হোয়াট্সঅ্যাপে নতুন ধরনের বিপজ্জনক স্ক্যাম ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে আপনার পাঠানো একটি সাধারণ ছবি ব্যবহার করেই সাইবার অপরাধীরা প্রতারণা চালাতে পারে। ছবি এডিট বা ভুয়ো পরিচয় তৈরি করে আর্থিক ক্ষতি ও ব্যক্তিগত তথ্য চুরির আশঙ্কা বাড়ছে। কী ভাবে এই স্ক্যাম কাজ করে এবং কোন কোন সতর্কতা নিলে নিরাপদ থাকা সম্ভব জেনে নিন বিস্তারিত।
বর্তমান যুগে স্মার্টফোন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যোগাযোগ, কাজ, ব্যবসা, ব্যক্তিগত কথোপকথন থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেন—সবকিছুই এখন একটি ছোট ডিভাইসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই বাস্তবতায় হোয়াট্সঅ্যাপ হয়ে উঠেছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু সেই বিশ্বাসকেই পুঁজি করে সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ফাঁদ তৈরি করছে। সম্প্রতি বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে হোয়াট্সঅ্যাপের একটি নতুন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক স্ক্যাম—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ঘোস্ট-পেয়ারিং’। এই প্রতারণা এতটাই নিঃশব্দ ও নিখুঁত যে, ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না কখন তাঁর নিজের হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট অন্য কারও নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে।
এই স্ক্যামের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল, এতে আক্রান্ত ব্যক্তির ফোন হাতে নেওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। হ্যাকাররা দূর থেকেই আপনার হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের একটি সম্পূর্ণ প্রতিলিপি বা ক্লোন তৈরি করে নেয়। এরপর তারা আপনার পরিচয় ব্যবহার করে আপনারই বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে এই ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ আদায়, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেলিং বা এমনকি অপরাধমূলক কাজও করা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এই পুরো প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে আপনার অজান্তেই। আপনি হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহার করছেন, অথচ একই সময়ে অন্য কোথাও আপনার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে অপরাধীরা।
‘ঘোস্ট-পেয়ারিং’ মূলত হোয়াট্সঅ্যাপের ‘লিঙ্কড ডিভাইস’ ফিচারের অপব্যবহার। এই ফিচারটি মূলত ব্যবহারকারীদের সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যাতে মোবাইল ছাড়াও কম্পিউটার বা ল্যাপটপে হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহার করা যায়। সাধারণত এর জন্য মোবাইল থেকে একটি কিউআর কোড স্ক্যান করতে হয়। কিন্তু প্রতারকরা কৌশলে এই কিউআর কোড স্ক্যান করার অনুমতি ব্যবহারকারীর কাছ থেকেই আদায় করে নেয়। একবার সেই অনুমতি মিললেই, হ্যাকারদের ডিভাইস আপনার হোয়াট্সঅ্যাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই সংযুক্তিকরণ বা পেয়ারিং এতটাই নিঃশব্দে ঘটে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারী কোনও সতর্কবার্তা বা সন্দেহজনক আচরণ লক্ষ্য করেন না।
এই স্ক্যামের ফাঁদ সাধারণত শুরু হয় অত্যন্ত পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য একটি উপায়ে। আপনার পরিচিত কারও নম্বর থেকে একটি ছবি বা লিঙ্ক পাঠানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে সেই ছবিটি আপনার নিজেরই কোনও ছবি, যা আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল থেকে সংগ্রহ করা। ছবিটির সঙ্গে লেখা থাকে কোনও সাধারণ বার্তা—যেমন এই ছবিটি নিয়ে কিছু তথ্য যাচাই করতে হবে, অথবা ছবিটি কোথা থেকে পাওয়া গিয়েছে তা জানতে একটি লিঙ্কে ক্লিক করতে বলা হয়। যেহেতু নম্বরটি পরিচিত, তাই সন্দেহ না করেই অনেকেই সেই লিঙ্কে ক্লিক করে বসেন।
লিঙ্কে ক্লিক করলেই একটি ভুয়ো ওয়েবপেজ খুলে যায়, যা দেখতে একেবারে হোয়াট্সঅ্যাপ বা কোনও পরিচিত পরিষেবার মতো। সেখানে বলা হয় ভেরিফিকেশনের জন্য একটি কোড দিতে হবে। আপনাকে ফোন নম্বর, নাম বা ইমেল আইডি দেওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করা হয়। তথ্য দেওয়ার পর আপনার ফোনে একটি কোড আসে। এই কোডটিই আসলে হোয়াট্সঅ্যাপের লগইন বা লিঙ্কড ডিভাইস অথেনটিকেশন কোড। আপনি যদি সেটি ওয়েবপেজে লিখে দেন, তাহলেই হ্যাকারদের হাতে চলে যায় আপনার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ। এই পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যায়।
এরপর শুরু হয় আসল বিপদ। আপনার হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের একটি ক্লোন তৈরি করে নেয় অপরাধীরা। তারা আপনার সমস্ত চ্যাট পড়তে পারে, কনট্যাক্ট লিস্ট ডাউনলোড করতে পারে এবং একে একে আপনার পরিচিতদের কাছে বার্তা পাঠাতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি বিপদের গল্প ফেঁদে টাকা চাওয়া হয়। কোথাও আবার বিনিয়োগের প্রলোভন, কোথাও লোভনীয় অফার বা কুপনের ফাঁদ। যেহেতু বার্তাগুলি আপনার নম্বর থেকেই যাচ্ছে, তাই অনেকেই বিশ্বাস করে ফেলেন। এর ফলে শুধু আপনিই নন, আপনার পরিচিতরাও প্রতারণার শিকার হন।
এই স্ক্যামের আর একটি মারাত্মক দিক হল গোপনীয়তা লঙ্ঘন। ব্যক্তিগত ছবি, নথি, কথোপকথন—সবকিছুই হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে। অনেক সময় এই তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেলিং করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে এই তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রিও করা হয়। এমনকি আপনার ফোনে থাকা অন্যান্য অ্যাপ, ইমেল বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টেও নজরদারি চালানো সম্ভব হয়ে ওঠে। একবার ম্যালঅয়্যার ঢুকে পড়লে পুরো ডিভাইসটাই কার্যত ঝুঁকির মধ্যে চলে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের স্ক্যাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ মানুষের অসচেতনতা ও অতিরিক্ত বিশ্বাস। পরিচিত নম্বর থেকে আসা বার্তাকে আমরা স্বাভাবিক ভাবেই নিরাপদ মনে করি। কিন্তু সাইবার অপরাধীরা এখন সেই বিশ্বাসকেই অস্ত্র বানাচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার পদ্ধতিও আরও সূক্ষ্ম ও জটিল হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও অবস্থাতেই হোয়াট্সঅ্যাপের ভেরিফিকেশন কোড অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না। হোয়াট্সঅ্যাপ কখনওই মেসেজ বা কল করে এই কোড চাইবে না। কোনও লিঙ্কে ক্লিক করে কোড দেওয়ার অনুরোধ এলে সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণা বলে ধরে নিতে হবে। পরিচিত নম্বর হলেও সন্দেহ করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া নিয়মিত ভাবে হোয়াট্সঅ্যাপের ‘লিঙ্কড ডিভাইস’ অপশনটি চেক করা উচিত। সেখানে গিয়ে দেখতে হবে আপনার অ্যাকাউন্টের সঙ্গে কোনও অচেনা ডিভাইস যুক্ত রয়েছে কি না। যদি থাকে, সঙ্গে সঙ্গে সেটি লগ আউট করতে হবে। ব্যবহারের পর কম্পিউটার বা ল্যাপটপে খোলা হোয়াট্সঅ্যাপ ওয়েব অবশ্যই লগ আউট করা প্রয়োজন।
হোয়াট্সঅ্যাপে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেস আইডি লক চালু রাখাও অত্যন্ত কার্যকর একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। এতে কেউ আপনার ফোন হাতে পেলেও সহজে অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারবে না। একই সঙ্গে ফোনের অপারেটিং সিস্টেম এবং হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাপটি নিয়মিত আপডেট রাখা জরুরি, কারণ নতুন আপডেটে অনেক সময় নিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটি ঠিক করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ব্যবহারকারীর সচেতনতা। বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধীরা মানুষের কৌতূহল এবং বিশ্বাসকেই তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই কোনও ছবি, ভিডিও বা লিঙ্ক দেখেই আবেগের বশে বা কৌতূহল থেকে তাতে ক্লিক করা একেবারেই উচিত নয়। বিশেষ করে যদি সেই লিঙ্কের সঙ্গে বিনামূল্যে রিচার্জ, আকর্ষণীয় পুরস্কার, লাকি ড্র, বড় ছাড় কিংবা জরুরি কোনও বার্তার ইঙ্গিত থাকে, তবে আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় এই ধরনের বার্তা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ভাবে তৈরি করা হয় যে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারেন না, এটি আসলে একটি প্রতারণার ফাঁদ।
পরিচিত নম্বর থেকে আসা বার্তা হলেও অন্ধভাবে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ সাইবার অপরাধীরা এখন পরিচিত মানুষের পরিচয় নকল করেও বার্তা পাঠাতে সক্ষম। এমন পরিস্থিতিতে কোনও লিঙ্কে ক্লিক করার আগে বা কোনও তথ্য দেওয়ার আগে সরাসরি ফোন করে যাচাই করা সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। যিনি বার্তাটি পাঠিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তিনি সত্যিই সেই বার্তার প্রেরক কি না, তা নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক মুহূর্তের যাচাই আপনাকে বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
ঘোস্ট-পেয়ারিং স্ক্যাম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনও সফটওয়্যার নয়, বরং ব্যবহারকারীর নিজস্ব সচেতনতা। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সাইবার অপরাধীরাও ততই নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করছে। আজ যে পদ্ধতিটি জানা আছে, কালই তার আরও আধুনিক ও নিঃশব্দ সংস্করণ সামনে আসতে পারে। তাই শুধুমাত্র অ্যাপের উপর ভরসা করে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। নিজের ডিজিটাল অভ্যাসের দিকেও সমান নজর রাখা প্রয়োজন।
এক মুহূর্তের অসাবধানতা যে কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা এই ধরনের স্ক্যামের ঘটনায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। বহু মানুষ নিজের জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছেন, ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য হাতছাড়া করেছেন, এমনকি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে। হোয়াট্সঅ্যাপ বা অন্য কোনও ডিজিটাল মাধ্যম শুধু যোগাযোগের উপকরণ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত পরিচয়, গোপনীয়তা এবং আর্থিক নিরাপত্তা।
তাই হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহার মানেই শুধু চ্যাট করা বা ছবি আদানপ্রদান করা নয়। এর সঙ্গে নিজের ডিজিটাল পরিচয়কে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বও জড়িয়ে রয়েছে। সচেতন থাকা, সন্দেহজনক কিছু দেখলেই থেমে যাওয়া, যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়া—এই কয়েকটি অভ্যাসই পারে আপনাকে বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে। ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদ থাকার একমাত্র উপায় হল সতর্ক থাকা, কারণ এখানে সামান্য ভুলের খেসারত অনেক বড় হতে পারে।