ধাপায় প্রতিদিন প্রায় হাজার টন কঠিন বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে পুরসভা। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জঞ্জাল সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রতিদিন প্রায় হাজার টন কঠিন বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ambitious পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে কলকাতা পুরসভা। শহরের ক্রমবর্ধমান জঞ্জাল সমস্যার স্থায়ী ও পরিবেশবান্ধব সমাধান খুঁজতেই এই প্রকল্পে এগোচ্ছে পুর কর্তৃপক্ষ। জঞ্জাল প্রক্রিয়াকরণ করে যে অপ্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, তা সরকারি বা বেসরকারি বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার গ্রিডে সরবরাহ করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই পুরসভার হাতে এসেছে নতুন ৭৩ হেক্টর জমি। ধাপার বর্তমান ল্যান্ডফিল এলাকার আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ায় সেখানে আর নতুন করে জঞ্জাল ফেলার জায়গা নেই। ফলে শহরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ বাড়ছিল। সেই পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এই আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রকল্পকেই ভবিষ্যতের পথ হিসেবে দেখছে পুরসভা।
বর্তমানে ধাপায় পুরনো জমিতে ইতিমধ্যেই সার কারখানা, থার্মোকল প্রসেসিং ইউনিট এবং বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে। তবে নগরীর বিপুল পরিমাণ জঞ্জালের তুলনায় এই পরিকাঠামো মোটেই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন কলকাতা শহর থেকে যে বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, তা প্রক্রিয়াকরণ করতে গেলে আরও বড় ও আধুনিক পরিসরের প্রয়োজন পড়ছে।
পরিবেশ আদালতের নির্দেশ এবং পরিবেশগত চাপের কারণেও বিজ্ঞানসম্মত ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ল্যান্ডফিল’ তৈরি করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ধাপায় আর জঞ্জাল ফেলার মতো জায়গা না থাকায় শহরের বাইরে নতুন জমি খোঁজা ছাড়া উপায় ছিল না।
এই প্রসঙ্গে পুরসভার সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, নতুন জমি পাওয়ার জন্য প্রায় ২৫ বছর ধরে চেষ্টা চালানো হচ্ছিল। বহু জায়গা ঘুরে দেখার পর অবশেষে বাসন্তী হাইওয়ের ধারেই উপযুক্ত জমি পাওয়া সম্ভব হয়েছে। ২০১১ সালের পর ধাপা লাগোয়া মাত্র ১০ হেক্টর জমি কেনা হয়েছিল, যা পর্যাপ্ত ছিল না। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রসপুঞ্জ এলাকাতেও জমি খোঁজা হয়েছিল, তবে নানা কারণে সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত পুরসভার ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে বাসন্তী হাইওয়ের ধারে খানাবেড়িয়া এবং দুর্গাপুর গ্রামে এই জমি চিহ্নিত করা হয়। স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে জমি কিনে নেওয়া হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০ একর জমি পুরসভা কিনে ফেলেছে এবং বাকি জমির আইনি প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।
নতুন এই পরিবেশবান্ধব বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রকল্পে একাধিক ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধুমাত্র জঞ্জাল পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, জঞ্জাল থেকে তৈরি হবে বিকল্প জ্বালানি বা ফুয়েল। এই ফুয়েল সিমেন্ট কারখানা ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিক্রি করা যেতে পারে, যা পুরসভার জন্য বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠবে।
এছাড়াও পরিকল্পনায় রয়েছে—
আধুনিক চিকিৎসা বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট
বর্তমানে ধাপায় চালু থাকা থার্মোকল প্রসেসিং ইউনিটের সম্প্রসারণ
সার কারখানার ক্ষমতা বৃদ্ধি
আরও বৃহৎ আকারের বায়ো-সিএনজি প্লান্ট
আধুনিক ই-বর্জ্য (E-Waste) প্রসেসিং ইউনিট
বর্তমানে ধাপায় একটি বায়ো-সিএনজি প্লান্ট চালু রয়েছে। নতুন জমিতে আরও বড় বায়ো-সিএনজি প্লান্ট তৈরি হলে পুরসভার জঞ্জাল সাফাইয়ের গাড়িগুলি সেই জ্বালানিতে চালানো যাবে। এতে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরসভার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কনসালট্যান্ট বা পরামর্শদাতা সংস্থা নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুরসভা। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে টেন্ডার ডাকা হয়েছে এবং অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। মোট সাতটি সংস্থা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
জঞ্জাল সাফাই ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সংস্থা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এখন চলছে। কোন প্রকল্পের জন্য কতটা জমি প্রয়োজন, কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হবে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সঙ্গে কী ধরনের চুক্তি হবে, পুরসভা আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হবে এবং মোট খরচ কত দাঁড়াবে—এই সমস্ত বিষয় খুঁটিয়ে দেখে তবেই প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হবে।
এই প্রকল্প সফল হলে কলকাতার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত খুলবে বলেই মনে করছেন পরিবেশবিদরা। ধাপার মতো জঞ্জালের পাহাড় তৈরি না করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে বর্জ্য থেকেই তৈরি হবে জ্বালানি ও সার—ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভবান হবে পুরসভা। পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি শহরের টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করবে এই প্রকল্প।
সব মিলিয়ে, ধাপার আয়ু শেষ হওয়ার পর কলকাতার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যে বড় সঙ্কট দেখা দিয়েছিল, তারই দীর্ঘমেয়াদি ও আধুনিক সমাধান হিসেবে এই প্রকল্পকে দেখছে পুর প্রশাসন। এখন দেখার, কবে বাস্তব রূপ পায় এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে কলকাতার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যে বিপ্লব সাধিত হতে চলেছে, তাতে একদিকে যেমন শহরের পরিবেশ পরিস্থিতি উন্নত হবে, অন্যদিকে শহরের আর্থিক অবস্থাও শক্তিশালী হবে। আজকের দিনে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নয়, বরং একটি অত্যন্ত বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলকাতার মত একটি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া শহরের জন্য, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জঞ্জালের পরিমাণও বাড়ছে, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই প্রকল্পটির মাধ্যমে পুরসভা নির্ধারণ করেছে যে, শহরের বর্জ্যকে শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর না করে, বরং এটিকে এক নতুন উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যা শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবে।
ধাপার বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেবল একটি শক্তিশালী এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নয়, বরং এটি কলকাতার নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। বর্তমানে, শহরের শক্তির চাহিদা পূরণে বহিরাগত উৎসের উপর নির্ভরতা রয়েছে, যার ফলে পরিবেশ দূষণ এবং খরচও বাড়ছে। তবে, এই প্রকল্পটি সফল হলে, শহরের বর্জ্য থেকে উৎপন্ন শক্তি ব্যবহার করে শহরের বিদ্যুৎ চাহিদা কিছুটা হলেও মেটানো সম্ভব হবে, যা শহরের শক্তির উৎস বৈচিত্র্যকরনেও সাহায্য করবে।
এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই করবে না, বরং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সিমেন্ট কারখানায় বিক্রি করার মাধ্যমে শহর অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। এই বিক্রি থেকে পুরসভা অর্জিত অর্থ নতুন পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করতে পারবে, ফলে এটি একটি সুরক্ষিত অর্থনৈতিক চক্র সৃষ্টি করবে, যা কলকাতার উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
এছাড়া, এই প্রকল্পের আরেকটি বড় দিক হলো, জঞ্জাল থেকে জ্বালানি এবং সার উৎপাদনের পরিকল্পনা। এই সার শুধু শহরের সবুজায়নের জন্য উপযোগী হবে না, বরং এটি কৃষিক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে, ফলে শহরের কৃষি খাতেরও উন্নতি হবে।
জ্বালানি উৎপাদন যে মাত্রায় শুরু হবে, তা শুধু পরিবেশের উপকারে আসবে না, বরং বাণিজ্যিকভাবে এটি এক নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে, সিমেন্ট কারখানা ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লা ব্যবহৃত হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এই প্রকল্পের মাধ্যমে জঞ্জাল থেকে উৎপন্ন জ্বালানি ব্যবহার করা হলে, তা পরিবেশের উপর কম চাপ ফেলবে এবং গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দেবে, ফলে নির্গমনও কমবে।
এই প্রকল্পের আরেকটি মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ দূষণ কমানো। কলকাতা শহর, বিশেষ করে ধাপা এলাকার পরিবেশগত অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়েছিল। এখানে জমে থাকা জঞ্জালের স্তূপগুলি বায়ু, জল এবং মাটির দূষণ সৃষ্টি করছিল। তাই, পুরসভা এক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর সমাধান খুঁজছিল। প্রকল্পটি সফল হলে, ধাপা থেকে নতুন উন্নত স্থানে চলে আসা, যেখানে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য যথেষ্ট জায়গা এবং আধুনিক প্রযুক্তি থাকবে, একদিকে যেমন পরিবেশের জন্য উপকারী হবে, তেমনি শহরের গতি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।
এছাড়া, এই প্রকল্পটি পরবর্তীতে শহরের আর্থিক প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে উত্সাহিত করবে, কারণ এটি নতুন শিল্প এবং উৎপাদন ইউনিটের জন্ম দেবে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করবে।
এই প্রকল্পটির অন্যতম মাইলফলক হল এটি শুধুমাত্র শহরের পরিবেশ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াকেই পরিবর্তন করবে না, বরং এটি শহরের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে, এই প্রকল্পের মডেল অন্যান্য শহরেও প্রয়োগ করা হতে পারে, যাতে তারা নিজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শক্তির চাহিদা পূরণের জন্য এই ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে।
এছাড়া, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সেবার মান বৃদ্ধি, এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবসা এবং শিল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে। পুরসভা কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, এই প্রকল্পটি কলকাতা শহরের একটি নতুন পরিচিতি তৈরি করবে যা তাকে একটি আধুনিক, সাসটেইনেবল এবং স্মার্ট শহরে পরিণত করবে।
পুরসভা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা ও পরিকল্পনাকারীরা আশাবাদী যে এই প্রকল্পটির মাধ্যমে কলকাতার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগ শুরু হবে। একদিকে যেমন শহরের পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে শহরের অর্থনীতি, শক্তির ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সেবা ক্ষেত্রেও বড় ধরনের উন্নতি হবে। তবে, এর সফল বাস্তবায়ন শহরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা সৃষ্টির উপর নির্ভরশীল।
এক কথায়, ধাপার শেষ সময়ের এই প্রকল্পটি কলকাতার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে দাঁড়াবে। এখন দেখার বিষয় হল, কবে বাস্তবায়িত হয় এই উদ্যোগ, এবং কিভাবে তা কলকাতার সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে কলকাতার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যে বিপ্লব আসবে, তাতে শহরের উন্নয়ন এবং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি অন্যতম মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে।