চিনের হেনান প্রদেশের জিগুতে খননে মিলেছে প্রায় ২,৬০০ প্রস্তর অস্ত্র, যার কয়েকটিতে ছিল হাতল—আধুনিক মানবের প্রাচীন প্রযুক্তি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে এই আবিষ্কার।
পাথর কেটে তৈরি ধারালো ফলা, যার সঙ্গে যুক্ত কাঠের হাতল—দেখতে প্রায় আধুনিক বর্শা বা ছুরির মতো। কিন্তু এগুলি আধুনিক যুগের নয়। বরং প্রায় এক লক্ষ ৬০ হাজার বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল এই অস্ত্রগুলি। আরও চমকপ্রদ বিষয় হল, এই অস্ত্রগুলির সন্ধান মিলেছে আজকের চিনের ভূখণ্ডে, মধ্য চিনের হেনান প্রদেশের জিগু এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে যে ধারণা প্রচলিত ছিল, পূর্ব এশিয়ার আদিম মানুষ প্রযুক্তিগত দিক থেকে আফ্রিকা ও ইউরোপের তুলনায় পিছিয়ে ছিল, এই আবিষ্কার সেই ধারণাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে।
২০১৭ সালে জিগু অঞ্চলে খনন চালিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদদের একটি দল প্রায় ২,৬০০টি প্রস্তর নির্মিত অস্ত্র উদ্ধার করে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটিতে স্পষ্টভাবে কাঠের হাতলের চিহ্ন পাওয়া গেছে অথবা পাথরের ফলাকে কাঠের লাঠির সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। বহু বছরের বিশ্লেষণ ও গবেষণার পর সেই আবিষ্কারের ফলাফল প্রকাশিত হয় ২৭ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস-এ। গবেষণাটি মানব বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রচলিত ধারণায় ধাক্কা
দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নতত্ত্ববিদদের একাংশ মনে করতেন, আধুনিক প্রস্তর প্রযুক্তির সূচনা হয়েছিল আফ্রিকা ও ইউরোপে। সেখানে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে থেকেই জটিল অস্ত্র, যন্ত্র তৈরি হতে শুরু করেছিল। সেই তুলনায় পূর্ব এশিয়ার আদিম মানুষ অপেক্ষাকৃত সরল অস্ত্র ব্যবহার করত—যেমন বড় আকারের পাথরের হাতিয়ার, যার সঙ্গে কাঠের হাতল জোড়ার প্রমাণ খুব কমই মিলত। ফলে ধারণা তৈরি হয়েছিল, পূর্ব এশিয়া প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল।
কিন্তু জিগু অঞ্চলের এই আবিষ্কার সেই দীর্ঘদিনের ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গবেষকদের মতে, চিন থেকে উদ্ধার হওয়া এই অস্ত্রগুলি শুধু ধারালোই নয়, এগুলির নকশা ও গঠন এতটাই উন্নত যে সেগুলিকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় ফেলাই যুক্তিযুক্ত। বিশেষ করে পাথরের ফলার সঙ্গে কাঠের হাতল যুক্ত করার কৌশলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু অস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায়নি, বরং মানব মস্তিষ্কের পরিকল্পনাশক্তি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতারও পরিচয় দেয়।
কীভাবে আবিষ্কার হল অস্ত্রগুলি?
২০১৭ সালে চিনের হেনান প্রদেশের জিগু এলাকায় একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খনন অভিযানের সময় প্রথম এই অস্ত্রগুলির সন্ধান পাওয়া যায়। মাটি খুঁড়ে গবেষকরা একে একে প্রায় ২,৬০০টি প্রস্তর হাতিয়ার উদ্ধার করেন। প্রথমে সেগুলিকে সাধারণ প্রস্তর অস্ত্র বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার মধ্যে কয়েকটিতে স্পষ্টভাবে কাঠের হাতলের চিহ্ন রয়েছে বা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কাঠের লাঠির সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহার করা যায়।
এর পর শুরু হয় দীর্ঘ পরীক্ষানিরীক্ষা। অস্ত্রগুলির বয়স নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় আধুনিক ডেটিং প্রযুক্তি। পাশাপাশি মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয় পাথরের ধার, কাঠের অংশের চিহ্ন এবং ব্যবহারজনিত ক্ষয়ক্ষতি। সব মিলিয়ে গবেষকরা নিশ্চিত হন যে, এই অস্ত্রগুলি প্রায় ৭২ হাজার থেকে এক লক্ষ ৬০ হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল।
এই সময়কাল মানব ইতিহাসের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ঠিক এই সময়েই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানব বিবর্তনের নানা শাখা বিস্তার লাভ করছিল। আধুনিক মানুষ বা হোমো সোপিয়েন্স, ডেনিসোভান, নিয়ান্ডারথালসহ একাধিক মানব প্রজাতি তখন সহাবস্থান করছিল বিভিন্ন ভূখণ্ডে। ফলে এই অস্ত্রগুলি ঠিক কোন মানব প্রজাতি তৈরি করেছিল, তা নির্ধারণ করাও গবেষকদের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এই অস্ত্রগুলি ‘আধুনিক’?
প্রশ্ন উঠতে পারে—কীভাবে কয়েক লক্ষ বছর আগের অস্ত্রকে ‘আধুনিক’ বলা হচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অস্ত্রগুলির গঠন ও ব্যবহার পদ্ধতিতে। সাধারণ প্রস্তর হাতিয়ার সাধারণত বড় আকারের হত, হাতে ধরে ব্যবহার করা হত এবং সেগুলির নকশা তুলনামূলকভাবে সরল ছিল। কিন্তু জিগু অঞ্চলের এই অস্ত্রগুলি আকারে ছোট—প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২ ইঞ্চির (৫০ মিলিমিটার) কম—তবু গঠন অত্যন্ত জটিল।
এই অস্ত্রগুলিতে পাথরের ধারালো ফলাকে কাঠের হাতলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই হাতল অস্ত্র ব্যবহারে লিভারের কাজ করত। এর ফলে শিকার ধরতে বা আঘাত হানতে কম শক্তি প্রয়োগ করেই বেশি কার্যকারিতা পাওয়া যেত। অর্থাৎ, এই অস্ত্রগুলি শুধু ধারালো নয়, বরং প্রকৌশলগত দিক থেকেও উন্নত।
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ সেন্টার ফর হিউম্যান ইভলিউশনের নির্দেশক ও গবেষক দলের অন্যতম সদস্য মাইকেল পেট্রাগলিয়া জানিয়েছেন, “এই অস্ত্রগুলির নকশা থেকে বোঝা যায়, এগুলি পরিকল্পনা করে ধাপে ধাপে তৈরি করা হয়েছে। যারা এগুলি বানিয়েছিল, তাদের দূরদৃষ্টি ছিল। তারা শুধু বর্তমান প্রয়োজন নয়, ভবিষ্যতের ব্যবহারের কথাও ভেবেছিল।”
এই বক্তব্য মানব বিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—প্রযুক্তিগত দক্ষতা শুধু হাতিয়ার বানানোর ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা পরিকল্পনা, পূর্বানুমান ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।
হোমো সোপিয়েন্স না অন্য কেউ?
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন হল—এই অস্ত্রগুলি কি আধুনিক মানুষ বা হোমো সোপিয়েন্স তৈরি করেছিল? না কি এগুলি তৈরি করেছিল অন্য কোনও আদিম মানব প্রজাতি?
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ও ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বেন মারউইক জানিয়েছেন, এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। কারণ, ওই সময় পূর্ব এশিয়ায় একাধিক মানব প্রজাতির অস্তিত্ব ছিল। তার মধ্যে থাকতে পারে ডেনিসোভান, হোমো লঞ্জি, হোমো জুলুয়েনসিস এবং সম্ভবত আধুনিক মানুষও।
ডেনিসোভানদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহা থেকে, কিন্তু জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের প্রভাব পূর্ব এশিয়ার বহু আধুনিক মানুষের মধ্যেও রয়েছে। হোমো লঞ্জি বা তথাকথিত ‘ড্রাগন ম্যান’-এর জীবাশ্মও চিনে আবিষ্কৃত হয়েছে। ফলে পূর্ব এশিয়া যে মানব বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, তা ক্রমশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে জিগু অঞ্চলের অস্ত্রগুলি শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকে নয়, মানব প্রজাতির বিবর্তন ও বিস্তার বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে।
পূর্ব এশিয়ার মানুষ কি সত্যিই পিছিয়ে ছিল?
দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ইউরো-আফ্রিকান কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছিল মানব ইতিহাসের গবেষণায়। তাতে মনে করা হত, আধুনিক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মূলত আফ্রিকা ও ইউরোপেই প্রথম ঘটেছিল। পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলকে সেই তুলনায় পিছিয়ে রাখা হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে একের পর এক আবিষ্কার এই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জিগু অঞ্চলের অস্ত্রগুলি সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ সংযোজন। এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে, প্রায় এক লক্ষ ৬০ হাজার বছর আগেই পূর্ব এশিয়ার মানুষ জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম ছিল। তারা শুধু পাথর কেটে হাতিয়ার বানাত না, বরং কাঠের মতো অন্যান্য উপকরণও ব্যবহার করত এবং সেগুলিকে একত্রিত করে কার্যকর অস্ত্র তৈরি করত।
এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতারও ইঙ্গিত দেয়। শিকার ধরার জন্য উন্নত অস্ত্র থাকা মানে শুধু খাদ্য সংগ্রহ সহজ হওয়া নয়, বরং সামাজিক সংগঠন, দলগত শিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাওয়া।
অস্ত্রগুলির ব্যবহার কী ছিল?
গবেষকদের মতে, এই অস্ত্রগুলি মূলত শিকারের কাজে ব্যবহার করা হত। পাথরের ধারালো ফলার সঙ্গে কাঠের হাতল যুক্ত থাকায় এগুলি সম্ভবত বর্শা বা ছুরির মতো ব্যবহার করা হত। ছোট আকারের হওয়ায় এগুলি নিক্ষেপযোগ্যও হতে পারে। অর্থাৎ, শিকার ধরার সময় দূর থেকে প্রাণীর দিকে ছুড়ে মারার সুবিধাও থাকতে পারে।
এ ছাড়া, এই অস্ত্রগুলি শুধু শিকারের কাজে নয়, দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে ব্যবহৃত হতে পারে—যেমন পশুর চামড়া কাটতে, গাছের ডাল ছাঁটতে বা খাবার প্রস্তুত করতে। এর ফলে বোঝা যায়, এই অস্ত্রগুলি ছিল বহুমুখী এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
পরিকল্পনা ও ধাপে ধাপে নির্মাণ
এই অস্ত্রগুলির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এগুলির নির্মাণ পদ্ধতি। গবেষকদের মতে, এগুলি হঠাৎ করে বা খেয়ালখুশি ভাবে তৈরি হয়নি। বরং পরিকল্পনা করে ধাপে ধাপে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথমে পাথর বেছে নেওয়া হয়েছে, তার পরে নির্দিষ্ট কৌশলে সেটিকে ধারালো ফলায় রূপ দেওয়া হয়েছে। এরপর কাঠের হাতল প্রস্তুত করে সেটির সঙ্গে পাথরের ফলাকে যুক্ত করা হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়া থেকে স্পষ্ট হয়, নির্মাতাদের মধ্যে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয়, বরং একটি সুসংগঠিত চিন্তাভাবনাও ছিল। তারা জানত, কোন ধরনের পাথর বেশি কার্যকর, কীভাবে সেটিকে কাটা উচিত এবং কীভাবে কাঠের সঙ্গে যুক্ত করলে অস্ত্র সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। এই সব কিছুই মানব মস্তিষ্কের জটিল চিন্তাশক্তির পরিচয় দেয়।
পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন
জিগু অঞ্চলের মানুষদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অস্ত্রগুলির ধরন ও নির্মাণ পদ্ধতি থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, তারা মূলত শিকার ধরে ও ফলমূল সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের জীবন ছিল পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। ফলে পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের মধ্যে থাকা স্বাভাবিক।
উন্নত অস্ত্র থাকার অর্থ, তারা বিভিন্ন ধরনের প্রাণী শিকার করতে পারত এবং বিভিন্ন পরিবেশে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারত। এটি মানব বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ, যে মানব গোষ্ঠী নতুন পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে, তারাই সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে ও বিস্তার লাভ করে।
কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁজ নয়; এটি মানব ইতিহাসের বহু পুরনো ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে তিনটি কারণে এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সম্পর্কে ধারণা বদলানো
এত দিন মনে করা হত, আধুনিক প্রযুক্তির সূচনা হয়েছিল মূলত আফ্রিকা ও ইউরোপে। কিন্তু এই আবিষ্কার দেখাচ্ছে, পূর্ব এশিয়াতেও একই সময়ে বা তার কাছাকাছি সময়ে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছিল।
মানব বিবর্তনের বহুকেন্দ্রিক ধারণা এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে, মানব বিবর্তন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হয়তো একক কোনও অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সমান্তরালভাবে এই অগ্রগতি ঘটতে পারে।
আদিম মানব প্রজাতি সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন এই অস্ত্রগুলি কে তৈরি করেছিল—হোমো সোপিয়েন্স, না অন্য কোনও মানব প্রজাতি—এই প্রশ্ন মানব বিবর্তনের ইতিহাসে নতুন গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে।
গবেষকদের প্রতিক্রিয়া
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল পেট্রাগলিয়া জানিয়েছেন, “চিন থেকে পাওয়া এই অস্ত্রগুলি আমাদের দেখাচ্ছে যে, আমরা যেভাবে মানব প্রযুক্তির ইতিহাস কল্পনা করতাম, বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।” তাঁর মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, আধুনিক চিন্তাভাবনা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা হয়তো একাধিক মানব প্রজাতির মধ্যেই বিকশিত হয়েছিল।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেন মারউইক বলেন, “আমরা যে সময়ে মনে করতাম, তার অনেক আগেই জটিল অস্ত্র নির্মাণ শুরু হয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, পূর্ব এশিয়ার মানুষদের এতদিন যেভাবে প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে ভাবা হত, এই আবিষ্কার সেই ধারণাকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে।
নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত গবেষণা
২৭ জানুয়ারি নেচার কমিউনিকেশনস-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই অস্ত্রগুলির বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এর আগে পূর্ব এশিয়া থেকে প্রায় তিন লক্ষ বছর পুরনো কিছু অস্ত্র বা যন্ত্র মিলেছিল, কিন্তু সেগুলির গঠন ছিল তুলনামূলকভাবে সরল। কাঠ ও পাথরের সংমিশ্রণে তৈরি এত পুরনো অস্ত্র এই প্রথম পাওয়া গেল চিন থেকে।
এই গবেষণায় আধুনিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে—যেমন মাইক্রোওয়্যার অ্যানালিসিস, ৩ডি স্ক্যানিং এবং রেডিওমেট্রিক ডেটিং। এগুলির মাধ্যমে অস্ত্রগুলির বয়স, ব্যবহার পদ্ধতি ও নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে বিশদ তথ্য পাওয়া গেছে।
ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে বদল আসবে কি?
এই আবিষ্কার প্রকাশ্যে আসার পর অনেক গবেষকই মনে করছেন, মানব ইতিহাস নিয়ে প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকে হয়তো নতুন করে সংশোধন আনতে হবে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
এত দিন মানব প্রযুক্তির বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে আফ্রিকাকে গুরুত্ব দেওয়া হত—যা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত, কারণ আধুনিক মানুষের উৎপত্তি সেখানেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, অন্যান্য অঞ্চলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঘটেনি। জিগু অঞ্চলের অস্ত্রগুলি প্রমাণ করছে, মানব ইতিহাসের গল্প অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও জটিল।
ভবিষ্যৎ গবেষণার দিকনির্দেশ
এই আবিষ্কার মানব ইতিহাসের গবেষণায় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষকরা হয়তো আরও খনন অভিযান চালাবেন পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, যাতে আরও এমন নিদর্শন পাওয়া যায়। একই সঙ্গে জিনগত গবেষণার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হবে, ওই অঞ্চলের কোন মানব প্রজাতি এই অস্ত্রগুলি তৈরি করেছিল।
এ ছাড়া, এই অস্ত্রগুলির ব্যবহার ও নির্মাণ কৌশল নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রত্নতত্ত্ব (experimental archaeology) চালানো হতে পারে—যেখানে আধুনিক গবেষকরা একই ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে সেই অস্ত্রগুলি তৈরি করার চেষ্টা করবেন, যাতে বোঝা যায় কতটা দক্ষতা ও সময়ের প্রয়োজন ছিল।
আধুনিক মানুষের আত্মপরিচয়ের নতুন দিক
এই আবিষ্কার আমাদের নিজেদের সম্পর্কে ভাবার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিতে পারে। এত দিন আমরা মনে করতাম, আধুনিক মানুষের বিশেষত্ব হল জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার ও পরিকল্পনামূলক চিন্তাভাবনা। কিন্তু যদি দেখা যায়, এই ধরনের দক্ষতা আধুনিক মানুষের আগেও বা পাশাপাশি অন্য মানব প্রজাতির মধ্যেও বিকশিত হয়েছিল, তবে মানবতার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য নতুন করে ভাবতে হবে।
এতে মানব বিবর্তনের গল্প আরও সমৃদ্ধ ও জটিল হয়ে উঠবে। এটি দেখাবে যে, মানব ইতিহাস শুধু একক কোনও রেখায় এগোয়নি, বরং নানা পথে, নানা অঞ্চলে এবং নানা প্রজাতির মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে।