Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পলগারের প্রশ্নে নাইলসেনের জবাব |এসিপেঙ্কো নয়, ইউক্রেনের শিকারদের জন্যই সহানুভূতি

রাশিয়ান গ্র্যান্ডমাস্টার আন্দ্রে এসিপেঙ্কোর গুরুত্বপূর্ণ blunder ঘিরে দাবা জগতে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিতর্ক চরমে উঠেছে পিটার হাইন নাইলসেনের মন্তব্যের পর, যেখানে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন আমার সহানুভূতি এসিপেঙ্কোর জন্য নয়, ইউক্রেনের ভুক্তভোগীদের জন্য। সুসান পলগারের প্রশ্নের উত্তরে তাঁর এই মন্তব্য দাবা মহল ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোড়ন তুলেছে। এ ঘটনায় নাইলসেনের বক্তব্য শুধু একটি ম্যাচ বিশ্লেষণের সীমা পেরিয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার আক্রমণে যাঁরা ইউক্রেনে প্রাণ হারিয়েছেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের কষ্টই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি খেলার ভুলের তুলনায় যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়কে তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। যদিও সুসান পলগার মূলত দাবার পরিপ্রেক্ষিতে এসিপেঙ্কোর blunder নিয়ে আলোচনা তুলেছিলেন, নাইলসেনের রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট মন্তব্য বিষয়টিকে নতুন দিশা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আন্তর্জাতিক দাবা মঞ্চে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বা ভুলও কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যাত হচ্ছে। এই মন্তব্য ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তর্ক বিতর্ক চলছেই। কেউ নাইলসেনের স্পষ্ট অবস্থানকে মানবিক সাহসিকতা বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত।

এসিপেঙ্কোর Blunder-কে ঘিরে নতুন বিতর্ক: “সহানুভূতি ইউক্রেনের ভুক্তভোগীদের”—পিটার হাইন নাইলসেনের মন্তব্যে দাবা জগতে ঝড়: দাবা বনাম নৈতিক অবস্থান

 

ভূমিকা:

ফিদে ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৫-এর মতো বিশ্বমানের টুর্নামেন্ট মানেই বোর্ডের ওপর চরম উত্তেজনা, তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এবং নিখুঁত কৌশলগত বিশ্লেষণ। কিন্তু এবারের আসরে রাশিয়ার উদীয়মান গ্র্যান্ডমাস্টার আন্দ্রে এসিপেঙ্কোর একটি গুরুতর ভুলের (Blunder) বিশ্লেষণ করতে গিয়েই দাবা বোর্ডের বাইরে এক বড় বিতর্ক তৈরি হলো। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন ম্যাগনাস কার্লসেনের দীর্ঘদিনের কোচ, আইকনিক অ্যানালিস্ট পিটার হাইন নাইলসেন (Peter Heine Nielsen)। বিশ্ব দাবা কিংবদন্তি সুসান পলগারের (Susan Polgar) প্রশ্নের উত্তরে নাইলসেন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন—“আমার সহানুভূতি এসিপেঙ্কোর প্রতি নয়; ইউক্রেনে যারা যুদ্ধের শিকার, তাদের প্রতিই আমার সহানুভূতি।”

তাঁর এই একটি জবাব দাবা বিশ্লেষণ এবং খেলার সীমানা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক আলোচনা, মানবিক বিপর্যয় এবং যুদ্ধের নৈতিক অবস্থানের দিকে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, নাইলসেনের কথায় প্রকাশ পেয়েছে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, আবার অন্য পক্ষ মনে করছে খেলাধুলার মঞ্চে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ঢোকানো উচিত নয়। কিন্তু ঘটনা যেভাবে unfolded হলো—তা নিঃসন্দেহে দাবা জগতে আলোড়ন তুলেছে এবং দাবা বিশ্বের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই নিবন্ধে আমরা ঘটনার সূত্রপাত, নাইলসেনের মন্তব্যের গভীরতা, এর প্রতিক্রিয়ার ঢেউ এবং দাবা জগতে যুদ্ধের প্রভাব বিশ্লেষণ করব।


 

১.  ঘটনার শুরু: এসিপেঙ্কোর গুরুত্বপূর্ণ Blunder

 

রাশিয়ান গ্র্যান্ডমাস্টার আন্দ্রে এসিপেঙ্কো, যিনি শান্ত, হিসেবি খেলা এবং নিখুঁত কম্বিনেশনের জন্য পরিচিত, ফিদে ওয়ার্ল্ড কাপে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে করে ফেলেন এক মারাত্মক blunder। এই ভুলের কারণে ম্যাচের মোমেন্টাম পুরো বদলে যায় এবং তাঁর বিজয়ী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়। দাবা বিশেষজ্ঞদের কাছে এই ধরনের ভুল বড় টুর্নামেন্টের চাপ বা প্রস্তুতির ঘাটতির ফল হিসেবেই বিবেচিত হয়।

  • আলোচনার সূত্রপাত: বিশ্ব দাবার কিংবদন্তি এবং অভিজ্ঞ ভাষ্যকার সুসান পলগার এই blunder নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার সূত্রপাত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন—এত উচ্চ স্তরের একজন খেলোয়াড় কেন এমন ভুল করলেন? এই ভুল কি অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফল, নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি?

এই আলোচনাতেই মন্তব্য করেন পিটার হাইন নাইলসেন, যিনি কেবল একজন কোচ বা অ্যানালিস্ট নন, দাবা জগতে তাঁর নৈতিক ও সামাজিক মন্তব্যের জন্য পরিচিত।


 

২.  নাইলসেনের বিস্ফোরক মন্তব্য—“আমার সহানুভূতি ইউক্রেনের ভুক্তভোগীদের জন্য”

 

সুসান পলগারের তুলনামূলকভাবে নিরীহ প্রশ্নের উত্তরে নাইলসেনের জবাব ছিল বিস্ফোরক এবং সরাসরি রাজনৈতিক। তিনি লেখেন:

“I have sympathy for the victims in Ukraine, not for Esipenko.” “আমার সহানুভূতি ইউক্রেনের ভুক্তভোগীদের প্রতি, এসিপেঙ্কোর প্রতি নয়।”

এই মন্তব্যে দাবা বিশ্লেষণের আলোচনাটি এক মুহূর্তে মানবিক ট্র্যাজেডির দিকে মোড় নেয়। যেখানে সাধারণত খেলোয়াড়ের ভুলের কারণ, পজিশনাল ব্যাখ্যা বা ওপেনিং ত্রুটি নিয়ে কথা হয়, সেখানে নাইলসেন পুরো আলোচনাকে যুদ্ধ এবং মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে গেলেন।

  • বার্তার গভীরতা: নাইলসেনের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, একজন দাবাড়ু একটি ভুল করল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইউক্রেন যুদ্ধে যারা সবকিছু হারিয়েছে, সেই ভুক্তভোগী মানুষগুলোর কষ্ট।

  • নৈতিক অবস্থান: তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, একটি খেলাধুলার ভুলের তুলনায় যুদ্ধের নিদারুণ বাস্তবতা অনেক বেশি গভীর ও তীব্র। একজন খেলোয়াড়ের সাময়িক ভুলের জন্য সহানুভূতি দেখানোর চেয়ে, যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

নাইলসেনের এই অবস্থান কেবল এসিপেঙ্কোকে উদ্দেশ্য করে ছিল না, বরং যুদ্ধের নৈতিক দিক নিয়ে দাবা বিশ্বের মধ্যে এক নীরব প্রশ্নের জন্ম দেয়।


 

৩. ???? দাবা বোর্ডের বাইরে যুদ্ধের প্রভাব

 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই দাবা জগতে এর গভীর প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন (FIDE) রাশিয়ান খেলোয়াড়দের অনেককেই নিরপেক্ষ পতাকার নিচে খেলার নির্দেশ দিয়েছে এবং কিছু টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে নাইলসেনের বক্তব্য আরও গভীর অর্থ বহন করে:

  • রাজনৈতিক অবস্থান: নাইলসেন যেন আড়ালে বলতে চেয়েছেন যে, যেহেতু এসিপেঙ্কো রাশিয়ান, তাই তাঁর ভুলের জন্য অতিরিক্ত সহানুভূতি দেখানোর প্রয়োজন নেই। কারণ এই আগ্রাসনের কারণে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ চরম কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছে।

  • মানবিক বিপর্যয়: তিনি খেলার ভুলের চেয়ে মানবিক বিপর্যয়কে অনেক বড় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা দাবা কমিউনিটিকে তাদের নিজেদের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।

  • সাংস্কৃতিক সংঘাত: তাঁর মন্তব্য রাশিয়ান এবং ইউক্রেনিয়ান দাবা খেলোয়াড়দের মধ্যে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংঘাতকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।


 

৪.  সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া

 

নাইলসেনের মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে দাবা অনুরাগী, গ্র্যান্ডমাস্টার এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে তুমুল তর্কবিতর্ক শুরু হয়। এটি যেন দাবা জগতের রাজনৈতিক বিভাজনকে স্পষ্ট করে তোলে।

 

নাইলসেনকে সমর্থনকারীরা:

news image
আরও খবর

 

  • "তিনি ঠিকই বলেছেন। যুদ্ধের শিকারদের কষ্টই আসল। একজনের ব্লান্ডার নিয়ে সহানুভূতি কেন?"

  • "দাবা জগতেও রাশিয়ান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া উচিত।"

  • "এই মন্তব্য যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা মনে করিয়ে দিল।"

 

বিরোধী পক্ষ (খেলাধুলার বিশুদ্ধতা):

 

  • "খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখুন। এটি একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ভুল।"

  • "এসিপেঙ্কো একজন খেলোয়াড়, যুদ্ধের জন্য তিনি সরাসরি দায়ী নন।"

  • "নাইলসেনের মন্তব্য অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক এবং অপ্রাসঙ্গিক।"

এদিকে, সুসান পলগার এই বিতর্ককে দীর্ঘায়িত করতে চাননি। তিনি কূটনৈতিকভাবে জানান, "আমি মূলত খেলাকে কেন্দ্র করে কথা বলছিলাম। নাইলসেন তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন—সেটি তাঁর ব্যক্তিগত মত।"


 

৫.  এসিপেঙ্কোর নীরবতা এবং বিশেষজ্ঞদের মত

 

আন্দ্রে এসিপেঙ্কো, যিনি একজন তরুণ গ্র্যান্ডমাস্টার, নাইলসেনের এই মন্তব্যের পরে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ানো থেকে তিনি স্বাভাবিকভাবেই বিরত থাকতে চান এবং পুরো মনোযোগ খেলায় রাখতে চান।

  • অসহায়ত্ব: এসিপেঙ্কো মতো খেলোয়াড়রা, যারা একটি কঠোর রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে রাশিয়ার সরকারি নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন। নাইলসেনের মন্তব্য এই খেলোয়াড়দের একটি অস্বস্তিকর পরিবেশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

  • বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: অনেকেই বলছেন, নাইলসেনের এই মন্তব্য দাবা জগতে বিদ্যমান এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে—যেখানে রাশিয়ান খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব এখন তাদের দেশের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে বিচার করা হতে পারে।


 

৬.  দাবা জগতে যুদ্ধের প্রভাব—এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা

 

নাইলসেনের মন্তব্য আলোচনাকে অন্যদিকে নিয়ে গেলেও এটি সত্য যে—দাবা বিশ্বের পরিবেশ আর আগের মতো নেই।

  • বিভাজন: আন্তর্জাতিক দাবায় রাশিয়ান এবং ইউক্রেনিয়ান খেলোয়াড়দের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট। ইউক্রেনের খেলোয়াড়রা যুদ্ধের ক্ষতির কারণে অনেক বাধার মুখে পড়েছেন।

  • রাজনৈতিক চাপ: ফিদেকে ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে এবং বহু দেশ টুর্নামেন্ট আয়োজনে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।

নাইলসেনের মন্তব্য এই বাস্তবতাকে আরও একবার সামনে নিয়ে এলো—যেখানে খেলার ফলাফলকে মানবিক ট্র্যাজেডি থেকে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।


উপসংহার:

দাবার বোর্ডে একটি ভুল সাধারণত কৌশলগত আলোচনা তৈরি করে। কিন্তু আন্দ্রে এসিপেঙ্কোর blunder নিয়ে পিটার হাইন নাইলসেনের বক্তব্য রাজনৈতিক ও মানবিক আবেগের এমন এক মিশ্রণ তৈরি করেছে, যা দাবা জগতে অনেকদিন ধরে আলোচনার বিষয় থাকবে। এই ঘটনায় এটি স্পষ্ট যে:

  1. দাবা আর শুধু দাবা নয়: বিশ্ব পরিস্থিতি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত এবং পেশাদার জীবনেও প্রভাব ফেলছে।

  2. নৈতিক দায়িত্ব: খেলোয়াড় এবং বিশ্লেষকদের নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নটি এখন খেলার ফল নিয়ে আলোচনার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

  3. বাস্তবতা: মঞ্চ যাই হোক, যুদ্ধের নিদারুণ বাস্তবতা মানুষের মন থেকে মুছে যায় না।

পিটার হাইন নাইলসেন হয়তো একটি তীব্র সত্যই মনে করিয়ে দিলেন—মানবিক কষ্ট যেকোনো খেলাধুলার ভুলের চেয়ে অনেক বড়, এবং খেলার জগতের মানুষেরও যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

Preview image