Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

লাল গ্রহে নতুন রহস্য! অচেনা পাথর ঘিরে নাসার রোভারের বড় আবিষ্কার

নাসার মার্স পারসিভারেন্স রোভার মঙ্গলের মাটিতে পাওয়া প্রতিটি পাথরই সূক্ষ্মভাবে স্ক্যান ও বিশ্লেষণ করে। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে এই উন্নত রোবট। সম্প্রতি সেই রোভারই আবিষ্কার করেছে এক নতুন ধরনের অদ্ভুত পাথর, যা লাল গ্রহের ভূতত্ত্বে নতুন রহস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


মঙ্গল গ্রহে নাসার অনুসন্ধান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে লাল গ্রহের বুকে লুকিয়ে আছে অজস্র অজানা রহস্য। বহু বছর ধরে মঙ্গল নিয়ে গবেষণা চলছে ঠিকই, কিন্তু ২০২১ সালে পারসিভারেন্স রোভার সেখানে অবতরণ করার পর থেকে সেই অনুসন্ধান যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। নাসার পাঠানো এই উন্নত রোবটটি মঙ্গলের পাথর, মাটি, পরিবেশ এবং পূর্বেকার জলপ্রবাহের চিহ্ন খুঁজে বের করতে প্রতিদিনই নানা ধরনের পরীক্ষা চালাচ্ছে। গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সে যে তথ্য, ছবি ও নমুনা সংগ্রহ করছে, তা কেবল মঙ্গল নয়—পুরো সৌরজগতের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সম্প্রতি সেই পারসিভারেন্স রোভারই আবিষ্কার করেছে এমন এক অদ্ভুত পাথর, যা এখন বিজ্ঞানী মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। পাথরটি প্রথম নজরে সাধারণ মনে হলেও কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এর গঠন এবং উপাদান মঙ্গলের আর পাঁচটা পাথরের মতো নয়। রোভার-এর ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবিগুলো পৃথিবীতে পৌঁছাতেই গবেষকরা চমকে ওঠেন। তাদের মতে, এই পাথরটি মঙ্গলের নিজস্ব ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে তৈরি হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। বরং এর ভেতরে থাকা উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে—এটি সম্ভবত গ্রহের বাইরে কোথাও থেকে এসে পড়েছে।

পাথরটির মধ্যে অস্বাভাবিক মাত্রায় লোহা ও নিকেল পাওয়া গেছে। সাধারণত এই ধরনের ধাতু-সমৃদ্ধ পাথর তৈরি হয় বৃহৎ কোনও গ্রহাণুর কেন্দ্রীয় অংশে, অথবা মহাশূন্যে ভেঙে যাওয়া উল্কাপিণ্ড থেকে। মঙ্গলের পৃষ্ঠে আগে কয়েকটি ধাতব উল্কাপিণ্ডের সন্ধান মিললেও, পারসিভারেন্স যে পাথরটি খুঁজে পেয়েছে তা তাদের চেয়ে গঠন ও ঘনত্বে অনেকটাই ভিন্ন। এর গায়ে থাকা দাগ, ক্ষতচিহ্ন এবং ধাতব আভা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি সম্ভবত মহাকাশ থেকে ছুটে এসে মঙ্গলের ওপর আছড়ে পড়েছিল বহু বছর আগে।

এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, মহাজাগতিক উল্কাপিণ্ড গ্রহের বুকে পতিত হলে তা ওই গ্রহের গঠন, ইতিহাস এবং মহাশূন্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পাওয়া এই পাথরটি মঙ্গলের অতীত সম্পর্কে এমন তথ্য উন্মোচন করতে পারে, যা আগে কোনও যন্ত্রেই ধরা পড়েনি। রোভারটি যেহেতু নিজের মধ্যে ছোট একটি ল্যাবরেটরি বহন করে, তাই এই পাথরটির রাসায়নিক উপাদান তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে আরও গভীর গবেষণার জন্য প্রয়োজন ছিল এটি পৃথিবীতে আনার। কিন্তু পারসিভারেন্স রোভার নমুনা পরীক্ষা করতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো পৃথিবীতে পাঠানোর সক্ষমতা তার নেই।

তবুও, নাসার বিজ্ঞানীরা আশাবাদী—মঙ্গলের নতুন এই পাথর লাল গ্রহের রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মঙ্গলে আগে সত্যিই কোনও প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, কিংবা ভবিষ্যতে মানুষের বসবাস সেখানে সম্ভব কি না—এমন বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে এই ধরনের আবিষ্কারই গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। পারসিভারেন্স রোভার তার অনুসন্ধান চালিয়ে যাবে যত দিন তার যান্ত্রিক শক্তি টিকে থাকে। আর সেই অনুসন্ধানের ফাঁকেই সামনে আসতে পারে আরও বহু চমকপ্রদ তথ্য—যার প্রত্যাশায় আছে পুরো বিশ্ব।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসার মার্স পারসিভারেন্স রোভার প্রথমবারের মতো মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ করে। উদ্দেশ্য ছিল—লাল গ্রহের ভূতত্ত্ব, পরিবেশ, পূর্বেকার জলপ্রবাহের ইতিহাস, জীবনের সম্ভাব্য অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যতে মানুষের বসবাসের উপযোগিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো। সেই থেকে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে রোভারটি মঙ্গলের জেজ়িরো ক্রেটার ঘুরে ঘুরে পাথর, মাটি, ধূলিকণা ও পরিবেশের নানা পরিবর্তন পরীক্ষা করে দেখছে। মঙ্গলের অন্যান্য রোভারদের মতো শুধু ছবি তুলেই নয়, পারসিভারেন্স নিজের গায়ে বহন করছে একটি ছোট ল্যাবরেটরি, যেখানে সে পাথরের নমুনা কেটে, গুঁড়ো করে বা লেজার দিয়ে পুড়িয়ে নানাভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে।

এই দীর্ঘ অনুসন্ধান অভিযানের মধ্যেই সম্প্রতি ধরা পড়েছে এক রহস্যময় পাথর, যার নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ‘ফিপসাকস্লা’ (Fipsaksla)। পাথরটি আকারে প্রায় ৩১ ইঞ্চি চওড়া—মঙ্গলের গড় পাথরের তুলনায় বেশ বড়সড়। এটি পাওয়া গেছে জেজ়িরো ক্রেটারের ভারনোডেন (Vernorden) অঞ্চলে, যেখানে পারসিভারেন্স গত কয়েক মাস ধরে ঘোরাফেরা করছে। রোভার প্রথম যখন পাথরটির ছবি পৃথিবীতে পাঠায়, তখনই বিজ্ঞানীদের চোখে পড়ে পাথরটির গঠন ও অবস্থানের অস্বাভাবিকতা। অন্যান্য পাথরের তুলনায় এটি একটু উঁচুতে অবস্থান করছিল, যেন উপরে কোথাও থেকে পড়ে এসে আটকে গেছে। পাশাপাশি এর গায়ে ক্ষতবিক্ষত দাগ দেখা যায়, যা সাধারণ মঙ্গলীয় পাথরের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়।

রোভার তার সুপারক্যাম (SuperCam) নামের শক্তিশালী লেজার ও স্পেক্ট্রোমিটার যন্ত্র দিয়ে পাথরটিতে লেজার ছুড়তে শুরু করে। লেজার দিয়ে পাথরের উপরের স্তর উত্তপ্ত হলে নির্গত আলো ও গ্যাস বিশ্লেষণ করেই জানা যায় এর মৌলিক উপাদানের ধরন। সেই পরীক্ষার ফলাফলে বিজ্ঞানীরা চমকে যান—পাথরটির মধ্যে রয়েছে অত্যধিক পরিমাণে লোহা (Iron) এবং নিকেল (Nickel)। মঙ্গলে আগে লোহা-সমৃদ্ধ পাথর পাওয়া গেলেও নিকেলের উপস্থিতি এভাবে ঘন ও浓 ছিল না বাকি পাথরগুলোর মধ্যে। আর লোহা-নিকেল সমৃদ্ধ এমন পাথর সাধারণত গ্রহাণু বা উল্কাপিণ্ডের কেন্দ্রীয় অংশে গঠিত হয় বলে পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক মহল বহুদিন ধরেই জানে।

এ থেকেই সন্দেহ জোরালো হয়—ফিপসাকস্লা আসলে কি একটি উল্কাপিণ্ড?
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বেশ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ উল্কাপিণ্ডগুলো সাধারণত ঢালাই লোহার মতো গঠিত হয় এবং নিকেল-লোহা মিশ্রণের কারণে সেগুলোর পৃষ্ঠে বিশেষ ধরনের ক্ষতচিহ্ন বা খাঁজ দেখা যায়, যেগুলো মঙ্গলীয় পরিবেশে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফিপসাকস্লার গায়েও তেমন কিছু দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

আরও একটি বিষয় বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে—পাথরটির রং ও বৈশিষ্ট্য আশপাশের মাটির সঙ্গে কোনও মিল নেই। মঙ্গলের পাথর সাধারণত অক্সিডাইড হওয়ার ফলে লালচে বা বাদামি আভা ধারণ করে। কিন্তু ফিপসাকস্লার রং অনেকটা ধূসর-কালো ধাতব আভাযুক্ত, যেমনটা পৃথিবীতে লৌহ-নিকেল উল্কাপিণ্ডে দেখা যায়।

news image
আরও খবর

সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন বেশ নিশ্চিত—পাথরটি মঙ্গলের স্থানীয় নয়। সম্ভবত বহু হাজার বছর আগে কোনও বিশাল গ্রহাণুর অংশ ভেঙে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে এসে পড়েছিল। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তুলনায় অনেক পাতলা, ফলে যেকোনও মহাজাগতিক বস্তু সেখানে পৌঁছালে সহজেই পৃষ্ঠে আছড়ে পড়তে পারে।

তবে এখনই গবেষকরা শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত হতে চাইছেন না। কারণ, বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে আরও বহু পরীক্ষা প্রয়োজন। বিশেষত, পাথরের ঘনত্ব, বয়স নির্ণয়, উপাদানগুলোর বিন্যাস, জমাট বাঁধার ধরন—এগুলোর পরীক্ষা পৃথিবীতে আনল্যাবরেটরিতে করলে সবচেয়ে নির্ভুল ফল পাওয়া যায়। পারসিভারেন্স রোভারের সীমাবদ্ধতা হলো—এটি পাথর পরীক্ষা করতে পারে, ছবি পাঠাতে পারে, কিন্তু নমুনা পৃথিবীতে পাঠাতে পারে না।

নাসার ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় ছিল Mars Sample Return Mission, যেখানে পারসিভারেন্সের সংগ্রহ করা নমুনা তুলে আনতে একটি আলাদা মহাকাশযান মঙ্গলে পাঠানো হবে। কিন্তু ব্যয়বহুল এই প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত অবস্থায় রয়েছে এবং নাসা নতুন কৌশল ভাবছে। ফলে ফিপসাকস্লাকে পৃথিবীতে এনে পরীক্ষা করার সম্ভাবনা এখনই নেই।

পাথরের এই আবিষ্কার শুধু একটি নতুন উল্কাপিণ্ড নয়, এটি মঙ্গলের ইতিহাস ও সৌরজগতের বিকাশ সম্পর্কে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ একটি গ্রহে পড়ে থাকা উল্কাপিণ্ড সেই গ্রহের ভূতত্ত্বে বিশেষ ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে এবং মহাকাশের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে কোনো উপাদান এনে দিতে পারে, যা অন্যথায় আমরা কখনো জানতে পারতাম না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন উল্কাপিণ্ডের উৎস যদি সত্যিই বৃহৎ কোনও গ্রহাণুর কেন্দ্র হয়, তবে তা সৌরজগতের প্রাথমিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গ্রহাণুগুলো মূলত প্রাচীন সৌরজগতের অবশেষ, যেগুলোর রাসায়নিক গঠন সৌরজগতের গঠনের শুরুর অবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেয়। মঙ্গলের জেজ়িরো ক্রেটার আবার এমন একটি স্থান যেখানে অতীতে নদী বা হ্রদ থাকার প্রমাণ বহুবার পাওয়া গেছে। অর্থাৎ উল্কাপিণ্ডটি হয়তো খুব প্রাচীন সময়েই সেখানে পড়েছিল—যে সময়ে মঙ্গল ছিল অনেক বেশি জলসমৃদ্ধ ও বাসযোগ্য।

পারসিভারেন্স রোভারের যাত্রাপথও বিজ্ঞানীদের পরিকল্পিত। এটি মূলত মঙ্গলের পূর্বেকার জলপ্রবাহ এলাকাগুলো ঘুরে ঘুরে পাথর সংগ্রহ করছে, কারণ সেই এলাকাগুলোতেই জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন বেশি পাওয়া যেতে পারে। মঙ্গলে অতীতে মাইক্রোবিয়াল অর্থাৎ ক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেটিই নাসার অন্যতম প্রধান অনুসন্ধান। নতুন পাওয়া এই পাথর সরাসরি জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত না হলেও, এটি লাল গ্রহে মহাজাগতিক পদার্থের আগমন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন—
“ফিপসাকস্লার এই অস্বাভাবিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মঙ্গল গ্রহ এখনও অনেক রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—এই গ্রহকে আমরা আসলে কতটুকু চিনি?”

পারসিভারেন্স রোভারের কার্যক্ষমতার এখনো কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। যত দিন তার যান্ত্রিক অংশ ঠিক থাকবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত থাকবে, তত দিন সে তার অনুসন্ধান চালিয়ে যাবে। তাই বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, আগামী দিনগুলোতে রোভার আরও নতুন ও বিস্ময়কর তথ্য পাঠাবে পৃথিবীতে।

ফিপসাকস্লার আবিষ্কার সেই দীর্ঘ যাত্রাপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক মাত্র। এই পাথরের প্রকৃত পরিচয় জানতে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন, যা ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানগুলোর ওপর নির্ভর করছে। তবে একথা নিশ্চিত—এই পাথর আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে, আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা এখন ব্যস্ত।

Preview image