Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কুসুম বাদ দিয়ে ডিমের সাদা অংশটুুকু খান তাতে ক্ষতি হতে পারে বলে চিকিৎসকের দাবি সত্যি

কারও লক্ষ্য রোগা হওয়া। কেউ মনে করেন কুসুম খেলে কোলেস্টেরল বাড়বে। কাউকে চিকিৎসকই নিষেধ করে দিয়েছেন কুসুম খেতে। বলেছেন, বড়জোর আধখানা কুসুম চলতে পারে। কিংবা একটি।

ডিম নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বাঙালির রান্নাঘর থেকে জিম-ডায়েটের তালিকা—সব জায়গাতেই ডিম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। কিন্তু কুসুম থাকবে না সাদা অংশই যথেষ্ট—এই প্রশ্ন ঘিরে বিভ্রান্তি দীর্ঘদিনের। কেউ মনে করেন কুসুম মানেই অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, কেউ আবার বলেন কুসুম বাদ দিলে ডিমের আসল পুষ্টিগুণই নষ্ট হয়। সম্প্রতি দিল্লির হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অলোক চোপড়া-র মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তাঁর দাবি, শুধু ডিমের সাদা অংশ খাওয়াও পুরোপুরি নিরাপদ নয়; বরং কুসুম বাদ দিলে প্রদাহ (inflammation) বাড়তে পারে। এই বক্তব্য ঘিরে স্বাস্থ্যসচেতন মহলে স্বাভাবিকভাবেই আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে পুষ্টিবিদ শ্রেয়া চক্রবর্তী বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, চিকিৎসকের বক্তব্য পুরোপুরি অসত্য নয়, তবে তা সবার ক্ষেত্রে একভাবে প্রযোজ্যও নয়। অর্থাৎ, বিষয়টি সাদা-কালো নয়; বরং নির্ভর করছে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, অ্যালার্জির প্রবণতা, বিপাকক্রিয়া ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের উপর।


ডিমের গঠন ও পুষ্টিগুণ: আসলে কী আছে কোথায়?

একটি ডিম মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—
১. সাদা অংশ (Egg white)
২. কুসুম (Egg yolk)

ডিমের সাদা অংশে কী থাকে?

ডিমের সাদা অংশে প্রধানত প্রোটিন ও জল থাকে। এতে ক্যালরি কম, চর্বি নেই বললেই চলে। সাদা অংশের মূল প্রোটিনগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • ওভাল অ্যালবুমিন (Ovalbumin)

  • ওভোমিউকয়েড (Ovomucoid)

  • ওভোট্রান্সফেরিন

  • লাইসোজাইম

এই প্রোটিনগুলি শরীরের পেশি গঠন ও কোষ মেরামতে সাহায্য করে। তাই জিম-যাওয়া মানুষ, বডি বিল্ডার বা ওজন কমাতে আগ্রহীদের মধ্যে সাদা অংশ খাওয়ার প্রবণতা বেশি।

কুসুমে কী থাকে?

কুসুমকে অনেকেই ভয় পান, কিন্তু এখানেই রয়েছে:

  • ভিটামিন A, D, E, K

  • ভিটামিন B12

  • কোলিন (Choline)

  • লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন (চোখের জন্য উপকারী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট)

  • স্বাস্থ্যকর চর্বি

  • আয়রন, জিঙ্ক

অর্থাৎ কুসুম হলো পুষ্টির ভাণ্ডার। কুসুমেই ডিমের অধিকাংশ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থাকে।


কোলেস্টেরল বিতর্ক: সত্যি কি কুসুম ক্ষতিকর?

একসময় মনে করা হতো, কুসুমে কোলেস্টেরল বেশি থাকায় তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য থেকে প্রাপ্ত কোলেস্টেরল সরাসরি রক্তের কোলেস্টেরল বাড়ায় না সবার ক্ষেত্রে। বরং শরীর নিজেই প্রয়োজন অনুযায়ী কোলেস্টেরল উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে যাঁদের আগে থেকেই:

  • উচ্চ কোলেস্টেরল

  • হৃদরোগ

  • ডায়াবেটিস

  • মেটাবলিক সিনড্রোম

রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কুসুমের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন হতে পারে।


ডিমের সাদা অংশ কি সত্যিই প্রদাহ বাড়ায়?

ডাঃ অলোক চোপড়া-র বক্তব্য অনুযায়ী, কুসুম ছাড়া সাদা অংশ খেলে তা “ইনফ্ল্যামেটরি প্রোটিন”-এর মতো আচরণ করতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে সবার ক্ষেত্রেই তা ক্ষতিকর।

পুষ্টিবিদ শ্রেয়া চক্রবর্তীর মতে, ডিমের সাদা অংশে থাকা কিছু প্রোটিন বিশেষ ব্যক্তির শরীরে অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে। অ্যালার্জি হলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হয়ে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর লক্ষণ হতে পারে:

  • ত্বকে র‌্যাশ

  • চুলকানি

  • পেটের সমস্যা

  • বমি বমি ভাব

  • শ্বাসকষ্ট (গুরুতর ক্ষেত্রে)

অর্থাৎ, যাঁদের ডিমে অ্যালার্জি আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সাদা অংশ সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সাধারণ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটি পুষ্টিকর প্রোটিনের উৎস হিসেবেই কাজ করে।


কুসুম-সাদা অংশ একসঙ্গে খাওয়ার উপকারিতা

ডিম প্রকৃতির এক “কমপ্লিট ফুড” হিসেবে পরিচিত। কারণ এতে প্রয়োজনীয় প্রায় সব অ্যামিনো অ্যাসিড সঠিক অনুপাতে থাকে। কুসুম ও সাদা অংশ একত্রে খেলে:

news image
আরও খবর
  • প্রোটিনের জৈবপ্রাপ্যতা (bioavailability) বাড়ে

  • ফ্যাট-সোলিউবল ভিটামিন শোষণ ভাল হয়

  • দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে

  • পেশি ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভাল থাকে

কোলিন, যা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও স্মৃতিশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রধানত কুসুমেই থাকে। গর্ভবতী নারীদের জন্যও কোলিন অত্যন্ত জরুরি।


ওজন কমাতে কুসুম বাদ দেওয়া কি জরুরি?

অনেকে মনে করেন, কুসুম বাদ দিলে ক্যালরি কমে যায়। সত্যিই কুসুমে কিছুটা বেশি ক্যালরি ও চর্বি থাকে। কিন্তু সেই চর্বির বড় অংশই স্বাস্থ্যকর। উপরন্তু, কুসুম খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।

শুধু সাদা অংশ খেলে:

  • প্রোটিন পাওয়া যায়

  • কিন্তু প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল কমে যায়

অর্থাৎ, সম্পূর্ণ পুষ্টির জন্য গোটা ডিমই বেশি উপকারী।


কারা কুসুম কম খাবেন?

নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:

  • যাঁদের LDL কোলেস্টেরল খুব বেশি

  • যাঁদের একাধিক হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে

  • যাঁদের পারিবারিকভাবে হাইপারলিপিডেমিয়া আছে

তবে অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে দিনে ১টি সম্পূর্ণ ডিম খাওয়া নিরাপদ বলেই বিবেচিত।


ডিম, প্রদাহ ও ক্যানসার: কতটা সম্পর্ক?

ইনফ্ল্যামেশন দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন অসুখের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এটা সত্য। কিন্তু ডিমের সাদা অংশ সাধারণ মানুষের শরীরে সরাসরি ক্যানসারের কারণ—এমন প্রমাণ নেই। বরং ডিমে থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও পুষ্টি উপাদান অনেক ক্ষেত্রে কোষের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।

অ্যালার্জি থাকলে প্রদাহ বাড়তে পারে, কিন্তু সেটি একটি ব্যক্তিনির্ভর প্রতিক্রিয়া।


রান্নার ধরনেও কি প্রভাব পড়ে?

হ্যাঁ।

  • অতিরিক্ত তেলে ভাজা ডিম স্বাস্থ্যকর নয়।

  • অল্প তেলে বা সেদ্ধ ডিম বেশি উপকারী।

  • কাঁচা ডিম খাওয়া উচিত নয় (ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি থাকে)।

সঠিকভাবে রান্না করলে ডিম সহজপাচ্য হয় এবং প্রোটিন শোষণ ভাল হয়।


শেষকথা

ডিমের কুসুম নিয়ে ভয় বা সাদা অংশ নিয়ে অন্ধবিশ্বাস—দুটিই চরমপন্থা। ডাঃ অলোক চোপড়া-র বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনও খাদ্যকে একপাক্ষিকভাবে বিচার করা ঠিক নয়। আবার পুষ্টিবিদ শ্রেয়া চক্রবর্তীর কথাও গুরুত্বপূর্ণ—সবাই এক নয়। কারও অ্যালার্জি থাকলে সমস্যা হতে পারে, কিন্তু তাই বলে সবার ক্ষেত্রেই সাদা অংশ ক্ষতিকর—এমন নয়।

সুস্থ মানুষের জন্য গোটা ডিমই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, পুষ্টিকর খাবার। পরিমিত পরিমাণে, সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করে খেলে ডিম শরীরের উপকারই করে। বিশেষ কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া ভালো, কিন্তু তথ্যভিত্তিক সচেতনতা আরও জরুরি। ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে তাই আতঙ্ক নয়, দরকার ভারসাম্য ও ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত।

উপসংহার

ডিমকে ঘিরে বিতর্ক আসলে আমাদের খাদ্যসংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য-মনস্তত্ত্বেরই প্রতিফলন। কখনও কুসুমকে ‘শত্রু’ ভাবা হয়েছে, কখনও আবার সাদা অংশকে ‘সেরা’ বলে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবটা এত সরল নয়। দিল্লির হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অলোক চোপড়া-র মন্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনও খাদ্যকে একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা ঠিক নয়। অন্যদিকে পুষ্টিবিদ শ্রেয়া চক্রবর্তী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ডিমের সাদা অংশ সবার জন্য ক্ষতিকর—এমন দাবি যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনই কুসুম সব পরিস্থিতিতে নিরাপদ—এমন কথাও নিরঙ্কুশ সত্য নয়।

ডিম একটি পূর্ণাঙ্গ খাদ্য—এ কথা বিজ্ঞানের বহু গবেষণাতেই প্রমাণিত। কুসুম ও সাদা অংশ একত্রে থাকলেই ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণতা পায়। সাদা অংশে থাকা উচ্চমানের প্রোটিন পেশি গঠন ও কোষ মেরামতে সাহায্য করে, আবার কুসুমে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখে। কোলিন, ভিটামিন ডি, লুটেইন—এই সব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কেবল কুসুমেই পাওয়া যায়। ফলে কুসুম বাদ দিলে আমরা শুধু ক্যালরি নয়, একাধিক প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকেও বঞ্চিত হই।

তবে এটাও সত্য, সব শরীর এক রকম নয়। যাঁদের ডিমে অ্যালার্জি রয়েছে, বিশেষত ডিমের সাদা অংশে থাকা নির্দিষ্ট প্রোটিনে সংবেদনশীলতা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রদাহ বা অস্বস্তি হতে পারে। আবার যাঁদের দীর্ঘদিনের হৃদরোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা বিপাকজনিত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে কুসুমের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ডিম খাওয়ার নিয়ম সবার জন্য এক ছাঁচে ফেলা যায় না।

আমাদের খাদ্যাভ্যাসে প্রায়ই দেখা যায়—কোনও একটি উপাদানকে হঠাৎ ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ তকমা দেওয়া হয়। কখনও কার্বোহাইড্রেট বাদ, কখনও চর্বি বাদ, কখনও আবার কুসুম বাদ। কিন্তু শরীর একটি জটিল ব্যবস্থা, যেখানে পুষ্টির ভারসাম্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেবলমাত্র ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে বা ভ্রান্ত ধারণার বশে যদি কেউ দীর্ঘদিন কুসুম এড়িয়ে চলেন, তবে তা পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করতে পারে। আবার চিকিৎসকের নির্দিষ্ট নির্দেশ থাকলে সেই পরামর্শ মেনে চলাও সমান জরুরি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন বিষয়টি। শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ অনেক অসুখের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, ঠিকই। কিন্তু ডিমের সাদা অংশ খাওয়া মানেই সবার শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি হবে—এমন বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই। বরং অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়া নিরাপদ ও উপকারী। সমস্যার মূল থাকে ব্যক্তিগত সহনশীলতা, অ্যালার্জি বা বিদ্যমান রোগে।

সুতরাং, কুসুম ছাড়া ডিম খাওয়াই একমাত্র স্বাস্থ্যকর—এমন ধারণা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই কুসুম খেলে অবধারিত বিপদ—এই ভয়ও ভিত্তিহীন। সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পথ হলো সচেতনতা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যপরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।

খাদ্য নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত। ডিমের ক্ষেত্রেও তাই—পরিমিতি, ভারসাম্য এবং নিজের শরীরের চাহিদা বোঝাই শেষ কথা। সুস্থ মানুষের জন্য গোটা ডিমই হতে পারে একটি সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর যাঁদের বিশেষ সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য ব্যক্তিনির্ভর খাদ্যতালিকাই সঠিক পথ।

অতএব, কুসুম বনাম সাদা অংশের দ্বন্দ্বে না গিয়ে, বিজ্ঞানসম্মত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই হোক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি। স্বাস্থ্যরক্ষায় সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই সচেতনতা যেন তথ্য, যুক্তি ও ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকে—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Preview image