Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

“সাড়ে তিনশো বছরের প্রথা বজায় রেখে মালদার ফুলবাড়িতে মহাধুমধামে রায় পরিবারের কার্তিক পুজো

মালদার ফুলবাড়ি এলাকায় রায় পরিবারের প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহ্য মেনে মহাধুমধামে অনুষ্ঠিত হল কার্তিক পুজো। বাঁকে বিহারী নামে পরিচিত এই পুজোকে ঘিরে বসেছে মেলা, যার বিশেষ আকর্ষণ ভাটের খই যা শুধুমাত্র এখানকার মেলাতেই পাওয়া যায়।

মালদা জেলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও পরম্পরার পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পুজো-পার্বণ, আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহ্য আর লোকবিশ্বাস। সেই সমস্ত ঐতিহ্যের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা নিয়ে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় মালদা শহরের ফুলবাড়ি এলাকার রায় পরিবারের সাড়ে তিনশো বছরের কার্তিক পুজো। দীর্ঘ তিন শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক মিলনমেলার প্রতীক। স্থানীয়দের কাছে এই পুজো শুধু ভাগবানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উপলক্ষ নয়; বরং তাদের পারিবারিক ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও অলিখিত উত্তরাধিকারকেও বহন করে।

রায় পরিবারের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ‘বাঁকে বিহারী’ কার্তিক—যাঁকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে বহু লোকগাথা, আচার, প্রথা এবং এক বিশেষ সামাজিক আবেগ। এই পুজোর এমনই ঐতিহাসিক গরিমা যে কার্তিক মাস এলেই এলাকার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন পুজো, মেলা এবং বহু প্রাচীন সেই “ভাটের খই”-র স্বাদ পেতে। প্রতি বছর যেমন হয়ে এসেছে, এ বছরও সেই প্রথা অবিকল মেনে কার্তিক মাসের পুণ্য সংক্রান্তি তিথিতে মহাধুমধামে কার্তিক পুজো অনুষ্ঠিত হল রায় বাড়িতে।

রায় পরিবারের কার্তিক পুজোর ঐতিহ্য

এই পরিবারে কার্তিক পুজোর সূচনা ঠিক কবে হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট প্রামাণ্য দলিল না থাকলেও পারিবারিক বংশানুক্রমিক বয়ানে জানা যায়—প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে রায় বাড়ির এক পূর্বপুরুষ স্বপ্নাদেশ পান। বিশ্বাস করা হয়, সেই স্বপ্নাদেশ অনুসারেই এই পুজোর সূচনা। পরবর্তীতে রায় পরিবারের উত্তরপুরুষেরা নিয়ম মেনে, ভালোবাসা নিয়ে ও কঠোর শাস্ত্রীয় আচারে এই পুজোকে ধরে রেখেছেন।

এই পুজোর বিশেষত্ব হল—শুধুমাত্র কার্তিক দেব নন, তাঁর সঙ্গে তিনটি বিশেষ চালায় আরও ২৪ জন দেবদেবীর অধিষ্ঠান রয়েছে। একসঙ্গে এই ২৫ দেবতার পূজা মালদা জুড়েই বিশেষ প্রসিদ্ধ। বহু দেবতার একত্র অধিষ্ঠান ও সেই অনুযায়ী প্রণীত বিশেষ আচারবিধি এই পুজোকে আলাদা মাত্রা দেয়।

পুজোর আগের দিন থেকেই রায় পরিবারের উঠোনে শুরু হয় প্রস্তুতি—

  • আলপনা আঁকা

  • পুজোর ভোগ প্রস্তুত

  • ফুল সংগ্রহ

  • শোভাযাত্রার প্রস্তুতি

  • পুরনো প্রতিমা ঝাড়পোঁছ

  • আরতি সামগ্রী সাজানো

পরিবারের সবাই মিলেই এই প্রস্তুতিতে যোগ দেন। একই সঙ্গে স্থানীয়রাও সহযোগিতার হাত বাড়ান। পুজোকে ঘিরে গোটা এলাকার মধ্যে যে সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়, তা অনন্য।

বাঁকে বিহারী কার্তিকের মাহাত্ম্য

এই অঞ্চলে কার্তিক দেবকে “বাঁকে বিহারী” নামে ডাকা একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। স্থানীয় কথিত আছে, দেবতার মুখাবয়ব ও অঙ্গভঙ্গিতে ‘কৈশোরোত্তীর্ণ কৃষ্ণের বাঁকা ভঙ্গিমা’ যেন ফুটে ওঠে। তাই তাঁর নাম বাঁকে বিহারী।

অন্য জায়গায় কার্তিক পুজো মানেই কেবল যুদ্ধদেবতার পূজা। কিন্তু ফুলবাড়ির পুজোতে কার্তিক দেবকে একই সঙ্গে রক্ষাকর্তা, সংসারের অভিভাবক, পরিবাররক্ষক এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মানা হয়। বহু পরিবার বিশ্বাস করেন—

  • বাঁকে বিহারী কার্তিক তাঁদের ব্যবসায়ে সমৃদ্ধি দেন

  • পরিবারের অশান্তি দূর করেন

  • সন্তানদের রক্ষা করেন

  • রোগ-শোক থেকে বাঁচান

এ কারণে দূর-দূরান্ত থেকেও বহু মানুষ এখানে এসে প্রণাম করেন এবং মানত করেন।

ফুলবাড়ির মেলা—লোকসংস্কৃতির মহোৎসব

কার্তিক পুজো মানেই ফুলবাড়ি এলাকায় বসে বৃহৎ মেলা, যা বহু দশক ধরে একইভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের মতে, এই মেলা একসময় ছিল গ্রামীণ হাট—সেখানে কৃষিপণ্য, মাটির জিনিস ও খেলনা বিক্রি হত। ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে সেই হাট রূপ নেয় বড় মেলায়। এখন এই মেলা মালদার অন্যতম জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এ বছরও মেলায় দূর-দূরান্তের দোকানিরা এসে পসার সাজিয়েছেন—

  • হাতে তৈরি মাটির পুতুল

  • কাঠের খেলনা

  • বালিশ, শাড়ি, পোশাক

  • জুতসাই খাবার

  • পিঠেপুলি

  • চুড়ি, অলংকার

  • স্থানীয় হস্তশিল্প

  • নাগরদোলা, ব্রেকড্যান্স রাইড, ট্রাম্পোলিন

মেলার মধ্যমণি অবশ্যই ভাটের খই। যা পুরো মালদায় পাওয়া যায় না—শুধুমাত্র এই মেলাতেই মেলে। গরম ভাতে তৈরি এই বিশেষ খই পুরোনো দিনের স্বাদ ধরে রেখেছে। অনেকের কাছে এই খই যেন পুজোর আবেগেরই অংশ।

পুজোর দিন রায় বাড়ির দৃশ্য

পুণ্য তিথির সূর্য উঠতেই রায় বাড়ি যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। প্রবেশদ্বার থেকে উঠোন, দেবালয় থেকে রান্নাঘর—সব জায়গায় ব্যস্ততা। পুজো শুরুর আগে বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা মাটির প্রদীপ জ্বালান, তারপর শুরু হয় ঘণ্টা-ঘণ্টার শব্দে দেবতার অভিষেক।

news image
আরও খবর

এই পুজোর সবচেয়ে বিশেষ অংশ হল—

  • মন্ত্রোচ্চারণ

  • ঢাক ঢোলের তালে আরতি

  • ২৫ দেবতার অন্নভোগ নিবেদন

  • সন্ধ্যারতি

  • স্থানীয় মানুষের সমবেত প্রার্থনা

অনেকের মতে, এই পুজোর সন্ধ্যারতি এমনই মনকাড়া হয় যে তা একবার দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে।

স্থানীয়দের আবেগ

ফুলবাড়ির মানুষ এই পুজোকে শুধু ধর্মীয় আচার নয়—তাদের পরিচয়, সংস্কৃতি আর পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতীক মনে করেন। মেলা ঘিরে মানুষের আনন্দ, কেনাকাটা, আত্মীয়দের আসা—সব মিলিয়ে গোটা এলাকা উৎসবের আবহে ভেসে ওঠে।

কেউ বলেন—
“আমাদের জীবনের বছরের সেরা সময়ই হলো এই কার্তিক পুজো।”

কেউ বলেন—
“এটা শুধু রায় পরিবারের পুজো নয়, পুরো এলাকার পুজো।”

অনেকেই আবার মানত করেন যে—
“বাঁকে বিহারী কার্তিক তাঁর ভক্তের ডাকে সাড়া দেন।”

প্রথা বজায় রেখে আধুনিকতার ছোঁয়া

যদিও পুজো তিন শতকের বেশি পুরোনো, তবুও রায় পরিবার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু আধুনিক ব্যবস্থা চালু করেছেন—

  • আলোকসজ্জা

  • মাইকে ঘোষণাপত্র

  • নিরাপত্তাব্যবস্থা

  • গাড়ি রাখার পৃথক জায়গা

  • ভিড় সামলানোর জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল

এসব কিছুর পরও মূল পুজোর আচারবিধিতে একটিও পরিবর্তন হয়নি—প্রজন্ম ধরে ধরে তা অক্ষত রাখা হয়েছে।

পুজোর পরিণতি ও সামাজিক গুরুত্ব

এই পুজো একদিকে যেমন ধর্মীয় অনুভূতি জাগায়, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিকেও বেগবান করে। মেলার দোকানিরা আয় করেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেরই অস্থায়ী কাজ পাওয়া যায়, হস্তশিল্পীরা তাদের পণ্যের বাজার পান।

বহু মানুষ এই পুজোকে ঘিরে বলেন—
“আমাদের এলাকার উন্নয়নের চাবিকাঠিও এই পুজো।”

অর্থাৎ এই এক উৎসবকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে আছে ধর্ম, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, পরিবার এবং লোকসংস্কৃতি।

পুজোর সমাপ্তি—ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

পুজো শেষ হওয়ার পরও রায় পরিবারের বাড়িতে কয়েক দিন ধরে চলে নিয়মিত ভোগ, প্রণাম, প্রসাদ বিতরণ। এলাকার মানুষ একে একে এসে প্রণাম করেন। অনেকেই বলেন—এই পুজো না দেখলে বছরটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তিন শতকেরও বেশি সময় ধরে বজায় থাকা এই পুজো আগামী প্রজন্মকেও একইভাবে সমান ঐতিহ্যে বেঁধে রাখবে—এই বিশ্বাস সকলের মনে। 

কারণ এই পুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি স্থানীয় মানুষের পরিচয়, তাঁদের ইতিহাস, এবং চিরায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। রায় পরিবারের কার্তিক পুজো ঘিরে যে আবেগ, যে ভক্তিভাব, যে সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়, তা বছরের অন্য কোনও উৎসবে এত ব্যাপকভাবে দেখা যায় না। তাই মানুষ মনে করেন—এ পুজো কখনও হারিয়ে যাবে না; সময় বদলালেও, প্রথার আসল সুর ও আধ্যাত্মিকতা অটুটই থাকবে।

আজকের তরুণ প্রজন্মও এই পুজোকে আপন করে নিতে শুরু করেছে। তারা স্মার্টফোনে ছবি তোলে, ভিডিও বানায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে পুজোর মহিমাকে ছড়িয়ে দেয় দূরদূরান্তে। তারা হয়তো আগের দিনের মতো পুরোনো রূপে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু নতুন সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েও ঐতিহ্যটিকে ধরে রাখছে সমান শ্রদ্ধায়। পুজোর দিনগুলোতে এলাকার ছেলে-মেয়েরা সকলে মিলে মেলার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে—কারও কাজ আলো লাগানো, কেউ মঞ্চের সাজসজ্জা দেখে, কেউ আবার দোকানিদের জায়গা ঠিক করে দেয়। এভাবে তারা একদিকে যেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, অন্যদিকে শেখাচ্ছে কীভাবে ঐতিহ্যকে হাতে-হাতে বহন করতে হয়।

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা প্রায়ই বলেন—‘‘আমাদের সময়ে এই পুজোর আনন্দ ছিল অন্যরকম।’’ তাঁদের সেই স্মৃতিগুলো এখনও উজ্জ্বল। শীতের সন্ধেয় আলপনা মেখে, ধূপের গন্ধে ভরা পরিবেশে, কাঁসার থালায় প্রসাদ নিয়ে ভিড় জমত উঠোন জুড়ে। আজকের প্রজন্ম হয়তো একটু বদলেছে, কিন্তু সেই ভক্তি, সেই আনন্দ এখনও একইরকম উষ্ণ। বরং এখন সুবিধা বেড়েছে—বাড়তি আলো, সাজসজ্জা, উন্নত মেলার ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে পুজোর অনুষ্ঠান আরও জমজমাট হয়েছে।

পুরো ফুলবাড়ি এলাকা পুজোর সময় যেন এক উৎসবগ্রামে পরিণত হয়। রাস্তার দুই ধারে সারি সারি দোকান—ভাটের খই, নকুলদানা, লাউচাপড়া, খেলনা, কাঁসার বাসন, রঙিন আলো, গ্রামীণ কারু শিল্পের নানা সামগ্রী—সব মিলিয়ে উৎসবের রং যেন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। পরিবারের সাথে যারা বাইরে থেকে আসেন, তাঁদের জন্য এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ ভোলার নয়।

কার্তিক পুজোর মূল মন্ত্র হলো শান্তি, সুস্বাস্থ্য, ভক্তি ও সমৃদ্ধি। তাই বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, এই পুজো তাঁদের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে। এলাকার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে কর্মজীবী, ব্যবসায়ী—সকলেই এই পুজোয় অংশ নেন হৃদয়ের টানে। রায় পরিবারও চেষ্টা করেন সবাই যেন সমান মর্যাদায় ভোগ-প্রসাদ পান। এই সাম্যের মনোভাবই পুজোটিকে আরও শ্রদ্ধার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

আজকাল শহরতলির অনেক জায়গায় পুরোনো প্রথাগুলো বদলে যাচ্ছে। দ্রুতগতির জীবনে মানুষ সময়ের অভাবে সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আগের মতো যুক্ত থাকতে পারছেন না। কিন্তু ফুলবাড়ির এই কার্তিক পুজো এখনও সেই ধারা ধরে রেখেছে। আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে, মানুষের জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তন এসেছে—তবুও প্রথা, বিশ্বাস আর ভক্তিভাবের কোনও হেরফের হয়নি। তাই সবাই মনে করেন—এই পুজো কেবল অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতের পথও দেখাবে।

অবশেষে, যতদিন মানুষের মনে এই পুজোর প্রতি ভালোবাসা থাকবে, ততদিন এই ঐতিহ্য অটুট থাকবে। তাই রায় পরিবারের প্রত্যেক প্রজন্মের দায়িত্ব—এই পুজোকে আরও সমৃদ্ধ করে, আরও সুসংগঠিত করে, আগামী দিনের শিশুদের হাতে পৌঁছে দেওয়া। যাতে তারাও একদিন একই গর্বে বলতে পারে—‘‘আমাদের ফুলবাড়ির কার্তিক পুজো তিনশো বছরের নয়, চারশো বছরের ঐতিহ্য! 

Preview image