ভাঙড়ের বোমা বিস্ফোরণ মামলার তদন্তে বড় পদক্ষেপ নিল NIA। তদন্তের সূত্র ধরে শওকত মোল্লার বাড়িতে তল্লাশি চালায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। এই অভিযানের ফলে মামলার তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভাঙড়ের বহুল আলোচিত বোমা বিস্ফোরণ মামলার তদন্তে বড়সড় পদক্ষেপ করল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। বৃহস্পতিবার ভোরবেলা দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ের জীবনতলা এলাকায় প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লার বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা। একই সঙ্গে তাঁর বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় এবং পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একাধিক স্থানে তল্লাশি চালানো হয়। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রের খবর, ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া এলাকায় বিধানসভা নির্বাচনের আগে ঘটে যাওয়া বোমা বিস্ফোরণ-কাণ্ডের তদন্তের সূত্র ধরেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। সেই বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু হয়েছিল এবং একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন। ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চলার পর অবশেষে এনআইএ সরাসরি শওকত মোল্লার বাড়িতে পৌঁছে যাওয়ায় নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই জীবনতলা এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে একাধিক গাড়িতে করে এনআইএ-র আধিকারিকেরা শওকত মোল্লার বাড়িতে পৌঁছন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘক্ষণ ধরে তল্লাশি অভিযান।
শুধু বাড়িতেই নয়, বাড়ির পাশের দলীয় কার্যালয়েও তদন্তকারীরা প্রবেশ করেন। সেখানে বিভিন্ন নথিপত্র, দলীয় কার্যকলাপ সংক্রান্ত তথ্য এবং সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ নথি খতিয়ে দেখা হয় বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা কোনও তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করলেও সূত্রের দাবি, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, অভিযানের সময় বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না শওকত মোল্লা। ফলে তদন্তকারীরা তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। বিশেষ করে তাঁর ছেলে ইমরান মোল্লাকে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে খবর।
বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন শওকতের স্ত্রী এবং কন্যাও। তদন্তকারীরা তাঁদের কাছ থেকেও কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করেন। বাড়ির বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি বেশ কিছু নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়। তদন্তকারীরা ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যও খতিয়ে দেখেছেন বলে সূত্রের দাবি।
তল্লাশি অভিযান শুধু জীবনতলার বাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মৌখালিতে শওকত-পুত্র ইমরান মোল্লার পরিচালিত একটি ক্যাফেতেও যান এনআইএ-র আধিকারিকেরা। সেখানে কিছু নথি এবং ব্যবসায়িক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
তদন্তকারী সংস্থার ধারণা, বিস্ফোরণ মামলার সঙ্গে জড়িত কোনও আর্থিক বা যোগাযোগের সূত্র থাকলে তা বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া যেতে পারে। সেই কারণেই একাধিক স্থানে একযোগে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া এলাকায় একটি ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয় এবং কয়েকজন গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণের পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, বেআইনি বিস্ফোরক মজুত এবং স্থানীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব—সবকিছু নিয়েই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
প্রথমে স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও পরে বিষয়টির গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তরফেও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ওঠে। বিশেষ করে আইএসএফ এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য এনআইএ-র হস্তক্ষেপ দাবি করেছিল।
ভাঙড়ে আইএসএফ-এর শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতি রয়েছে। দলের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির নেতৃত্বে এই ঘটনার এনআইএ তদন্তের দাবি জোরালোভাবে তোলা হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, বিস্ফোরণের নেপথ্যে বড় চক্র কাজ করছে এবং তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।
পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তভার এনআইএ-র হাতে তুলে দেয়। তারপর থেকেই জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
এই মামলায় এর আগেও বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে এনআইএ। তাদের মধ্যে তৃণমূল নেতা ওয়াহিদুল ইসলামের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তদন্তকারীদের দাবি, বিস্ফোরণ-কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একাধিক অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর নতুন কিছু সূত্র সামনে আসে। সেই সূত্র ধরেই তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানো হয়। তদন্তকারীদের মতে, শুধু বিস্ফোরণের ঘটনাই নয়, এর নেপথ্যে থাকা সম্ভাব্য পরিকল্পনা, অর্থের উৎস, বিস্ফোরক সংগ্রহ এবং সংগঠিত নেটওয়ার্কের দিকটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে শওকত মোল্লা দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্র থেকে তিনি ২০১৬ এবং ২০২১ সালে পরপর দু’বার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে বিধায়ক নির্বাচিত হন।
স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। তৃণমূলের সংগঠন বিস্তারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেও অনেকে মনে করেন। ফলে তাঁর বাড়িতে এনআইএ-র তল্লাশি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শওকত মোল্লাকে ভাঙড় কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু সেই নির্বাচনে তিনি আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকির কাছে পরাজিত হন।
এই ফলাফল দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতিতে বিশেষ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। কারণ ভাঙড়ে আইএসএফ-এর শক্ত ঘাঁটির সামনে তৃণমূলের অন্যতম পরিচিত নেতার পরাজয় রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিয়েছিল।
নির্বাচনে হারের পর শওকতকে তুলনামূলকভাবে কম প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছে। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে তিনি পুরোপুরি দূরে সরে যাননি বলেই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এনআইএ-র অভিযানের ঠিক আগের দিনই শওকত মোল্লা বিধানসভায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেন বলে জানা যায়। বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতেই শওকতের ওই সাক্ষাৎ বলে রাজনৈতিক সূত্রে খবর।
এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এনআইএ-র তল্লাশি অভিযান শুরু হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আরও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থা এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি যে তল্লাশি থেকে কী কী তথ্য বা নথি উদ্ধার হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মামলায় তদন্তকারীরা সাধারণত মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, মেসেজ, আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকলাপ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
আধুনিক অপরাধ তদন্তে ডিজিটাল ফরেনসিক্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনও ঘটনার সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখছিলেন, কোথায় কোথায় যাতায়াত হয়েছে, কার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন হয়েছে—এসব তথ্য অনেক সময় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।
এনআইএ-র এই অভিযানকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের দাবি, বিস্ফোরণ মামলার প্রকৃত সত্য সামনে আনতেই তদন্তকারী সংস্থা সক্রিয় হয়েছে। তাঁদের মতে, আইন নিজের পথে চলুক এবং তদন্তে কোনওরকম বাধা দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, তদন্ত অবশ্যই হওয়া উচিত, তবে তা যেন সম্পূর্ণ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এবং নিরপেক্ষভাবে হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে ভালো নয় বলেও মত প্রকাশ করেছেন অনেক নেতা।
ভাঙড় ও ক্যানিং এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গিয়েছে। অনেকের মতে, বিস্ফোরণের ঘটনায় একজনের প্রাণহানি ঘটেছিল। ফলে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই মামলার তদন্ত চলছে। এবার যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে, তাহলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পথ সুগম হতে পারে।
বর্তমানে এনআইএ সংগৃহীত তথ্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করছে। তল্লাশি অভিযান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরও জিজ্ঞাসাবাদ, তলব কিংবা নতুন গ্রেফতারির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে তদন্তকারী সংস্থা এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালানো মানেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। তদন্তের স্বার্থে তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করাই এই ধরনের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।
সব মিলিয়ে, ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া বোমা বিস্ফোরণ মামলায় প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লার বাড়িতে এনআইএ-র হানা রাজ্যের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং তল্লাশি থেকে কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই এখন নজর সবার। মামলার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে এনআইএ কতটা সফল হয়, তা আগামী দিনের তদন্তই স্পষ্ট করে দেবে।