নিপা একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা আক্রান্ত পশুর দেহাবশেষ বা মলমূত্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই ভাইরাস সংক্রমণ ছড়াতে পারে সরাসরি সংস্পর্শে এলে বা দূষিত পরিবেশের মাধ্যমে।
ফের একবার আতঙ্ক ছড়াল পশ্চিমবঙ্গে। কেরলের পর এবার বাংলার মাটিতে নিপা ভাইরাসের উপস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের একটি হাসপাতালে কর্মরত দুই নার্সকে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। দু’জনকেই ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা চলছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় নিপা ভাইরাসের উপসর্গ মেলায় নমুনা পাঠানো হয়েছে পুণের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজিতে (NIV)। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পুরো বিষয়টি ‘সন্দেহজনক নিপা সংক্রমণ’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
স্বাভাবিক ভাবেই এই খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারণ নিপা ভাইরাস সাধারণ ভাইরাল জ্বর নয়—এই ভাইরাসে মৃত্যুহার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
নিপা ভাইরাস (Nipah Virus বা NiV) একটি জুনোটিক ভাইরাস। অর্থাৎ এটি পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। ১৯৯৮ সালে প্রথম এই ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া যায় মালয়েশিয়ায়। পরে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে—বিশেষ করে কেরলে—বারবার নিপা সংক্রমণের ঘটনা সামনে এসেছে।
এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ফলখেকো বাদুড় (Fruit Bat)। বাদুড়ের দেহে এই ভাইরাস প্রাকৃতিকভাবে থাকে এবং তারা নিজেরা অসুস্থ না হলেও মানুষের শরীরে ঢুকলে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়।
নিপা ভাইরাস মূলত কয়েকটি পথে ছড়াতে পারে—
বাদুড়ের আধখাওয়া ফল
বাদুড়ের লালা, মূত্র বা মল দ্বারা দূষিত ফল
মাঠে পড়ে থাকা ফল খেলে সংক্রমণের আশঙ্কা
বিশেষ করে শুয়োর নিপার মধ্যবর্তী বাহক
আক্রান্ত শুয়োরের শরীরের নিঃসরণ, রক্ত বা মলমূত্র থেকে সংক্রমণ
আক্রান্ত ব্যক্তির থুতু, লালা
ব্যবহৃত বিছানা, কাপড়, তোয়ালে
দীর্ঘ সময় কাছাকাছি থাকলে
হাসপাতালে চিকিৎসার সময় সুরক্ষা না নিলে
এই কারণেই চিকিৎসক ও সেবাকর্মীদের জন্য নিপা ভাইরাস সবচেয়ে বিপজ্জনক।
নিপা ভাইরাসে সংক্রমণের পর সাধারণত
? ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ শুরু হয়
প্রথম দিকে লক্ষণ এতটাই সাধারণ যে অনেক সময় সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করা হয়—যা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
জ্বর
মাথাব্যথা
পেশিতে ব্যথা
বমি বমি ভাব
দুর্বলতা
শ্বাসকষ্ট
বিভ্রান্তি, ভুল বকা
অচেতন হয়ে যাওয়া
খিঁচুনি
স্মৃতি হারানো
কাউকে চিনতে না পারা
এনসেফেলাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ)
কোমা
শ্বাসযন্ত্র বিকল হওয়া
মৃত্যু
চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে ৫–৬ দিনের মধ্যেই রোগী কোমায় চলে যেতে পারেন।
নিপা ভাইরাস একসঙ্গে মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে আক্রমণ করে।
মস্তিষ্কে প্রদাহ হলে স্নায়বিক সমস্যা হয়
ফুসফুসে সংক্রমণে শ্বাসকষ্ট বাড়ে
দ্রুত অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটতে পারে
সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো—
? নিপার কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা এখনও নেই
সাধারণ রক্ত পরীক্ষা বা জ্বরের পরীক্ষায় নিপা ধরা পড়ে না।
নিপা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন—
বায়ো-সেফটি লেভেল–৩ (BSL-3) ল্যাবরেটরি
নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়—
থুতু ও লালা
মূত্র
রক্ত
সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF)
এই কারণেই রাজ্যের বাইরে, পুণের NIV-তে নমুনা পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে নিপার চিকিৎসা মূলত—
উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা (Supportive Care)
ভেন্টিলেশন
অক্সিজেন সাপোর্ট
খিঁচুনি ও স্নায়ুর সমস্যা নিয়ন্ত্রণ
চিকিৎসক শুভম সাহার কথায়—
“নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে বোঝা যায় না। খুব দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। একবার ফুসফুস বা মস্তিষ্কে সংক্রমণ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”
বিশ্বজুড়ে নিপা ভাইরাসের টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। জেনোভার একটি প্রতিষেধক পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকদের আশা—এই টিকা কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।
নিয়মিত হাত ধোয়া
পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকা
অপরিষ্কার ফল না খাওয়া
ফল খাওয়া আপাতত বন্ধ
শুয়োর থেকে দূরে থাকা
মাস্ক ব্যবহার (N95 হলে ভালো)
ভিড় এড়িয়ে চলা
রোগীর সংস্পর্শে গেলে সাবধানতা
PPE কিট
মাস্ক ও গ্লাভস
ঘনঘন হাত ধোয়া
এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে—
নিপা সন্দেহে দু’জন আক্রান্ত
দু’জনই ভেন্টিলেশনে
অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক
স্বাস্থ্য দপ্তর পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে।
নিপা ভাইরাস কোনও সাধারণ রোগ নয়। এটি দ্রুত ছড়ায়, দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। টিকা না থাকায় সচেতনতা ও সতর্কতাই একমাত্র অস্ত্র। সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করলে বিপদ বাড়তে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
নিপা ভাইরাস কোনও সাধারণ রোগ নয়। এটি দ্রুত ছড়ায় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। সাধারণ ভাইরাল জ্বরের সঙ্গে এর প্রাথমিক লক্ষণ মিল থাকায় বহু ক্ষেত্রেই রোগটি ধরা পড়ে দেরিতে। আর এই দেরিই অনেক সময় মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে নিপা ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত টিকা না থাকায় সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধই একমাত্র ভরসা।
নিপা ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল—এটি একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে একসঙ্গে আক্রমণ করে। মস্তিষ্ক, ফুসফুস এবং স্নায়ুতন্ত্রে এই ভাইরাসের প্রভাব পড়ে খুব দ্রুত। ফলে রোগীর অবস্থা কয়েক দিনের মধ্যেই গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণের পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই রোগী অচেতন হয়ে পড়েন বা কোমায় চলে যান। এই পর্যায়ে চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।
নিপা ভাইরাসের মৃত্যুহার অন্যান্য অনেক ভাইরাসজনিত রোগের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিপা সংক্রমণে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ আক্রান্ত চারজনের মধ্যে দুই থেকে তিনজনের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয় না। এই পরিসংখ্যানই নিপাকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ভাইরাসগুলির তালিকায় ফেলেছে।
নিপা ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ ভাইরাল ফিভারের মতো হওয়ায় অনেকেই বিষয়টিকে হালকা ভাবে নেন। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি ভাব—এই উপসর্গগুলি আমাদের দেশে খুব পরিচিত। ফলে অনেকেই বাড়িতে সাধারণ জ্বরের ওষুধ খেয়ে সময় কাটান। কিন্তু নিপার ক্ষেত্রে এই অবহেলাই মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে রোগীর আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়—যেমন হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, ভুল বকা, ঘুম ঘুম ভাব, বা পরিচিত মানুষকেও চিনতে না পারা—তাহলে এক মুহূর্তও দেরি না করে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে এমন হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন। কারণ এই লক্ষণগুলি মস্তিষ্কে সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়, যা নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাধারণ ও ভয়ানক।
নিপা ভাইরাসের আরেকটি বড় বিপদের দিক হল—এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত রোগীর থুতু, লালা, কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে হাসপাতাল বা বাড়িতে রোগীর সেবার সময় সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।
এর ফলে শুধু রোগীই নয়, তাঁর পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও ঝুঁকির মুখে পড়েন। অতীতে কেরল ও বাংলাদেশে নিপা সংক্রমণের বহু ঘটনায় দেখা গেছে, চিকিৎসাকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। তাই সন্দেহভাজন নিপা রোগীকে আলাদা করে রাখা (আইসোলেশন) এবং সেবাকর্মীদের জন্য কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
নিপা ভাইরাস যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, ততই রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও বাড়ে। যদিও নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তবুও শুরুতেই সঠিক সাপোর্টিভ কেয়ার দেওয়া গেলে জটিলতা কমানো সম্ভব হয়। দেরিতে রোগ ধরা পড়লে ভাইরাস ইতিমধ্যেই মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে ব্যাপক ক্ষতি করে ফেলতে পারে।
এ কারণেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন—জ্বরকে কখনও হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়, বিশেষ করে যদি সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সন্দেহ হলেই পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
নিপা ভাইরাসের মতো রোগ মোকাবিলায় শুধু হাসপাতাল বা সরকার নয়, সাধারণ মানুষের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক সচেতনতা না বাড়লে এই ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। বাজার থেকে ফল কেনার সময় ভালো করে দেখে নেওয়া, কাটা বা আধখাওয়া ফল না খাওয়া, রাস্তায় পড়ে থাকা ফল এড়িয়ে চলা—এই ছোট ছোট অভ্যাসই বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।
এছাড়াও অসুস্থ অবস্থায় ভিড় এড়িয়ে চলা, মাস্ক ব্যবহার করা, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা—এই অভ্যাসগুলি শুধু নিপা নয়, অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে।
নিপা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে গুজব। ভুল তথ্য, অযথা ভয় বা অপ্রমাণিত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাই স্বাস্থ্য দপ্তর বা চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্যের উপরই ভরসা করা জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো কোনও খবর যাচাই না করে বিশ্বাস করা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
নিপা ভাইরাসের মতো মারাত্মক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা, তাঁদের আইসোলেশনে রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা—এই সব কাজ একসঙ্গে না হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি উন্নত ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোও ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নিপা ভাইরাস এক ভয়ংকর বাস্তবতা, যাকে অবহেলা করার কোনও জায়গা নেই। টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় সচেতনতা, সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসাই একমাত্র রক্ষা-কবচ। সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করলে বিপদ বাড়তে পারে বহু গুণ। তাই নিজের বা আশেপাশের কারও মধ্যে সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। জীবন বাঁচাতে হলে ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।