ক্যানসার ধরা পড়লেও ভয় নয় সঠিক চিকিৎসার সঙ্গে প্রতিদিনের ছোট একটি অভ্যাস জীবনকে করতে পারে আরও নিরাপদ এবং শক্তিশালী।
ক্যানসার আজকের দিনে মানুষের জীবনে এক বড় আতঙ্কের নাম হলেও বাস্তবতা হল এই রোগকে এখন আর অজেয় বলা যায় না চিকিৎসা বিজ্ঞানের অসাধারণ উন্নতি এবং মানুষের সচেতনতা এই রোগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছে তবুও ক্যানসার শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভয় দানা বাঁধে কারণ আমরা অনেকেই মনে করি এই রোগ মানেই শেষ কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয় বরং সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শক্তি থাকলে ক্যানসারকেও হারানো সম্ভব।
প্রথমেই বুঝতে হবে ক্যানসার কী ক্যানসার হল এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের কোষগুলি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং এই বৃদ্ধি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে তা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে তবে এই রোগেরও অনেক ধাপ রয়েছে এবং প্রতিটি ধাপে চিকিৎসার পদ্ধতি আলাদা তাই ক্যানসার মানেই সব শেষ এমন ভাবা একেবারেই ভুল।
আগেকার দিনে ক্যানসারের চিকিৎসা এতটা উন্নত ছিল না তাই মানুষ এই রোগকে ভয় পেত কিন্তু এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসেছে কেমোথেরাপি রেডিয়েশন থেরাপি ইমিউনোথেরাপি টার্গেটেড থেরাপি সহ আরও বহু আধুনিক পদ্ধতি যা রোগীকে নতুন জীবন দিতে সক্ষম হচ্ছে শুধু তাই নয় এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যানসার পুরোপুরি নিরাময়ও সম্ভব
তবে শুধুমাত্র চিকিৎসা করলেই হবে না রোগীর মানসিক অবস্থাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একজন রোগী যখন জানতে পারেন তার ক্যানসার হয়েছে তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি ভয় পেয়ে যান হতাশ হয়ে পড়েন এবং অনেক সময় নিজেকে হারিয়ে ফেলেন কিন্তু এই ভয় এবং হতাশাই সবচেয়ে বড় শত্রু কারণ এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বিজ্ঞান বলছে আমাদের মস্তিষ্ক এবং শরীরের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে যখন আমরা ভীত থাকি বা দুশ্চিন্তায় ভুগি তখন শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় যা আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয় ফলে শরীর রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা হারায় অন্যদিকে যখন আমরা ইতিবাচক চিন্তা করি আত্মবিশ্বাসী থাকি তখন শরীরে এমন কিছু রাসায়নিক নিঃসৃত হয় যা আমাদের শক্তি বাড়ায়।
এই জায়গাতেই আসে সেই ছোট কাজটির কথা যা বড় পরিবর্তন আনতে পারে আর সেটি হল মানসিক স্থিরতা এবং ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা এটি শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর প্রভাব অসাধারণ একজন রোগী যদি নিজের মনে বিশ্বাস রাখেন যে তিনি সুস্থ হবেন তাহলে তার চিকিৎসার ফল অনেক ভালো হয়।
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে চিকিৎসা নেন তাদের শরীর চিকিৎসার প্রতি দ্রুত সাড়া দেয় তারা কেমোথেরাপি বা অন্যান্য কঠিন চিকিৎসাও তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সহ্য করতে পারেন কারণ তাদের মনের শক্তি শরীরকে সহযোগিতা করে।
এছাড়া মন ভালো থাকলে শরীরে এন্ডোরফিন নামক একটি রাসায়নিক নিঃসৃত হয় যা প্রাকৃতিকভাবে ব্যথা কমায় এবং শরীরকে স্বস্তি দেয় ফলে রোগীর কষ্ট কমে এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হওয়ার পথে এগিয়ে যান।
মানসিক শক্তি বাড়ানোর জন্য কিছু সহজ অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে যেমন প্রতিদিন কিছু সময় নিজের জন্য রাখা প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো ইতিবাচক বই পড়া বা ভালো গান শোনা ধ্যান করা বা প্রার্থনা করা এগুলি মনকে শান্ত রাখে এবং ভয়ের মাত্রা কমায়।
পরিবারের ভূমিকা এখানেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ক্যানসার রোগীর পাশে যদি তার পরিবার এবং বন্ধুজন শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে রোগী অনেক বেশি সাহস পান একাকিত্ব এবং ভয় দূর হয় তাই রোগীর প্রতি সহানুভূতি এবং ভালোবাসা দেখানো খুব জরুরি।
এছাড়া রোগীর উচিত চিকিৎসকের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখা এবং নিয়ম মেনে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অনেক সময় মানুষ বিভিন্ন ভুল তথ্য বা গুজব শুনে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন যা খুবই বিপজ্জনক তাই সবসময় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শরীরকে শক্তিশালী করে তোলে প্রচুর শাকসবজি ফলমূল প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম এবং হালকা ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখে।
ক্যানসারকে জয় করার জন্য প্রয়োজন তিনটি জিনিস সঠিক চিকিৎসা শক্ত মানসিকতা এবং সুস্থ জীবনযাপন এই তিনটির সমন্বয় একজন মানুষকে নতুন জীবন দিতে পারে।
আমাদের সমাজে এখনও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে যে ক্যানসার হলে আর কিছু করার নেই কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই রোগকে হারিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন তারা প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভব কিছুই নয়।
তাই যদি কখনও জানা যায় শরীরে ক্যানসার বাসা বেঁধেছে তাহলে ভয় পেয়ে ভেঙে পড়ার কোনও প্রয়োজন নেই বরং নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করাতে হবে মনে রাখতে হবে আপনি একা নন আপনার পাশে রয়েছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আপনার পরিবার এবং সবচেয়ে বড় শক্তি আপনার নিজের মন।
ছোট একটি কাজ অর্থাৎ নিজের মনকে স্থির রাখা ইতিবাচক রাখা এবং বিশ্বাস রাখা এই অভ্যাসই আপনার জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে এটি শুধু ক্যানসার নয় জীবনের যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতেও আপনাকে জয়ী হতে সাহায্য করবে।
শেষে বলা যায় ক্যানসার আর আগের মতো ভয়ঙ্কর নয় এটি একটি চ্যালেঞ্জ যা সঠিক চিকিৎসা এবং দৃঢ় মানসিক শক্তির মাধ্যমে জয় করা সম্ভব তাই ভয় নয় সচেতনতা প্রয়োজন হতাশা নয় আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন আর এই আত্মবিশ্বাসই আপনাকে জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে সুস্থতার দিকে নতুন আশার দিকে।
এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করতে হলে প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কিছু ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা দরকার কারণ সুস্থতার পথ শুধু ওষুধের উপর নির্ভর করে না বরং আপনার প্রতিদিনের অভ্যাস আপনার চিন্তাভাবনা এবং আপনার আশেপাশের পরিবেশ সবকিছু মিলেই একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
প্রথমেই প্রয়োজন নিজেকে ভালোবাসা অনেক সময় আমরা নিজের শরীর এবং মনের যত্ন নিতে ভুলে যাই কিন্তু যখন আপনি নিজেকে গুরুত্ব দেবেন তখন আপনার ভেতর থেকে শক্তি তৈরি হবে নিজের প্রতি এই যত্ন আপনাকে প্রতিদিন নতুনভাবে লড়াই করার সাহস দেবে।
এরপর আসে নিয়মিত রুটিন মেনে চলা প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা সময়মতো খাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় শরীর যদি সুস্থ থাকে তাহলে চিকিৎসার প্রভাবও ভালোভাবে কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি পুষ্টিকর খাবার শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে তাজা ফল সবজি প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত জল গ্রহণ শরীরকে পরিষ্কার রাখে এবং শক্তি জোগায় অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত তেল মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ধ্যান এবং গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস খুবই উপকারী প্রতিদিন কিছু সময় চোখ বন্ধ করে নিজের শ্বাসের দিকে মনোযোগ দিলে মন শান্ত হয় দুশ্চিন্তা কমে এবং মস্তিষ্ক স্বস্তি পায় এতে শরীরের ভেতরের ভারসাম্য বজায় থাকে।
এছাড়া নিজের পছন্দের কাজ করা যেমন গান শোনা বই পড়া বা প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো মনকে ভালো রাখে যখন মন ভালো থাকে তখন শরীরও ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয় এবং চিকিৎসার প্রক্রিয়াও সহজ হয়ে ওঠে।
পরিবার এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক শক্তি বাড়ানোর অন্যতম উপায় একজন রোগীর জন্য ভালোবাসা এবং সমর্থন সবচেয়ে বড় ওষুধ হতে পারে কাছের মানুষের উপস্থিতি ভয় দূর করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেক সময় আমরা নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে যাই যা ক্ষতিকর হতে পারে তাই নিয়মিত চেকআপ করা এবং চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ করা উচিত এতে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
নিজেকে সবসময় মনে করাতে হবে যে এই লড়াই আপনি জিততেই পারবেন প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে ইতিবাচক কথা বলা আপনার আত্মবিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করবে এই ছোট অভ্যাসটি আপনার মনের ভিতরে নতুন শক্তি তৈরি করবে।
ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভয় পাওয়ার বদলে বর্তমানের উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত আজ আপনি কীভাবে নিজেকে ভালো রাখছেন সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রতিটি ভালো দিন আপনাকে সুস্থতার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।
এছাড়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে জীবনের ছোট ছোট ভালো দিকগুলিকে স্বীকার করলে মন হালকা হয় এবং ইতিবাচক চিন্তা বাড়ে এতে করে আপনি আরও শক্তভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবেন।
সবচেয়ে বড় কথা হল নিজের ভেতরের আশা কখনও হারানো যাবে না কারণ আশা হল সেই শক্তি যা আপনাকে অন্ধকারের মধ্যেও আলো দেখায় ক্যানসার একটি কঠিন পথ হলেও এটি শেষ নয় বরং এটি একটি নতুন শুরু যেখানে আপনি নিজেকে নতুনভাবে চিনতে পারেন নিজের শক্তিকে আবিষ্কার করতে পারেন।
তাই প্রতিদিন নিজেকে বলুন আপনি পারবেন আপনি লড়াই করছেন এবং আপনি জিতবেন এই আত্মবিশ্বাসই আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সুস্থতার দিকে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নতুন করে উপভোগ করার সুযোগ এনে দেবে।