Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১৩০০ বছরে একবার: শান্ত সমুদ্রে জন্ম নিল ৫৮ ফুটের রাক্ষুসে ঢেউ, মিথ মানলেন বিজ্ঞানীরা

বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে ঢেউয়ের গতি ও উচ্চতায় বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস আগেই দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা।

১৩০০ বছরে একবার: শান্ত সমুদ্রে জন্ম নিল ৫৮ ফুটের রাক্ষুসে ঢেউ, মিথ মানলেন বিজ্ঞানীরা
Environment & Geoscience

শান্ত, স্থির, নিরিবিলি সমুদ্র। দূর দিগন্ত জুড়ে নীল জলরাশি যেন নিঃশব্দে নিজের মতো করে দুলছে। ছোট ছোট ঢেউ ছন্দে ছন্দে এগিয়ে আসছে তটরেখার দিকে। হঠাৎ সেই ছন্দে ভাঙন। মুহূর্তের মধ্যেই শান্ত সমুদ্রের বুক চিরে উঠে এল এক ভয়াল দৃশ্য — আকাশ ছুঁতে চাওয়া বিশাল এক জলপ্রাচীর! জল উঠে গেল প্রায় ৫৮ ফুট পর্যন্ত। চার তলা বাড়ির সমান উঁচু সেই ঢেউ যেন মুহূর্তে প্রমাণ করে দিল, সমুদ্র যতই শান্ত দেখাক না কেন, তার অন্তরে লুকিয়ে থাকতে পারে বিধ্বংসী শক্তি।

বিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের ঢেউকে বলা হয় ‘রোগ ওয়েভ’ (Rogue Wave) বা বাংলায় যাকে বলা যায় রাক্ষুসে ঢেউ। সাধারণ ঢেউয়ের তুলনায় এই ঢেউ হয় আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহভাবে শক্তিশালী। আশপাশের ঢেউয়ের তুলনায় যখন কোনও ঢেউ হঠাৎ দ্বিগুণ বা তারও বেশি উচ্চতায় উঠে যায়, তখন তাকে রাক্ষুসে ঢেউ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বহু শতাব্দী ধরে নাবিকেরা এমন ঢেউয়ের গল্প বললেও বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে তা বিশ্বাস করতে চাননি। এসব কাহিনিকে বলা হত সমুদ্রযাত্রীদের ভয় কিংবা কল্পনার ফল।

কিন্তু ১৯৯৫ সালে সেই ধারণা বদলে যায়। নরওয়ের উপকূলের কাছে সমুদ্রে একটি তেল উত্তোলন প্ল্যাটফর্মে আচমকা আছড়ে পড়েছিল প্রায় ৮৫ ফুট উঁচু এক ঢেউ। ঘটনাটি আধুনিক যন্ত্রে ধরা পড়ে এবং বিজ্ঞানীদের সামনে উঠে আসে এমন ঢেউয়ের বাস্তব অস্তিত্ব। সেই ঘটনার পর থেকেই ‘রোগ ওয়েভ’ শব্দটি বিজ্ঞানের অভিধানে পাকাপাকি জায়গা করে নেয়।

৫৮ ফুটের ঢেউ: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

২০২০ সালে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের উপকূলে ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের কাছে এমনই এক রাক্ষুসে ঢেউয়ের নথি ধরা পড়ে। জল উঠে যায় প্রায় ৫৮ ফুট পর্যন্ত। যদিও ইতিহাসে আরও উঁচু ঢেউয়ের রেকর্ড রয়েছে, তবু বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এই ঢেউটিকেই সবচেয়ে শক্তিশালী রাক্ষুসে ঢেউ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ এর আপেক্ষিক শক্তি — অর্থাৎ আশপাশের ঢেউয়ের তুলনায় এর উচ্চতা — ছিল নজিরবিহীন।

বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী, ওই সময় আশপাশের ঢেউগুলির গড় উচ্চতা ছিল প্রায় ১৭-১৮ ফুট। তার তুলনায় এই ঢেউ উঠে যায় প্রায় তিন গুণ বেশি উঁচুতে। এই অনুপাতই একে করে তুলেছে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রাক্ষুসে ঢেউ।

এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীদের একাংশ আখ্যা দিয়েছেন 'অসামান্য’, ‘অত্যন্ত বিস্ময়কর’ এবং ‘চরমভাবে ব্যতিক্রমী’ বলে। তাঁদের মতে, সমুদ্রে রাক্ষুসে ঢেউ মাঝেমধ্যেই তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু এই মাত্রার ঢেউ প্রায় ১৩০০ বছরে একবারই দেখা যায়। তাই এই ঘটনাকে শুধু বিরল নয়, সমুদ্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাক্ষুসে ঢেউ কীভাবে তৈরি হয়?

আজও বিজ্ঞানীদের কাছে রাক্ষুসে ঢেউয়ের সৃষ্টি রহস্য পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে কয়েকটি তত্ত্ব বা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

তরঙ্গের সংঘর্ষ (Wave Interference)

সমুদ্রের ঢেউ সাধারণত বিভিন্ন দিক থেকে আসে। কখনও কখনও কয়েকটি ঢেউ একসঙ্গে মিলিত হলে তাদের শক্তি ও উচ্চতা যোগ হয়ে যায়। একে বলা হয় constructive interference। এই মিলিত শক্তি হঠাৎ তৈরি করতে পারে বিশাল এক ঢেউ।

স্রোত ও ঢেউয়ের মুখোমুখি সংঘর্ষ

কোনও অঞ্চলে সমুদ্রস্রোত যদি ঢেউয়ের বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়, তবে ঢেউয়ের গতি কমে যায়, কিন্তু উচ্চতা বেড়ে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াতেও তৈরি হতে পারে অস্বাভাবিক উঁচু ঢেউ।

গভীর সমুদ্রের ভৌগোলিক গঠন

সমুদ্রতলের নিচে পাহাড়, খাদ বা আকস্মিক উচ্চ-নিম্ন গঠন ঢেউয়ের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ অঞ্চলে এই কারণেও হঠাৎ শক্তিশালী ঢেউ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আবহাওয়ার জটিল প্রভাব

ঝড়, নিম্নচাপ, সাইক্লোন কিংবা বায়ুচাপের দ্রুত পরিবর্তন ঢেউয়ের শক্তি ও গঠন বদলে দিতে পারে। যদিও অনেক রাক্ষুসে ঢেউ শান্ত আবহাওয়ার মধ্যেই তৈরি হয়েছে, তবু আবহাওয়ার ভূমিকা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল — ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ওই ঢেউয়ের সময় কোনও ঝড়, সাইক্লোন বা বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলছিল না। সমুদ্র ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত। তাই বিজ্ঞানীদের মতে, এই ঢেউয়ের সৃষ্টি ছিল আরও রহস্যময় এবং গবেষণার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

কেন এত দিন বিশ্বাস করা হয়নি রাক্ষুসে ঢেউয়ের অস্তিত্ব?

সমুদ্রের ইতিহাসে বহু নাবিক, জেলে ও অভিযাত্রী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হঠাৎ আকাশচুম্বী ঢেউয়ের কথা বলে এসেছেন। কেউ বলেছেন, মাঝসমুদ্রে আচমকা বিশাল জলপ্রাচীর উঠে এসে জাহাজ উল্টে দিয়েছে। কেউ বলেছেন, শান্ত আবহাওয়ার মধ্যেই সমুদ্র যেন রাক্ষস হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের কাহিনিকে অতিরঞ্জিত গল্প, ভ্রম কিংবা মানসিক আতঙ্কের ফল বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কারণ তখনকার পরিমাপ যন্ত্র ও পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তিতে এমন ঢেউয়ের প্রমাণ মেলেনি। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সমুদ্রের ঢেউ একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়মে চলে এবং আচমকা এত বড় ঢেউ তৈরি হওয়ার কথা নয়।

১৯৯৫ সালে নরওয়ের ড্রপনার তেল প্ল্যাটফর্মে আছড়ে পড়া ৮৫ ফুটের ঢেউ সেই ধারণা চূর্ণ করে দেয়। যন্ত্রের মাধ্যমে রেকর্ড হওয়া ওই ঢেউ প্রমাণ করে দেয়, প্রকৃতি মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি অপ্রত্যাশিত ও শক্তিশালী হতে পারে। এরপর থেকেই বিজ্ঞানীরা নতুন করে সমুদ্রতরঙ্গের চরিত্র বিশ্লেষণ শুরু করেন।

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ঢেউ: কেন একে সবচেয়ে শক্তিশালী বলা হচ্ছে?

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন — যখন নরওয়ের ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল ৮৫ ফুট, তখন ৫৮ ফুটের ঢেউকে কেন সবচেয়ে শক্তিশালী বলা হচ্ছে?

এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আপেক্ষিক শক্তি বা relative wave height ধারণার মধ্যে। কোনও ঢেউ শুধু কত উঁচু উঠেছে, সেটাই একমাত্র মানদণ্ড নয়। তার আশপাশের ঢেউগুলির তুলনায় সেটি কতটা বেশি উঁচু, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

নরওয়ের ঢেউয়ের সময় আশপাশের ঢেউগুলিও তুলনামূলকভাবে বেশ উঁচু ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ঘটনায় সাধারণ ঢেউয়ের গড় উচ্চতা ছিল মাত্র ১৭-১৮ ফুট। তার তুলনায় ৫৮ ফুটের ঢেউ ছিল প্রায় তিন গুণ বেশি উঁচু। এই অনুপাতকে বিজ্ঞানীরা বলেছেন অভূতপূর্ব। তাই এটিকেই বলা হচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রাক্ষুসে ঢেউ।

সমুদ্রযাত্রায় রাক্ষুসে ঢেউয়ের ভয়াবহ প্রভাব

রাক্ষুসে ঢেউয়ের আকস্মিকতা ও শক্তি সমুদ্রযাত্রার জন্য চরম বিপজ্জনক। সাধারণ ঢেউয়ের সঙ্গে জাহাজের নকশা ও স্থিতিশীলতা মানিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু যখন হঠাৎ তিন থেকে চার গুণ উঁচু ঢেউ সামনে এসে পড়ে, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী জাহাজও বিপদের মুখে পড়তে পারে।

news image
আরও খবর

ইতিহাসে বহু জাহাজডুবির পেছনে রাক্ষুসে ঢেউয়ের ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে সত্তরের দশকে ও তার আগের সময়ে যে সব জাহাজ বা মাছ ধরার নৌকা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিল, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই কোনও ধ্বংসাবশেষ বা সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় তখন এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হয়নি।

আজ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ওইসব অন্তর্ধানের পেছনে হয়তো এই ধরনের অপ্রত্যাশিত রাক্ষুসে ঢেউ কাজ করে থাকতে পারে।

মেরিনল্যাবসের সিইও ও সমুদ্র বিশেষজ্ঞ স্কট বিটি বলেন,

“রাক্ষুসে ঢেউয়ের আকস্মিকতা এবং তীব্র শক্তি যে কোনও সামুদ্রিক অভিযানের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। শুধু জাহাজ নয়, উপকূলবর্তী মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”

আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে ধরছে রাক্ষুসে ঢেউ?

আগে সমুদ্রে কী ঘটছে, তা জানার জন্য মূলত জাহাজের রিপোর্ট কিংবা উপকূলীয় পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করতে হত। কিন্তু আধুনিক যুগে এসেছে স্যাটেলাইট নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় বয়া (buoy), সেন্সর ও সমুদ্রতলের যন্ত্র।

এই যন্ত্রগুলির সাহায্যে এখন সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা, গতি, দিক ও শক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে রেকর্ড করা হচ্ছে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ৫৮ ফুটের ঢেউটিও ধরা পড়েছিল এমনই একটি বয়া ও সেন্সরের মাধ্যমে। পরে তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ রাক্ষুসে ঢেউ।

এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও উন্নত হলে রাক্ষুসে ঢেউয়ের পূর্বাভাস দেওয়াও সম্ভব হতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা। আগাম সতর্কতা মিললে নাবিকেরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে যেতে পারবেন এবং অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সমুদ্র ঢেউয়ের পরিবর্তন

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় আগেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউয়ের গতিবিধি বদলাতে পারে। বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে ঢেউয়ের উচ্চতা গড়ে আরও বৃদ্ধি পাবে।

২০২৪ সালের একটি গবেষণায় সেই আশঙ্কা আরও জোরালোভাবে উঠে আসে। ওই গবেষণায় দাবি করা হয়, ভবিষ্যতে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা বর্তমান গড়ের তুলনায় চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এর অর্থ, রাক্ষুসে ঢেউয়ের মতো ঘটনাও আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, বাতাসের গতি ও দিক বদলাচ্ছে, বায়ুচাপের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ঝড়ব্যবস্থা। এসবই ঢেউয়ের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে ভবিষ্যতে আরও বেশি শক্তিশালী ঢেউ দেখা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

ভবিষ্যতে কি আরও ভয়াবহ রাক্ষুসে ঢেউ দেখা যাবে?

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ৫৮ ফুটের ঢেউকে আজ সবচেয়ে শক্তিশালী বলা হলেও, বিজ্ঞানীদের ধারণা — এই রেকর্ড দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের শক্তি ও অস্থিরতা বাড়লে আরও বড় ও ভয়াবহ ঢেউ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে সমুদ্রযাত্রার নকশা, জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই সম্ভাব্য ঝুঁকিকে মাথায় রেখেই নতুন পরিকল্পনা করতে হবে।

রাক্ষুসে ঢেউ যদি সত্যিই আরও ঘন ঘন দেখা দেয়, তবে তা শুধু জাহাজ চলাচল নয়, উপকূলবর্তী শহর, দ্বীপ, বন্দর এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিজ্ঞানীদের আশা: একদিন আগাম সতর্কতা সম্ভব হবে

আজও রাক্ষুসে ঢেউ কীভাবে, ঠিক কখন এবং কেন তৈরি হয় — তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। তবে আধুনিক গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই রহস্য অনেকটাই পরিষ্কার হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

বিজ্ঞানীরা চাইছেন এমন একটি পূর্বাভাস ব্যবস্থা তৈরি করতে, যা সমুদ্রের ঢেউয়ের আচরণ বিশ্লেষণ করে আগাম জানাতে পারবে — কোথায় কখন বিপজ্জনক ঢেউ তৈরি হতে পারে। এতে নাবিকেরা সতর্ক হতে পারবেন, জাহাজের রুট বদলাতে পারবেন এবং বহু দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।

রাক্ষুসে ঢেউ ও মানুষের কল্পকাহিনি: মিথ থেকে বাস্তব

এক সময় সমুদ্রযাত্রীদের গল্পে শোনা যেত — শান্ত সমুদ্রে হঠাৎ বিশাল ঢেউ এসে জাহাজ গিলে ফেলেছে। বিজ্ঞানীরা সেই গল্পকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজ সেই গল্পই বিজ্ঞানের পাতায় বাস্তব হয়ে উঠেছে।

রাক্ষুসে ঢেউয়ের অস্তিত্ব প্রমাণ করে দিয়েছে, প্রকৃতি সব সময় মানুষের গাণিতিক মডেল বা ধারণার মধ্যে বাঁধা থাকে না। সমুদ্র যেমন শান্ত ও সুন্দর হতে পারে, তেমনই মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী রূপও নিতে পারে।

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ৫৮ ফুটের ঢেউ সেই বাস্তবতারই এক শক্তিশালী প্রতীক — যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সামনে মানুষ এখনও কতটা ক্ষুদ্র এবং কতটা অনিশ্চিত।

উপসংহার

শান্ত সমুদ্রের বুকে আচমকা উঠে আসা ৫৮ ফুটের রাক্ষুসে ঢেউ শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয় — এটি বিজ্ঞান, ইতিহাস ও মানব সভ্যতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে দেয়, বহুদিনের ‘মিথ’ বলে অবহেলিত ধারণাও একদিন বাস্তব প্রমাণিত হতে পারে।

১৩০০ বছরে একবার ঘটে এমন এই অঘটন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সমুদ্রের অন্তরে এখনও কত রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্কবার্তাও — জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে প্রকৃতির আচরণ আরও অপ্রত্যাশিত, আরও চরম হয়ে উঠতে পারে।

রাক্ষুসে ঢেউ নিয়ে গবেষণা যত এগোবে, ততই আমরা সমুদ্রকে নতুন চোখে চিনতে শিখব — শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং এক শক্তিশালী, রহস্যময় এবং মাঝে মাঝে ভয়ংকর প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে।

Preview image