Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শ্রবণশক্তি হ্রাসের কারণ কি হতে পারে কিডনির রোগ উচ্চ রক্তচাপেও ক্ষতি হয় একই রকম কী ভাবে

উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির রোগে যে কানেরও ক্ষতি হয়, তা জানতেন কি? রক্তচাপ বাড়লে কানের ভিতরে রক্তক্ষরণ হতে পারে। অনেক সময়েই তা বোঝা যায় না। আর কিডনির সমস্যায় এমন টক্সিন জমা হয়, যা বিপজ্জনক। এর থেকে বধিরতাও আসতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে আমরা সাধারণত হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক কিংবা কিডনির জটিলতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখি। কিন্তু অনেকেই জানেন না, রক্তচাপের হেরফের সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে আমাদের শ্রবণশক্তির উপরেও। হঠাৎ করে কানে কম শোনা, একটানা ভোঁ ভোঁ বা ঝিঁঝিঁ শব্দ হওয়া (টিনিটাস), মাথা ঘোরা, এমনকি হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সচেতনতার অভাবে অনেক সময় এই লক্ষণগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যার ফলে ক্ষতি বাড়তে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ ও কানের গঠন: সম্পর্ক কোথায়?

মানবকর্ণ তিনটি ভাগে বিভক্ত—বহিঃকর্ণ, মধ্যকর্ণ এবং অন্তঃকর্ণ। অন্তঃকর্ণে থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, ‘কক্‌লিয়া’ (Cochlea), যা শামুকের খোলের মতো গঠনবিশিষ্ট। এই কক্‌লিয়ার ভিতরে রয়েছে সূক্ষ্ম স্নায়ুকোষ (হেয়ার সেল) এবং অতি সূক্ষ্ম রক্তনালির জালিকা। শব্দতরঙ্গ যখন কানের পর্দায় আঘাত করে, তখন সেই কম্পন মধ্যকর্ণ পেরিয়ে কক্‌লিয়ায় পৌঁছয়। কক্‌লিয়ার স্নায়ুকোষগুলি সেই কম্পনকে বৈদ্যুতিক সঙ্কেতে রূপান্তরিত করে মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্ক সেই সঙ্কেতকে শব্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া পুরোপুরি নির্ভর করে স্বাভাবিক রক্তসঞ্চালনের উপর। কারণ কানের ভিতরের স্নায়ুকোষগুলির জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি প্রয়োজন। রক্তচাপ অত্যধিক বেড়ে গেলে এই সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলির উপর চাপ পড়ে। কখনও তা ফেটে যেতে পারে, কখনও আবার রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি হয়। ফলে কক্‌লিয়ার কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

সিডিসি-র পর্যবেক্ষণ

Centers for Disease Control and Prevention (CDC) জানিয়েছে, শোনার প্রক্রিয়াটি কানের ভিতরের সূক্ষ্ম রক্তনালি ও স্নায়ুর উপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এই সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলির প্রাচীর মোটা হয়ে যেতে পারে অথবা সেগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র রক্তক্ষরণও হতে পারে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে কানের গঠনকে নষ্ট করে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্‌লিয়ার হেয়ার সেল বা সংবেদনশীল স্নায়ুকোষগুলি এক বার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর তৈরি হয় না। তাই উচ্চ রক্তচাপের কারণে যদি এই কোষগুলির ক্ষতি হয়, তা হলে শ্রবণশক্তির হ্রাস স্থায়ী হতে পারে।

কী ভাবে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

১. রক্তনালির ক্ষতি: উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালির প্রাচীরকে দুর্বল করে। অন্তঃকর্ণে যেহেতু রক্তনালিগুলি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, তাই সেখানে ক্ষতি দ্রুত হয়।
২. রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া: রক্তনালির সংকোচন বা ব্লকেজ হলে কক্‌লিয়ায় পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। এতে কোষমৃত্যু হতে পারে।
৩. স্নায়ুকোষের স্থায়ী ক্ষতি: দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে স্নায়ুকোষ নষ্ট হয়ে যায়। এগুলি পুনর্গঠিত হয় না।
৪. টিনিটাস: কানের ভিতরে রক্তপ্রবাহের অস্বাভাবিকতার কারণে অনেক সময় ভোঁ ভোঁ বা ঝিঁঝিঁ শব্দ শোনা যায়।

কিডনির রোগ ও শ্রবণশক্তি

কিডনির সমস্যার সঙ্গেও কানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিডনি ও অন্তঃকর্ণের কোষগঠন এবং তরল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে বিস্ময়কর সাদৃশ্য আছে। কিডনি শরীরের তরল ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিডনির রোগ হলে শরীরে তরলের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা অন্তঃকর্ণের তরলচাপেও প্রভাব ফেলে।

অন্তঃকর্ণে থাকা বিশেষ তরল (এন্ডোলিম্ফ ও পেরিলিম্ফ) শব্দ ও ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে এই তরলের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। ফলে—

  • কানে কম শোনা

  • মাথা ঘোরা

  • ভারসাম্যহীনতা

  • বমি বমি ভাব

ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হঠাৎ শ্রবণশক্তি কমে গেলে কী করবেন?

অনেক সময় হঠাৎ এক কান বা দুই কানে কম শোনা শুরু হয়। এটিকে ‘সাডেন সেন্সরিনিউরাল হিয়ারিং লস’ বলা হয়। এটি একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু না করলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তাই—

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

  • দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে ভোগা ব্যক্তিরা

  • ডায়াবেটিস রোগী

  • কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগী

  • ধূমপায়ী

  • অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে যাঁদের

প্রতিরোধের উপায়

১. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা: নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খাওয়া জরুরি।
২. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: কম লবণ, কম চর্বিযুক্ত খাবার, বেশি ফল ও শাকসবজি।
৩. ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
৪. ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন: এগুলি রক্তনালির ক্ষতি বাড়ায়।
৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: কিডনি ফাংশন টেস্ট, লিপিড প্রোফাইল, ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সচেতনতার অভাবই বড় সমস্যা

অনেকেই মনে করেন, কানে কম শোনা মানেই বয়সের প্রভাব। কিন্তু যদি তুলনামূলক কম বয়সে এমন সমস্যা শুরু হয় এবং তার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যা থাকে, তা হলে সতর্ক হওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে শ্রবণশক্তি সম্পূর্ণ হারানোর ঝুঁকি থাকে।
 

উপসংহার

উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির রোগ—দুটি সমস্যাকেই আমরা সাধারণত ‘নীরব ঘাতক’ বলে জানি। কারণ, অনেক সময় এদের উপসর্গ স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ে না, অথচ ভিতরে ভিতরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক বা চোখের উপর প্রভাবের কথা আমরা প্রায়ই শুনি, কিন্তু কানের উপর এর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলক কম। অথচ অন্তঃকর্ণের সূক্ষ্ম রক্তনালি ও স্নায়ুকোষ এতটাই সংবেদনশীল যে সামান্য রক্তচাপের হেরফেরও সেখানে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

শ্রবণশক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যোগাযোগ, সামাজিক মেলামেশা, পেশাগত দক্ষতা—সব ক্ষেত্রেই শোনার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানে একটানা ভোঁ ভোঁ শব্দ হওয়া, আচমকা কম শোনা, বা হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা—এই লক্ষণগুলি অনেকেই সাময়িক ভেবে এড়িয়ে যান। কেউ ভাবেন হয়তো ঠান্ডা লেগেছে, কেউ মনে করেন বয়সের প্রভাব। কিন্তু যদি এর নেপথ্যে থাকে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির জটিলতা, তা হলে অবহেলা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে অন্তঃকর্ণের কক্‌লিয়ার সূক্ষ্ম রক্তজালিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অক্সিজেন ও পুষ্টির ঘাটতিতে স্নায়ুকোষগুলি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এক সময় তা স্থায়ী ভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল—এই স্নায়ুকোষগুলি এক বার ধ্বংস হয়ে গেলে আর পুনর্গঠিত হয় না। অর্থাৎ ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রেই স্থায়ী। একই ভাবে কিডনির রোগ শরীরের তরল ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট করে অন্তঃকর্ণের কার্যকারিতায় বিঘ্ন ঘটায়। ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাসের পাশাপাশি মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যহীনতার সমস্যাও দেখা দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সচেতনতা ও প্রতিরোধ। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ গ্রহণ, কম লবণযুক্ত সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জলপান, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান বর্জন—এই সাধারণ অভ্যাসগুলিই বড় ক্ষতি ঠেকাতে পারে। পাশাপাশি কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং বার্ষিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই শ্রবণশক্তি সম্পূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যাঁদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকা উচিত। কানে অস্বাভাবিক শব্দ, হঠাৎ কম শোনা বা ঘন ঘন মাথা ঘোরা—এই উপসর্গগুলিকে কখনও হালকা ভাবে নেওয়া চলবে না। দ্রুত ইএনটি বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, শরীরের প্রতিটি অঙ্গ পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। একটি সমস্যাকে অবহেলা করলে তার প্রভাব অন্যত্র গিয়েও পড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির অসুখ কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট অঙ্গের সীমাবদ্ধ রোগ নয়—তা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি ছাপ ফেলে।

তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং উপসর্গ দেখলেই দ্রুত চিকিৎসা—এই তিনটি পদক্ষেপই পারে আমাদের শ্রবণশক্তি ও সামগ্রিক সুস্থতা রক্ষা করতে। মনে রাখতে হবে, এক বার শ্রবণশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে গেলে তা আর সহজে ফিরে পাওয়া যায় না। নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া—এই দায়িত্ব আমাদেরই। সুস্থ জীবনযাপনই হোক সুস্থ শ্রবণশক্তির চাবিকাঠি।

Preview image