এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সক্রিয় আগ্নেয়গিরি হল হাওয়াই দ্বীপের মৌনা লোয়া, যার সর্বশেষ অগ্নুৎপাত ঘটে ২০২২ সালে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইথিওপিয়ার হায়েলি গুব্বি আগ্নেয়গিরির ভৌগোলিক গঠন ও অগ্নুৎপাতের ধরন মৌনা লোয়ার সঙ্গে আশ্চর্যজনক ভাবে মিল রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, এই সাদৃশ্য সেই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আগ্নেয়গিরি-ক্রিয়াকলাপের ইঙ্গিত বহন করছে।
পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়ার উত্তর–পশ্চিম প্রান্ত—ভূগোল বইয়ের মানচিত্রে যেটিকে চিনে নেওয়া গেলেও বাস্তবে সে জায়গাটি রয়ে গেছে প্রায় অচেনা, অজানা। বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে শুধু পাথুরে জমি, রুক্ষ পাহাড়, শুষ্ক বাতাস এবং অনাবাদি তৃণভূমি। আধুনিকতার ছোঁয়া বললেই চলে না, নগরজীবনের কোনও স্পন্দন নেই। এতটাই প্রত্যন্ত যে, জনবসতি চোখে পড়ার মতো নেই; যে-কয়েকজন মানুষ সেখানে থাকেন, তাঁদেরও অধিকাংশই যাযাবর প্রকৃতির। এই নির্জন ভূমির বুকেই ঘুমিয়ে ছিল এক আগ্নেয় দৈত্য—হায়েলি গুব্বি। ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় বহুবার উল্লেখ করা হলেও সক্রিয় আগ্নেয়গিরির তালিকায় একে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কারণ, সাধারণ ধারণা ছিল—এটি বহু হাজার বছর ধরেই নিশ্চুপ পড়ে আছে।
কিন্তু সমস্ত পূর্বধারণাকে ভুল প্রমাণ করে আচমকাই জেগে উঠল সেই আগ্নেয় দৈত্য। প্রায় ১২ হাজার বছর পর হায়েলি গুব্বি এমন অগ্নুৎপাত ঘটিয়েছে, যা শুধু ইথিওপিয়ার জনজীবনই নয়, গোটা পূর্ব আফ্রিকা, এমনকি ভারত মহাসাগর পার হয়ে ভারত পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছে।
অগ্নুৎপাতের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশাল ছাইয়ের স্তম্ভ আকাশে উঠে গিয়ে রূপ নেয় ভয়ংকর এক অ্যাশ ক্লাউডে। লোহিত সাগর পেরিয়ে সেই ছাইমেঘ পৌঁছে যায় ভারতের আকাশসীমায়। শুধু তাই নয়, ছাইয়ের ব্যাপকতা ও ঘনত্বের কারণে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়। কিছু রুট ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, কিছু ফ্লাইট বাতিল হয়। এই ঘটনা ভূবিজ্ঞানীদের সামনে এক নতুন ধাঁধা হাজির করেছে—১২ হাজার বছর পরে আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠাই যেখানে যথেষ্ট চমকপ্রদ, তার থেকেও বেশি বিস্ময়কর হলো ছাইমেঘের গঠন।
কারণ, হায়েলি গুব্বির আগ্নেয়গিরি-বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই জানতেন, এটি একটি শিল্ড ভলক্যানো, যা অত্যন্ত বিস্তৃত ও ঢালু কাঠামোয় তৈরি হয় এবং সাধারণত লাভা প্রচুর বের হয় বটে, কিন্তু ছাইয়ের স্তম্ভ বিশাল আকার নেয় না। এই ধরনের আগ্নেয়গিরি থেকে সাধারণত আগুনের ধোঁয়া বা ছাই অন্য দেশের আকাশে উড়ে যাওয়ার মতো শক্তিশালী হয় না। সেই কারণেই এই অগ্নুৎপাত বিজ্ঞানীদের মনে গভীর প্রশ্ন তুলেছে—
এই ছাইমেঘ তৈরি হল কীভাবে? কেন এত উঁচুতে উঠল? আর কেনই বা তা এত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল?
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মৌনা লোয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। ২০২২ সালে সর্বশেষ অগ্নুৎপাত ঘটিয়েছে সেটি। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, হায়েলি গুব্বির গঠনগত চরিত্র মৌনা লোয়ার সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিল। দুই আগ্নেয়গিরিই ঢাল আকৃতির—যাকে বলা হয় ‘কবচ আগ্নেয়গিরি’। এদের লাভা প্রবাহ তরল ও দ্রুতগতির হয়, যা বিশাল উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু ছাইয়ের মেঘ সাধারণত ছোট এবং স্থানীয় স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে, এই ঘটনার ব্যতিক্রমধর্মী আচরণ স্বভাবতই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী জুলিয়েট বিগ্স বলেন, “এই অঞ্চলে এমন বিশাল অগ্ন্যুৎপাত এবং ছাতা আকৃতির ছাইমেঘ অত্যন্ত বিরল।” তাঁর মতে, এই অগ্নুৎপাত শুধু ভৌগোলিক ব্যতিক্রমই নয়, ভবিষ্যতের আগ্নেয় প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
পূর্ব আফ্রিকার ‘রিফট জোন’ পৃথিবীর ভূতত্ত্বে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই বিশাল ফাটল অঞ্চল মূলত আফ্রিকান ও আরবীয় টেকটনিক পাতের বিচ্ছেদের ফলে তৈরি হয়েছে। ভূত্বককে বিশাল ধাতব পাতের মতো কল্পনা করলে দেখা যাবে, এই দুই পাত যেন খুব ধীরে—কিন্তু ধারাবাহিকভাবে—পৃথক দিকে সরে যাচ্ছে। গবেষণায় জানা গেছে, এই বিচ্ছেদের হার বছরে প্রায় ০.৪ থেকে ০.৬ ইঞ্চি। সংখ্যাটি ছোট হলেও ভূতাত্ত্বিক সময়ে এর প্রভাব ভয়ংকর রকম বড়। হাজার হাজার বছর ধরে এই ক্ষুদ্র সরে যাওয়া জমে গিয়ে পুরো অঞ্চলের ভূত্বককে প্রসারিত ও দুর্বল করে দিয়েছে।
যখন দুটি টেকটনিক পাত আলাদা হতে থাকে, তখন মাঝের অংশটি টান পড়ে ক্রমশ পাতলা হয়ে আসে। পাতলা ভূত্বকের নিচে থাকে ম্যান্টল নামের উত্তপ্ত শিলার স্তর। সাধারণ অবস্থায় এই উত্তপ্ত শিলা উপরের দিকে উঠতে পারে না, কারণ ভূত্বকের চাপ তাকে আটকে রাখে। কিন্তু বিচ্ছেদের ফলে যখন ভূত্বক প্রসারিত হতে শুরু করে, তখন গভীরের তাপিত শিলা উপরে ওঠার সুযোগ পায়। উপর দিকে উঠতেই তা গলতে শুরু করে এবং তৈরি হয় ম্যাগমা—যা আগ্নেয়গিরির মূল জ্বালানি।
এই ম্যাগমা পর্যাপ্ত পরিমাণে জমে উঠলে আগ্নেয়গিরির ভেতরের চাপ বাড়তে থাকে। সেই চাপে ভূত্বকের দুর্বল অংশ ভেঙে যায় এবং হঠাৎ করেই শুরু হয় অগ্নুৎপাত—লাভা, গ্যাস ও ছাই ধেয়ে আসে উপরের দিকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রক্রিয়াটি এতটাই স্বাভাবিক যে, আগ্নেয়গিরি সক্রিয় হবে কিনা তা নির্ভর করে মূলত ভূত্বক কতটা প্রসারিত হচ্ছে এবং ম্যাগমা তৈরির গতি কতটা বেশি।
উত্তর ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ আরিয়ানা সোল্ডাটি ঠিক এ কথাটিই আরও স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, “যখন ভূত্বক প্রসারিত হতে থাকে, তখন সেখানে ম্যাগমা তৈরির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। যতক্ষণ তা থাকবে, ততক্ষণ অগ্নুৎপাতের সম্ভাবনাও অটুট থাকবে—সে অগ্নুৎপাত ১,০০০ বছর পর হোক বা ১০,০০০ বছর পর।”
অর্থাৎ, আগ্নেয়গিরির ঘুম ভাঙা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ভূগর্ভে হাজার হাজার বছর ধরে যে চাপ, উত্তাপ ও রাসায়নিক পরিবর্তন জমে জমে তৈরি হয়েছে, তারই ফল হিসেবে আগ্নেয়গিরি একসময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। মাটির নিচের প্রতিক্রিয়ার সময় নির্দিষ্ট নয়—কখনও কয়েকশো বছর, কখনও কয়েক হাজার বছর, আবার কখনও আরও বেশি।
হায়েলি গুব্বির অগ্নুৎপাতকে তাই “হঠাৎ ঘটে যাওয়া” কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে না। বরং এটি সেই দীর্ঘমেয়াদি ভূগর্ভস্থ পরিবর্তনেরই বহিঃপ্রকাশ, যা পূর্ব আফ্রিকার রিফট জোনকে ধীরে ধীরে রূপ দিচ্ছে নতুন এক ভূখণ্ডে। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, এই অঞ্চলের এই প্লেট বিচ্ছেদ ভবিষ্যতে এক নতুন সমুদ্রের জন্ম দিতে পারে। তাই এমন অগ্নুৎপাত কেবল বর্তমানের বিস্ময় নয়—পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভূগোলের দিকে তাকালেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
বেশ কিছু বিশেষজ্ঞের দাবি, হায়েলি গুব্বি সত্যিই ১২ হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এই সন্দেহের কারণ দুটি—
এই অঞ্চলে কোনও স্থায়ী গবেষণাকেন্দ্র নেই, নেই নিয়মিত মানচিত্রায়ন। তাই ছোটখাটো অগ্নুৎপাত চোখ এড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।
হায়েলি গুব্বির কাছাকাছি রয়েছে ‘এরটা আলে’—যা বিশ্বজোড়া বিখ্যাত একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসেই এরটা আলে প্রচুর ছাই ও লাভা ছড়িয়েছে। স্যাটেলাইট তথ্য থেকে দেখা গেছে, সেই সময়ে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৮ মাইল গভীরে ম্যাগমা সঞ্চালিত হয়েছে, যা হায়েলি গুব্বির নিচেও পৌঁছে গিয়েছিল। এমন অবস্থায় হায়েলি গুব্বির জমি কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত ফুলে ওঠে, এবং কিছু ছাইমেঘ তৈরি হতে দেখা যায়।
অতএব, বিজ্ঞানীদের মতে—এটি হয়তো প্রথম বড় অগ্নুৎপাত, কিন্তু একেবারে প্রথম নয়।
২৩ নভেম্বর অগ্নুৎপাতের সময় সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ডেরেক কিয়ের ঘটনাচক্রে ইথিওপিয়ায়ই ছিলেন। অগ্নুৎপাতের পরদিনই তিনি ছাই সংগ্রহ করেন। তাঁর সংগ্রহ করা নমুনা থেকেই জানা যাবে—
ম্যাগমার ধরণ কী ছিল
কেন এত ছাই তৈরি হল
অ্যাশ ক্লাউড এত উচ্চতায় উঠল কীভাবে
১২ হাজার বছর ঘুমের ধারণা ঠিক কি না
এই বিশ্লেষণ পরবর্তী গবেষণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই অগ্নুৎপাত একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে—বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা এতদিন পূর্ব আফ্রিকার রিফট জোনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। অথচ এই অঞ্চলই ভবিষ্যতে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিতে পারে। টেকটনিক প্লেটের বিচ্ছেদ যদি একইভাবে চলতে থাকে, তবে কয়েক হাজার বছর পরে ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়ার কিছু অংশ সরে গিয়ে একটি নতুন সমুদ্রের জন্ম দিতে পারে। ফলে এখানে আগ্নেয়গিরি-ক্রিয়াকলাপ বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
হায়েলি গুব্বির অগ্নুৎপাত তাই শুধু একবারের ঘটনাই নয়—এটি ভবিষ্যতের ভূগর্ভস্থ পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।
হায়েলি গুব্বির এই অগ্নুৎপাত প্রমাণ করেছে, পৃথিবীর ভূগর্ভস্থ পরিবর্তন কখনও থেমে থাকে না। রুক্ষ, নির্জন, মানুষের দৃষ্টির বাইরে থাকা অঞ্চলও কখনও কখনও এমন ঘটনার জন্ম দেয়, যা বিজ্ঞানকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
একদিকে ১২ হাজার বছরের ঘুম ভাঙা আগ্নেয়গিরির রহস্য, অন্যদিকে অস্বাভাবিক ছাইমেঘের সৃষ্টি—এই দুই মিলেই হায়েলি গুব্বি আজ বৈজ্ঞানিক বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে নিবিড় নজরবন্দি গবেষণা বাড়বে, নতুন তথ্য উঠে আসবে এবং পূর্ব আফ্রিকার ভূমি-পাতের রহস্য আরও উন্মোচন হবে—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।