Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভারতের প্রথম কৃত্রিম বৃষ্টির শহর নিউটাউন তাপপ্রবাহ কমাতে বসল ক্লাউড সিডিং টাওয়ার এবং জলের সংকট মেটাতে এক অভিনব উদ্যোগ

তীব্র গরমে যখন পুড়ছে গোটা দক্ষিণবঙ্গ তখন নিউটাউনে আজ বিকেলেই নামল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। প্রকৃতির খেয়াল নয় বরং বিজ্ঞানের জাদুতে এই অসাধ্য সাধন হলো। ভারতের প্রথম স্মার্ট রেইন সিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল নিউটাউন। শহরের বুকে বসানো হলো পাঁচটি বিশাল আয়োনাইজেশন টাওয়ার যা ইচ্ছেমতো মেঘ তৈরি করে বৃষ্টি নামাতে সক্ষম। এই প্রযুক্তির ফলে গরমে আর কষ্ট পেতে হবে না শহরবাসীকে এবং মিটবে জলের ঘাটতি।

ভারতের প্রথম কৃত্রিম বৃষ্টির শহর নিউটাউন তাপপ্রবাহ কমাতে বসল ক্লাউড সিডিং টাওয়ার এবং জলের সংকট মেটাতে এক অভিনব উদ্যোগ
Environment & Geoscience

বাইরে তখন তাপমাত্রার পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁই ছুঁই করছে। চড়া রোদে রাস্তাঘাট ফাঁকা এবং গরম হাওয়ায় যেন শরীর পুড়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়েই নিউটাউনের আকাশ কালো করে মেঘ জমতে শুরু করল এবং বিকেল ৪টে বাজতে না বাজতেই নামল মুষলধারে বৃষ্টি। অবাক করা বিষয় হলো আশেপাশের এলাকা যেমন সল্টলেক বা উল্টোডাঙায় তখনো কড়া রোদ। এই বৃষ্টি কোনো কালবৈশাখী ঝড় নয় বা নিম্নচাপের বৃষ্টি নয়। এটি হলো মানুষের তৈরি বৃষ্টি বা কৃত্রিম বৃষ্টি। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো শহর নিজস্ব প্রযুক্তিতে নিজের আকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলো। নিউটাউন আজ থেকে পরিচিত হলো ভারতের প্রথম কৃত্রিম বৃষ্টির শহর বা রেইন সিটি হিসেবে।

নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা এনকেডিএ এবং আইআইটি কানপুরের যৌথ উদ্যোগে এই মেগা প্রজেক্টটি বাস্তবায়িত হয়েছে। আজ দুপুরে রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং পরিবেশ মন্ত্রী নিউটাউনের ইকো পার্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। তারা একটি রিমোটের বোতাম টিপতেই শহরের পাঁচটি ভিন্ন প্রান্তে বসানো বিশাল আকারের টাওয়ারগুলো কাজ করা শুরু করে এবং মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফল হাতেনাতে পাওয়া যায়।

প্রযুক্তির নাম ক্লাউড আয়োনাইজেশন

সাধারণত আমরা জানি কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরাতে গেলে বিমানের সাহায্যে মেঘের ওপর সিলভার আয়োডাইড বা ড্রাই আইস ছড়াতে হয় যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। কিন্তু নিউটাউনে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। এর নাম ক্লাউড আয়োনাইজেশন প্রযুক্তি।

আইআইটি কানপুরের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন শহরের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ১০০ ফুট উঁচু স্টিলের টাওয়ার বসানো হয়েছে। এই টাওয়ারগুলো দেখতে অনেকটা মোবাইল টাওয়ারের মতো কিন্তু এর মাথায় রয়েছে একটি বিশেষ ছাতার মতো অ্যান্টেনা। এই অ্যান্টেনাগুলো থেকে বায়ুমন্ডলে কোটি কোটি ঋণাত্মক আয়ন বা নেগেটিভ আয়ন এবং চার্জড পার্টিকল বা আধানযুক্ত কণা নির্গত করা হয়। এই কণাগুলো বাতাসের ধূলিকণা এবং জলীয় বাষ্পকে আকর্ষণ করে। নিউটাউনের বাতাসে থাকা আর্দ্রতা বা হিউমিডিটি এই আয়নগুলোর টানে এক জায়গায় জমা হতে শুরু করে এবং কৃত্রিম মেঘ তৈরি হয়। যখন এই মেঘ ভারী হয়ে যায় তখন তা বৃষ্টির আকারে নিচে ঝরে পড়ে।

কেন এই উদ্যোগ

গত কয়েক বছর ধরে কলকাতায় গরমের দাপট অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কংক্রিটের জঙ্গল বা আরবান হিট আইল্যান্ড এফেক্টের কারণে নিউটাউন এবং রাজারহাট এলাকায় তাপমাত্রা কলকাতার অন্যান্য অংশের চেয়ে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি বেশি থাকে। গাছপালা কমে যাওয়া এবং জলাশয় ভরাট হওয়ার ফলে এই সমস্যা আরও বেড়েছে। এসি চালিয়েও ঘর ঠান্ডা করা যাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে শহরকে ঠান্ডা রাখার একমাত্র উপায় ছিল বৃষ্টি। কিন্তু প্রকৃতির ওপর তো আর মানুষের হাত নেই। তাই বিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হয়েছিল সরকার।

এছাড়াও ভূগর্ভস্থ জলস্তর বা গ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল কমে যাওয়া নিউটাউনের একটি বড় সমস্যা। এই কৃত্রিম বৃষ্টির জল রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং বা জল সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে মাটির নিচে পাঠানো হবে। এর ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব হবে। একদিকে গরম কমবে এবং অন্যদিকে জলের ভাণ্ডার বাড়বে।

খরচ এবং কার্যকারিতা

এনকেডিএ সূত্রে খবর এই পুরো প্রজেক্টের জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। দুবাই বা আবু ধাবিতে এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুফল পাওয়া গেছে। তবে ভারতের মতো ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল আবহাওয়ায় এটি কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। আজকের সফল পরীক্ষার পর সেই সন্দেহ দূর হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই টাওয়ারগুলো চালাতে খুব বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না এবং এতে কোনো ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না তাই পরিবেশের কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

প্রতিটি টাওয়ার প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বৃষ্টি নামাতে পারে। নিউটাউনের অ্যাকশন এরিয়া ১ অ্যাকশন এরিয়া ২ এবং অ্যাকশন এরিয়া ৩ এর বিভিন্ন জায়গায় এই টাওয়ারগুলো বসানো হয়েছে যাতে পুরো শহরটিই কভার করা যায়। তবে বৃষ্টি নামানোর জন্য বাতাসে অন্তত ৪০ শতাংশ আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প থাকা প্রয়োজন। সৌভাগ্যবশত কলকাতার বাতাসে জলীয় বাষ্পের অভাব নেই তাই এই প্রযুক্তি এখানে খুব ভালো কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া

বিকেলের এই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির পর নিউটাউনের বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে উল্লাস করতে শুরু করেন। শিশুদের দেখা যায় বৃষ্টির জলে ভিজতে এবং ফুটবল খেলতে। বিশ্ব বাংলা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এক কলেজ ছাত্র বলেন আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে আমরা এখন আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। একটু আগেই গরমে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল আর এখন কী সুন্দর ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন দার্জিলিং এ আছি।

ইকো স্পেসের এক আইটি কর্মী বলেন অফিস থেকে বেরোনোর সময় ছাতা আনিনি কারণ আবহাওয়া দপ্তরে বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস ছিল না। কিন্তু এই ভিজে যাওয়াটা আমার কাছে খুব আনন্দের। গরম থেকে তো বাঁচলাম।

বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

news image
আরও খবর

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর তড়িৎ রায় চৌধুরী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় আমাদের এই ধরনের অভিযোজন বা অ্যাডাপ্টেশন প্রযুক্তির দিকেই যেতে হবে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে এই প্রযুক্তি যেন অতিরিক্ত ব্যবহার না করা হয়। প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দে বেশি হস্তক্ষেপ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন যে শুধুমাত্র তাপপ্রবাহ বা খরার সময়ই যেন এই টাওয়ারগুলো চালানো হয়।

সরকার জানিয়েছে যদি নিউটাউনের এই মডেল সফলভাবে চলতে থাকে তবে আগামী দিনে বাঁকুড়া পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামের মতো খরাপ্রবণ জেলাগুলোতেও এই টাওয়ার বসানো হবে। কৃষিকাজের জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটিতে যদি বছরে কয়েকবার কৃত্রিম বৃষ্টি নামানো যায় তবে সেখানেও সোনার ফসল ফলবে।

দূষণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা

এই কৃত্রিম বৃষ্টির আরেকটি বড় সুবিধা হলো দূষণ নিয়ন্ত্রণ। শীতে যখন কলকাতার আকাশ ধোঁয়াশা বা স্মগ এ ঢেকে যায় এবং বাতাসের গুণমান বা একিউআই বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছায় তখন এই কৃত্রিম বৃষ্টি বাতাসের বিষাক্ত ধূলিকণা ধুয়ে পরিষ্কার করে দিতে পারবে। দিল্লির মতো দূষণ সমস্যা মোকাবিলায় এটি একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। আজ বৃষ্টির পর নিউটাউনের বাতাস অনেক বেশি পরিষ্কার এবং সতেজ মনে হচ্ছে। গাছের পাতাগুলো থেকে ধুলো সরে গিয়ে ঝকঝকে সবুজ রং বেরিয়ে এসেছে।

পর্যটনের নতুন আকর্ষণ

নিউটাউন এমনিতেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। ইকো পার্ক মোমবাতি মিউজিয়াম এবং বিশ্ব বাংলা গেটের টানে মানুষ এখানে আসেন। এবার কৃত্রিম বৃষ্টি পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠবে। এনকেডিএ পরিকল্পনা করছে যে প্রতি শনি ও রবিবার বিকেলে নির্দিষ্ট সময়ে ইকো পার্কে রেইন শো বা বৃষ্টি উৎসব আয়োজন করা হবে। পর্যটকরা জানবেন যে ঠিক বিকেল ৫টায় বৃষ্টি হবে এবং তারা সেই অনুযায়ী আনন্দ করতে পারবেন। এটি শহরের পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

অর্থনৈতিক লাভ

দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভ অপরিসীম। গরম কমলে এসির ব্যবহার কমবে ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। জলের ট্যাঙ্ক বা জলের গাড়ি ডাকার খরচ কমবে। শহরের পরিবেশ ভালো থাকলে মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়বে এবং অসুস্থতা কমবে। সব মিলিয়ে এটি একটি সুস্থায়ী উন্নয়ন বা সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট এর মডেল।

চ্যালেঞ্জ এবং রক্ষণাবেক্ষণ

তবে এই টাওয়ারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঝড়ে বা বজ্রপাতে যাতে অ্যান্টেনাগুলোর ক্ষতি না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। এছাড়াও এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করতে কড়া প্রোটোকল বা নিয়মাবলী তৈরি করা হয়েছে। কখন এবং কতটা বৃষ্টি নামানো হবে তা ঠিক করবে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। কারণ অকারণে বৃষ্টি নামলে ট্রাফিক জ্যাম বা জলমগ্নতার সমস্যা তৈরি হতে পারে। আজকের বৃষ্টিতে অবশ্য নিকাশি ব্যবস্থা ভালো থাকায় জল জমেনি।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

নিউটাউনের এই সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও সাড়া ফেলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ বা ইউনাইটেড নেশনস এর পরিবেশ বিভাগ বা ইউএনইপি থেকে রাজ্য সরকারকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। আগামী মাসে জাপানে অনুষ্ঠিত হতে চলা স্মার্ট সিটি সামিটে নিউটাউনের প্রতিনিধি দলকে এই প্রকল্পের প্রেজেন্টেশন দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ভারত যে প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে নেই তা আরও একবার প্রমাণিত হলো।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি দিনটি প্রমাণ করল যে সদিচ্ছা এবং বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটালে মরুভূমিতেও ফুল ফোটানো সম্ভব। নিউটাউনের আকাশে আজ যে মেঘ জমল তা কেবল জলীয় বাষ্পের মেঘ নয় তা হলো আশার মেঘ। এই বৃষ্টি ধুয়ে দিক সমস্ত ক্লান্তি মুছে দিক খরা এবং তাপপ্রবাহের অভিশাপ। মানুষ এতদিন প্রকৃতির কাছে অসহায় ছিল আজ মানুষ প্রকৃতির বন্ধু হয়ে তাকে নতুন রূপ দিল। নিউটাউনের এই নীল টাওয়ারগুলো এখন আশার স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী দিনে হয়তো বাংলার প্রতিটি শহরের আকাশেই এমন মেঘ জমানোর যন্ত্র থাকবে এবং বৃষ্টির জন্য আর চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। রিমোটের বোতাম টিপলেই আকাশ ঝরবে ধারায়। বিজ্ঞানকে স্যালুট এবং নিউটাউনকে অভিনন্দন এই ঐতিহাসিক যাত্রার জন্য।

Preview image