খনিজ ও ভিটামিনে ভরপুর এই সব্জিটিকে অনেকেই এড়িয়ে চলেন। তবে স্যালাডে কাঁচা খেলে বা ডাল ও তরকারিতে মিশিয়ে নিলে শরীর পায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং কমে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বাড়িতে স্যালাড বানিয়ে খাওয়ার অভ্যাস আজ অনেকের মধ্যেই দেখা যায়
শসা পেঁয়াজ টম্যাটো দিয়েই সাধারণত স্যালাডের থালা সাজানো হয়
কখনও কখনও ধনেপাতা বা লেটুস যোগ করা হয়
কিন্তু এই পরিচিত উপকরণের বাইরে এমন একটি সব্জি রয়েছে যা অত্যন্ত পুষ্টিকর হলেও বহু মানুষের প্লেট থেকে বাদ পড়ে যায়
এই সব্জিটি দেখলেই অনেকেই মুখ ঘুরিয়ে নেন
কারও কাছে গন্ধ ভালো লাগে না
কারও আবার ধারণা এটি খেলে পেটের সমস্যা হবে
ফলে স্যালাডে তো দূরের কথা দৈনন্দিন রান্নাতেও জায়গা পায় না
অথচ এই সব্জিটি সঠিকভাবে খেলে শরীরের জন্য হতে পারে ভীষণ উপকারী
এই অবহেলিত অথচ শক্তিশালী সব্জিটির নাম মুলো
খনিজ ও ভিটামিনে ভরপুর মুলো বহু দিন ধরেই খাদ্যতালিকায় থাকলেও আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে তার গুরুত্ব কমে গেছে
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বারবার বলছেন
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য শুধু দামি খাবার নয়
বরং সাধারণ সব্জির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃত পুষ্টি
আমেরিকায় কর্মরত এমস হার্ভার্ড ও স্ট্যানফোর্ড প্রশিক্ষিত গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট সৌরভ শেট্টী মুলোর উপকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন
তিনি জানিয়েছেন
মুলো এমন একটি সব্জি যা প্রতিদিনের স্ন্যাকস হিসেবেও খাওয়া যেতে পারে
কারণ এটি কম ক্যালোরিযুক্ত এবং হজমে সহায়ক
মুলো কাঁচা খেলে যেমন উপকার পাওয়া যায়
তেমনই ডাল তরকারি বা ভাজিতেও এর পুষ্টিগুণ অনেকটাই বজায় থাকে
বিশেষ করে স্যালাডে মুলো যোগ করলে খাবারে এক ধরনের মুচমুচে স্বাদ আসে
যা খাওয়ার আনন্দও বাড়িয়ে দেয়
অনেকেই ভাবেন মুলো খাওয়া মানেই পেটফাঁপা
এই ধারণাকে পুরোপুরি ভুল বলে ব্যাখ্যা করেছেন চিকিৎসক
তিনি বলছেন
মুলো কারও ক্ষেত্রে গ্যাস তৈরি করতে পারে
আবার কারও ক্ষেত্রে হজমের সমস্যা কমাতেও সাহায্য করে
এটি আসলে ব্যক্তিভেদে আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখায়
মুলোর সবচেয়ে বড় গুণ হল
এটি খুব কম শর্করা এবং কম ক্যালোরিযুক্ত
এই কারণেই ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে মুলো অত্যন্ত কার্যকর
যাঁরা লিভারের অতিরিক্ত চর্বি নিয়ে চিন্তিত
তাঁদের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত মুলো রাখা যেতে পারে
ফ্যাটি লিভার বর্তমানে একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে উঠেছে
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত তেল মশলা
চিনি জাতীয় খাবার
এবং শরীরচর্চার অভাব এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে
এই পরিস্থিতিতে মুলোর মতো হালকা সব্জি লিভারের উপর চাপ কমায়
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখতেও মুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়
মুলোর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুব কম
ফলে এটি খেলে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না
ডায়াবেটিসে ভুগছেন এমন মানুষদের জন্য এটি একটি নিরাপদ সব্জি
ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও মুলো সহায়ক
কারণ কম ক্যালোরিযুক্ত খাবার হওয়ায় পেট ভরে যায়
কিন্তু শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমা হয় না
তবে একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে
অনেকে মনে করেন মুলো খেলে শুধু পেটের চর্বি কমে
এই ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই
চিকিৎসকের মতে
ওজন কমানো একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া
একটি মাত্র খাবার দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গার চর্বি কমানো সম্ভব নয়
মুলোতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার
যা হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে
এবং অন্ত্রকে সুস্থ রাখে
যাঁদের নিয়মিত পেট পরিষ্কার না হওয়ার সমস্যা রয়েছে
তাঁদের জন্য মুলো উপকারী হতে পারে
গবেষণাগারে করা কিছু পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে
মুলোতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে
যা ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে
বিশেষ করে অন্ত্র ও পাকস্থলীর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চলছে
তবে এখনও পর্যন্ত মানুষের উপর সরাসরি পরীক্ষার পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি
তাই চিকিৎসকেরা একে প্রতিরোধমূলক সহায়ক খাদ্য হিসেবে দেখছেন
মুলো খাওয়ার সেরা উপায় হল
স্যালাডে পাতলা করে কেটে যোগ করা
এর সঙ্গে লেবুর রস
হালকা দই
অথবা স্বাস্থ্যকর সস মেশালে স্বাদ আরও ভালো হয়
তাতে অনেকেই যাঁরা আগে মুলো খেতে চাইতেন না
তাঁরাও সহজে খেতে পারেন
ডাল তরকারিতে মুলো মিশিয়ে নিলেও পুষ্টিগুণ পাওয়া যায়
বিশেষ করে মুগ ডাল বা সবজি মিশ্র ডালে মুলো দিলে স্বাদ ও স্বাস্থ্য দুটোই বাড়ে
সব মিলিয়ে বলা যায়
মুলো এমন একটি সব্জি
যাকে অবহেলা করার কোনও কারণ নেই
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় জায়গা পাওয়ার মতো সব গুণই রয়েছে এই সাধারণ সব্জিটির মধ্যে
আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক সময়ই স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা ভুলে যাই
সহজে পাওয়া যায় এমন খাবারের দিকেই ঝোঁক বেশি থাকে
ফাস্ট ফুড
প্যাকেটজাত খাবার
এবং অতিরিক্ত তেল মশলাযুক্ত পদ ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করে
এই পরিস্থিতিতে মুলোর মতো সহজলভ্য সব্জি আমাদের স্বাস্থ্যের বড় সহায়ক হতে পারে
মুলো কম ক্যালোরিযুক্ত একটি সব্জি
যার অর্থ এটি খেলে শরীরে অতিরিক্ত শক্তি জমা হয় না
যাঁরা ওজন নিয়ে চিন্তিত
যাঁরা প্রতিদিন ক্যালোরি হিসাব করে খাবার খান
তাঁদের জন্য মুলো অত্যন্ত উপযোগী
কারণ পেট ভরে যায়
কিন্তু ক্যালোরির পরিমাণ থাকে অনেক কম
শুধু কম ক্যালোরি নয়
মুলোতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ
যা শরীরের নানা কাজকে সঠিকভাবে চালাতে সাহায্য করে
ভিটামিন সি
পটাশিয়াম
ফাইবার
এই সব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়
হজমের সমস্যায় ভুগছেন এমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে
অনিয়মিত খাওয়া
অল্প জল পান
এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
এই সব কারণেই হজমের গোলমাল দেখা দেয়
মুলো হজমে সহায়ক একটি সব্জি
এর মধ্যে থাকা ফাইবার অন্ত্রকে সক্রিয় রাখে
পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমাতে সহায়ক হয়
অনেকে মনে করেন
মুলো খেলেই পেটফাঁপা হয়
এই ধারণা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়
কিছু মানুষের শরীর মুলো সহজে গ্রহণ করতে পারে
তাঁদের ক্ষেত্রে বরং গ্যাসের সমস্যা কমে
হজম ভালো হয়
শরীর হালকা লাগে
এই কারণে মুলো খাওয়ার আগে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝা জরুরি
লিভারের স্বাস্থ্য ভালো রাখা আজকের দিনে খুব প্রয়োজন
কারণ অস্বাস্থ্যকর খাবার
অতিরিক্ত চিনি
এবং শরীরচর্চার অভাবের ফলে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা বাড়ছে
মুলো কম শর্করা এবং কম ক্যালোরিযুক্ত হওয়ায়
লিভারের উপর চাপ কমায়
নিয়মিত মুলো খেলে লিভারের চর্বি জমার ঝুঁকি অনেকটাই কমতে পারে
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাও অত্যন্ত জরুরি
বিশেষ করে যাঁরা ডায়াবেটিসে ভুগছেন
বা যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে
মুলোর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুব কম
ফলে এটি খেলে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে
এই কারণেই ডায়াবেটিক খাদ্যতালিকায় মুলো একটি নিরাপদ সব্জি হিসেবে ধরা হয়
মুলো শুধু রোগ প্রতিরোধেই সাহায্য করে না
বরং শরীরকে ভিতর থেকে সতেজ রাখে
ত্বকের জন্যও এটি উপকারী
কারণ শরীরের ভিতরে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে
এর ফলে ত্বক উজ্জ্বল থাকে
ব্রণ বা ফুসকুড়ির সমস্যা কমতে পারে
অনেক গবেষণায় দেখা গিয়েছে
মুলোতে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে
যা শরীরের কোষকে সুরক্ষা দিতে পারে
বিশেষ করে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
যদিও মানুষের উপর সরাসরি পরীক্ষার তথ্য এখনও সীমিত
তবু পুষ্টিবিদদের মতে
প্রতিরোধমূলক খাদ্য হিসেবে মুলো নিয়মিত খাওয়া যেতে পারে
মুলো খাওয়ার পদ্ধতিও খুব সহজ
স্যালাডে পাতলা করে কেটে নিলে
খেতে বেশ মুচমুচে লাগে
শসা পেঁয়াজ টম্যাটোর সঙ্গে মুলো যোগ করলে
স্যালাডের স্বাদ ও পুষ্টি দুটোই বাড়ে
যাঁরা কাঁচা মুলো খেতে অসুবিধা বোধ করেন
তাঁরা ডাল বা হালকা তরকারিতে মিশিয়ে নিতে পারেন
আজ থেকে স্যালাড বানানোর সময়
শসা পেঁয়াজ টম্যাটোর পাশে
এই সাধারণ অথচ শক্তিশালী সব্জিটিকেও জায়গা দিন
প্রথমে হয়তো অভ্যাস করতে একটু সময় লাগবে
কিন্তু ধীরে ধীরে শরীরের পরিবর্তন টের পাওয়া যাবে
খাওয়ার পর পেট হালকা লাগবে
অল্প খেয়েই তৃপ্তি আসবে
হজমের সমস্যা কমবে
এবং ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরের ভারসাম্য ফিরে আসবে
স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য সব সময় বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না
ছোট ছোট অভ্যাসই বড় ফল দেয়
মুলোকে খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা তেমনই একটি ছোট কিন্তু কার্যকর পরিবর্তন
শরীর নিজেই তার সুফল বুঝিয়ে দেবে
শক্তি বাড়বে
অস্বস্তি কমবে
এবং সুস্থ থাকার অনুভূতি প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে উঠবে