১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সম্মেলন ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী মোদী এআই এর নৈতিক ব্যবহারের জন্য মানব ভিশন প্রকাশ করেছেন তবে এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের মাঝেই এক চিনা রোবট কুকুরকে নিজেদের বলে দাবি করে চরম বিতর্কের মুখে পড়েছে গালগোটিয়াস বা ল্যাঙ্গোটিয়া ইউনিভার্সিটি যার ফলে তাদের এক্সপো থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির প্রগতি ময়দানে অবস্থিত সুবিশাল ভারত মণ্ডপমে আজ চলছে বিশ্বের অন্যতম মেগা প্রযুক্তি সম্মেলন ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬ গত ষোলোই ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই পাঁচ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন আজ তার চতুর্থ দিনে পা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সামিটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং আজ তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের এক যুগান্তকারী রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি বলেন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অবশ্যই মানুষের কল্যাণে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে এই মেগা সামিটে বিশ্বের তাবড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা উপস্থিত হয়েছেন যা ভারতকে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত নেতা হিসেবে বিশ্বের দরবারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে
সম্মেলনের চতুর্থ দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মানব বা মানব ভিশন এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য এই মানব ফ্রেমওয়ার্ক তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন মানব শব্দের এম মানে হলো মরাল অ্যান্ড এথিক্যাল বা নৈতিক ব্যবস্থা অর্থাৎ এআই প্রযুক্তিকে সর্বদা নৈতিকতার গণ্ডির মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে এ মানে হলো অ্যাকাউন্টেবল বা জবাবদিহিমূলক শাসন যার অর্থ হলো স্বচ্ছ নিয়মকানুন এবং কড়া নজরদারি থাকতে হবে এন মানে হলো ন্যাশনাল সভেরেন্টি বা জাতীয় সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ দেশের ডেটার ওপর সেই দেশেরই সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে দ্বিতীয় এ মানে হলো অ্যাক্সেসিবল বা সহজলভ্য যার অর্থ হলো এআই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না বরং তা সমাজের সবার কাছে পৌঁছাতে হবে এবং ভি মানে হলো ভ্যালিড বা বৈধ অর্থাৎ এআই কে অবশ্যই আইনসম্মত হতে হবে প্রধানমন্ত্রী জানান এই মানব ভিশন আগামী দিনে সারা বিশ্বের এআই ইকোসিস্টেমের জন্য একটি শক্তিশালী পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে
এই মেগা সামিটে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ থেকে শুরু করে গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই অ্যান্থ্রোপিক এর সিইও দারিও আমোদি এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উপস্থিত ছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ভারতের ডিজিটাল অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন ভারত এমন এক ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরি করেছে যা উন্নত বিশ্বের অন্য কোনো দেশ আজ পর্যন্ত করতে পারেনি তিনি শিশুদের সুরক্ষার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া এবং এআই এর ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান অন্যদিকে অ্যান্থ্রোপিক এর সিইও দারিও আমোদি বলেন এআই এর উন্নয়নে এবং গ্লোবাল সাউথের কাছে এর সুবিধা পৌঁছে দিতে ভারত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই ভারতের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত পরিবেশের প্রশংসা করেন এবং ভারতের তরুণ প্রজন্মের মেধার ওপর গভীর আস্থা প্রকাশ করেন
সামিটে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ব্যবসায়িক চুক্তি এবং মাইলফলক অর্জিত হয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হলো টাটা গ্রুপ এবং ওপেনএআই এর মধ্যে হওয়া স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ এই চুক্তির মাধ্যমে ভারতে একশো মেগাওয়াট ক্ষমতার এক বিশাল এআই পরিকাঠামো তৈরি করা হবে যা ভবিষ্যতে এক গিগাওয়াট পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে এই পরিকাঠামো সম্পূর্ণ সবুজ শক্তি বা গ্রিন এনার্জি ব্যবহার করে চলবে এবং লিকুইড কুলিং প্রযুক্তির সাহায্যে ডেটা সেন্টারগুলোকে ঠান্ডা রাখা হবে এছাড়াও এই সামিটে ভারত এক নতুন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড তৈরি করেছে এআই রেসপনসিবিলিটি ক্যাম্পেইনে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আড়াই লক্ষেরও বেশি মানুষ শপথ গ্রহণ করেছেন যা এআই এর নিরাপদ ব্যবহারের প্রতি ভারতের সাধারণ মানুষের সচেতনতার প্রমাণ দেয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব নিউ দিল্লি ফ্রন্টিয়ার এআই ইমপ্যাক্ট কমিটমেন্টস এর ঘোষণা করেছেন যেখানে বড় বড় এআই কোম্পানিগুলো সুরক্ষিত এবং দায়িত্বশীল এআই তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে
তবে এই বিশাল আন্তর্জাতিক সাফল্যের আবহের মধ্যেই সামিটের এক্সপো বা প্রদর্শনীতে এক বিশাল এবং লজ্জাজনক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে যা সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমে তুমুল আলোড়ন ফেলেছে নয়ডা ভিত্তিক গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি যা ইন্টারনেটে সাধারণ মানুষের কাছে মিম এবং ট্রোলের কারণে ল্যাঙ্গোটিয়া ইউনিভার্সিটি নামেও প্রবল পরিচিত তারা এই সামিটে এক চরম অনভিপ্রেত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে সামিটের বিশাল এক্সপোতে দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্টার্টআপ এবং প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন উদ্ভাবন দেখাচ্ছিল সেখানে এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি অত্যাধুনিক রোবট কুকুর বা রোবডগ প্রদর্শন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে থাকা কর্মীরা গর্বের সাথে দাবি করেছিলেন যে এই রোবটটি তাদের নিজস্ব ছাত্রছাত্রী এবং গবেষকদের তৈরি এক অভিনব উদ্ভাবন
কিন্তু প্রযুক্তি দুনিয়ায় কোনো কিছুই বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় না সামিটে উপস্থিত থাকা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এবং সাংবাদিকরা খুব দ্রুতই ধরে ফেলেন যে ওই রোবট কুকুরটি আসলে একটি চিনা কোম্পানির তৈরি করা সাধারণ কমার্শিয়াল রোবট এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি স্রেফ একটি কেনা চিনা রোবটকে নিজেদের তৈরি উদ্ভাবন বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার সাথে সাথেই সামিট জুড়ে তীব্র সমালোচনা এবং হাসাহাসি শুরু হয়ে যায় একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যেখানে সারা বিশ্ব ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির দিকে তাকিয়ে আছে সেখানে এমন একটি জালিয়াতির ঘটনা দেশের সম্মানকে ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনরা এই ল্যাঙ্গোটিয়া ইউনিভার্সিটির তীব্র সমালোচনা শুরু করেন এবং তাদের এই কাজকে ভারতের মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্পের প্রতি এক বড় অপমান বলে আখ্যা দেন
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এবং সামিটের আয়োজকরা এই চুরির ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেন এবং বিন্দুমাত্র দেরি না করে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেন আইটি সচিব এস কৃষ্ণান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে এমন কোনো প্লেজিয়ারিজম বা চুরির ঘটনা সরকার কিছুতেই বরদাস্ত করবে না আয়োজকদের কড়া নির্দেশে গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটিকে অবিলম্বে এক্সপো থেকে তাদের সমস্ত জিনিসপত্র এবং স্টল গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় সামিটের নিরাপত্তারক্ষীদের পাহারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের কার্যত অপমানিত হয়েই সামিট প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যেতে হয় এই ইভিকশন বা বহিষ্কারের ঘটনা অন্যান্য সমস্ত প্রদর্শকদের কাছে এক কড়া বার্তা পৌঁছে দেয় যে উদ্ভাবনের নামে কোনো রকম প্রতারণা এখানে সহ্য করা হবে না
চারদিক থেকে প্রবল বিতর্কের মুখে পড়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসির পাত্র হয়ে গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি অবশেষে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে দাবি করেছে যে তাদের স্টলে থাকা কর্মীর অজ্ঞতার কারণেই এই বিশাল বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে তারা জানিয়েছে ওই কর্মী ক্যামেরার সামনে অতিরিক্ত উৎসাহে এবং উত্তেজনার বশে সাংবাদিকদের ভুল তথ্য দিয়েছিলেন এবং ওই প্রযুক্তিগত পণ্যের আসল উৎস সম্পর্কে তার কোনো সঠিক ধারণা ছিল না বিশ্ববিদ্যালয় আরও জানিয়েছে যে তারা কখনোই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো চিনা পণ্যকে নিজেদের বলে দাবি করতে চায়নি এবং তারা আয়োজকদের সম্মান জানিয়ে এক্সপো থেকে সরে এসেছে কিন্তু তাদের এই সাফাই সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি অনেকেই মনে করছেন যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে না জেনে এমন একটি বড় মঞ্চে ভুল তথ্য দিতে পারে
এই একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা বাদ দিলে ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬ ভারতের জন্য এক অকল্পনীয় এবং বিশাল সাফল্য হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী এই সামিটে দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন এবং জনগণের প্রবল চাহিদার কারণে এক্সপোর সময়কাল আরও এক দিন বাড়িয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে এই সামিট প্রমাণ করে দিল যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় ভারত এখন আর পিছিয়ে নেই বরং বিশ্বের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি কোন পথে চলবে তা এখন ভারতের মাটি থেকেই নির্ধারিত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং ভারতের তরুণ প্রজন্মের মেধার ওপর ভর করে ভারত আজ ডিজিটাল মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ভারত মণ্ডপমের এই মেগা ইভেন্ট শুধু একটি সম্মেলন নয় এটি হলো একুশ শতকে ভারতের বিশ্বজয়ের এক নতুন ইশতেহার
Tags: