ভারতের পরিবহন ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে গেল মুম্বাইয়ের আকাশে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ডানা মেলল ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যাত্রীবাহী উড়ন্ত গাড়ি বা ফ্লাইং কার গরুড় আইআইটি বোম্বে এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ইলেকট্রিক ভার্টিকাল টেক অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং বা ইভিটিওএল যানটি শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে সময় নেবে মাত্র কয়েক মিনিট মাটির রাস্তার ভিড় এখন অতীতের গল্প আকাশ পথেই তৈরি হবে নতুন ভারতের ভবিষ্যৎ
মানুষের কল্পनाशক্তির কোনো সীমা নেই এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির কোনো শেষ নেই একসময় আমরা রূপকথার গল্পে উড়ন্ত কার্পেট বা পক্ষীরাজ ঘোড়ার কথা শুনতাম আজ সেই রূপকথা বাস্তবের মাটিতে বা বলা ভালো বাস্তবের আকাশে ধরা দিল ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই যা তার আকাশছোঁয়া ট্রাফিক জ্যামের জন্য কুখ্যাত ছিল আজ থেকে সেই শহর এক নতুন পরিচিতি পেল ভারতের প্রথম স্কাই সিটি বা আকাশ নগরী হিসেবে আজ সকালে বান্দ্রা কুরলা কমপ্লেক্স বা বিকেসি তে তৈরি ভারতের প্রথম ভার্টিপোর্ট বা উড়ন্ত গাড়ির স্টেশন থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী সবুজ পতাকা নেড়ে ভারতের প্রথম যাত্রীবাহী উড়ন্ত গাড়ি গরুড় এর বাণিজ্যিক পরিষেবার সূচনা করলেন
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকার জন্য হাজার হাজার মানুষ বিকেসি গ্রাউন্ডে এবং আশেপাশের বহুতল ভবনগুলোর ছাদে ভিড় করেছিলেন যখন ড্রোন এবং হেলিকপ্টারের সংমিশ্রণে তৈরি দেখতে অদ্ভুত সুন্দর গরুড় যানটি কোনো শব্দ না করে খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে গেল এবং তারপর বিমানের মতো দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল তখন উপস্থিত জনতার উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো এটি কেবল একটি নতুন যানের উদ্বোধন নয় এটি হলো ভারতের পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা যা আগামী দিনে আমাদের জীবনযাত্রার মান সম্পূর্ণ বদলে দেবে
গরুড় প্রকল্পের নেপথ্য কাহিনী এবং মেক ইন ইন্ডিয়া
এই অসাধ্য সাধনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আট বছরের কঠোর গবেষণা এবং পরিশ্রম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মেক ইন ইন্ডিয়া স্বপ্নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো এই গরুড় প্রকল্প আইআইটি বোম্বের এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস এর বিজ্ঞানীরা দিনরাত এক করে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি যান তৈরি করা যা হবে নিরাপদ পরিবেশবান্ধব এবং ভারতের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য উপযুক্ত
গরুড় হলো একটি ইভিটিওএল বা ইলেকট্রিক ভার্টিকাল টেক অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং এয়ারক্রাফট অর্থাৎ এটি হেলিকপ্টারের মতো সোজা ওপরে উঠতে এবং নিচে নামতে পারে এর জন্য কোনো রানওয়ের প্রয়োজন হয় না কিন্তু আকাশে ওঠার পর এটি সাধারণ বিমানের মতোই ডানার সাহায্যে উড়তে পারে এতে আটটি শক্তিশালী ইলেকট্রিক মোটর এবং প্রোপেলার ব্যবহার করা হয়েছে যা একে অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং দ্রুতগামী করে তুলেছে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার এবং এক চার্জে এটি ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে
প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তার বলয়
আকাশে ওড়া মানেই সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার প্রশ্ন জাগে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন গরুড় সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা অটোনোমাস প্রযুক্তিতে চলে এতে কোনো মানুষের পাইলট থাকে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং অত্যাধুনিক জিপিএস সিস্টেমের মাধ্যমে এটি নিজের পথ খুঁজে নেয় এবং অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তুর সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে
আইআইটি বোম্বের প্রধান বিজ্ঞানী ডক্টর রঘুনাথ মাসেলকর বলেন আমরা এতে ট্রিপল রিডানডেন্সি সিস্টেম ব্যবহার করেছি অর্থাৎ এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তিনবার করে আছে যদি ওড়ার সময় একটি মোটর বা ব্যাটারি খারাপও হয়ে যায় তাহলেও বাকিগুলো দিয়ে এটি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে এমনকি যদি সবকটি ইঞ্জিন একসাথে বন্ধ হয়ে যায় তবুও ভয়ের কিছু নেই কারণ এতে একটি ব্যালিস্টিক প্যারাসুট সিস্টেম আছে যা জরুরি অবস্থায় পুরো যানটিকে নিরাপদে মাটিতে নামিয়ে আনবে
এছাড়াও মুম্বাইয়ের আকাশের জন্য একটি বিশেষ এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এটিএমএস তৈরি করা হয়েছে যা মাটির রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালের মতোই আকাশের রুট বা করিডর নিয়ন্ত্রণ করবে কোন উচ্চতায় কোন গাড়ি উড়বে তা এই সিস্টেম ঠিক করে দেবে যাতে আকাশে কোনো যানজট না হয়
আকাশ পথ বা স্কাই করিডর এবং ভার্টিপোর্ট
এই উড়ন্ত গাড়িগুলো কিন্তু যেখানে সেখানে উড়বে না এদের জন্য নির্দিষ্ট আকাশ পথ বা স্কাই করিডর তৈরি করা হয়েছে বর্তমানে মুম্বাইয়ে তিনটি প্রধান করিডর চালু করা হয়েছে ১ দক্ষিণ মুম্বাইয়ের নারিমান পয়েন্ট থেকে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২ বিকেসি থেকে নাভি মুম্বাই বিমানবন্দর ৩ থানে থেকে দক্ষিণ মুম্বাই
এই করিডরগুলো দিয়ে যাতায়াত করতে এখন সময় লাগবে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট যা আগে সড়কপথে লাগত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা এই উড়ন্ত গাড়িগুলো ওঠানামা করার জন্য শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বহুতল ভবনের ছাদে এবং মেট্রো স্টেশনের ওপরে ভার্টিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে এই ভার্টিপোর্টগুলো দেখতে অনেকটা ছোটখাটো বিমানবন্দরের মতো যেখানে যাত্রীদের জন্য লাউঞ্জ এবং ব্যাটারি সোয়াপিং বা দ্রুত ব্যাটারি বদলানোর সুবিধা আছে
জীবনযাত্রায় প্রভাব এবং অর্থনৈতিক বিপ্লব
গরুড় চালু হওয়ার ফলে মুম্বাইবাসীর জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন আসবে যারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিকে আটকে থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট করতেন তারা এখন সেই সময়টি পরিবারকে দিতে পারবেন বা নিজের কাজে লাগাতে পারবেন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে কাজ করা এখন অনেক সহজ হয়ে যাবে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন এর ফলে মুম্বাইয়ের রিয়েল এস্টেট বা আবাসন শিল্পে বড় পরিবর্তন আসবে এতদিন মানুষ অফিসের কাছাকাছি থাকার জন্য বেশি ভাড়া দিয়ে ছোট ফ্ল্যাটে থাকতেন এখন দূরত্ব কোনো বাধা নয় তাই মানুষ শহরের বাইরে খোলামেলা জায়গায় থাকতে পছন্দ করবেন এর ফলে উপনগরীগুলোর উন্নয়ন হবে
এছাড়াও এই নতুন শিল্পের হাত ধরে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে ভার্টিপোর্ট ম্যানেজমেন্ট আকাশ পথের ট্রাফিক কন্ট্রোলার ড্রোন মেকানিক এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা প্রচুর বেড়ে যাবে এটি ভারতের জিডিপিতে এক নতুন গতির সঞ্চার করবে
পরিবেশগত সুবিধা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ
হেলিকপ্টারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর বিকট শব্দ কিন্তু গরুড় যেহেতু সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক মোটরে চলে তাই এর শব্দ খুবই কম বিজ্ঞানীরা একে হুইসপার কোয়াইট বা ফিসফিসানির মতো শান্ত বলে দাবি করছেন শহরের ২০০ ফুট ওপর দিয়ে উড়ে গেলেও নিচের মানুষ কোনো শব্দ পাবেন না
এছাড়াও এটি সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত মুম্বাইয়ের রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ি যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড ছড়ায় তা থেকে মুক্তি মিলবে এই আকাশ পথ ব্যবহারের ফলে ভারতের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর লক্ষ্যে এটি এক বড় পদক্ষেপ সরকার জানিয়েছে এই ভার্টিপোর্টগুলোর বিদ্যুতের জোগান দেওয়া হবে সৌরশক্তি বা অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে
খরচ এবং সাধারণ মানুষের নাগাল
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে এই অত্যাধুনিক পরিষেবা কি সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকবে শুরুতে এর ভাড়া কিছুটা বেশি রাখা হয়েছে বর্তমানে এটি উবার বা ওলার মতো অ্যাপ ভিত্তিক এয়ার ট্যাক্সি পরিষেবা হিসেবে চালু হয়েছে নারিমান পয়েন্ট থেকে বিমানবন্দর যেতে খরচ পড়বে প্রায় ৩০০০ টাকা যা সাধারণ ট্যাক্সির ভাড়ার চেয়ে ৫ গুণ বেশি
তবে সরকার এবং টাটা গ্রুপ জানিয়েছে এটি কেবল শুরু তাদের লক্ষ্য হলো আগামী ৫ বছরের মধ্যে এই ভাড়াকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা যখন আরও বেশি সংখ্যক গরুড় আকাশে উড়বে এবং প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে তখন খরচ অনেক কমে যাবে সরকার এই পরিষেবার ওপর প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তুকি দেওয়ার কথাও ভাবছে যাতে মধ্যবিত্ত মানুষও এর সুবিধা নিতে পারেন
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং অন্যান্য শহর
মুম্বাই হলো এই প্রকল্পের পাইলট সিটি বা পরীক্ষামূলক শহর এখানে সাফল্য পেলে আগামী ২ বছরের মধ্যে দিল্লি ব্যাঙ্গালুরু হায়দ্রাবাদ এবং চেন্নাইয়ের মতো অন্য মেট্রো শহরগুলোতেও এই পরিষেবা চালু করা হবে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ১০০টি শহরকে স্কাই সিটিতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে
এছাড়াও কেবল যাত্রী পরিবহন নয় ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত পণ্য পরিবহন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অন্য অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে যখন দ্রুত এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে অঙ্গ নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয় তখন গরুড় জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করতে পারে
চ্যালেঞ্জ এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া
যেকোনো নতুন প্রযুক্তি আসার সাথে সাথে কিছু চ্যালেঞ্জ এবং ভয়ও আসে অনেকের মনে প্রশ্ন আকাশে যদি এত গাড়ি ওড়ে তবে কি আমাদের বাড়ির গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি নষ্ট হবে না জানলার পাশ দিয়ে উড়ন্ত গাড়ি গেলে কি অস্বস্তি হবে না
এই বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন স্কাই করিডরগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে তা আবাসিক এলাকার সরাসরি ওপর দিয়ে না যায় মূলত বড় রাস্তা নদী বা সমুদ্রের ওপর দিয়ে এই রুটগুলো তৈরি করা হয়েছে এছাড়াও গরুড় যানের জানলায় বিশেষ ধরনের গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে যা বাইরে থেকে ভেতরে দেখা গেলেও ভেতর থেকে বাইরে নিচের দিকে তাকানো কঠিন করে তোলে
সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম এই নতুন প্রযুক্তিতে দারুণ উচ্ছ্বসিত তারা একে ভবিষ্যতের ভারত বলে মনে করছেন অন্যদিকে প্রবীণ নাগরিকদের একাংশ কিছুটা শঙ্কিত তারা বলছেন মাটির ঝামেলা এবার আকাশেও পৌঁছাল তবে প্রথম দিন যারা এই যাত্রা করেছেন তারা তাদের অভিজ্ঞতাকে অবিস্মরণীয় বলে বর্ণনা করেছেন
উপসংহার
২০২৬ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি দিনটি ভারতের ইতিহাসে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিল মানুষ এতদিন মাটিকে জয় করেছে জলকে জয় করেছে এবার মানুষ তার প্রতিদিনের চলাচলের জন্য আকাশকে জয় করল গরুড় কেবল একটি উড়ন্ত গাড়ি নয় এটি হলো ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক এটি প্রমাণ করে যে ভারত আর উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তি নকল করে না বরং ভারত এখন নিজেই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে বিশ্বকে পথ দেখায় মুম্বাইয়ের আকাশে আজ যে নতুন সূর্যোদয় হলো তা আগামী দিনে সারা ভারতকে এক নতুন গতি এবং নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে ট্রাফিক জ্যামের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা এখন এক মুক্ত আকাশের বাসিন্দা জয় হিন্দ