অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি বিচে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার রেশ গিয়ে পড়ল ক্রিকেটের ময়দানেও। অ্যাডিলেড ওভালে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ টেস্ট ম্যাচের আগে দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাঠের চারপাশে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাইফেলধারী পুলিশ মোতায়েন এবং অর্ধনমিত জাতীয় পতাকা সব মিলিয়ে ক্রিকেট উৎসবের আবহে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। বন্ডির ঘটনায় নিহতদের স্মরণে ম্যাচ শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন দুই দলের ক্রিকেটার, ম্যাচ অফিসিয়াল এবং দর্শকেরা। সাধারণত যে অ্যাডিলেড ওভাল আনন্দ, উল্লাস ও করতালিতে মুখর থাকে, সেদিন সেখানে ছিল নিস্তব্ধতা ও ভারাক্রান্ত পরিবেশ। ক্রিকেটারদের মুখেও ছিল গম্ভীরতা, যেন মাঠের বাইরের ট্র্যাজেডি তাঁদের মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়াজগৎ বরাবরই কঠিন সময়ে একতার বার্তা দিয়ে এসেছে, আর এই ম্যাচও তার ব্যতিক্রম নয়। নিরাপত্তার কড়াকড়ি ও শোকাবহ পরিবেশের মধ্যেও খেলাটি এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কারণ ক্রিকেটকেই ধরা হয় আশার প্রতীক হিসেবে। তবে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল বন্ডি সন্ত্রাসের ক্ষত শুধু শহর নয়, জাতির মননেও গভীর ছাপ ফেলেছে।
বিশেষ প্রতিবেদক | অ্যাডিলেড ওভাল থেকে
অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়াজগতে 'অ্যাশেজ' মানেই এক চিরকালীন উন্মাদনা। এটি কেবল একটি টেস্ট সিরিজ নয়; এটি দেড়শ বছরের পুরনো এক আভিজাত্য, জেদ এবং মর্যাদার লড়াই। মেলবোর্ন থেকে সিডনি, ব্রিসবেন থেকে পার্থ—অ্যাশেজের দিনগুলোতে অস্ট্রেলিয়া যেন এক বিশাল উৎসবে মেতে ওঠে। কিন্তু এবারের অ্যাডিলেড ওভালের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে মাঠে বিয়ারের গ্লাস হাতে দর্শকদের উল্লাস আর ড্রামের শব্দে কান পাতা দায় হতো, সেখানে আজ বিরাজ করছে এক অখণ্ড নিস্তব্ধতা। মাঠের ভেতরে যখন প্যাট কামিন্স আর জেমস অ্যান্ডারসনরা একে অপরের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত হচ্ছেন, তখন মাঠের বাইরে রাইফেলধারী পুলিশের টহল আর অর্ধনমিত জাতীয় পতাকা মনে করিয়ে দিচ্ছে—দেশটি এক গভীর ক্ষতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
কয়েকদিন আগে সিডনির বিখ্যাত বন্ডি বিচে যা ঘটে গেল, তা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সিডনির অন্যতম ব্যস্ত এই পর্যটন কেন্দ্রটি শান্ত সমুদ্র আর সোনালী বালুর জন্য পরিচিত। কিন্তু এক অপরাহ্নে সেখানে নেমে আসে নারকীয় তান্ডব। এক আততায়ীর এলোপাথাড়ি ছুরি ও অস্ত্র হামলায় মুহূর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়েন নিরীহ পথচারী, পর্যটক এবং কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে সেই ভয়াবহ চিত্র। মানুষ যখন প্রাণের ভয়ে দিগ্বিদিকে ছুটছে, তখন সমুদ্রের নোনা বাতাসের বদলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল রক্তের গন্ধ। এই হামলা কেবল মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের যে 'নিরাপদ জীবনযাত্রার' গর্ব, তাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। গোটা বিশ্ব যখন এই হামলায় স্তব্ধ, ঠিক তখনই শুরু হওয়ার কথা অ্যাশেজের এই গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট।
অ্যাডিলেড ওভালকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ক্যাথেড্রাল চার্চের চূড়া আর পার্কল্যান্ডের মাঝখানে এই মাঠটি সাধারণত উৎসবের রঙে রঙিন থাকে। কিন্তু এবারের চিত্রটি ছিল বিষণ্ণ।
নিরাপত্তার কঠোর বেষ্টনী: স্টেডিয়ামের প্রবেশপথে সাধারণ নিরাপত্তা তল্লাশির বদলে ছিল বিশেষায়িত বাহিনীর কড়া নজরদারি। প্রতিটি গেটে রাইফেলধারী স্নাইপার এবং আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত কমান্ডোদের উপস্থিতি দর্শকদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।
অর্ধনমিত পতাকা: স্টেডিয়ামের স্কোরবোর্ডের পাশে এবং গ্যালারির উঁচুতে থাকা অস্ট্রেলীয় জাতীয় পতাকাগুলো পতপত করে ওড়ার বদলে আজ অর্ধনমিত। এটি কেবল রাষ্ট্রীয় শোক নয়, এটি প্রতিটি অস্ট্রেলীয়র মনের যন্ত্রণার প্রতীক।
দর্শকদের প্রতিক্রিয়া: মাঠে আসা দর্শকদের পরনে প্রিয় দলের জার্সি থাকলেও মুখে ছিল এক গম্ভীর অভিব্যক্তি। অনেককেই দেখা গেছে বন্ডির হামলায় নিহতদের স্মরণে ফুল বা বিশেষ বার্তা সম্বলিত প্লাকার্ড হাতে নিতে।
ম্যাচ শুরুর আগে প্রথাগত জাতীয় সঙ্গীতের সময় গ্যালারি ছিল নজিরবিহীনভাবে শান্ত। এরপর আসে সেই মুহূর্ত—এক মিনিটের নীরবতা। ৩০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়ামে তখন একটি পিন পড়ার শব্দও যেন শোনা যাচ্ছিল। এই নীরবতা ছিল বন্ডির সেই মায়েদের জন্য যারা সন্তান হারিয়েছেন, সেই শিশুদের জন্য যারা অনাথ হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড—দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের খেলোয়াড়রাই হাতে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন। স্টিভ স্মিথ বা জো রুটের মতো তারকাদের চোখেমুখে যে কাঠিন্য দেখা যায়, তা আজ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল এক মানবিক বেদনায়। এই এক মিনিট যেন প্রমাণ করে দিল, সীমানা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাই শ্রেষ্ঠ।
বন্ডি হামলার পর অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। অ্যাশেজের মতো হাই-প্রোফাইল ইভেন্ট সবসময়ই উগ্রপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই স্টেডিয়ামজুড়ে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন ব্যবস্থা:
ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ড্রোন: আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিটি দর্শকের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন: প্রায় ২ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে কেবল এই টেস্ট ম্যাচকে ঘিরে।
অদৃশ্য ভয়: নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র হলেও দর্শকদের মনে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছিল। মাঠের আনন্দ নিতে আসা মানুষ বারবার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন। ক্রিকেটের যে 'নির্ভার আনন্দ', তা যেন এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আড়ালে কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে।
বন্ডি ট্র্যাজেডির পর অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক মাধ্যমে এক বিরাট বিতর্ক শুরু হয়েছিল—এই শোকের আবহে কি খেলা চালিয়ে যাওয়া উচিত? একদল যুক্তি দিয়েছিলেন, যখন দেশ কাঁদছে, তখন ব্যাটে-বলের লড়াই অমানবিক। কিন্তু ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশাসন ভিন্ন মত পোষণ করে। তাদের যুক্তি ছিল—সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্যই হলো জীবনকে থামিয়ে দেওয়া। খেলা চালিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো আমরা হেরে যাইনি। ক্রিকেট এখানে একতার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। মানুষ যখন একসাথে গ্যালারিতে বসেছে, তখন তারা একে অপরের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে।
মাঠে খেলা শুরু হলেও ক্রিকেটের সেই চিরচেনা আগ্রাসন লক্ষ্য করা যায়নি। বোলারদের বাউন্সার বা ব্যাটসম্যানদের বাউন্ডারিতে যে উগ্র উল্লাস থাকে, তা আজ ছিল অনেকটা সংযত। ধারাভাষ্যকাররাও লক্ষ্য করেছেন যে, খেলোয়াড়দের মনসংযোগে কিছুটা হলেও ব্যাঘাত ঘটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো জাতীয় বিপর্যয়ের সময় ক্রীড়াবিদরা অনেক সময় দ্বিগুণ চাপে থাকেন। একদিকে পেশাদারিত্বের দায়, অন্যদিকে দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। মাঠের প্রতিটি শট যেন ছিল বন্ডির সেই যন্ত্রণাকাতর মানুষদের উৎসর্গ করা।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবী যখনই সংকটে পড়েছে, খেলাধুলা মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।
৯/১১ এবং বেসবল: ২০০১ সালে আমেরিকায় হামলার পর বেসবল ম্যাচগুলো যখন শুরু হয়, তখন তা কেবল খেলা ছিল না, তা ছিল আমেরিকার পুনরুত্থানের ঘোষণা।
মুম্বই হামলা (২৬/১১) এবং ক্রিকেট: ২০০৮ সালে মুম্বই হামলার কিছুদিন পরেই ভারত বনাম ইংল্যান্ডের টেস্ট সিরিজ শুরু হয়েছিল। শচীন টেন্ডুলকার সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে তা উৎসর্গ করেছিলেন শহীদদের প্রতি।
অ্যাডিলেডের এই ম্যাচও সেই তালিকারই অন্তর্ভুক্ত হলো। এটি প্রমাণ করল যে, রাইফেলধারী পুলিশ বা ড্রোন দিয়ে হয়তো শরীর রক্ষা করা যায়, কিন্তু মনের ক্ষত সারাতে প্রয়োজন ক্রিকেটের মতো একটি সর্বজনীন ভাষা।
এই টেস্ট ম্যাচ কেবল ক্রিকেট রেকর্ডের জন্য নয়, বরং সামাজিক সংহতির জন্য মনে রাখা হবে। মাঠে উপস্থিত এক দর্শক অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলছিলেন, "আমরা আজ এখানে এসেছি কারণ আমরা দেখাতে চাই আমরা একা নই। ক্রিকেট আমাদের পরিবার।"
এই পারিবারিক বন্ধনটাই সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় শত্রু। যখন বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ একসাথে বসে বন্ডির নিহতদের জন্য প্রার্থনা করে, তখন ঘৃণার পরাজয় ঘটে।
অ্যাশেজের এই বিষণ্ণ সূচনা আমাদের শিখিয়ে দিল যে, ক্রিকেট কেবল রানের হিসাব নয়। এটি সমাজের দর্পণ। ক্রিকেটের গ্ল্যামার আর অর্থের আড়ালে যে মানবিক মুখটি রয়েছে, তা আজ অ্যাডিলেডে স্পষ্ট। বন্ডি সন্ত্রাসের ক্ষত হয়তো সময়ের সাথে সাথে সেরে যাবে, কিন্তু অ্যাডিলেড ওভালের এই মৌন পরিবেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।
রাইফেলধারী পুলিশের নজরদারিতে শুরু হওয়া এই ম্যাচ হয়তো অনেক উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত উপহার দেবে, হয়তো কোনো দল জয়ী হবে। কিন্তু দিনের শেষে জয় হবে সেই এক মিনিটের নীরবতার। জয় হবে সেই অর্ধনমিত পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একতাবদ্ধ মানুষগুলোর।
বন্ডি বিচের সেই রক্তভেজা বালির স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীটা কত অনিশ্চিত। আর অ্যাডিলেডের এই অ্যাশেজ টেস্ট আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, সেই অনিশ্চয়তাকে জয় করার ক্ষমতা কেবল আমাদের ঐক্যেই আছে। খেলা চলবে, রেকর্ড ভাঙবে, কিন্তু শোক আর শ্রদ্ধার এই মেলবন্ধন ক্রিকেটকে আজ অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেল।
অ্যাডিলেড ওভালের এই ম্যাচটি আজ আর কেবল অ্যাশেজ নয়, এটি মানবতার পরীক্ষার এক অগ্নিমঞ্চ। আর সেই পরীক্ষায় অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্ব ক্রিকেট প্রমাণ করল—সন্ত্রাস জীবনকে আঘাত করতে পারে, কিন্তু জীবনের গতিকে স্তব্ধ করতে পারে না।