তরুণদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি। অনেকেই মনে করেন শুধু চিনি খেলেই হয় ‘সুগার’, কিন্তু আসল কারণ আরও গভীরে। চিনি কমালেই কি ডায়াবিটিস রুখে দেওয়া যায়? জানুন ঝুঁকির কারণ, ভুল ধারণা ভাঙা তথ্য ও প্রতিরোধের কার্যকর উপায়
ডায়াবিটিস এমন এক অসুখ, যা ধীরে ধীরে শরীরের ভিতরে বাসা বাঁধে। বাইরে থেকে তেমন বোঝা যায় না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিকে নিঃশব্দে অকেজো করে দিতে পারে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞেরা ডায়াবিটিসকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা ‘নিঃশব্দ ঘাতক’ বলে ব্যাখ্যা করেন। উচ্চ রক্তশর্করা দীর্ঘদিন অজান্তে থেকে গেলে কিডনি, চোখ, স্নায়ু, হার্ট—শরীরের প্রায় প্রতিটি সিস্টেমের ক্ষতি করে। অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম দিকের উপসর্গ—যেমন ক্লান্তি, দুর্বলতা, তন্দ্রাচ্ছন্ন লাগা, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, ঘন ঘন সংক্রমণ—এতটাই সাধারণ যে কেউ তা আলাদা করে গুরুত্ব দেন না। ফল—ধরা পড়তে পড়তে অসুখ অনেকটাই এগিয়ে যায়।
একসময় ডায়াবিটিসকে বয়সকালের অসুখ বলা হত। বিশেষ করে চল্লিশ বা পঞ্চাশ পেরোলেই কারও রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কথা অনেকেই জানতেন। অথচ গত এক দশকে চিত্র বদলে গেছে। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায়ই কিশোর বয়স থেকে শুরু করে বিশের কোঠার তরুণ-তরুণীর মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে টাইপ–২ ডায়াবিটিস। এর পিছনে জিনগত কারণ কিছুটা থাকলেও, চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন—কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অভাব, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম ও অনিদ্রার মতো আধুনিক জীবনধারার সমস্যার।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—চিনি কম খেলেই কি ডায়াবিটিস হবে না? নাকি আসল সমস্যা শরীরের ভেতরে চলতে থাকা জটিল হরমোনজনিত পরিবর্তন? কীভাবে প্রতিরোধ সম্ভব? সব প্রশ্নের উত্তরই ধাপে ধাপে মিলবে নিচে।
ডায়াবিটিসকে সাধারণত দু’ধরনে ভাগ করা হয়—টাইপ–১ ও টাইপ–২। দুটির কারণ, উপসর্গ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আলাদা, যদিও বাইরে থেকে দুটোকেই আমরা ‘সুগার’ বলে থাকি।
টাইপ–১ ডায়াবিটিস সাধারণত জিনভিত্তিক বা অটোইমিউন সমস্যার কারণে হয়। এই অবস্থায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষগুলিকে আক্রমণ করে ফেলে। ফলে ইনসুলিন উৎপাদন একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইনসুলিন ছাড়া শরীর শর্করাজাতীয় খাবার থেকে শক্তি তৈরি করতে পারে না।
এই ধরনের ডায়াবিটিস সাধারণত কম বয়সে ধরা পড়ে।
রোগীকে সারাজীবন ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়।
এর উপর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনেরও কড়া নজর দরকার।
টাইপ–২ ডায়াবিটিস হয় শরীরে ইনসুলিন তৈরি স্বাভাবিক থাকলেও, সেই ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ না করার কারণে। একে বলে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স। আধুনিক জীবনযাপন—অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা, অনিয়মিত ঘুম—এই সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করে।
এ ছাড়া পরিবারের কারও ডায়াবিটিস থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এখন এমন অনেক তরুণও টাইপ–২ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন, যাদের পরিবারে কোনও ইতিহাস ছিল না।
ডায়াবিটিস হওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক স্তর থাকে—প্রিডায়াবিটিস। এখানে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি থাকে, তবে ডায়াবিটিসের মাত্রায় পৌঁছয় না।
সমস্যাটি হলো:
এই পর্যায়ে বেশিরভাগ মানুষের কোনও উল্লেখযোগ্য উপসর্গ থাকে না।
শরীর নিঃশব্দে ইনসুলিনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে থাকে।
অনেক সময় রক্ত পরীক্ষা ছাড়া বোঝাই যায় না।
ডায়াবিটিস চিকিৎসক অভিজ্ঞান মাঝি জানাচ্ছেন, “প্রিডায়াবিটিস থেকে ডায়াবিটিস হওয়া নিঃশব্দেই ঘটে। তাই মানুষ বুঝতেই পারেন না। যখন ধরা পড়ে, তখন অনেকটাই দেরি হয়ে যায়।”
প্রিডায়াবিটিসের সাধারণ উপসর্গ:
খুব ক্লান্ত লাগে
ব্যায়াম না করলেও দুর্বল লাগে
ঘন ঘন প্রস্রাব
বারবার সংক্রমণ
ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
এসবই অত্যন্ত সাধারণ লক্ষণ—যা অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ফলে ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে।
নয়ডার যাপন-সহায়ক ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ দীপিকা রাম্পা জানাচ্ছেন—“টাইপ–২ ডায়াবিটিস এক দিনে হয় না। আগে থেকেই শরীরে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স তৈরি হয়।”
ইনসুলিন তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু শরীর সেই ইনসুলিনকে উপেক্ষা করতে থাকে। এর ফলে:
খাবার থেকে পাওয়া শর্করা শক্তি হিসেবে ব্যবহার না হয়ে ফ্যাট হিসেবে জমা হতে থাকে।
ওজন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
আবার কারও কারও ক্ষেত্রে ইনসুলিন কম তৈরি হলে ওজন কমে যেতে পারে, কারণ শরীর শক্তির জন্য সঞ্চিত ফ্যাট পোড়াতে থাকে।
এই অবস্থাটি নিঃশব্দে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। যতক্ষণ না রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে পরীক্ষা করার সময় ধরা পড়ে।
নানা গবেষণা, মেডিক্যাল রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞ মতামত থেকে যেটা পরিষ্কার—ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বাড়ছে তিনটি প্রধান কারণে।
প্রসেসড ফুড, চিনিযুক্ত পানীয়, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট—তরুণদের খাদ্যতালিকায় এগুলি অত্যন্ত সাধারণ। ফাস্ট ফুড, তেলে ভাজা খাবার, অতিরিক্ত কফি-চা, মাঝরাতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস—সব কিছুই রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট করে।
অনলাইন ক্লাস, অফিস, মোবাইল গেম, সিরিজ দেখার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় চেয়ারে বা বিছানায় কাটে।
এতে:
ইনসুলিনের কাজ বাধা পায়
বিপাকীয় হার কমে
ওজন বাড়ে
পেশির শক্তি কমে
এগুলো ডায়াবিটিসের প্রধান ঝুঁকি।
স্ট্রেসের কারণে কর্টিসল বাড়ে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
রাতে দেরি করে ঘুমোলে শরীরের জৈবঘড়ি নষ্ট হয়—এটাও ডায়াবিটিসের বড় কারণ।
উত্তর—হ্যাঁ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে টাইপ–২ ডায়াবিটিস সম্পূর্ণভাবেই প্রতিরোধযোগ্য। তবে শর্ত হলো—সময় থাকতে সচেতন হতে হবে।
অনেকে ভাবেন—চিনি খেলেই নাকি ‘সুগার হয়’।
কিন্তু চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন—চিনি ডায়াবিটিসের প্রধান কারণ নয়, বরং চিনি কমালে স্বাস্থ্য ভাল হয়। ডায়াবিটিস হলে চিনি খাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে—এই ধারণা থেকেই ভুল ধারণাটা ছড়িয়েছে।
আসল সমস্যা চিনি নয়,
বরং—
জীবনযাপনের অনিয়ম
ওজন বৃদ্ধি
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
প্রিডায়াবিটিস অবস্থাকে অবহেলা
রোদে কিছুক্ষণ থাকা ভিটামিন–ডি বাড়ায়, যা ইনসুলিন ফাংশনকে সক্রিয় রাখে।
খালি পায়ে হাঁটা হলে মাটির সংস্পর্শে শরীরের বৈদ্যুতিক ভারসাম্য ভালো থাকে।
বেশি সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারে স্ট্রেস হরমোন বাড়ে, ঘুম নষ্ট হয়—ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দ্রুত বাড়ে।
সকালে তাড়াতাড়ি ওঠা
রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো
মাঝরাতে কাজ বা খাওয়া বাদ দেওয়া
ঘুম ঠিক থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ফল, সবজি, ডাল, বাদাম, শস্য—এসব ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমায়।
রাতে হজমের ক্ষমতা সবচেয়ে কম থাকে, তাই রাত ৮টার পর ভারী খাবার রক্তে শর্করা বাড়ায়।
সাদা চাল, রুটি, আলু, মিষ্টি—এগুলোর পরিমাণ কমিয়ে:
ডিম
মাছ
ডাল
চিকেন
বাদাম
এগুলো খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা
সপ্তাহে তিন দিন ওজন নিয়ে ব্যায়াম
খাওয়ার পরে ১০ মিনিট হাঁটা
এগুলো ডায়াবিটিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
দীপিকার মতে, “খাওয়ার পর ১০ মিনিট হাঁটাহাটি করলে রক্তে শর্করার মাত্রা অসাধারণভাবে কমে। এটা খুব সহজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী অভ্যাস।”
ডায়াবিটিস এক দিনে হয় না। ধীরে ধীরে বছর ধরে শরীর পরিবর্তিত হতে থাকে।
তাই প্রতিরোধই এখানে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
সময়মতো রক্ত পরীক্ষা
নিয়মিত ব্যায়াম
ঘুমের নিয়ম
চিনি কমানো
স্ট্রেস কমানো
রোদ লাগানো
খাবারে ফাইবার বাড়ানো
এসব করলে টাইপ–২ ডায়াবিটিস হওয়ার সম্ভাবনা ৫০–৮০% পর্যন্ত কমে যায়—বিভিন্ন গবেষণা তা প্রমাণ করেছে।
ডায়াবিটিস আছে মানেই জীবন শেষ নয়।
বরং সংযম, সচেতনতা, নিয়ম মানলে—এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আর যারা এখনো অসুস্থ নন—তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতনতা ও প্রতিরোধ।