরবর্তী ম্যাচে সফল হতে চায়।
মোহনবাগানের জন্য এটি ছিল একটি হতাশাজনক মুহূর্ত, যখন তারা খেলা শুরু করার পরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গোল করতে পারেনি। এই ম্যাচে তাদের অবস্থা ছিল এমন, যে তারা সহজ সুযোগ তৈরি করেও সেগুলি কাজে লাগাতে পারছিল না। কোচ লোবেরা গতকাল মোহনবাগান দলকে বেশ আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় মাঠে নামিয়েছিলেন। কিন্তু মাঠে তাদের দৃশ্যমান দুর্বলতা ছিল পরিষ্কার—ফিনিশিংয়ে সমস্যার কারণে তাদের সহজ সুযোগগুলিও মিস হয়ে যাচ্ছিল। সুনীল ছেত্রী এবং অন্যদের মতো প্রভাবশালী খেলোয়াড়রা তাদের আক্রমণে পরিপূর্ণতা আনতে ব্যর্থ হন।
বেঙ্গালুরুর খেলা যদিও পরিকল্পিত ছিল। কোচ রেনেডি সিংয়ের লক্ষ্য ছিল ম্যাচটি ড্র করে ফিরে আসা, যাতে তারা মোহনবাগানকে কোনোভাবেই সহজ সুযোগ না দেয়। তার দল খুব বেশি আক্রমণে যেতে চাইল না, বরং তারা মোহনবাগানকে বিক্ষিপ্তভাবে আক্রমণ করতে দেয় এবং তাদের আক্রমণ আটকে রাখার চেষ্টা করে। এর ফলে বেঙ্গালুরু স্ট্র্যাটেজি ছিল সোজা—যতটা সম্ভব কম আক্রমণ করা এবং ড্র করতে যাওয়া।
মোহনবাগান যখন মাঠে নামে, তখন তাদের অঙ্গীকার ছিল পাঁচটি ম্যাচে পাঁচটি জয়। কিন্তু তারা সেই লক্ষ্যকে সফল করতে পারেনি। সুনীল ছেত্রী এবং তার দলের একাধিক আক্রমণ সেভ হয়ে যায়। মাঠে তাদের বল দখলে বেশ শক্তি ছিল, কিন্তু তারা সেই শক্তি গোলের দিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, দিমিত্রি পেত্রাতোস, যিনি এই ম্যাচে তার শততম ম্যাচ খেলছিলেন, তার সামনে যে সুযোগ এসেছিল তা তিনি কাজে লাগাতে পারেননি। ৮৩ মিনিটে সহজ সুযোগ মিস করার পর, মোহনবাগান আরও হতাশ হয়ে পড়ে।
যদিও ম্যাচে তারা আক্রমণ করেছে, তবুও গোলমুখে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি ছিল অস্থির। টম অলড্রেড এবং আলবার্তো রডরিগেজের রক্ষণ যথাযথ ছিল এবং তাদেরকে প্রতিপক্ষের আক্রমণ আটকাতে হয়। তবে মিডফিল্ড এবং আক্রমণভাগে কিছু সংকট দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, তাদের আক্রমণভাগ গোলমুখে গিয়ে গোল করতে ব্যর্থ হয়। একাধিক সুযোগ নষ্টের কারণে, মোহনবাগান খুবই হতাশ ছিল।
গোলমুখের কাছে পৌঁছানোর পরও তারা ফিনিশিংয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছিল। এমনকি, খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসও কম ছিল, কারণ তারা জানত যে তারা সহজ সুযোগগুলোও কাজে লাগাতে পারছে না। বিশেষত, দিমিত্রি পেত্রাতোসের সুযোগ মিস করার পর, পুরো দলটা যেন একটা মনোস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে পড়ে যায়। তাছাড়া, জেসন কামিংসকে পরিবর্তন হিসেবে নামিয়ে দেওয়ার পরও সেই গোলের আশায় ছিলেন তারা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোলের সুযোগ আসে না। তবে তার পরও দলটি ১৩ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যা তাদের জন্য কিছুটা শান্তির কথা ছিল।
বেঙ্গালুরুর কোচ রেনেডি সিংয়ের পরিকল্পনা ছিল ম্যাচের সময় নীরব থাকতে এবং তেমন কোনো ভুল না করা। তবে সুনীল ছেত্রীর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা যখন সহজ সুযোগ মিস করেন, তখন এটি যে দলের ওপর চাপ বাড়ায় তা বলাই বাহুল্য। তার পরও, বেঙ্গালুরুর ডিফেন্ডাররা খুব দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে মোহনবাগান তাদের আক্রমণ থামাতে ব্যর্থ হয়।
এছাড়াও, পিচের পরিস্থিতি এবং পরিবেশও খেলার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। গরম আবহাওয়া এবং কান্তিরাভা স্টেডিয়ামের পরিবেশ, যেখানে মোহনবাগান খেলতে এসেছিল, তাতে তাদের কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। মাঠের তাপমাত্রা এবং ভিন্ন পরিবেশে খেলার অভিজ্ঞতা এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে দেয়। তবে, মোহনবাগানকে তাদের খেলার মানের উন্নতি করতে হবে এবং আরো ভালো ফলাফলের জন্য নিজেদের আক্রমণভাগে আরও উন্নতি সাধন করতে হবে।
পরবর্তী ম্যাচে, মোহনবাগান মুম্বই সিটির বিরুদ্ধে খেলবে এবং সেখানেও তাদের লক্ষ্য হবে জয় পাওয়া। তবে, তাদের আগে সুনীল ছেত্রী এবং তার দলের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের কাছ থেকে ইতিবাচক মনোভাব এবং আরও শক্তিশালী আক্রমণ আশা করা হচ্ছে। দলের ভিতরে শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা এখনো গোলমুখে তাদের পারফরম্যান্সে আরো ধারালোতা আনতে পারবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
মোহনবাগানকে তাদের আক্রমণভাগে আরও নিখুঁত ফিনিশিং নিয়ে আসতে হবে এবং তারা যদি সুনীল, আশিক এবং রায়ান উইলিয়ামসের মতো খেলোয়াড়দের বিপক্ষে ফিনিশিং আরও উন্নত করতে পারে, তবে দলটি সাফল্য পাবে। বর্তমানে তারা ১৩ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, তবে তাদের খেলার মধ্যে আরও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন যদি তারা পরবর্তী ম্যাচগুলোতে আরও বড় অর্জন পেতে চায়। মোহনবাগানকে অবশ্যই তাদের আক্রমণভাগে আরও ধারালোতা আনতে হবে এবং খেলার পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সুনীল ছেত্রী এবং অন্যান্য অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মেধা এবং নেতৃত্ব থেকে দলটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। তাদের পরবর্তী ম্যাচে মুম্বই সিটির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জয়ী হতে হলে, ফিনিশিং এবং আক্রমণাত্মক কৌশল আরও উন্নত করতে হবে। তবে, তাদের শীর্ষে থাকা প্রতিযোগিতায় আরও বেশি মনোযোগ এবং সামগ্রিক দলের সহযোগিতা প্রয়োজন।