হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে অনেকেই খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ আনছেন, আবার কেউ নিয়মিত শরীরচর্চা ও ওজন কমানোর দিকে নজর দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট যোগাসনও হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হার্টের রোগ এখন আর শুধুমাত্র বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত কোনও সমস্যা নয়। বর্তমান দ্রুতগতির জীবনযাত্রা ও অভ্যাসগত পরিবর্তনের ফলে অল্প বয়স থেকেই হৃদযন্ত্র নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় মোবাইল, টিভি বা ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস শরীরচর্চার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, ফাস্টফুডে আসক্তি এবং মানসিক চাপ। এই সব কারণ মিলিয়েই হার্টের রোগের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম শুধু চোখ বা ঘাড়ের সমস্যাই তৈরি করে না, বরং মানসিক চাপও বাড়িয়ে তোলে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে মনোযোগ ধরে রাখার ফলে উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয় এবং শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দনের উপর। রক্তচাপ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলে হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, যা ভবিষ্যতে হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে হার্টের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো সচেতনতা, সঠিক জীবনযাপন এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে অল্প বয়স থেকেই হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা সম্ভব।
অন্য দিকে, মধ্যবয়স ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, মেদ বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের মতো সমস্যাগুলি হার্টের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এই কারণেই আজকাল অনেকেই হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনছেন। কেউ তেল-মশলা কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ বা চিনি ও ফাস্টফুড এড়িয়ে চলছেন। আবার অনেকে নিয়মিত জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করছেন বা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন। তবে শুধু ডায়েট বা ব্যায়াম নয়, হার্ট সুস্থ রাখতে যোগাসনও অত্যন্ত কার্যকর একটি উপায়।
যোগাসন শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি শরীর ও মনের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে। নিয়মিত যোগাভ্যাস রক্তসঞ্চালন উন্নত করে, মানসিক চাপ কমায় এবং স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে। এর ফলে হৃদযন্ত্রকে অযথা অতিরিক্ত কাজ করতে হয় না এবং হার্টের ক্ষমতাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট যোগাসন আছে, যেগুলি নিয়মিত করলে হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিচে এমনই তিনটি উপকারী যোগাসনের বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
বৃক্ষাসন
বৃক্ষাসন শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাসন। এই আসন করার সময় শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, ফলে মনও একাগ্র হয়। একাগ্র মন ও মানসিক স্থিরতা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। মানসিক উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং অতিরিক্ত চাপ হৃদযন্ত্রের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বৃক্ষাসন নিয়মিত করলে এই মানসিক অস্থিরতা অনেকটাই কমে যায়।
এ ছাড়া বৃক্ষাসন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে এবং রক্তসঞ্চালন উন্নত করতে সাহায্য করে। শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত প্রবাহ সঠিক ভাবে হলে হার্টকে অতিরিক্ত জোরে কাজ করতে হয় না। ফলে হৃদযন্ত্র ধীরে ও স্বাভাবিক ছন্দে কাজ করতে পারে। নিয়মিত এই আসন অভ্যাস করলে শরীরের ভারসাম্য, মনোযোগ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়, যা সার্বিক ভাবে হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
কী ভাবে করবেন: সোজা হয়ে দাঁড়ান। পা দুটো একসঙ্গে রাখুন এবং হাত স্বাভাবিক ভাবে শরীরের দু’পাশে রাখুন। এবার ডান পা ভাঁজ করে ডান পায়ের পাতাটি বাঁ উরুর ভেতরের দিকে যতটা উপরে সম্ভব রাখুন। শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে ধীরে ধীরে দু’হাত মাথার উপরে নমস্কারের ভঙ্গিতে তুলুন। এই অবস্থানে ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট থাকুন। দৃষ্টি সামনে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির রাখুন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখুন। এর পরে ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে পা সোজা করুন। একই প্রক্রিয়া বাঁ পা দিয়ে পুনরাবৃত্তি করুন।
কতক্ষণ করবেন: প্রতি পায়ে ১ মিনিট করে মোট ২ মিনিট।
অর্ধ মৎস্যেন্দ্রাসন
অর্ধ মৎস্যেন্দ্রাসন একটি বসে করা মোচড়ানো যোগাসন, যা বুকের পেশি ও মেরুদণ্ডকে প্রসারিত করে। এই আসন করার ফলে ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরে অক্সিজেনের প্রবাহ উন্নত হয়। যখন শরীরের প্রতিটি কোষ পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায়, তখন হৃদযন্ত্রকে তুলনামূলক ভাবে কম পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে হার্টের উপর চাপ কমে এবং হৃদযন্ত্র দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকে।
এই আসন হজমশক্তি উন্নত করে এবং পেটের চারপাশের অতিরিক্ত মেদ কমাতেও সাহায্য করে। অতিরিক্ত মেদ ও কোলেস্টেরল হার্টের রোগের একটি বড় কারণ। তাই অর্ধ মৎস্যেন্দ্রাসন নিয়মিত করলে পরোক্ষ ভাবে হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে। পাশাপাশি এই আসন মেরুদণ্ড নমনীয় রাখে এবং শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলিকে সক্রিয় করে তোলে।
কী ভাবে করবেন: পা সোজা করে সামনে ছড়িয়ে বসুন। বাঁ পা ভাঁজ করে ডান নিতম্বের পাশে রাখুন এবং ডান পা ভাঁজ করে বাঁ হাঁটুর উপর দিয়ে এনে বাঁ পায়ের বাইরে মেঝের উপর রাখুন। ডান হাত পিঠের পেছনে মেঝের উপর রাখুন। বাঁ হাত দিয়ে ডান হাঁটুকে ধরে ধীরে ধীরে ডানদিকে শরীর ঘোরান। চাইলে বাঁ হাত ভাঁজ করে ডান হাঁটুর উপর দিয়ে এনে ডান পায়ের আঙুল ধরতে পারেন। ঘাড় ঘুরিয়ে ডান কাঁধের উপর দিয়ে পেছনের দিকে তাকান এবং ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট এই অবস্থানে থাকুন। এর পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুন এবং অন্য দিকে একই প্রক্রিয়া করুন।
কতক্ষণ করবেন: প্রতি দিকে ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট।
শবাসন
শবাসন যোগাভ্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন। অনেকেই একে শুধুই বিশ্রামের আসন বলে মনে করেন, কিন্তু বাস্তবে শবাসনের উপকারিতা অত্যন্ত গভীর। এই আসন শরীরের প্রতিটি পেশি ও স্নায়ুকে সম্পূর্ণ ভাবে শিথিল করে। এর ফলে মানসিক চাপ কমে, উদ্বেগ প্রশমিত হয় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ হার্টের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর সমস্যাগুলির একটি, তাই শবাসন হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে বিশেষ ভাবে উপকারী।
নিয়মিত শবাসন করলে হৃদস্পন্দন ধীরে ও স্থিতিশীল হয়। এতে হার্ট অতিরিক্ত উত্তেজিত না হয়ে স্বাভাবিক ছন্দে কাজ করতে পারে। দীর্ঘ দিন মানসিক চাপ ও অনিদ্রার সমস্যায় ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে শবাসন খুবই কার্যকর। ভালো ঘুম ও মানসিক শান্তি হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখার অন্যতম শর্ত।
কী ভাবে করবেন: চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন। পা দুটো সামান্য ফাঁক করে রাখুন। হাত দুটো শরীরের থেকে একটু দূরে রাখুন এবং হাতের তালু আকাশের দিকে রাখুন। চোখ বন্ধ করুন এবং শরীরের প্রতিটি অংশ ধীরে ধীরে শিথিল করুন। মনকে শান্ত রেখে শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর মনোযোগ দিন। এই অবস্থায় সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিন।
সব ধরনের ব্যায়াম ও যোগাসন সম্পন্ন করার পর শবাসনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় দেওয়া অত্যন্ত উপকারী। এই সময়টুকু শরীর ও মন সম্পূর্ণ ভাবে বিশ্রাম পায়। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ শিথিল করলে হৃদস্পন্দন ধীরে ও স্থিতিশীল হয়, যা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধুমাত্র ওষুধ সেবন বা খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ আনাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জীবনযাত্রায় সামগ্রিক পরিবর্তন। নিয়মিত যোগাভ্যাস শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য হৃদযন্ত্রকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায় এবং কোলেস্টেরল ও মেদের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে, আর মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে হার্টের উপর অযথা চাপ পড়ে না।
এই চারটি বিষয়—যোগাভ্যাস, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সুস্থতা—একসঙ্গে মেনে চললে হৃদযন্ত্র দীর্ঘদিন সুস্থ ও সবল রাখা সম্ভব। তবে যাঁদের আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনও গুরুতর অসুস্থতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নিজে থেকে যোগাসন শুরু না করে অবশ্যই চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এতে নিরাপদ ভাবে হার্টের যত্ন নেওয়া সম্ভব হবে।